পাঁচ দুর্ধর্ষ কিলারের ব্যয়বহুল খুন

Feature Image

মধ্যরাত। রাজধানী তখন ঘুমে। কিন্তু ঘুমের রেশমাত্র নেই অভিজাত গুলশানের কয়েকটি এলাকায়। বেশ কয়েকটি ক্লাবে চলছে ডিজে পার্টি। উচ্চ শব্দের মিউজিকের সঙ্গে তাল মেলাচ্ছেন শত শত তরুণ-তরুণী। এমনি একটি ক্লাব ট্রাম্পসে ডিজে পার্টি রূপ নিয়েছিল খুনোখুনির পার্টিতে। রক্তাক্ত হয় সেই ক্লাব। খুন হন সুদর্শন নায়ক সোহেল চৌধুরী। ক্লাবের গেটের সামনে গাড়ি থেকে নামতেই সোহেল চৌধুরী ও তার বন্ধুদের লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়ল অস্ত্রধারীরা। নায়কসহ কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়লেন। ডিজে পার্টিতে হুলস্থূল কাণ্ড। নারী-পুরুষের ছোটাছুটি। পেছনের দরজা দিয়ে পালাচ্ছেন তারা। কেউ কেউ হলরুমের ভিতরেই লুকিয়ে রাখছেন নিজেকে। রাজধানীর খুনোখুনির ইতিহাসে সেই ক্লাবে একসঙ্গে দুর্ধর্ষ পাঁচ শীর্ষ সন্ত্রাসীর অংশ নেওয়ার ঘটনা ছিল সেটাই প্রথম। বলা হয়, ১৯ বছর আগের ওই খুনের ঘটনাটি ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল।

সোহেল চৌধুরীর খুনের খবর পরদিন সকালে রাজধানীসহ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়লে তোলপাড় শুরু হয়। শত শত মানুষ তাকে দেখতে ছুটে যান গুলশান থানা থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গ পর্যন্ত। আলোচনায় আসে সেই সময়ের উচ্চবিত্তদের আনন্দ ক্লাব ‘ক্লাব ট্রাম্পস’। আলোচনায় আসেন আলোচিত-সমালোচিত ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই। সোহেল চৌধুরী হত্যাকাণ্ডে এই আলোচিত ব্যবসায়ীকে গোয়েন্দা পুলিশ গ্রেফতারও করে। এ ছাড়া এ হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন আন্ডারওয়ার্ল্ভ্রের দুর্ধর্ষ সব সন্ত্রাসী। ইমন, লেদার লিটন, কিলার আব্বাস, মামুন, আদনানসহ আরও কয়েক শীর্ষ সন্ত্রাসী এ হত্যা মিশনে অংশ নিয়েছিলেন। পুলিশ ও গোয়েন্দাদের মতে, একটি ঘটনায় একসঙ্গে পাঁচ শীর্ষ সন্ত্রাসীর অংশ নেওয়া ছিল বিরল। সোহেল চৌধুরীর খুনের ঘটনা ছাড়া অন্য কোনো ঘটনায় এদের একসঙ্গে অপারেশন করতে দেখা যায়নি। সে সময় এটি ছিল সবচেয়ে ব্যয়বহুল খুন। এ ছাড়া খুনের পরদিনই দুই তরুণী গুলশান থানায় হাজির হয়ে নিজেদের সোহেল চৌধুরীর স্ত্রী দাবি করেন। সব মিলিয়ে সোহেল চৌধুরীর খুনের ঘটনাটি ছিল টক অব দ্য কান্ট্রি। পত্রপত্রিকাগুলোয় খুনের ঘটনা ছাড়াও ট্রাম্পস ক্লাব ও ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের বিষয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সোহেল চৌধুরী সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন ১৯৯৮ সালে। তখন তার বয়স ছিল ৩৫ বছর। দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের বিচারকাজ ঝুলে আছে। তার স্বজন ও সহকর্মীরা আজও ভোলেননি তাকে। তারা হত্যাকারীদের শাস্তি দাবি করেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত তার হত্যার বিচার হয়নি। হত্যা মামলাটি কয়েক বছর ধরে হাই কোর্টের আদেশে স্থগিত হয়ে আছে।

পুলিশ ও অন্যান্য সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৮ সালের ১৭ ডিসেম্বর রাত ২টার দিকে সোহেল চৌধুরীকে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। এ সময় গুলিতে সোহেল চৌধুরীর বন্ধু আবুল কালাম আজাদ (৩৫), ট্রাম্পস ক্লাবের কর্মচারী নীরব (২৫) ও দাইয়ান (৩৫) আহত হন। গুলির ঘটনার পর পরই স্থানীয়রা আদনান সিদ্দিকী নামের এক সন্ত্রাসীকে ধরে পুলিশে দেয়। অন্যরা পালিয়ে যান। গুলির শব্দে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ট্রাম্পস ক্লাবে থাকা ২০০ জনের মতো নারী-পুরুষ প্রাণ বাঁচাতে ট্রাম্পস ক্লাব ত্যাগ করেন। তারা ড্যান্স পার্টিতে অংশ নিয়েছিলেন। ওই সময় বনানী-গুলশান এলাকার ডিশ ব্যবসা ও ট্রাম্পস ক্লাবকে কেন্দ্র করে মালিকপক্ষের সঙ্গে সোহেলের বিরোধ চরমে উঠেছিল। ঘটনার দিন রাত ৯টায় সোহেল চৌধুরী বনানীর বাসা থেকে বের হন। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন শহীদ, আবুল কালাম আজাদ, হেলাল ও হাফিজ নামে চার বন্ধু। বাসা থেকে বের হয়ে তারা একটি রেস্টুরেন্টে রাতের খাবার খান। এরপর রাত ২টার দিকে সোহেল চৌধুরী বন্ধুদের নিয়ে বাসায় ফেরেন। কিছুক্ষণ পর বন্ধুরা মিলে ট্রাম্পস ক্লাবের পার্টিতে যাওয়ার জন্য রওনা হন। সোহেলের বাসা থেকে ট্রাম্পস ক্লাবের দূরত্ব ২৫-৩০ গজের মতো। তারা হেঁটে ক্লাবের সামনে যান। ক্লাবের নিচ তলার কলাপসিবল গেটের কাছে দুই যুবক তাদের গতি রোধ করেন। এক যুবক আবুল কালামের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়ান। এরই একপর্যায়ে অন্য এক যুবক কোমরে বাঁধা হোলস্টার থেকে রিভলবার হাতে তুলে নেন। পেটে ব্যারেল ঠেকিয়েই পরপর দুবার ট্রিগারে চাপ দেন। লুটিয়ে পড়েন কালাম। সোহেল চৌধুরী চিৎকার করলে সন্ত্রাসীরা রিভলবার উঁচিয়ে তার দিকে ছুটে যায়। এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ করতে থাকে। সোহেল গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোতে থাকে। তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। ওইদিন পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ট্রাম্পস ক্লাবের ১১ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে। সোহেল চৌধুরীর বাবা তারেক আহমেদ চৌধুরী গুরুতর অসুস্থ ছিলেন। সোহেল চৌধুরী মা-বাবার সঙ্গে বনানীর বাসায় থাকতেন। তার ভাই তৌহিদুল ইসলাম চৌধুরী অন্যত্র থাকতেন। বনানীর ইকবাল টাওয়ারের পাশে ছিল ট্রাম্পস ক্লাব। ক্লাবে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশার অভিযোগ ছিল। সপ্তায় এক দিন পার্টির অনুমোদন থাকলেও প্রতিদিন রাতেই হতো পার্টি। চলত ভোর পর্যন্ত। সূত্র জানায়, সোহেল চৌধুরীকে হত্যা করে পাঁচ-ছয় জন সন্ত্রাসী প্রাইভেট কারে পালিয়ে যায়। আদনান সিদ্দিকী পালাতে না পেরে পাশের একটি ভবনে লুকাতে চেষ্টা করেন। এ সময় ট্রাম্পস ক্লাবের কর্মীরা তাকে ধরে পুলিশে সোপর্দ করেন। ওই বছরের ২৮ ডিসেম্বর আদনান সিদ্দিকী আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। তাতে তিনি উল্লেখ করেন, হত্যাকাণ্ডের আগে এক শিল্পপতির ফোন পেয়ে তিনি ঢাকা ক্লাব থেকে ঘটনাস্থলে যান।

তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে ট্রাম্পস ক্লাবে আসা-যাওয়া ছিল তার। যাতায়াতের কারণেই ক্লাবের একাধিক সদস্যের সঙ্গে পরিচয় হয়। ঘটনার রাতে কয়েকজন ক্লাব সদস্যের সঙ্গে তার ঝগড়া হয়। আর ওই কারণেই স্টাফরা তাকে ধরিয়ে দেন। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার বন্ধু নীরবসহ আটজন জড়িত ছিলেন বলে তিনি ওই সময় স্বীকার করেন। ওই ঘটনায় সোহেল চৌধুরীর ভাই তৌহিদুল ইসলাম চৌধুরী বাদী হয়ে গুলশান থানায় হত্যা মামলা করেন। এতে আজিজ মোহাম্মদ ভাই, ট্রাম্পস ক্লাবের মালিক ব্যবসায়ী বান্টি ইসলাম, আশীষ রায় চৌধুরী ওরফে বোতল চৌধুরী, তারিক সাইদ মামুন, আদনান সিদ্দিকী, ফারুক আব্বাসী, সানজিদুল হাসান ওরফে ইমন, মো. সেলিম খান ও হারুনুর রশীদ লিটন ওরফে লেদার লিটনকে আসামি করে মামলা করা হয়। এরপর পুলিশ কয়েক আসামিকে গ্রেফতারও করে। পরে তারা জামিনে বেরিয়ে যান। ২০০৪ সালে মামলাটির বিচার কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়। সোহেল চৌধুরীর পারিবারিক সূত্র জানায়, সোহেলের মৃত্যুর পর তার বাবা অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে যান। শেষ পর্যন্ত তিনি সেই শোকেই ২০০১ সালের দিকে মারা যান। সোহেলের বাবা জীবিত থাকার সময় হত্যাকারীদের বিচার দেখে যাওয়ার জন্য খুব চেষ্টা করতেন। কিন্তু তিনি তা দেখে যেতে পারেননি।

আরো খবর »