ওরা আমার ছেলেকে কেড়ে নেয় এবং গলা কেটে ফেলে

Feature Image

তুলা তলি গ্রামে ৩০ আগস্ট চলে ভয়াবহ গণহত্যা। সেই হত্যাকাণ্ড থেকে বেঁচে আসা ২০ বছর বয়সী রাজুমা জানিয়েছেন আরো কিছু ভয়াবহ ঘটনার কথা। মনে করা হয়- যেসব গ্রামে মিয়ানমারের সেনারা সবচেয়ে জঘন্য বর্বরতা চালিয়েছে তুলা তলি গ্রাম হচ্ছে তার অন্যতম।
কক্সবাজারের কুতুপালং স্কুলে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে একটি শরণার্থী শিবির। সেখানে বসে রাজুমা জানান- “গ্রামবাসীকে সাগরের বিচে নেয়া হয়।সেখানে নারী ও শিশুদের থেকে পুরুষদেরকে আলাদা করা হয়। এরপর পুরুষদেরকে গুলি করে হত্যা করা হয়। কাউকে কাউকে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয় এবং কাউকে কাউকে বেয়নেট দিয়ে খুচিয়ে মারা হয়।”

চার/পাঁচ জন সেনা পাঁচ থেকে সাতজন করে নারীকে আলাদা গ্রুপে ভাগ করছিল। এ সময় রাজুমা তারা ছেলে মোহাম্মাদ সিদ্দিককে ধরে রেখেছিলেন। রাজুমা জানান-“ওরা আমাকে অন্য চার নারীর সঙ্গে আলাদা করে একটি বাড়িতে নেয়। তারপর তারা আমার ছেলেকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নেয় এবং মাটির ওপর ছুঁড়ে দেয় এবং তার গলা কেটে ফেলে। নিজ হাতে তিনি তার সন্তানের মাথা কবর দিয়েছেন। কথাগুলো বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন রাজুমা।

হতভাগী রাজুমা কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “একবার আমার ছেলের মা ডাক শোনার জন্য আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে।” রাজুমা জানান, “১০ বছর বয়সী আমার একটা ছোট ভাই ছিল। আমার খুবই দুঃখ হচ্ছে- সেনারা আমার ভাইকে নিয়ে নিল এবং আমি তাকে বাঁচাতে পারলাম না।” আবার কান্নায় ভেঙে পড়েন রাজুমা।

রাজুমাকে আরো তিন মায়ের সঙ্গে একটি রুমে রাখে মিয়ানমারের সেনারা। সেখানে একটি টিনএজ মেয়ে ছিল এবং একজন ৫০ বছর বয়সী নারী ছিলেন। ওই বয়স্ক নারীকে বাদে মিয়ানমারের সেনারা সবাইকে ধর্ষণ করে। রাজুমাকে ধর্ষণ করে দুই সেনা; তিনি বলেন, এই পাশবিকতা চলেছে সম্ভবত দুই তিন ঘণ্টা ধরে।

এরপর সেনারা কাঠের লাঠি দিয়ে নারীদের প্রচণ্ড মারধরকরে। তারপর তাদের মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য সেনারা তাদেরকে ঘরের ভেতরে তালাবদ্ধ করে রাখে এবং আগুন ধরিয়ে দেয়।
আগুনের তাপে রাজুমার জ্ঞান ফিরে আসে। তিনি বাঁশের বেড়া ভেঙে বের হতে সক্ষম হন এবং পালিয়ে যান। একটি পাহাড়ে একদিন লুকিয়ে ছিলেন। যখন তিনি বেরিয়ে আসেন তখন অন্যদিকে তার গ্রামের তিন নারীকে এবং এক এতিমকে গুলি কের হত্যা করে সেনারা।
বিবস্ত্র অবস্থায় ছিলেন রাজমুা। পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ফেলে আসা একটি কাপড় দিয়ে নিজেকে ঢাকেন। যখন তিনি সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আসলেন তখন এক বাংলাদেশী তাকে কুতুপালং যেতে সাহায্য করেন এবং সেখানকার একটি ক্লিনিকে তিনি চিকিৎসা নেন। বাংলাদেশে তিনি তার স্বামী মোহাম্মাদ রফিককে খুঁজে পেয়েছেন। তুলা তলি গ্রামে গণহত্যা শুরু হলে রফিক কোনোমতে নদী সাঁতরে পালিয়ে বাংলাদেশে চলে আসেন।

রাজুমা জানান, “আমার পরিবারের সদস্যদেরকে হত্যা করা হয়েছে। এখন শুধু আমি, আমার এক ভাই এবং আমার স্বামী এখানে আছি। আমার জীবনের কষ্ট ও বর্বর অত্যাচারের কথা সারা দুনিয়াকে জানাতে চাই এই কারণে যে, তারা যেন জানতে পারে এবং তারা যেন শান্তি আনতে পারে।
তিনি জানান, “সেনারা আমার পরিবারের সাত সদস্যকে হত্যা করেছে। আমার মা সুফিয়া খাতুন (৫০), দুই বোন ১৮ বছরের রোকেয়া বেগম ও ১৫ বছরের রুবিনা বেগমকে হত্যা করেছে। এদের দুইজনকেই সেনারা ধর্ষণ করে। আমি ধারণা করছি ১০ বছরের ভাই মূসা আলীকে হত্যা করা হয়েছে। আমার ২৫ বছর বয়সী ননদ খালিদা এবং তার আড়াই বছরের ছেলে রোজুক আলী এবং আমার দেড় বছরের ছেলে মোহাম্মাদ সিদ্দিককে ওরা হত্যা করেছে।” রাজুমা বলেন, “আমাদের রোহিঙ্গাদের ওপর কী ঘটেছে সেসব কাহিনী জানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।”

আরো খবর »