বিশ্বাসে অবিশ্বাস

Feature Image

সামিয়া রহমান: কিছু দিন ধরে নানা প্রশ্নে ব্যতিব্যস্ত। গবেষণা চুরি, চৌর্যবৃত্তি, কুম্ভীলকবৃত্তি, ভিসির পাশে বসার আশকারা পায় কোথা থেকে, সতেরো বছর পর চিন্তায় আসে বাইরে কাজ করার অনুমতি আছে কি নেই, তার বইগুলো পড়ে দেখতে হবে আদতে বই হওয়ার যোগ্য কিনা, এত কাজ করার সময় আদতে কী করে পায়, তবে কীভাবে সে বই লেখে, তার চৌদ্দ বছরের সন্তান ফেসবুকে ইংরেজিতে কেমন করে এত ভালো লেখে, এটাও মায়ের লেখা কিনা… কত শত ধরনের অভিযোগ এবং ঢাক পিটিয়ে, ঢোল বাজিয়ে কোনো কিছু না জেনে না শুনে বাংলাদেশের কিছু মানুষ হয়ে উঠলেন মহান বিদ্বান, বিদুষী, পণ্ডিত, গবেষক, আইনপ্রণেতা এবং নীতিনির্ধারক।

বাকিরা হয়ে গেলেন নিশ্চুপ, অন্ধ-বধির। যারা মনের সুখে টক-ঝাল-নোনতা নিন্দা, পরচর্চা, গিবত করেছেন আদতে কতজন মিশেল ফুকোর ‘ডিসিপ্লিন অ্যান্ড পানিশ : দ্য বার্থ অফ দ্য প্রিজন’ বইটি সম্পূর্ণটা পড়েছেন? এডওয়ার্ড সাইদের ‘কালচার অ্যান্ড ইমপেরিয়ালিজম’ বইটি পুরোটা ক’জনার পড়া? কিন্তু আমরা তো মহাপণ্ডিত। কী বিষয়ে লেখা, লেখাটি আদতে গবেষণা ছিল কিনা, নাকি ফুকো আর সাইদের ব্যাখ্যা ছিল, লেখাটি সম্পূর্ণ করা হয়েছিল কিনা, এটি আইডিয়া না লেখা, ছাপা হওয়ার আগে কেন আশ্চর্যজনকভাবে অফিস থেকে হারিয়ে গেল, লেখা জমার প্রক্রিয়ার সঙ্গে ডিন অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ কে বা কারা করেছে, মূল অথর কোথায়— কিছু না জেনে হয়ে গেলেন মহাজ্ঞানী।

বলা হচ্ছে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় নাকি আপত্তি জানিয়েছে। অনলাইনে নেই এমন একটি লেখা শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে গেল কেমন করে! এর আগে সাংবাদিকতা বিভাগের একজন মহিলা অধ্যাপকের বিরুদ্ধে যখন একই বিভাগের আরেকজন শিক্ষক অভিযোগ করেছিলেন তার লেখার শুরু থেকে শেষ ফুলস্টপ পর্যন্ত কপি পেস্ট করেছেন ওই অধ্যাপক, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগ আর সিন্ডিকেট ছাড়া আর বাইরের কেউ জানল না কেন ঘটনাটি? ঘটনাটি তো ফেসবুকের যুগের সময়েই। এখন কেন গল্প এত ডালপালা গজাল? কারা ছড়াল? কেন ছড়াল? শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে তো কপিটি প্লেনে করে যায়নি। বিভাগের অতিদায়িত্ববান (!) কিছু শিক্ষক যারা যেচে ডিন অফিসে গিয়েছিলেন বিষয়টির ফয়সালা করতে তারাই হয়তো দেশ-জাতির কল্যাণার্থে পাঠিয়েছেন। কিন্তু তাদের একজনের বিরুদ্ধেই একবার ঘরোয়াভাবে চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ শুনেছিলাম। বইটি কিন্তু বাজারে এখনো আছে।

তবে কারও বোধহয় দেশ-জাতির কল্যাণের কথা মাথায় আসেনি। অথবা শত্রুতা আসেনি।

মানুষের এত কষ্ট, এত দুঃখ আমাকে নিয়ে যে গত সপ্তাহে বাংলাদেশ প্রতিদিনে আমি একটি লেখা লিখেছিলাম ‘মানুষ চেনা বড় দায়’ নামে, তাতেও কত আপত্তি! প্রশ্ন তোলেন, ‘শামসুর রাহমান কি এমনটাই ভেবেছিলেন’! প্রশ্ন তোলেন, ‘গণমাধ্যম কি যেমন ইচ্ছে লেখার আমার মিডিয়া খাতা’! আমার কলামে আমি যেমন ইচ্ছেই তো লিখব, তাই নয় কি বিজ্ঞ মহোদয়? একটু জানাতেও চাই সেদিনের পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে সবচেয়ে পঠিত লেখা কিন্তু সেটাই ছিল। শেয়ার  ছিল সতেরো হাজার। আমার পাঠকই আমাকে চোখে চোখে হারাতে যেয়ে বার বার শেয়ার দিয়েছেন বোধ করি। যারা সুদূর থেকে ক্ষমতাবানদের ধরে ধরে সরকারি চাকরির সুবিধা নিয়ে ফেসবুকে সময় কাটান, আমাকে বহু কষ্ট করে চোখে হারান, আমার লেখা পড়ে নিজেরা লেখায় উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন তাদের ধন্যবাদ জানাতে চাই। কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই কথিত নারীবাদী নামক জীবনযুদ্ধে পরাজিত কিছু মহিলা ও কিছু পুরুষকে। কারণ আমি মানুষের চোখে চোখেই থাকতে চাই।

আমি কারও প্রশ্নের উত্তর দিইনি। কারণ ফেসবুক বা অনলাইন পোর্টাল আমার উত্তর দেওয়ার জায়গা নয়। তদন্ত কমিটি সাবজুডিশিয়াল প্রক্রিয়া এবং স্পষ্টতই আমার ওপর নিষেধ আছে এ বিষয়ে মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকতে বা প্রমাণ তুলে ধরতে। তার পরও বাড়াবাড়ির পর্যায়ে গেছে বলেই কিছু তথ্য দেওয়া উচিত মনে করে আজ দু-একটি ছত্র লেখা। তাও আইনি পরামর্শে। ধৈর্য ধরে বসে আছি কবে তদন্ত কমিটি হয়। আশা করি এটি আঁধারে থাকবে না। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের শত ব্যস্ততার মাঝেও সময় দেবে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় নিশ্চয়ই শুধু অভিযোগ ছুড়ে দেবে না। আত্মপক্ষ প্রমাণের সুযোগও দেবে।

২০০০ সাল থেকে গণমাধ্যমে আছি সবার চোখের সামনে। ফ্রিল্যান্স হিসেবেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজের ব্যাঘাত না ঘটিয়ে, বিশ্ববিদ্যালয়কে অবহিত করেই। প্রেজেন্টার যেমন পদ, বিশেষ প্রতিনিধি যেমন পদ, তেমনি হেড অব কারেন্ট অ্যাফেয়ার্সও একটি পদ। বিশ্ববিদ্যালয় এবং গণমাধ্যম দুটি প্রতিষ্ঠানকে কাগজে কলমে নিয়মমাফিক অবহিত করেই সতেরো বছর ধরে ফ্রিল্যান্স কাজ করে যাচ্ছি, কই এত দিন তো প্রশ্ন ওঠেনি! আজ কেন কী উদ্দেশ্যে উঠছে তাও তো ভাবা উচিত বিজ্ঞ জ্ঞানীগুণীদের? এই বিশেষ গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানটির নীতিমালায় কি লেখা আছে ফ্রিল্যান্সকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া যাবে না? কোথায় লেখা আছে ওই মহীয়সী সাংবাদিক কি জানাবেন! জানাবেন কি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজের অবহেলা না করে, সুনাম বাড়িয়ে এই দায়িত্ব পালন করে কোন আইন ভঙ্গ হয়েছে?

নিজের বাবাকে পাশে রেখে পিতৃতুল্য শিক্ষকদের পাশে বসাকে যে শিক্ষক আশকারা মনে করে তার নৈতিক চরিত্র কি জাতি জানে? বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থে বিদেশ গিয়ে এক সপ্তাহের মাঝে ফিরে আসা এবং ছাত্রীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার চেয়েও সেটি কি অশ্লীল!

আমার কিন্তু মাথা হেঁট হয়নি, লজ্জায় মাথা কাটা যায়নি। বিরক্ত হয়েছি। কারণ আমি গল্পের পেছনের গল্পটা জানি। নাছোড়বান্দা এক ক্ষুরে মাথা মুড়ানো মানুষদের চিনি। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে আজ আপনি আছেন, কাল হয়তো আমি ছিলাম। মানুষের তুচ্ছতায় কষ্ট পাই সাময়িক, কিন্তু আমাকে তুচ্ছ করার চেষ্টা করা হয়েছে বলে নয়, কষ্ট পাই সে তুচ্ছ বলে। যারা ঘটনাটি শুনে অন্ধ বধির হওয়ার প্রক্রিয়ায় ছিলেন, তারা হয়তো বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে ছিলেন। হয়তো পাশে দাঁড়িয়ে দায় নিতে চাননি। ভেবেছিলেন পাছে লোকে কিছু বলে। হয়তো ছিলেন বিশ্বাস থেকে অবিশ্বাসের হাতছানিতে। সেই বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচল নিয়ে আজ বরং একটি গল্প বলি।

তবে গল্প শুরুর আগে ছোট একটি কবিতা বলতে চাই ঈশ্বরকে নিয়ে। কারণ বিশ্বাস-অবিশ্বাসের খেরোখাতায় সর্বপ্রথম তাঁর নামটিই লিখিত আছে সবচেয়ে বেশি। ক্ষুদ্র মানব সম্প্রদায় তো সেখানে তুচ্ছ। বিশ্বাসীদের ধারণা ঈশ্বর সর্বত্র, ঈশ্বর রয়েছেন জলে স্থলে, মানুষের মাঝে। আমার বাবা বাংলাদেশ বেতারের সাবেক পরিচালক কাজী মাহমুদুর রহমানের ভাষায়—

ঈশ্বর জেগে আছেন,

তিনি জেগে থাকেন,

বসে থাকেন সব দৃশ্য আর অদৃশ্যের মোহনায়। …

কখনো তিনি বিশ্বাস, অবিশ্বাসের সকল গ্রন্থে,

তর্কে-বিতর্কে আদালতের কাঠগড়ায়…

তখন বড় নিঃসহায়…

যেমন অন্ধ ভিক্ষুক কাঁপা কাঁপা হাতে

শূন্য থালা হাতড়ায়। …

ঈশ্বর সর্বত্রগামী — রাজভবন থেকে বস্তিতে…

তিনি ঈশ্বর… হূিপণ্ডহীন… অবিনশ্বর

তিনি ক্ষুধাহীন… নির্ঘুম। …

অথচ অসীম শ্রান্তিতে তিনি এখন ঘুমিয়ে

ক্ষুধার্ত পথশিশুর ছেঁড়া জামার শূন্য পকেটে।

দুঃখিত কবিতাটি কিছুটা ছেঁটে কেটে ফেলায়। কিন্তু আমার বাবা নিশ্চয়ই শত্রুতা করে আমার বিরুদ্ধে কপি পেস্টের দায় আনবেন না।

মার্কিন দার্শনিক, লেখক ড. ওয়েন ডায়ার বিশ্বাসী-অবিশ্বাসীদের নিয়ে চমৎকার একটি আধ্যাত্মিক গল্প বলেছিলেন। মায়ের গর্ভে দুই শিশু। একজন অন্যজনকে প্রশ্ন করল, ‘তুমি কি ডেলিভারির পরের জীবনে বিশ্বাস কর?’ অন্য শিশুটি বলল, ‘অবশ্যই। সেখানে নিশ্চয়ই ভালো কিছু অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। হয়তো আমরা এখান থেকে পরে যা হব তারই প্রস্তুতি নিচ্ছি আজ। ’ ননসেন্স! প্রথম জন বলল, ‘ডেলিভারির পরে আর কোনো জীবনই নেই। কোন ধরনের জীবন হবে তা তুমি জানো কিছু?’

দ্বিতীয় জন বলল, ‘আমি ঠিক জানি না তবে হয়তো এখানের চেয়ে নিশ্চয়ই অনেক আলোকিত হবে সেই জায়গাটি। সম্ভবত সেখানে আমরা দুই পায়ে হাঁটতে পারব। মুখ দিয়ে খেতে পারব। হয়তো আমাদের অনেক ইন্দ্রিয় থাকবে, যা এখন বুঝতে পারছি না। ’

প্রথম জন বলল, ‘পাগল নাকি! হাঁটা অসম্ভব আর মুখ দিয়ে খাওয়া… হাস্যকর! আমবিলিক্যাল কর্ড যা প্রয়োজন সে অনুযায়ী আমাদের পুষ্টি দিচ্ছে। কিন্তু আমবিলিক্যাল কর্ড এত ছোট তাই ডেলিভারির পরের জীবন যৌক্তিকভাবে অযৌক্তিক। ’

দ্বিতীয় জন জোর দিয়ে বলে, ‘আমার মনে হয় সেখানে নিশ্চয়ই এমন কিছু আছে যা এখানের চেয়ে ভিন্ন। হয়তো এই আমবিলিক্যাল কর্ডের আর প্রয়োজনই হবে না সেখানে। ’

প্রথম শিশু : ‘ননসেন্স! যদি সেখানে জীবন থেকেই থাকে তবে সেখান থেকে কেউ আজ পর্যন্ত এখানে ফিরে এলো না কেন? ডেলিভারি মানে জীবনের শেষ। ডেলিভারির পরে অন্ধকার ছাড়া আর কিছু নেই। শুধুই অন্ধকার আর নিস্তব্ধতা। ’

দ্বিতীয় শিশু, ‘ঠিক আছে, আমি জানি না, কিন্তু আমার বিশ্বাস নিশ্চিতভাবে সেখানে আমি আমার মাকে দেখতে পাব। তিনি আমাদের ভালোবাসবেন, যত্ন নেবেন। ’

প্রথম শিশুটি বলে ওঠে, ‘মা? আরে তুমি কি সত্যি বিশ্বাস কর মা বলে কেউ আছেন? হাস্যকর! তিনি যদি থাকেন তবে তিনি কোথায় এখন?’

দ্বিতীয় শিশু : ‘তিনি সর্বত্র আছেন। আমাদের চারপাশে আছেন। আমরা তার ভিতরে, তার অস্তিত্বের মধ্যে আছি। তিনি ছাড়া এই পৃথিবীতে আমি আসতাম না, থাকতেও পারতাম না। ’

প্রথম জনের উত্তর :  ‘কিন্তু আমি তো তাকে দেখতে পাই না। তাই এটাই যৌক্তিক যে তিনি নেই। ’

দ্বিতীয় শিশুটি বলে ওঠে, ‘যখন তুমি নিস্তব্ধতার মাঝে থাকো, একটু চিন্তা করে বোঝার চেষ্টা করো, দেখবে তুমি তার উপস্থিতি টের পাবে, শুনবে তার ভালোবাসার কণ্ঠস্বর, বুঝবে তার অস্তিত্ব। ’

আজ খুব বলতে ইচ্ছা করছে :

বিশ্বাস দিয়ে আর কাজ নেই— থাক।

সে তো ঘুণপোকা।

অবিশ্বাসী!

ঈশ্বরের মতো

আছে কি নেই!

হোক না শত্রু, হোক না মিত্র

সে লড়াই তো সত্যের সাথে মিথ্যের

জয় একদিন হবেই হবে

বিশ্বাস দিয়ে আর কাজ নেই— থাক।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

আরো খবর »