দেড় বছর পর রাজশাহীর হোটেলে তরুণ-তরুণী খুনের রহস্য উদঘাটন

Feature Image

দীর্ঘ দেড় বছর পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ইসলামের ইতিহাস বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র মিজানুর রহমান মিজান ও পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পাবিপ্রবি) পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্রী সুমাইয়া নাসরিন হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটিত হয়েছে। প্রেমের প্রতিশোধ নিতেই চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছিল বলে জানা গেছে।

গত বছর ২২ এপ্রিল রাজশাহী নাইস হোটেলের একটি কক্ষ থেতে ওই দুই তরুণ-তরুণীর লাশ উদ্ধার করা হয়। কক্ষের ভেতরে মিজানুরের লাশ ওড়না দিয়ে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলানো ছিল। আর সুমাইয়ার লাশ বিছানায় পড়েছিল। ঘটনার পরের দিন ২২ এপ্রিল সুমাইয়ার বাবা আব্দুল করিম বাদী হয়ে নগরের বোয়ালিয়া থানায় মামলাটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এতে হোটেলের কর্মচারীদের সহযোগিতায় তরুণীকে ধর্ষণের পর দুইজনকে হত্যার অভিযোগ করা হয়।

পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) উপ পরিদর্শক মহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত চারজনকে তারা গ্রেফতার করেছেন। যাদের মধ্যে দুইজন রাজশাহীর মহানগর হাকিম আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তাদের জবানবন্দিতে বেরিয়ে এসেছে হত্যাকাণ্ডের চাঞ্চল্যকর সব তথ্য।

মহিদুল বলেন, পুলিশের খাতায় শেষ হওয়া মামলার ছায়া তদন্ত করে পিবিআই।
ঝুলন্ত লাশের হাত বাধা ও রুমের মধ্যে একাধিক ব্যান্ডের সিগারেটের শেষ অংশ তাদের সন্দেহ এনে দেয়। এ সন্দেহ থেকে তারা তদন্ত শুরু করে। এ ঘটনার সঙ্গে ওই চারজন ছাড়াও আরও কেউ থাকতে পারে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে বলে জানান মহিদুল।

গ্রেফতার চার খুনিরা হলেন, রাজশাহীর বরেন্দ্র কলেজের ছাত্র আহসান হাবিব ওরফে রনি (২০), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র রাহাত মাহমুদ, রাজশাহী কলেজের ছাত্র আল আমিন ও বোরহান কবির উৎস।

এদের মধ্যে রনি পাবনার ফরিদপুর উপজেলার এনামুল হক সরদারের ছেলে। রাহাতের বাড়ি সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলঅর খোর্দ্দ গজাইদ গ্রামে। তার বাবার নাম আমিরুল ইসলাম। আর আল আমিন রাজশাহীর পবা উপজেলার জয়কৃষ্ণপুর গ্রামের টিপু সুলতানের ছেলে এবং উৎস নাটোরের লালপুর উপজেলার উত্তর লালপুর গ্রামের শফিউল কালামের ছেলে।

পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মহিদুল ইসলাম বলেন, গ্রেফতার চার জনের মধ্যে রনি ও উৎসব আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা স্বীকার করেছে। রাহাত ও আল আমিনকে আবারো রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে জানান তিনি।

মহিদুল বলেন, আহসান হাবিব রনি রাজশাহীর বরেন্দ্র কলেজের ছাত্র হলেও ঘটনার পর থেকে সে ঢাকায় অবস্থান করছিল। গত ১৮ অক্টোবর তাকে ঢাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়। ঘটনার দিন নিহত মিজানুর ও রনির একটি ফোনকলের সূত্র ধরে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। এর পরের দিন তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাজশাহী নগরের একটি ছাত্রাবাস ও সোনাদিঘী এলাকা থেকে রাহাত মাহমুদ, আল আমিন ও উৎসকে গ্রেফতার করা হয়। ২০ অক্টোবর তাদের আদালতে হাজির করা হলে রবি ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। অপর তিনজনকে চার দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ২৩ অক্টোবর তাদের তিনজনকে আদালতে হাজির করা হলে উৎস ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে ধর্ষণ ও দুইজনকে হত্যার কথা স্বীকার করে। রাজশাহী মহানগর হাকিম জাহিদুল ইসলাম রনির এবং কুদরাত-ই-খোদা উৎসবের জবানবান্দী রেকর্ড করেন।

রনি স্বীকার করেন, হোটেল কক্ষে মিজানুরকে প্রথমে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়। এরপর তারা সুমাইয়াকে সবাই মিলে ধর্ষণ করেন। পুলিশের মেয়ে বলে ঘটনা ফাঁস হওয়ার ভয়ে তারা তাকেও মুখে বালিশ চাপা দিয়ে হত্যা করে।

জবানবন্দিতে হাবিব আরও বলে, রাহাত মাহমুদের সঙ্গে প্রথমে সুমাইয়ার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। পরে মিজানুরের সঙ্গে নতুন করে তার প্রেমের সম্পর্ক হয়। এ নিয়ে রাহাত তার ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য পরিকল্পনা করে। রাহাত নগরের বিনোদপুরের একটি ছাত্রাবাসে থাকতো। সেখানে তিনি আহসান হাবিবকে ডেকে নিয়ে তার পরিকল্পনার কথা বলেন। মিজানুরের সঙ্গে প্রেমের সর্ম্পকের কথা শুনে আহসান হাবিব বলেন, মিজানুরকে তিনি চেনেন। সে ল্যাংড়া।

এরই মধ্যে মিজানুরের সঙ্গে দেখা করার জন্য সুমাইয়া রাজশাহীতে আসছিলেন। মিজানুর তাকে নাটোরের বনপাড়া থেকে এগিয়ে নিয়ে আসেন। সে সময় মিজানুর আহসান হাবিবকে ফোন করে জানতে চান শহরের কোন হোটেলে উঠলে ভালো হয়। আহসান হাবিব তাকে হোটেল নাইসে উঠার পরামর্শ দেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২১ এপ্রিল রাত ৮ থেকে ১০টার মধ্যে হোটেল কক্ষে তারা মিজানুর ও সুমাইয়াকে হত্যা করে।

আদালতে আহসান হাবিব বলেছে, হোটেলের ওই কক্ষে ঢুকে তারা প্রথমে শুধু সুমাইয়াকে পান। তারপর তারা মিজানুরকে ফোন করে ডাকার জন্য সুমাইয়াকে চাপ দেন। বাধ্য হয়ে সুমাইয়া মিজানুরকে ফোন করে ডাকেন।

জবানবন্দিতে উৎস বলে, পাশের ভবনে এসির উপর দিয়ে গিয়ে তারা জানালা দিয়ে সুমাইয়ার রুমে প্রবেম করে। মিজান রুমে আসার পর তার সঙ্গে রাহাতের কথাকাটাকাটি হয়। এর এক পর্যায়ে রাহাত টি টেবিলের পায়া খুলে মিজানের মাথায় আঘাত করে। এতে তার মাথা ফেটে রক্ত বের হয়ে যায়। এর পর সুমাইয়ার ওড়না দিয়ে গালায় ফাস দিয়ে রাহাত ও রনি মিজানকে হত্যা করে। তার পর লাশ মেঝেতে রেখে প্রথমে রাহাত, এর পর রনি এবং আল আমিন সুমাইয়াকে ধর্ষণ করে। এ সময় মেয়েটি শুধু কাঁদছিল। ধর্ষণের পর রনি সুমাইয়াকে গলা টিপে হত্যার চেষ্টা করে। এতে সে ব্যর্থ হলে রাহাত ও রনি দুইজনে মিলে সুমাইয়ার মুখে বালিশ চেপে ধরে হত্যা করে। এর পর মিজানের লাশ রনি ও রাহাত ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে দেয়। ঘটনার সময় রাহাত ও রনি একাধিক সিগারেট খায়। এর পর রনি দরজা দিয়ে এবং অন্যরা জানালা দিয়ে বের হয়ে যায়।

আরো খবর »