ইভিএম-নতুন সীমানা নয়, বেশির ভাগ দল সেনা’র পক্ষে

Feature Image

স্বাধীনবাংলা২৪.কম

ঢাকা: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ধারাবাহিক সংলাপের তিনটি ধাপ শেষ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ইতিমধ্যে সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, গণমাধ্যম এবং নিবন্ধিত ৪০টি দলের সঙ্গে সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

পেছন ফিরে তাকালে দেখা যায়, এ পর্যন্ত সংলাপে আসা সুপারিশগুলোর মধ্যে বেশির ভাগ দল ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা সবচেয়ে বেশি সেনা মোতায়েনের পক্ষে এবং সীমানা পুনর্নির্ধারণের বিপক্ষে সুপারিশ করেছেন।

গত ৩১ জুলাই সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা নির্বাচনে সেনাবাহিনীকে বিচারিক ক্ষমতা দিয়ে নির্বাচনের মাঠে মোতায়েনের সুপারিশ করেন। একইসঙ্গে তারা ইভিএম বাদ দিতে বলেন। এছাড়া তারা সীমানা পুনর্নির্ধারণের তেমন প্রয়োজন নেই বলেও মত তুলে ধরেন।

এরপর ১৬ ও ১৭ আগস্ট সংলাপে অংশ নিয়ে গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা বলেন, প্রয়োজনে সেনা মোতায়েন করতে। তবে ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রতিনিধিরা সেনা মোতায়েনের বিপক্ষে মতামত দেন। এছাড়া তারা ইভিএম নিয়ে কোনো আলোচনাও করেননি। তবে সীমনা পুনর্নির্ধারণের না করার জন্য সুপারিশ করেছেন।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন করার পক্ষে মত দিয়েছে বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল। ৪০টি দলের মধ্যে ২৫টিই এ প্রস্তাব দিয়েছে। ১৯টি দল নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দিতে বলেছে। এ ছাড়া নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের বিষয়টিও প্রাধান্য পেয়েছে দলগুলোর সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের সংলাপে। তবে ৮টি দল বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচন চেয়েছে।

একাদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গত ২৪ আগস্ট থেকে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ শুরু করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ৪০টি নিবন্ধিত দলের সঙ্গে সংলাপ শেষ হয় গতকাল বৃহস্পতিবার। দলগুলোর কাছ থেকে প্রায় সাড়ে চার শ প্রস্তাব জমা পড়েছে।

সাবেক ও বর্তমান একাধিক নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, সংলাপে প্রাধান্য পাওয়া সব বিষয় বাস্তবায়ন করা একা ইসির পক্ষে সম্ভব নয়। কিছু বিষয়ে ক্ষমতাসীন দলের সদিচ্ছা প্রয়োজন। কারণ, এ ক্ষেত্রে আইন ও সংবিধান সংশোধন করতে হবে। সরকারি দল আওয়ামী লীগ না চাইলে তা হবে না।

নির্বাচন কমিশনার শাহাদাত হোসেন চৌধুরী বলেন, সব প্রস্তাব সংকলন করে তা সরকার ও সব দলকে দেওয়া হবে। এর মধ্যে নির্বাচন কমিশন-সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবগুলোর মধ্যে কোনটা নিয়ে কী করা যায়, কমিশন বসে তা ঠিক করবে।

ইসিকে দেওয়া দলগুলোর প্রস্তাব বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নিবন্ধিত ৪০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ২৫টি দল সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে সেনাবাহিনী মোতায়েন করার পক্ষে মত দিয়েছে। এর মধ্যে বিএনপিসহ ১০টি দল সেনাবাহিনীকে বিচারিক ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব দেয়।

তবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েনের পক্ষে। দলটি বলেছে, কোন পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনী নিয়োগ করা যাবে, তা ফৌজদারি কার্যবিধির ১২৯-১৩১ ধারায় বলা আছে। ওই ধারায় বলা হয়েছে, কোনো বেআইনি সমাবেশ অন্য কোনো উপায়ে ছত্রভঙ্গ করা না গেলে এবং জননিরাপত্তার জন্য তা ছত্রভঙ্গ করা প্রয়োজন বলে বিবেচিত হলে সর্বোচ্চ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার সামরিক শক্তি দিয়ে তা ছত্রভঙ্গ করতে পারবেন।

প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মূল প্রস্তাবগুলো পরস্পরবিরোধী। বিশেষ করে সেনা মোতায়েন, সংসদীয় আসনের সীমানা পরিবর্তন, ইভিএম ব্যবহার নিয়ে দুই দলের অবস্থান বিপরীতমুখী। নির্বাচনকালীন সরকার ও সংসদ বহাল রাখা না-রাখা নিয়ে আওয়ামী লীগ ইসিতে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব না দিলেও এ দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও তাদের অবস্থান বিএনপির বিপরীত।

এ অবস্থায় প্রধান দুই দল পরস্পরকে কতটা ছাড় দিতে প্রস্তুত, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম বলেন, বর্তমান সংবিধান অনুযায়ীই নির্বাচন হবে। এটা একটা মীমাংসিত বিষয়। কেননা, ২০১৪ সালে বর্তমান সংবিধানের আলোকেই নির্বাচন হয়েছে। বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচন এবং এই সরকারের প্রধানমন্ত্রী থাকবেন শেখ হাসিনা। এটা মেনে বিএনপিকে নির্বাচনে আসতে হবে।

আর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, নির্বাচনকালে সহায়ক সরকার, তফসিল ঘোষণার আগে সংসদ ভেঙে দেওয়া, নির্বাচনের সময় সেনাবাহিনী মোতায়েন—এগুলো নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মৌলিক বিষয়। তিনি বলেন, ক্ষমতাসীনেরা যদি আবারও ক্ষমতা দখলের প্রক্রিয়ায় যায় এবং নির্বাচন কমিশন এর সহায়ক হয়, তাহলে এর মূল্য তাদের দিতে হবে।

বর্তমান গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী নির্বাচনে সেনা মোতায়েন করার ক্ষেত্রে আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। ইসি চাইলে আপৎকালীন বাহিনী (স্ট্রাইকিং ফোর্স) হিসেবে সেনা মোতায়েন করতে পারে। আরপিওতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংজ্ঞায় সশস্ত্র বাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করতে হলে বা সশস্ত্র বাহিনীকে বিচারিক ক্ষমতা দিতে হলেও আইনের সংশোধনী আনতে হবে।

বিএনপি, কল্যাণ পার্টি, মুসলিম লীগ, খেলাফত মজলিস, জাগপা, জাতীয় পার্টি (মতিন), বাংলাদেশ ন্যাপ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), বাংলাদেশ মুসলিম লীগ ও জেএসডি বিচারিক ক্ষমতাসহ সেনা মোতায়েন করার প্রস্তাব করেছে। এ ছাড়া জাতীয় পার্টি (জাপা) ইসলামী ফ্রন্ট, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, গণফ্রন্ট, জমিয়তে ওলামা ইসলাম বাংলাদেশ, তরিকত ফেডারেশন, গণফোরাম, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, এলডিপি, বিকল্পধারা, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দল (পিডিপি) নির্বাচনে সেনা মোতায়েন করার প্রস্তাব করেছে।

বিএনপি জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়া দল এনপিপি ও ইসলামী ঐক্যজোট ঢালাওভাবে সেনাবাহিনী মোতায়েন না করার প্রস্তাব দিয়েছে। সাম্যবাদী দল বলেছে, প্রয়োজনে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা যেতে পারে। ওয়ার্কার্স পার্টি বলেছে, সেনাবাহিনীকে বিচারিক ক্ষমতা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। এর বাইরে ঐক্যবদ্ধ নাগরিক আন্দোলন ও বাসদ সেনাবাহিনী মোতায়েনের বিপক্ষে মত দিয়েছে।

স্বাধীনবাংলা২৪.কম/এমআর

আরো খবর »