বাংলাদেশের সঙ্গে আছি

Feature Image

রাখাইনের জাতিগত নিধন থেকে বাঁচতে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দানকারী বাংলাদেশের পাশে থাকার অঙ্গীকার করেছে জাতিসংঘ। বৃহস্পতিবারের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক সংস্থাটির মহাসচিব অ্যান্টনিও গুয়েতেরেজ এই অঙ্গীকার করেন। রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে অবিলম্বে সেনা অভিযান বন্ধ করা, সহিংসতা নিরসন, রাখাইনে ত্রাণ সামগ্রীর অবাধ প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করা, বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়া এবং আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়েছেন তিনি। রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকের আনুষ্ঠানিক আলোচনায় জাতিসংঘ মহাসচিব এইসব পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দেন। এর আগেও রোহিঙ্গা ইস্যুতে দুই দফায় নিরাপত্তা পরিষদে বৈঠক হয়েছে।

বাংলাদেশের স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার দিনগত রাত ১টার দিকে নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে আলোচনা শুরু হয়। শুরুতেই আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেন মহাসচিব গুয়েতেরেজ। বক্তব্যে তিনি সহিংসতা নিরসন, সেনা অভিযান বন্ধ, রাখাইনে মানবিক সহায়তার অবাধ প্রবেশগম্যতা নিশ্চিতের তাগিদ দেন। পাশাপাশি আনান কমিশনের সুপারিশ মেনে নিবন্ধিত রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব নিশ্চিতের আহ্বান জানান। আর যারা অনিবন্ধিত, তাদের ক্ষেত্রে স্ট্যাটাস কী হবে তা ঠিক করারও আহ্বান জানান।

মহাসচিব তার বক্তব্যে বলেন, রাখাইনে থাকা রোহিঙ্গাদের তিনভাগের দুই ভাগ পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছে। বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা ৫ লাখ ছাড়িয়েছে। এদের মানবিক সহায়তা নিশ্চিতে বাংলাদেশের পাশে থাকার অঙ্গীকার করেছেন তিনি। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকের প্রসঙ্গও উল্লেখ করেছেন তিনি।

মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কাঠামোগত সহিংসতার অভিযোগ এনেছেন মহাসচিব। ৭০টিরও বেশি গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। সহিংসতার জন্য দুই পক্ষকেই নিন্দা জানিয়েছেন গুয়েতেরেজ। অবিলম্বে সেনা অভিযান বন্ধ এবং সহিংসতা বন্ধে আশু পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তিনি। বক্তব্যে তিনি আরসাকে ইঙ্গিত করে জঙ্গিবাদী কার্যক্রম বন্ধ করতে বলেছেন। বাংলাদেশের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ আলোচনার মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ফিরিয়ে নেওয়ারও তাগিদ দিয়েছেন তিনি।

রোহিঙ্গাদের রাজনীতিকরণের শিকার বলে উল্লেখ করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব। পাচার করা হচ্ছে কাউকে কাউকে। নারী ও শিশু নির্যাতনসহ যৌন নিপীড়নের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন মহাসচিব। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন মেনে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সব জনগোষ্ঠীর মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিতে মিয়ানমারকে তাগিদ দিয়েছেন তিনি।

বাংলাদেশ সফরের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় মিয়ানমারের প্রতিনিধি দলকে স্বাগত জানিয়েছেন মহাসচিব। দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের লক্ষ্যে সংকটের রাজনৈতিক দিকটির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তিনি। আনান কমিশনের রাখাইন প্রতিবেদন বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গাদের রাষ্ট্রীয় পরিচয় নির্ধারণের সুপারিশ করেছেন তিনি।

রাখাইন পরস্থিতি নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদের প্রথম আলোচনা অনুষ্ঠিত হয় আগস্টের শেষ সপ্তাহে। সেখানকার ‘জাতিগত নিধন’ নিয়ে আলোচনার জন্য যুক্তরাজ্য ২৯ আগস্ট (মঙ্গলবার) আগ্রহ প্রকাশ করে এবং ৩০ আগস্ট (বুধবার) আলোচনার দিন ধার্য হয়। রুদ্ধদ্বার বৈঠকে রাখাইন ও রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। পরিষদের সদস্যরা মিয়ানমারের এই দুইপক্ষের মধ্যে সহিংসতা বন্ধ, মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা ও রাখাইন পরামর্শক কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেন। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স সে সময় খবর দেয়, পরিস্থিতি খারাপ হলে ভবিষ্যতে আবার আলোচনা হতে পারে।

পরিষদের দ্বিতীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় চলতি বছরে। ১৪ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্ক সময় বুধবার দুপুরে (বাংলাদেশ সময় বুধবার দিবাগত মধ্যরাত) ৯ বছর পর নিরাপত্তা পরিষদের সব সদস্যের ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে এক বিবৃতি দেওয়া হয়। বিবৃতিতে চলমান সহিংসতায় চরম উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। এ ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে সেখানকার সহিংসতা বন্ধেরও আহ্বান জানানো হয়। জাতিসংঘে নিযুক্ত যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত ম্যাথিউ রাইক্রফট সে সময় এক বিবৃতিতে বলেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগের ঘটনায় পরিষদ উদ্বেগ প্রকাশ করে এর নিন্দা ও তা অবিলম্বে বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। রাখাইন রাজ্য ও রোহিঙ্গাদের ওপর বিপর্যয় নেমে এসেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সহিংসতা বন্ধের পাশাপাশি নিরাপত্তা পরিষদের ওই বৈঠকে রাখাইনের পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা, আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, নাগরিকদের সুরক্ষা, সামজিক ও আর্থিক কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক করা এবং শরণার্থী সমস্যা নিরসনের আহ্বান জানানো হয়েছিল। পরিষদের বিবৃতিতে শরণার্থীদের সহায়তা দেওয়ার জন্য বাংলাদেশকে ধন্যবাদ জানানো হয় এবং জাতিসংঘ ও অন্যান্য সংস্থাগুলোকেও এ বিষয়ে বাংলাদেশকে সহায়তা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। বৈঠকে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা রাখাইন পরিস্থিতির একটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের বিষয়ে একমত হয়। কফি আনান কমিশনের প্রতিবেদন বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয় সেই বৈঠকে।

২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইনে দেশটির সেনাবাহিনীর তথাকথিত ক্লিয়ারেন্স অপারেশন শুরু হওয়ার পর এ পর্যন্ত ৪ লাখ ২০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। জাতিসংঘ মিয়ানমার সেনাবাহিনীর এই অভিযানকে জাতিগত নিধন হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

আরো খবর »