নতুন করে স্রোতের মতো আসতে শুরু করেছে রোহিঙ্গা

Feature Image

স্বাধীনবাংলা২৪.কম

কক্সবাজার: বাংলাদেশ-মিয়ানমারের স্থল সীমান্ত উখিয়ার পালংখালীর আঞ্জুমানপাড়া সীমান্ত দিয়ে আবারও বানের স্রোতের মতো রোহিঙ্গা আসা শুরু হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার ভোররাত থেকে এ যাত্রা শুরু হয়।

সেদিন একদিনেই প্রায় ৩০ হাজার রোহিঙ্গা নারী-শিশু-পুরুষ সীমান্তের শূন্যরেখা পার হয়ে কুতুপালং-বালুখালী ক্যাম্প ও আশপাশ এলাকায় মিশে যায়।

এনিয়ে সংবাদ প্রচারের পর সীমান্তরক্ষী বাহিনী সীমান্তজুড়ে কড়াকড়ি আরোপ করে। এরপর থেকে বাংলাদেশের রোহিঙ্গা ক্যাম্প উপলক্ষ করে আসা রোহিঙ্গারা শূন্য রেখায় আটকা পড়ে।

মঙ্গলবার দুপুর থেকে ভারি বর্ষণ শুরু হওয়ায় খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করা এসব রোহিঙ্গা চরম বিপর্যয়ে পড়ে। শিশু ও বৃদ্ধদের নিয়ে অনেক পরিবার খুব বেকায়দায় পড়ে ভেজা ছাড়া কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছেন না।

এমন হলেও বাংলাদেশমুখিতা বন্ধ হচ্ছে না। ফলে অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত আশা রোহিঙ্গা ছাড়াও আজকাল আসা অর্ধলাখ রোহিঙ্গা আনজুমান সীমান্তের নাফ নদীর তীরে অবস্থান করছে। এখানে গিয়েই কলেরার টিকা খাওয়ানো হয়েছে আগত রোহিঙ্গাদের। মঙ্গলবার বিকেলে সীমান্তে গিয়ে এ পরিস্থিতি দেখা গেছে।

সীমান্তে দায়িত্বপালনকারী বিজিবি ৩৪ ব্যাটালিয়নের ক্যাপ্টেন রুবেল জানান, পুরনো এবং চলমান আরাকান সঙ্কট মিলিয়ে প্রায় ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় পেয়েছে। এ সংখ্যা সীমান্ত উপজেলা টেকনাফ-উখিয়ার স্থানীয় জনগণের চেয়ে অধিক। এখানে আশ্রয় পাওয়া রোহিঙ্গাদের খাবার, বাসস্থান, স্বাস্থ্য ও স্যানিটেশনসহ প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছি আমরা। রোহিঙ্গাদের কারণে পাহাড়গুলো দখল হয়ে গেছে। সাবাড় হচ্ছে গাছপালা। অভয়ারণ্য হারাচ্ছে বন্যপ্রাণি। ফলে হাতিরপালের আক্রমণে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। এসব মৃত্যু সরকারের জন্য বিব্রতকর। এটা ছাড়াও রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আগ্নেয়াস্ত্র ও মাদক এবং নিষিদ্ধ বস্তু আসার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।

ইতোমধ্যে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী অনেক রোহিঙ্গাকে অস্ত্র, বোমা ও ইয়াবাসহ আটক করেছে। মানবিকতার সুযোগে এসব অপকর্ম মেনে নেয়া যায় না। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী মানবিক কিন্তু অপরাধ ও অপরাধীদের বিরুদ্ধে তিনি ইস্পাত কঠিন। তাই কোনো অপরাধী কিংবা অপরাধ কর্মে ব্যবহার্য দ্রব্য বাংলাদেশে আসুক এটা সরকার কখনও চায় না। নিজেকে বিলীন করে মানবিক হলে অস্থিত্ব সঙ্কটে পড়তে হতে পারে। তাই নতুন কোনো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, নতুন করে সীমান্ত পার হতে জিরো পয়েন্টে অবস্থান নিয়েছে ২৫-৩০ হাজার রোহিঙ্গা। এদের থাকার সংস্থান করতে বেগ পেতে হবে। তাই তাদের আটকে রেখে জিরো পয়েন্টে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

তবে রোহিঙ্গাদের কাছে সবচেয়ে পরিচিত আনজুমানপাড়া সীমান্ত ছাড়াও অর্ধশত কিলোমিটারের স্থল সীমান্তের অন্য পয়েন্ট দিয়ে এবং টেকনাফের জলসীমা পার হয়ে অনায়াসে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে ঢুকে বিভিন্ন ক্যাম্পে অবস্থান নিচ্ছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। আর নিপীড়নের প্রায় দু’মাস পর আবার বানের স্রোতে রোহিঙ্গা আসা নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সচেতন অনেকের প্রশ্ন-পাড়ায় পাড়ায় বিভৎস নির্যাতন হলে এখন আসা রোহিঙ্গা নারী-শিশু-পুরুষরা এতদিন কোথায় ছিলেন? এরা যদি এতদিন সেখানে নিরাপদে থাকতে পারে তাহলে কি এতদিনের ঘটনা রোহিঙ্গাদের এপারে ঠেলে দিতে সে দেশের সেনা ও রোহিঙ্গাদের সাজানো কোনো নাটক?

এসব প্রশ্ন জানতে পালংখালীর আঞ্জুমানপাড়া সীমান্ত দিয়ে নতুন আসা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলা হয়। তারা পুরনোদের মতোই মার-কাট ও নির্যাতনের কাহিনিই শুনিয়েছেন।

রাখাইনের বুচিদং থানার চাংগ্রীবিল গ্রামের সাবেক চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল (৪৫) বলেন, অনেক চেষ্টা করেছি নিজ ও পাশে গ্রামের লোকজনদের নিয়ে দেশে থাকতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও সেখানকার উগ্র রাখাইনদের অত্যচার নির্যাতনে সেটা সম্ভব হয়নি। ৫ একর জমিতে পাক ধরা ধান, দোতলা বাড়ি, গাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সব কিছু ছেড়ে বাংলাদেশে আশ্রয়ের জন্য সীমান্তে এসেছিলাম। কিন্তু দু’দিন ধরে এখানে আটকে আছি। তার মতো অসংখ্য সম্পদশালী রোহিঙ্গা সর্বস্ব হারিয়ে চৌদ্দ পুরুষের ভিটে মাটি ছেড়ে চলে এসেছে।

তার মতো অন্যরাও প্রতিবেশীসহ ঘর থেকে বের হয়ে সাত-আট দিন পাহাড়, জঙ্গল, কাদা, মাড়িয়ে নাফ নদী পেরিয়ে বাংলাদেশ সীমান্তে আসছে বলে দাবি করছেন। আগের মতো এখানে পৌঁছেই অনেক মা সন্তান জন্মদিচ্ছেন। নুর বানু তাদের একজন।

তিনি রোববার সকালে খোলা আকাশের নিচে দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম দেন। সন্তান সম্ভাবা এসব প্রসূতি হেটে সীমান্তে আসার গল্প সবাইকে ব্যথিত করছে। এরকম বেশ কয়েকজন মাতাকে আঞ্জুমানপাড়ার উত্তরপাড়া জামে মসজিদ সংলগ্ন মক্তবে এনে পরিচর্যা করছে একটি আইএনজিওর স্বাস্থ্যকর্মী ও ডাক্তারা। সবাই চরম পুষ্টিহীনতা, পানি শূণ্যতাসহ নানা সমস্যায় ভুগছেন।

মঙ্গলবার সকাল থেকে সারাদিন দলে দলে অনেক রোহিঙ্গা নাফ নদী পার হয়ে আসছে। এদিকে আসতে না পেরে তীর সংলগ্ন আঞ্জুমানপাড়ার চিংড়ি ঘেরের বাধ ও ধান খেতের আইলে কাদার মধ্যে ক্লান্ত শরীরে বসে ও শুয়ে থাকতে দেখা গেছে। এদের অধিকাংশ খাদ্য সংকটের কবলে পড়ে একেবারে দুর্বল হয়ে পড়েছেন। অনেকে হাঁটা তো দূরে থাক ঠিক মতো দাঁড়াতেও পারছে না।

বুচিডং মান্নানপাড়ার শামশুল আলম (৬০), রাজা বিলের নজির আহমদসহ (৪০) অসংখ্য রোহিঙ্গা জানান, সেনাবাহিনী ও রাখাইন সন্ত্রাসীদের হাতে একপ্রকার জিম্মি অবস্থায়ও নিজ ঘরে থাকার চেষ্টা করেছি। কোথাও যেতে না পেরে জমানো খাবারসহ প্রয়োজনীয় পণ্যে টান পড়ে। হাট-বাজারে যাওয়া নিষেধ, কাজকর্ম বা ব্যবসা বাণিজ্য নেই। ফলে চরম খাদ্য সংকটে গত ৯ অক্টোবর বুচিডং এর সাংগ্রীবিল, মগনামা, কুয়াংডং, ডাব্রং মং, আলী সংসহ অর্ধ ডজনাধিক গ্রাম থেকে প্রায় ২৫-৩০ হাজারের মতো রোহিঙ্গা বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা দেয়। পথে অং ঝাই পাহাড়ে সেনাবাহিনী ও রাখাইন সন্ত্রাসীরা অস্ত্রের মুখে তাদের জিম্মি করে টাকা পয়সা, স্বর্ণাংকার ও মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে ফেলেছে।

তারা আরও জানায়, নোম্যান্স ল্যান্ডে অবস্থান করা কালে শনিবার রাতে কোয়াংচি বং ক্যাম্পের বিজিপি সদস্যরা এসে তাদেরকে গুলি করার ভয় দেখিয়ে দা-বটিসহ সবকিছু কেড়ে নিয়ে যায়। বলে গেছে তোমাদের বাপদাদার দেশে (বাংলাদেশে) তোমরা দ্রুত চলে যাও। বুচিডং ও রাচিডং অঞ্চলে এখনও জীবিত আরও বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আসার প্রস্তুতিতে আছে বলেও উল্লেখ করেন তারা।

সেখানে রোহিঙ্গাদের সেবারত আইএনজিও এসিএফের ডিপিএম ইসমাইল ফারুক মানিক জানিয়েছেন, প্রায় ২০ হাজারের মতো খিচুড়ির প্যাকেট তারা এখানে বিতরণ করেছে। খিচুড়ি শেষ হওয়ায় পুষ্টি সমৃদ্ব বিস্কুট বিতরণ করা হচ্ছে। আর স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর বিশুদ্ধ পানি, ইউএনএইচসিআরসহ বেশ কিছু সাহায্য সংস্থা এসব রোহিঙ্গাদের মাঝে জরুরি ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করছে।

এদিকে পালংখালী ইউপির গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থী শাহাদত হোসেন জুয়েল বলেন, সরকার জেলা প্রশাসন ও সেনা

সদস্যদের দিয়ে সুশৃঙ্খলভাবে ত্রাণ বিতরণ করার পর থেকে আশ্রয়ে আসা রোহিঙ্গারা নিয়মমাফিক ত্রাণ পাচ্ছেন। এসব রোহিঙ্গারা ওপারে থেকে যাওয়া স্বজনদের ফোন করে এখানে পাওয়া সুযোগ সুবিধার কথা জানিয়ে চলে আসতে উদ্বুদ্ধ করছে।

স্বাধীনবাংলা২৪.কম/এমআর

আরো খবর »