গোপালগঞ্জের রূপকার মথুরানাথ বোস এখন শুধুই ইতিহাস

Feature Image

জেলা প্রতিনিধি, স্বাধীনবাংলা২৪.কম

গোপালগঞ্জ থেকে এস এম সাব্বির: মথুরানাথ বোস এখন গোপালগঞ্জের ইতিহাসে বি¯তৃত প্রায় একটি নাম। আলোকিত মানুষ তৈরি তথ্য শিক্ষার আলো বিস্তারে ঋষিতুল্য এ মানুষটি এক সময় ছিলেন প্রবাদপুরুষ। অশিক্ষা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আজীবন লড়ে গোপালগঞ্জের পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীকে জাগিয়ে তুলতে তার ভূমিকা ছিল অপরিসীম। তিনি ছিলেন এ অঞ্চলের শিক্ষার অগ্রদূত, ভাটির মানুষের মুক্তিদাতা, সমাজ সংস্কারক ও মঙ্গলের প্রতীক। অথচ ইতিহাসের অতল তলে এখন হারিয়ে যাচ্ছে তার স্মৃতি।

দেড়’শ বছর আগে যে মানুষটি এখানে ছিলেন জাগ্রত চেতনার বহ্নিশিখা, আজ তাকে কেউ স্মরন করছে না। পালিত হচ্ছে না তার কোন জন্ম বা মৃত্যুবার্ষিকী। অবহেলায় পড়ে আছে তার স্মৃতিসৌধ। সন্ধোবেলায় কেউ তার সমাধিতে প্রদীপ জ্বালে না, দেয় না আগরবাতি। বরং তার সম্পত্তি সংলগ্ন নিজস্ব অনেক জায়গা-জমি এখন প্রভাবশালীরা গ্রাস করে নিয়েছেন। তার ঘরবাড়ি, সহায়-সম্পত্তি এখন নিশ্চিহ্ন হয়ে পড়েছে। গোপালগঞ্জ শহরটি মুলত মধুমতি নদীর তীরে খাটরা মৌজার ওপর অবস্থিত। এর পূর্ব নাম ছিল রাজগঞ্জ। তৎকালে এ অঞ্চলটি নিতান্তই ছিল একেবারেই জলাভূমি ও প্লাবনে নিমজ্জিত এলাকা। অধিবাসীদের প্রায় সবাই ছিল নমঃশুদ্র সম্প্রদায়ের লোক। সকলেই ছিল গরীব, অশিক্ষিত ও নিরক্ষর। দশ গ্রামের মধ্যে নামস্বাক্ষরকারী কাউকে পাওয়া যেত না, ছিল না কোন স্কুল। অতি দরিদ্র, অনুন্নত ও অশিক্ষিত এসব মানুষের মধ্যে শিক্ষার আলো ও মুক্তির বার্তা পৌঁছে দিতে সে সময়ের ফরিদপুরের জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট মিঃ ওয়ারলেস কলকাতা মিশন-কর্তৃপক্ষকে-এ এলাকায় একজন মিশনারি পাঠানোর জন্য আবেদন জানান। কিন্তু কেউই তখন এখানে এ কাজে আসতে রাজি হয়নি। অবশেষে মথুরানাথ বোস এ গন্ডগ্রামে আসতে রাজি হন। অতঃপর তিনি কলকাতার ভবানীপুরে লন্ডন মিশনারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষকতার চাকুরি ছেড়ে ১৮৭৪ সালের ফেব্রয়ারি মাসের প্রথমে নৌকাযোগে রওয়ানা হয়ে পনের দিন পর গোপালগঞ্জে এসে পৌঁছান। শুরু করেন আরেক নিরন্তর সাধনা। মানুষকে আগিয়ে তোলার কাজ। গড়ে তোলেন শিক্ষাঙ্গন, ভজনালয়, কোর্ট, পোস্ট অফিস, হাইস্কুল, ব্যাংক, হাসপাতাল ও কৃষি খামার। অসহায় ও দরিদ্র মানুষের পাশে থেকে জীবনভর দিয়ে যান সেবা। হয়ে ওঠেন তাদের সখা ও বন্ধু।

মহাপু‘ষ মথুরানাথ বোসের সংপিক্ষপ্ত পরিচিতিঃ ১৮৪৩ সালে যশোর জেলার কোটচাঁদপুর গ্রামে এক বিখ্যাত কুলিন কায়েত পরিবারে মথুরানাথ বোস জন্ম গ্রহণ করেন। পড়াশুনা করেন কলকাতার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। ডাব কলেজ থেকে ১৮৬০ সালে তিনি গ্রাজুয়েট হন এবং পরের বছর ল পাস করেন। সেই থেকে মথুরানাথের কর্মময় জীবন শুরু হয় ১৮৬১ সালে কোলকাতা হাইকোর্টের আইন ব্যবসার মাধ্যমে। কিন্তু এ কাজ তার মনপুত হয়নি। ১৮৬৫ সালে তিনি কোলকাতার ভবানীপুরের লন্ডন মিশনারি হাইস্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন এবং একই বছরে তিনি খ্রিষ্টান ধর্মে দীক্ষিত হন। প্রায় ৯ বছর ঐ স্কুলে শিক্ষকতা করার পর কলকাতা মিশন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তিনি খ্রিষ্টধর্ম প্রচারের জন্য ১৮৭৪ সালে রাজগঞ্জের (বর্তমান গোপালগঞ্জ) অজপাড়াগায় চলে আসেন। রাজগঞ্জ তখন ছিল মাদারীপুর মহাকুমার অন্তর্গত একটি হাট (নদী বন্দর)। পরে এর নামকরণ হয় গোপালগঞ্জ। পরে ধর্মযাজক মথুরানাথের প্রচেষ্টাই এটি প্রথমে থানা এবং পরে ১৯০৯ সালে মহাকুমার মর্যাদা পায়। মথুরানাথ বোসই এ অঞ্চলের শিক্ষার আলোবঞ্চিত ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে জ্ঞানের অনিবার্ণ শিখা প্রজ্জ্বলিত করেন।

মথুরানাথ বোসই সর্বপ্রথম এখানে রেভারেন্ড জেএল সরকারের বাসভবনের কাছে ছেলেদের জন্য একটি পাঠশালা স্থাপন করেন। এ পাঠশালাটি ক্রমে উচ্চ প্রাইমারি ও পরে মিশন হাইস্কুলে উন্নীত হয়। পরে এ মিশন হাইস্কুলের নাম তারই নামানুসারে এমএন ইন্সটিটিউশন রাখা হয়। বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ মিশন হাইস্কুলের ছাত্র ছিলেন। ১৯৪২ সালে বঙ্গবন্ধু এ মিশন হাইস্কুল থেকে মেট্রিক পাস করেন। পরে এ মিশন স্কুলটি ১৯৫০ সালে কায়েদে আযম মেমোরিয়াল কলেজ এবং বর্তমানে সরকারি বঙ্গবন্ধু বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে রূপান্তরিত হয়েছে। এছাড়াও তার নামে প্রতিষ্ঠিত গোপালগঞ্জে একটি বিদ্যালয় বর্তমানে এস.এম মডেল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ও এস.এম মডেল সরকারি প্রাঃ বিদ্যালয় গোপালগঞ্জের সেরা বিদ্যাপীঠ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত।

মথুরানাথ মহিলা শিক্ষার জন্য মিশন মাইনর গার্লস স্কুল স্থাপন করেন। গোপালগঞ্জে তিনিই প্রথম কোর্ট স্থাপন করেন এবং ব্রিটিশ সরকার তাকেই প্রথম এ কোর্টের অবৈতনিক হাকিম নিযুক্ত করেন। এছাড়া তিনি দরিদ্র মানুষকে বিনা পয়সায় চিকিৎসার জন্য দাতব্য চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠা করেন। একক প্রচেষ্টায় তিনিই প্রথম এখানে কৃষি ব্যাংক ও হাসপাতাল স্থাপন করেন। প্রতিষ্ঠা করেন ডাকঘর। তার প্রচেষ্টাই গোপালগঞ্জ আলোকিত রূপ পায়। মর্যাদা পায় শহরের। মূলত গোপালগঞ্জের রূপকার ছিলেন তিনি।

জাতি ধর্ম নির্বিশেষে দুস্থ পীড়িত, অসহায় ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সেবা করাই ছিল তার ব্রত। দুর্যোগ হলে, তখণই তিনি চাল, ডাল, বস্ত্র ইত্যাদি নিয়ে হাজির হতেন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায়। তিনি ছিলেন প্রার্থনার মানুষ। প্রার্থনাই ছিল তার শক্তির উৎস। যে কোন অসুস্থ পীড়িত মানুষ এসেছে তার কাছে তিনিই মুক্ত হয়ে ফিরে গেছেন বাড়িতে। তিনি ছিলেন স্বর্গের দেব দূতের মতো। শশ্ররুমন্ডিত এ মানুষটি অন্তিমকাল পর্যন্ত অসহায় ও দুখী মানুষের সেবাদান করেছেন। তার নামের দোহাই দিয়ে আজও মানুষ প্রার্থনা করে শোক পীড়া থেকে মুক্তি পাচ্ছে। কিংবন্তির এ মহানায়ক সাধক পরুষ চির কুমার সেন্ট মথুরানাথ ৫৮ বছর বয়সে পরলোক গমন করেন। কিন্তু যে মানুষটির আপ্রাণ প্রচেষ্টায় গোপালগঞ্জ শহরের বিকাশ সেই মহৎপ্রাণ সেন্ট মথুরানাথের নাম আজ গোপালগঞ্জবাসীর গেছে বিস্মৃত প্রায়। নবপ্রজন্ম তার কথা জানেই না। পুরানোরাও কেউই তার কথা এখন আর স্মরণ করে না। তার মৃত্যু ও জন্মবার্ষিকীতে হয় না কোন স্মরণসভা। তারই প্রতিষ্ঠিত মিশন হাইস্কুলের (বর্তমান বঙ্গবন্ধু বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ) মাত্র দশ গজ দূরে পুরাতন লঞ্চঘাট। ঐ এলাকায় তাঁর সমাধি সৌধটি পড়ে আছে অযতেœ অবহেলায়। সমাধির গায়ে ইংরেজিতে লেখা যে এপিটাকটি ছিল তাও মুছ গেছে। সমাধি ক্ষেত্রে নেই কোন নামফলক। গোপালগঞ্জবাসীর কাছ থেকে যেন এভাবেই হারিয়ে যাচ্ছে একটি নাম, একটি ইতিহাস। তার স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য শহরের খ্রিস্টান পাড়ায় প্রতিষ্ঠিত প্রাচীনতম গির্জা সেন্ট মথুরানাথ ভজনালয় প্রতি রোববারে প্রার্থনা সভা বসে।

শিখানো হয় ধর্মসভা। কিন্তু সেন্ট মথুরানাথের নাম খুব কমই উচ্চারিত হয় এসব স্থানে। প্রশাসনের কর্মকর্তারাও তার নাম জানে কম। যে ব্যক্তির মহান ত্যাগ ও নিরলস কর্ম প্রচেষ্টায় আমরা পেয়েছি নাগরিক জীবনের ছোঁয়া, পেয়েছি শিক্ষার আলো, সেই মহামানব সেন্ট মথুরানাথকে স্মরণ করে আসেন ইতিহাসের অমরত্ব মেনে নেই, শ্রদ্ধা জানাই প্রতি স্মরণীয়কে। প্রাণে প্রাণে গেয়ে উঠি জীবনের গান, মানুষ মানুষের জন্য।

স্বাধীনবাংলা২৪.কম/এমআর

আরো খবর »