লালমনিরহাটের নিরাময় ক্লিনিকে ভুল চিকিৎসায় প্রসূতির মৃত্যু

Feature Image

জেলা প্রতিনিধি, স্বাধীনবাংলা২৪.কম

লালমনিরহাট থেকে জিন্নাতুল ইসলাম জিন্না: ৬ মাসের ব্যবধানে পর পর কয়েকজন রোগীর মৃত্যুর কারনে লালমনিরহাট জেলা শহরের নিরাময় ক্লিনিক এন্ড ডায়াগনষ্টিক সেন্টার যেন মৃত্যুকুপে পরিনত হয়েছে। ভুল চিকিৎসা এবং কর্তব্য অবহেলার কারনেই সম্প্রতি ফজিলা খাতুন (৩০) নামের আরও এক প্রসুতির মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। চিকিৎসার নামে ফজিলাকে হত্যা করার দাবি করে তার বাবা বাদী হয়ে লালমনিরহাট সদর থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেন।

প্রাপ্ত অভিযোগে জানা যায়, গত ১৮ অক্টোবর বুধবার বিকেলে আদিতমারী উপজেলার কুমড়িরহাট এলাকার  নুরুজ্জামানের স্ত্রী ফজিলার প্রসব বেদনা উঠলে তাকে শহরের নিরাময় ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। ওইদিন আনুমানিক রাত ৮টায় ডাঃ সিরাজুল ইসলাম প্রসুতি ফজিলার অস্ত্রপাচার করে পুত্র সন্তান প্রসব করেন। এরপর সবই স্বাভাবিক ভাবেই চলছিল এবং সদ্য ভুমিষ্ঠ হওয়া তার সন্তানকে নিজের বুকের দুধও পান করান ফজিলা। পরদিন সকালে ফজিলা হঠাৎ ছটফট করতে করতে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং এর কিছুক্ষনের মধ্যেই তিনি মারা যান বলে জানান ফুপু মিনা খাতুন।

ফজিলার ফুপু মিনা খাতুন সাংবাদিকদের জানান, সকালে ফজিলার অবস্থা খারাপ হতে থাকলে তিনি ক্লিনিক কর্তৃপক্ষকে তার প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিতে জোড় অনুরোধ জানান। কিন্তু ক্লিনিকের লোকজন তার কথায় কোন গুরুত্ব না দিয়ে বলেন ও কিছু না সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু ফজিলার অবস্থার আরো অবনতি হলে তিনি আবারও তাদের অনুরোধ জানানো হলে একজন আয়াকে পাঠানো হয় ফজিলাকে দেখতে। এর কিছুক্ষন পরেই ফজিলা মারা যায়।

ফজিলার মারা যাওয়ার বিষয়টি জানাজানি হলে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ তড়িঘড়ি করে ফজিলার মৃতদেহ মাইক্রোবাসে তোলেন। তখন ফুপু মিনা খাতুন তাদের বাধা দিলে তারা বলেন, রোগীকে রংপুর মেডিকেলে নিতে হবে এজন্য অনেক রক্তের প্রয়োজন। আপনারা রক্তের ব্যবস্থা করুন। কথা শেষ না হতেই তারা ফজিলার মৃতদেহ ও ভুমিষ্ঠ হওয়া বাচ্চাসহ ফুপুকে জোড় করে গাড়িতে তুলে রংপুরের উদ্দেশ্যে রওনা দেয় ক্লিনিকের লোকজন।

ফুপু মিনা আরও জানান, রংপুর মেডিকেলের বারান্দায় ফজিলাকে নেয়ার পর পরই সেখানকার লোক এসে বলেন রোগীতো অনেক আগেই মারা গেছে। আপনারা লাশ নিয়ে যান। ইতিমধ্যে নিরাময় ক্লিনিকের চৌকস ম্যানেজার মাসুদ তরিঘরি করে জাল ডেথ সার্টিফিকেট তৈরী করে লাশ ফজিলার স্বামীর বাড়িতে না দিয়ে তার বাবার বাড়িতে পৌছে পালিয়ে আসেন।

ফজিলার বাবা মোর্শেদ মিয়া কান্না জড়িত কন্ঠে সাংবাদিকদের জানান, ক্লিনিকের লোকজন তার মেয়ের লাশ আমার বাড়িতে রেখেই তড়িঘড়ি করে চলে যান। তখন তিনি বাড়িতে ছিলেন না। এরপর তিনি ক্লিনিকে এসে মেয়ের চিকিৎসার কাগজপত্র ও মৃত্যুর কারন জানতে চাইলে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ তাকে হুমকী ধমকী দিয়ে ক্লিনিক থেকে ঘার ধাক্কায়ে বের করে দেন। ভুল চিকিৎসা এবং কর্তব্যের অবহেলার কারনেই তার মেয়ের মৃত্যু হয়েছে বলে তিনি তার মেয়ের হত্যার বিচার চান।

এদিকে ফজিলার বাবা মোর্শেদ মিয়া বাদী হয়ে সদর থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেন। এরপরে উঠে পরে বসেন ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ। এক শ্রেণীর দালাল ও কুচক্রি মহলকে নিয়ে শুরু হয় ফজিলার জীবনের দর কষাকষি। অবশেষে গত ২৯ অক্টোবর সন্ধ্যায় থানা চত্বরেই ৬০ হাজার টাকায় নির্ধারন হয় ফজিলার জীবনের মুল্য।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পল্লী চিকিৎসক জানান, আয়া ও ওয়ার্ড বয়কে দিয়ে নাম সর্বস্ব চিকিৎসা কেন্দ্র খুলেছে নিরাময় ক্লিনিক। তাদের ভুল চিকিৎসায় শুধু ফজিলাই নয়, এর আগেও অনেক প্রসূতি মায়ের মৃত্যু হয়েছে।

বিষয়টি জানাজানি হলে তথ্যানুসন্ধ্যানে ওই ক্লিনিকে সাংবাদিকরা সংবাদ সংগ্রহে গেলে কোনরুপ তথ্য প্রদান করা হয়নি। ফজিলার মৃত্যুর বিষয়ে তারা কোন কিছু বলতে চান না বলেও সাফ জানিয়ে দেন।

নিরাময় ক্লিনিক এন্ড ডায়াগনষ্টিক সেন্টারের মালিক সামসুল আলম জানান, রোগী অসুস্থ হওয়ার পর তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয় এবং সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। তবে মোটা অংকের রফাদফার বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন।

লালমনিরহাট সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মাহফুজ আলম জানান, ফজিলার সদ্য প্রসূত সন্তানকে প্রতিপালনের জন্য ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ তার পরিবারকে ৬০ হাজার টাকা দিয়ে অভিযোগটির মিমাংসা করে নিয়েছেন।

লালমনিরহাট সিভিল সার্জন ডাঃ কাশেম আলী জানান, ফজিলার মৃত্যুর বিষয়টি লোকমুখে শুনে নিরাময় ক্লিনিকসহ সকল ক্লিনিককে চিঠি পাঠানো হচ্ছে। শিশু ও মাতৃ মৃত্যুর হার এবং মৃত্যুর কারন জানতে যাওয়া হচ্ছে সেই চিঠিতে। ফজিলার পরিবার পরিবার লিখিত অভিযোগ দিলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

স্বাধীনবাংলা২৪.কম/এমআর

আরো খবর »