গোপালগঞ্জে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারকে হয়রানীর অভিযোগ

Feature Image

জেলা প্রতিনিধি,স্বাধীনবাংলা২৪.কম

গোপালগঞ্জ থেকে এস এম সাব্বির: গোপালগঞ্জে ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের পক্ষ থেকে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা পরিবারকে হয়রানী করা হচ্ছে বলে জেলা প্রশাসক বরাবরে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।

কাশিয়ানী উপজেলার পাথারঘাটা গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য মৃত শেখ শাহাবুর রহমানের ছেলে নাহিদুল ইসলাম এ অভিযোগ করেছেন। এ ব্যাপারে আগামী ১৩ নভেম্বর দু’ পক্ষের শুনানী শেষে তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রতিবেদন দাখিল করবেন বলে জানাগেছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, নাহিদুল ইসলামের পিতা শাহাবুর রহমান ১৯৬৯ সালে পাকিস্তান সেনা বাহিনীতে যোগ দেন। ট্রেনিং শেষে ৭১ সালের  ফেব্রুয়ারীতে ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে আসে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি গ্রাম থেকেই মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। দেশ স্বাধীন হলে তিনি বাংলাদেশ বাহিনীতে ফিরে যান। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তিনি গেজেট ভূক্ত হন। তাঁর গেজেট নং ৩২৩৯। মুক্তিবার্তা ও লালবইতে সিরিয়াল নং ০১০৯০৪৭৭৬। সনদ নং ১৭৯৬২২। এসব কাগজপত্রে ভুল বসত তার নাম শাহাবুর রহমানের স্থলে মাহবুর রহমান (সেনাবাহিনী) লেখা হয়। ২০০০ সাল থেকে শাহাবুর মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পাচ্ছেন। নামে ভুল থাকার সুযোগ নিয়ে শাহাবুরের আপন বড় ভাই অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্য মাহবুর রহমান মুক্তিবার্তা, লাল বইতে তার নাম রয়েছে দাবি করে মুক্তিযোদ্ধা তালিকা ভূক্ত হওয়ার জন্য মন্ত্রনালয়ে আবেদন করেন। তখন শাহাবুর রহমান মন্ত্রনালয়ে আবেদন করে নাম সংশোধন চান। কাশিয়ানী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে এ ব্যাপারে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলে মন্ত্রনালয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তদন্ত শেষে  শাহাবুর রহমাকে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মন্ত্রনালয়ে প্রতিবেদন দাখিল করেন। তদন্তকারী কর্মকর্তা মুক্তিযোদ্ধা শাহাবুর রহমানকে হয়রানী না করার জন্য মাহাবুর রহমানকে শতর্ক করেন। এর কয়েক দিন পর মাহাবুর রহমান মারা যান। মাহাবুর রহমানের  মৃত্যুর পর শাহাবুর রহমানের মুক্তিবার্তা নম্বর ব্যবহার করে  গোপানে মাহাবুর ররহমানের নামে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা চালু করা হয়। মুক্তিবার্তা ও লাল বইতে মাহাবুর রহমান সেনা বাহিনী লেখা রয়েছে। মাহাবুর রহমান কখনো সেনা বাহিনীতে ছিলেন না। তিনি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ৯ মাস পুলিশ বাহিনীতেই কর্মরত ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে সেনা সদস্য শাহাবুর রহমানই মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তিনি গত ২০১৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারী মৃত্যু বরন করেন।

অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য মুক্তিযোদ্ধা মৃত শাহাবুর রহমানের ছেলে নাহিদুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, মুক্তিবার্তা প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৯৮ সালে। ২০০৪ সালে এটি সর্বশেষ সংশোধন করা হয়। তখন আমার বাবার নামের স্থলে মাহাবুর রহমান লেখা ছিলে। সে সময় আমার চাচা নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা দাবি করেননি। যখন মুক্তিযোদ্ধাদের মূল্যায়ন বেড়েছে ঠিক তখন ২০১২ সালে তিনি নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা দাবি করেছেন। তারপর থেকে তারা আমাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ দিয়ে পদে পদে হয়রানী করে আসছে। ২০১২ সালে আমার বাবার ভাতা তারা অভিযোগ দিয়ে বন্ধ করে দেয়। সর্বশেষ যাচাই বছাইয়ে মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে আমাদের ভাতা ফের বন্ধ করে দেয় হয়। অনেক চেষ্টা করে এ ভাতা চালু করেছি। মাহাবুর রহমানের মৃত্যুর পর তার পরিবারের সদস্যরা অবৈধ ভাবে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা চালু করেছে। এ ব্যাপারে প্রতিকার চেয়ে আমি জেলা প্রশাসক বরাবর আবেদন করেছি। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে তদন্ত পূর্বক ব্যবস্থা গ্রহনের নির্দেশ দিয়েছেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমিকে বিষয়টি তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছেন।

শাহাবুরের সহযোদ্ধা ইদ্রিস আলী মিয়া, মোল্লা আলী আশরাফ, ফরিদ আহম্মেদ মোল্লা  বলেন, শাহাবুর আমাদের সাথে যুদ্ধ করেছেন। যুদ্ধের সময় তিনি কাশিয়ানী উপজেলার ফুকরা ইউনিয়নের বোয়ালিয়ায় পাক বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। পরে জীবন নিয়ে ফিরে আসেন। মুক্তিযুদ্ধে তিনি বীরত্বপূর্ন অবদান রাখেন।

মুক্তিযোদ্ধা শাহাবুর রহমানের আপন ছোট ভাই অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্য মোঃ মশিউর রহমান বলেন, আমার ভাই শাহাবুর রহমান প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। তিনি সেনা বাহিনীতে ছিলেন। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সেনা বাহিনীও তাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্ত বড় ভাই মাহাবুর রহমান মুক্তিযোদ্ধা নয়।  শাহাবুরের মুক্তিযোদ্ধার কাগজপত্রের নামের বানান ভুল ছিলো। পিতার নাম, গ্রাম, উপজেলা ও জেলা একই ছিলো। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে মাহাবুর মুক্তিযোদ্ধা হয়েছেন। মাহাবুর পুলিশ বাহিনীতে ছিলেন। পুলিশের পক্ষ থেকে তাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কোন লিখিত দেয়া হয়নি। এছাড়া জাতীয় পরিচয়পত্রে আমার বড় ভাইয়ের নাম শেখ মাহাবুবুর রহমান লেখা আছে। তার নাম শেখ মাহাবুর রহমান নয়। তার প্রকৃত নাম শেখ মাহাবুবুর রহমান। যাচাই বছাই করে মুক্তিযোদ্ধা তালিকা থেকে মাহাবুরের নাম বাদ দেয়ার দাবি জানান তিনি।

মাহাবুরের স্ত্রী রেবেকা মাহাবুর বলেন, আমার  স্বামী অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্য মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তবে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমার স্বামীর পুলিশ বাহিনীর কোন কাগজ নেই। গেজেটে নামের পাশে ভুল বসত সেনা বাহিনী লেখা রয়েছে। এটি সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছি। তিনি এ নিয়ে শাহবুরের পরিবারকে হয়রানী করছেন না বলে  জানান।

উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আল মোক্তাদির হোসেন  বলেন, এ ব্যাপারে তদন্তের জন্য আগামী ১৩ নভেম্বর দু’ পক্ষকে কাশিয়ানী আমার অফিসে ডাকা হয়েছে। শুনানী শেষে দ্রুত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।

স্বাধীনবাংলা২৪.কম/এমআর

আরো খবর »