রামায়ণের চার অবহেলিতা নারী

Feature Image

দেবশ্রী চক্রবর্তী:

ইন্ডিয়া

আজ মহাকাব্যের এমন চার নারী চরিত্রের বিশ্লেষণ করব যাঁদের উল্লেখ মহাকাব্যে খুব স্বল্প পরিসরে দেওয়া হলেও , এই বিদুষী নারীদের সাথে মহাকাব্যের লেখক সূ বিচার করেন নি । কারন এই চরিত্র গুলি আর মহিমান্বিত করে উপস্থাপিত করা যেত , যা না করে বেশ কিছু দূর্বল পুরুষ চরিত্রকে গুরুত্ব বেশি দেওয়া হয়েছে । প্রথম জন হলেন কৈকেয়ী দশরথের স্ত্রী পরিচয় ছাড়াও যার অন্যতম পরিচয় হচ্ছে কেকয় রাজ্যের রাজকন্যা কৈকেয়ী ।কৈকেয়ী কেকয়রাজ অশ্বপতির কন্যা ছিলেন। শৈশব থেকে যুদ্ধ বিদ্যায় পারদর্শিনী এই রাজকন্যা একজন রাজা হবার সব গুনের অধিকারিণী হলেও শুধুমাত্র নারী হিসেবে জন্মেছিলেন বলে তিনি রাজ সিঙ্ঘাসনের অধিকারী হতে পারেন নি । পরবর্তীকালে শুধুমাত্র নিজের পিতার রাজ্য রক্ষার জন্য দশরথকে বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছিলেন ।কারাচাপার যুদ্ধে তিনি স্বামী দশরথের সাথে একত্রিত হয়ে শত্রুর সাথে যুদ্ধ করেছিলেন , শুধু তাই না, আহত দশরথকে নিজে রথ চালিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বারকরে নিয়ে এসেছিলেন । প্রবল প্রতিভাশালী এই নারীর মধ্যে একজন রাজমাতা হওয়ার সব গুন থাকলেও তিনি স্বামীর দ্বিতীয়া স্ত্রী হিসেবেই থেকে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন । আহত দশরথের প্রাণ রক্ষা এবং তাঁকে সুস্থ করে তোলার পুরস্কার হিসেবে দশরথ তাঁকে কিছু চাইতে বলেন, তখন কৈকেয়ী বলেছিলেন যে তিনি সময় মতন তা চেয়ে নেবেন । তাই সময় আসতে তিনি নিজের পুত্র ভরতের জন্য সিংহাসন দাবী করেছিলেন । সুন্দরী, বিদুষী এবং বীর কৈকেয়ীকে দশরথ বিবাহ করেছিলেন পুত্রের ইচ্ছায় । নিজের পিতার রাজ্য রক্ষার জন্য একজন বিবাহিত পুরুষকে বিবাহ করতে তিনি বাধ্য হয়েছিলেন । এ চিল তার প্রথম বলিদান । তাছাড়া কারাচাপার যুদ্ধে কৈকেয়ীর জন্য সপ্তসিন্ধুর একটি বৃহত্তম অংশ রাবণের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিল । অযোদ্ধার সিংহাসন সুরক্ষিত হয়েছিল । তাই আমার দৃষ্টিতে কৈকেয়ীর এই দাবী অন্যায্য ছিলো না । রাজমহিষী হবার সকল গুন থাকা সত্ত্বেও তিনি তার স্বামীর দ্বিতীয়া স্ত্রী এবং একজন উপেক্ষিতা নারী হিসেবেই থেকে গেলেন ।

 

বর্তমান সময়ে হানি ট্র্যাপ বলে একটি শব্দের সাথে আমরা বহুল পরিচিত । কোন দেশের গোপন তথ্য জানার জন্য মহিলাদের ব্যাবহার করা হয় । কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে যাঁদের বিষকন্যা হিসেবে বর্ননা করা হয়েছে । রামায়ণের যুগেও হানি ট্র্যাপ ছিল । কোন ঋষিকে দিয়ে কোন কাজ করানর জন্য সুন্দরী মহিলাদের ব্যাবহার করা হত । অযোধ্যার রাজা দশরথের তিন স্ত্রী ছিলেন , পুত্রের আশায় তিনি তিনবার বিয়ে করলে কোন স্ত্রী তাঁকে পুত্রসন্তান দিতে পারেন নি । দশরথের প্রথম স্ত্রী কৈশল্যার অবশ্য একটি কন্যা সন্তান হয় , তাঁর নাম তিনি রাখেন শান্তা । দশরথ কন্যা সন্তানের জন্মে খুশি ছিলেন না, তাঁর চাই পুত্র সন্তান । এই সময় একদিন অঙ্গ রাজ্যের রাজা রোমপদ এলেন দশরথের কাছে , তিনি জানালেন যে তাঁর রাজ্য খরায় আক্রান্ত । এই মুহুর্তে রাজ্যকে একজন ঋষি রক্ষা করতে পারেন এবং তিনি হলেন ঋষ্যশৃঙ্গ । কিন্তু তিনি গভীর তপস্যায় মগ্ন, তাঁর তপস্যা ভঙ্গের জন্য চাই দশরথের কন্যা শান্তার মতন একজন সুন্দরী এবং বুদ্ধিমতী নারী । দশরথকে লোভ দেখান হয় যে এই ঋষিকে তুষ্ট করতে পারলে দশরথের পুত্রসন্তান প্রাপ্তি হবে । শান্তাকে পাঠান হয় ঋষির কাছে । শান্তার সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়ে সেই ঋষি শান্তার কথা মেনে অঙ্গ রাজ্যে বৃষ্টিপাত আনেন এবং যজ্ঞ করে দশরথের তিন স্ত্রীকে সন্তান প্রাপ্তি করান । রামায়ণের সূচনা হয়েছে শান্তার আত্মবলিদান দিয়ে । কিন্তু এই সুন্দরী, বিদুষী নারী রামায়ণে অবহেলিতা রওয়ে গেলেন । রাম চন্দ্রের বনবাস জীবনে তার একবার মাত্র উল্লেখ আমরা পাই । শুধুমাত্র একজন নারী হবার দোষে তিনি রাজ সুখ হতে বঞ্চিতা হয়েছিলেন ।

 

রামায়ণের আরেক বিদুষী নারী অনসূয়া দেবী । রামায়ণে মাত্র একবার এই নারীর উল্লেখ আমরা পাই । কিন্তু তার বিচার বিশ্লেষণ ঠিক ভাবে হয় নি । বিদূষী অপেক্ষা‚ বৈদিক সাহিত্যে তাঁর পরিচয় সতী এবং পতিব্রতা নারী রূপে | সপ্তর্ষির অন্যতম অত্রি মুনির পত্নী অনসূয়া ছিলেন স্বামী-অনুগত-স্ত্রী | স্বামী ছিলেন তাঁর কাছে আরাধ্য দেবতা | তাঁর প্রতি অচল ভক্তির শক্তিতে জীবনভর কিংবদন্তিকে সত্যিতে পরিণত করেছিলেন অনসূয়া | হিন্দু ধর্মের ত্রিদেবকে শিশুতে পরিণত করে পান করিয়েছিলেন স্তনদুগ্ধ |

অনসূয়া ছিলেন ঋষি কর্দম এবং দেবাহূতির কন্যা | তাঁদের ৯ বোনেরই বিবাহ হয়েছিল সপ্তর্ষির সাত জন ঋষির মধ্যে কারও কারও সঙ্গে | সবার মধ্যে সতী স্ত্রী হিসেবে আদর্শোজ্জ্বল হয়ে আছেন অনসূয়া | তাঁর নামের অর্থ হল যাঁর মধ্যে কোনও অসূয়া বা হিংসে নেই |

তাঁর পতিভক্তির কথা পৌঁছল স্বর্গরাজ্যেও | একদিন মহর্ষি নারদকে প্রশ্ন করলেন লক্ষ্মী‚ সরস্বতী এবং পার্বতী | জানতে চাইলেন ‚ তাঁদের মধ্যে কে সবথেকে বেশি পতিব্রতা স্ত্রী ? নারদ উত্তর দিলেন‚ এই তিনজনের মধ্যে কেউ সর্বোচ্চ পতিব্রতা নন | কারণ তিনজনেই ম্রিয়মাণ হয়ে যাবেন অত্রি-পত্নী অনসূয়ার কাছে |

শুনে ঈর্ষ্বান্বিত হয়ে পড়লেন তিন দেবী | শেষে কিনা এক মানবীর কাছে তাঁদের পরাভূত হতে হবে ! তিনজনে দেখতে চাইলেন কত শক্তি ধরে অনসূয়ার সততা এবং সঙ্কল্প | তাঁরা অনুরোধ করলেন নিজেদের স্বামীদের | মর্ত্যে গিয়ে অনসূয়ার পতিভক্তির পরীক্ষা নিতে হবে |

স্ত্রীদের কথায় বাধ্য হয়ে স্বরস্বতী‚ লক্ষ্মী এবং পার্বতীর স্বামী যথাক্রমে ব্রহ্মা‚ বিষ্ণু এবং মহেশ্বর এলেন মর্ত্যে‚ চিত্রকূট অরণ্যে ঋষি অত্রির আশ্রমে | তিন দেবতাই তখন ছদ্মবেশ ধারন করেছেন | তাঁরা হয়েছেন তিন সন্ন্যাসী | অত্রি যখন স্নান করতে নদীতে গিয়েছিলেন তখন তিন ছদ্মবেশী দেবতা এলেন তাঁর পর্ণকুটিরে |

অনসূয়া ব্যস্ত হয়ে পড়লেন তাঁদের সেবায় | কিন্তু তিনজনে জানালেন‚ তাঁরা কঠিন সঙ্কল্প গ্রহণ করেছেন | সবাই দীর্ঘ অভূক্ত | কিন্তু ‘নির্বাণ-ভিক্ষা‘না পেলে গ্রহণ করবেন না | অর্থাৎ‚ দাতা যদি সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে খাদ্য পরিবেশন না করেন‚ তবে সেই খাদ্য তাঁরা গ্রহণ করবেন না |

শুনে অনসূয়া পড়লেন উভয়সঙ্কটে | একদিকে তিনি অতিথিদের সেবা থেকে বিরত থাকতে পারেন না | অন্যদিকে স্বামীর প্রতি বিশ্বাস সততা স্থির রেখে পরপুরুষের সামনে নগ্ন হওয়াও অসম্ভব | দিব্য ক্ষমতার অধিকারিণী অনসূয়া উপলব্ধি করলেন এঁরা সাধারণ সন্ন্যাসী নন | ঐশী ক্ষমতাবলে তিনি জানতে পারলেন‚ এঁরা আসলে তিন দেবতা | এসেছেন তাঁকে পরীক্ষা করতে |

বুদ্ধিমতী অনসূয়া নিয়ে এলেন স্বামীর পাদ-তীর্থম | যে জলে তিনি স্বামীর পদযুগল ধুয়ে দেন‚ সেই জল | কমণ্ডলু থেকে সেই পবিত্র পাদোদক তিনি ছিটিয়ে দিলেন তিন সন্ন্যাসীরূপী দেবতার গায়ে | সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা রূপান্তরিত হলেন তিন শিশুতে | দেখে অনসূয়ার মন ভরে গেল | তিনি তখনও মাতৃত্বের স্বাদ পাননি | কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে‚ অনসূয়া তখন অনুভব করলেন তাঁর স্তনে প্রবাহিত হচ্ছে অনাবিল দুগ্ধধারা | পরম স্নেহ এবং বাৎসল্যে তিনি তিন শিশুকে স্তনপান করালেন | স্বামী অত্রি মুণি কুটিরে ফিরলে সব খুলে বলেন অনসূয়া | স্ত্রীর কাজকে সমর্থন করলেন ঋষি |

এদিকে স্বর্গে তিন দেবী বসে আছেন ‚ কখন ফিরে আসেন স্বামীরা | নারদ এসে তাঁদের বললেন‚ ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর তিনজনে অনসূয়ার কাছে শিশুতে পরিণত হয়েছেন | শুনে স্বামী উদ্ধারে পড়িমরি করে ছুটলেন তিন দেবী | চিত্রকূট আশ্রমে গিয়ে তাঁরা ক্ষমা চাইলেন অনসূয়ার কাছে | প্রার্থনা করলেন স্বামীদের ফিরিয়ে দেওয়ার |

অনসূয়ার ইচ্ছায় আবার শিশুরা পরিণত হলেন ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরে | তাঁদের কাছে সন্তান প্রার্থনা করলেন অত্রি এবং অনসূয়া | তখন তিন দেবতার সম্মিলিত রূপ হিসেবে জন্ম হল এক শিশুর | তাঁর তিন মাথা‚ দুই পা এবং ছয় হাত | তাঁর নামকরণ হল দত্তাত্রেয় | পিতার মতো তিনিও ছিলেন প্রখ্যাত ঋষি | মহাকাব্য রামায়ণে এভাবেই বর্ণিত হয়েছে অনসূয়ার প্রথম পুত্রলাভের আখ্যান |

এ বার দ্বিতীয় পুত্রলাভ কী করে হল‚ সেই পর্ব | অত্রি-অনসূয়ার সমকালীন বৈদিক সভ্যতার প্রতিষ্ঠাননগরে বাস করতেন এক ব্রাহ্মণ | তাঁর নাম কৌশিক | তিনি নিয়মিত পতিতালয়ে যেতেন | কিন্তু তাঁর স্ত্রী সুমন্থি ছিলেন অত্যন্ত পতিব্রতা | তিনি কিন্তু পতিতালয়ে যাওয়া স্বামীর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেননি | বিপ্র কৌশিকের কুষ্ঠরোগ হল | সেই অবস্থাতেও তিনি পতিতার কাছে যেতে উদ্যত হলেন |

সতী স্ত্রী সুমন্থি তখন স্বামীকে পিঠে করে নিয়ে গেলেন পতিতালয়ে | যদিও কৌশিককে দেখে ঘেন্নায় দূর দূর করে তাড়িয়ে দিল সেই বারাঙ্গনা | স্বামীকে পিঠে চাপিয়ে ফিরছিলেন সুমন্থি | তিনি খেয়াল করেননি‚ পথে কাঁটাবিদ্ধ হয়ে পড়ে আছেন ঋষি মাণ্ডব্য | এক নৃপতি তাঁকে ভুল করে শাস্তি দিয়েছিলেন | ভ্রান্তিবশত মাণ্ডব্যের গায়ে কৌশিকের পা লেগে যায় | কুপিত হয়ে ঋষি অভিশাপ দিলেন‚ পরের সূর্যোদয়ে প্রাণ হারাবেন কৌশিক |

শুনে তো বিহ্বল হয়ে পড়লেন সুমন্থি | তবে হার মানলেন না | তিনি উল্টে চিৎকার করে বললেন‚ আমি যদি সতী স্ত্রী হই‚ তবে সূর্যদেবই যেন আর না উদিত হন | তাঁর অভিশাপ সত্যি হল | মর্ত্যে সূর্যোদয় বন্ধ হয়ে গেল | উদ্ধারলাভে দেবতারা অনসূয়ার শরণাগত হলেন |

অনসূয়া কথা দিলেন সুমন্থির স্বামী কৌশিক জীবিত থাকবেন | তখন সুমন্থির আদেশে আবার আকাশে উদিত হলেন সূর্যদেব | সূর্যোদয়ে প্রয়াত হলেন কৌশিক | নিজের ক্ষমতাবলে আবার তাঁর জীবন ফিরিয়ে আনলেন অনসূয়া | তাঁর ভূমিকায় সন্তুষ্ট প্রজাপতি ব্রহ্মা চন্দ্রার্তি বা চন্দ্র অবতারে অনসূয়ার পুত্র হয়ে জন্ম নিলেন | দ্বিতীয় পুত্রলাভ করলেন অত্রি-অনসূয়া |

তাঁদের তৃতীয় পুত্র হলেন ঋষি দুর্বাসা | তিনি মহাদেবের অবতার | একবার সূর্যকে গ্রাস করেন রাহু | তাঁর গ্রাস থেকে সূর্যকে বের করে আনেন ঋষি অত্রি | পরিস্তুষ্ট হয়ে মহাদেব দুর্বাসা অবতারে আসেন অত্রি-অনসূয়ার তৃতীয় পুত্র রূপে | তিন পুত্র এবং এক কন্যা অপালা ( কোথাও কোথাও আবার তাঁদের মেয়ের নাম শুভাত্রেয়ী) নিয়ে এই ঋষি এবং ঋষিপত্নীর সুখের সংসার ছিল চিত্রকূট তপোবনে |

বনবাসকালে রামসীতা এসেছিলেন অত্রি মুণির আশ্রমে | শোনা যায়‚ সীতাকে তিনটি উপহার দিয়েছিলেন অনসূয়া | একটি রত্ন‚ একটি মন্ত্রপূতঃ মালা এবং রূপটান হিসেবে চন্দনবাটা | এই জাদু রূপটান দিয়ে নিজের রূপ অটুটভাবে ধরে রাখা যায় | এখনও চিত্রকূটে দণ্ডকারণ্যের মুখে আছে অত্রি-অনসূয়ার আশ্রম | মনোরম পরিবেশে এখানে বয়ে চলেছে মন্দাকিনী নদী | একবার নাকি সুদীর্ঘ বছর ধরে ক্ষরা চলে চিত্রকূটে | ব্রহ্মার অনুরোধে মন্দাকিনী নদীকে স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে আনেন অনসূয়া | সেই থেকে স্বর্গের নদী এখানে প্রবহমান |

আরো খবর »