ফেসবুকে প্রতারক চক্রের যে ফাঁদে ফেসে যাচ্ছেন আপনিও

Feature Image

নাম তার সুলতানা (ছদ্মনাম)। বাড়ী খুলনার একটি শহরে। তিনি স্কট মারি নামে এক যুবককে চেনেন ব্রিটিশ নাগরিক হিসেবে। এ পরিচয়ে ফেসবুকে বন্ধুত্বও গড়ে উঠে। বিভিন্ন টেকনিক্যাল ডিভাইস হ্যাকড করে ঢাকায় বসেই লন্ডনে অবস্থানের কথা বলে ভাইবার, ট্যাঙ্গো, হোয়াটস অ্যাপসহ ইন্টারনেটভিত্তিক বিভিন্ন মাধ্যমে কথাও বলতেন স্কট মারি।

একপর্যায়ে বন্ধুত্বের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হওয়ার পর দামি গিফট পাঠানোর প্রস্তাব পান সুলতানা। এরপর বিমানবন্দর থেকে সেই গিফট ছাড়িয়ে আনতে
গেলেই টের পান তিনি ভয়ংকর প্রতারণার ফাঁদে আটকে গেছেন।

কিন্তু এর আগেই সর্বস্বান্ত তিনি। সংসারেরও টলমলে অবস্থা। এছাড়া প্রমা নামে আরেক গৃহবধূকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে তারা হাতিয়ে নিয়েছে ১৬ লাখ টাকা!

এরকম ভয়ঙ্কর এক প্রতারণার ফাঁদে আটকে যাচ্ছেন ধনাঢ্য পরিবার সুন্দরী গৃহবধূরাও। বিদেশি সেজে প্রথমে ফেসবুকে বন্ধুত্ব, পরে প্রেম এরপর তারা হারাচ্ছে নগদ অর্থ ও সম্মান। এমনই লোমহর্ষক ঘটনা এবার প্রকাশ্যে এসেছে এক গৃহবধূ অভিযোগ দায়ের করার পর থেকে।

সম্প্রতি সুলতানা (ছদ্মনাম) ঐ নামের এক গৃহবধূ উত্তরা থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেন। আর এর থেকেই অনেক কিছু বের হয়ে আসে প্রতারক চক্রটি সম্পর্কে।

আফ্রিকা ও বাংলাদেশের বিশাল একটি চক্র এই প্রতারণার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলেও তথ্য পেয়েছে গোয়েন্দারা। আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী সুলতানার অভিযোগের পর অভিযান চালিয়ে জানতে পারে ভয়ংকর এ প্রতারণার মূলে আছে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের একটি সংঘবদ্ধ চক্র। আর বিদেশী এ প্রতারকদের সহযোগিতা করছে এ দেশীয় আরেকটি চক্র।

সে নিজেকে একজন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী হিসেবেও পরিচয় দেয়। একপর্যায়ে তার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠলে কিছু উপহারসামগ্রী পাঠানোর প্রস্তাব করে।

এরপর ৩ ফেব্রুয়ারি দুপুর দেড়টায় সাইফুল নামে একজন হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাস্টমস অফিসের কর্মকর্তা পরিচয়ে সুলতানাকে ফোন দেন।

তিনি জানান, ‘লন্ডন থেকে আপনার নামে কিছু পার্সেল এসেছে। পার্সেলটি পরিবহন ও অন্যান্য চার্জ বাবদ ৬০ হাজার টাকা সিটি ব্যাংকের একটি শাখায় পরিশোধ করতে হবে। ’

সে মোতাবেক ৬০ হাজার টাকা ওই দিনই ব্যাংকে জমা দেন সুলতানা। কিন্তু এরপরদিনই সাইফুল আবারও ফোন করে বলেন, ‘আপনার পার্সেলে বিদেশী মুদ্রা থাকার কারণে বিমানবন্দর থেকে ছাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। ’

এ পর্যায়ে প্রতারক চক্রটি ভয় দেখিয়ে বলে, পার্সেলে বিদেশী মুদ্রা থাকায় আমার সমস্যা হতে পারে। টাকা পরিশোধের জন্য দেয়া হয় ট্রাস্ট ব্যাংকের একটি অ্যাকাউন্ট নম্বর। ভয়ে তিনি ৪ ফেব্রুয়ারি ওই অ্যাকাউন্টে এক লাখ টাকা জমা দেন। পরদিন থেকে সাইফুলের নম্বরটি বন্ধ।

গিফট না পেয়ে খুলনা থেকে ঢাকায় চলে আসেন সুলতানা। ৭ ফেব্রুয়ারি রাসেল নামে আরেকজন পার্সেল পেতে আরও দু’দিনের সময় চেয়ে ২ লাখ টাকা জমা দিতে বলেন।

কিন্তু সুলতানা সাইফুলের যে কণ্ঠে গত দু’দিন কথা বলেছেন একই কণ্ঠ রাসেল নাম-পরিচয় দেয়ায় তার গোলকধাঁধা কেটে যায়।

তিনি যে প্রতারকের খপ্পরে পড়েছেন তার কিছুটা আঁচ করতে পেরেছেন। তিনি সাইফুলের সঙ্গে দেখা করতে চাইলে সে মোবাইল ফোন বন্ধ করে দেয়।

পরে তিনি বিমানবন্দর কাস্টমস অফিসে যোগাযোগ করে জানতে পারেন ওই নামে কোনো পার্সেল নেই। এবার প্রতারণার বিষয়টি পুরোপুরি নিশ্চিত হয়ে উত্তরায় র‌্যাব-১ কার্যালয়ে গিয়ে বিষয়টি খোলাসা করেন।

এরপরই সাইফুল নামে যে যুবক সুলতানাকে ফোন করে টাকা নিয়েছে মোবাইল নম্বরের সূত্র ধরে তাকে আটক করতে সক্ষম হয় র‌্যাব।

পরে জানা যায়, সাইফুল নামে যিনি ফোন করেছেন তার নাম এএসএম সুলতান মাহমুদ। তার সঙ্গে মাসুম মোকাররম নামে আরেকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

তাদের দেয়া জবানবন্দি অনুযায়ী রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে ১৩ নাইজেরিয়ান ও কেনিয়ার নাগরিককে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ সময় ৩০টি মোবাইল সেট, চারটি ল্যাপটপ, ২ লাখ ৮৩ হাজার টাকাও জব্দ করা হয়।

বনানী থানায় করা মামলায় দেয়া হয় আরও ভয়ংকর তথ্য। প্রমা নামে এক গৃহবধূকে ব্ল্যাকমেইল করে নাইজেরিয়ান আরেকটি চক্র হাতিয়ে নিয়েছে ১৬ লাখ ৬০ হাজার টাকা। এ ঘটনায় তার সংসার ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়।

আরো খবর »