৪২ বছর পর চরম সত্যের মুখোমুখি এক মা

Feature Image

স্বাধীনবাংলা২৪.কম

আর্ন্তজাতিক ডেস্ক: ১৯৭৫ সালে মারা গিয়েছিল লিডিয়া রেইডের সদ্যোজাত সন্তান। নাম রেখেছিলেন গ্যারি। ৪২ বছর ধরে গ্যারির সমাধিতে রোজ যেতেন লিডিয়া। নিভৃতে বসে তার কথা ভাবতেন। ওর সুন্দর বাদামি চোখগুলো স্মৃতিতে ভাসতো।

হঠাৎ করে চরম এক সত্যের মুখোমুখি হন লিডিয়া। যে কফিনে এত দিন তিনি ফুল দিয়ে আসছেন সেটিতে তার সন্তানের কোনো দেহাবশেষ নেই। বিক্ষিপ্ত, দিশেহারা লিডিয়া উত্তর খুঁজে ফেরেন, কেন এমন হলো? কোথায় তাঁর সন্তান?

ফেরা যাক পেছনে। স্কটল্যান্ডের লিডিয়া মাত্র ২৬ বছর বয়সেই তৃতীয়বারের মতো মা হন। গর্ভধারণের ৩৪ সপ্তাহে জটিলতা তৈরি হওয়ায় অস্ত্রোপচার করে বের করে আনা হয় শিশুটিকে। নির্দিষ্ট সময়ের আগে জন্ম নেওয়ায় শিশুটি অসুস্থ ছিল। তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রাখা হয়। জন্মের পর পর, লিডিয়াকে দেখতে দেওয়া হয়নি গ্যারিকে। তবে লিডিয়ার জোরাজুরিতে এক সময় গ্যারিকে দেখার সুযোগ দেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

গ্যারি খুবই অসুস্থ ছিল। ওর অস্ত্রোপচার করা হয়। প্রতিদিন ওর শরীর থেকে টিস্যু সংগ্রহ করতেন চিকিৎসকেরা। আর ছোট্ট গ্যারির হাত আলতো করে ধরে তাঁকে আদর করতেন মা।

এভাবেই চলছিল। একসময় গ্যারি অনেক অসুস্থ হয়ে পড়ে। ওকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। লিডিয়াকে একদিন জানানো হয়, গ্যারি মারা গেছে। খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে যান লিডিয়া। তবে তাঁর সঙ্গে অদ্ভুত আচরণ করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তাঁকে দেখানো হচ্ছিল না মৃত শিশুটিকে। বহু অনুনয়ের পর যে শিশুটির মৃতদেহ দেখানো হয় লিডিয়ার মনে হয় সেটি গ্যারির নয়। কিন্তু সবাই মিলে তাঁকে বোঝান, তীব্র হতাশার কারণে দৃষ্টিভ্রম হয়েছে।

কেটে যায় অনেকদিন। শিশুর সমাধির পাশে রোজ যেতেন লিডিয়া। কিন্তু মনে সন্দেহটি থেকেই গিয়েছিল। লিডিয়া শোনেন, ১৯৯৯ সালে যুক্তরাজ্যের হাসপাতালগুলোর অঙ্গ কেলেঙ্কারির ঘটনা। মৃত ব্যক্তির আত্মীয়ের সম্মতি না নিয়ে গোপনে অঙ্গ কেটে রেখে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে যুক্তরাজ্যের হাসপাতালগুলোর ওপর। বিশেষ করে মৃত নবজাতকের ক্ষেত্রেই এমনটি বেশি ঘটে। তদন্তে বের হয়ে আসে লিভারপুলের ‘অলড্যার হেই চিলড্রেন্স হসপিটালে’ ময়নাতদন্তের সময় মৃত শিশুর শরীরের অংশ রেখে দেন ডাচ প্যাথলজিস্ট ডিক ভ্যান ভেলজেন। এই বিষয়ে শিশুদের পিতামাতাকে কিছুই জানানো হতো না। তদন্তে আরও বের হয়ে আসে, এমন ঘটনা ঘটছে যুক্তরাজ্যসহ স্কটল্যান্ডের বহু হাসপাতালে। মূলত পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্যই অভিভাবকের সম্মতি না নিয়ে শিশুদের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ, শিশুর মৃতদেহ বিশেষ পদ্ধতিতে হাসপাতালে সংরক্ষণ করত কর্তৃপক্ষ। ।

২০০০ সালে স্কটল্যান্ডের হাসপাতালেও এমন ঘটনা ঘটেছে এই তথ্য ফাঁস হয়। লিডিয়ার মনে পড়ে সেই সময়ের কথা। যে শিশুর মৃতদেহ তিনি দেখেছিলেন সেটি গ্যারির ছিল না। লিডিয়ার সন্দেহ হয় সমাধিতে গ্যারির মৃতদেহ নেই। বহু আইনি প্রক্রিয়ার পর ৪২ বছর পর সমাধি থেকে তোলা হয় কফিন। কফিনটি খোলার পর তাঁর ভেতরে পাওয়া যায় শিশুর পোশাক, শুকনো ফুল। কিন্তু কোনো দেহাবশেষ নেই। লিডিয়া জানতে চান, ‘তাহলে গ্যারি কোথায়? ওর ভাগ্যে কি জুটেছে?’

লিডিয়া হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন? কোনো সদুত্তর পান না। এরপর ‘নিরাপরাধদের ন্যায়বিচার’ (জাস্টিস ফর ইনোসেন্টস) ব্যানারে আন্দোলন গড়ে তোলেন লিডিয়া। এই আন্দোলন পরিচালনার জন্য তাঁকে আটকও করা হয়। অবশ্য মানবিকতার খাতিরে তাঁকে ছেড়ে দেয় পুলিশ।

একপর্যায়ে বিষয়টি তদন্তে কমিটি গঠন করে স্কটিশ কর্তৃপক্ষ। তদন্ত কমিটি ‘ম্যাকলিন রিপোর্ট’ নামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, স্কটল্যান্ডের হাসপাতালগুলোতে এমন ছয় হাজার অঙ্গ রয়েছে। তবে এই প্রতিবেদন মেনে নেননি লিডিয়া। তাঁর মতে এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি।

এই ঘটনার পর অনেক পিতামাতার কাছে সন্তানের অঙ্গ ফেরত দিয়ে দেওয়া হয়। অনেকেই আবার শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন।

তবে লিডিয়া খুঁজে পাননি গ্যারিকে। তিনি এখনো জানেন না বাদামি চোখের ছোট্ট নারী ছেঁড়া ধন, তার ভাগ্যে কী জুটেছিল। ওয়াশিংটন পোস্ট অবলম্বনে।

স্বাধীনবাংলা২৪.কম/এমআর

আরো খবর »