সুরৎহাল

Feature Image

দেবশ্রী চক্রবর্তী:  সন্ধ্যা দিয়ে সবে শাঁখে ফু দিয়েছি কলিংবেলটা বেজে উঠতেই চমকে উঠলাম। ঘড়ির কাটার দিকে তাকিয়ে দেখলাম সাড়ে ছটা বাজে, আজ একটু তাড়াতাড়ি বেল বেজেছে, কোন কথা না বলে আই হোলে চোখ রাখতে দেখলাম পরিশ্রান্ত মানুষটিকে। দড়জা খুলতেই বলল গঙ্গাজল নিয়ে এসো। বুঝলাম কিসের ইঙ্গিত। চুপচাপ। গঙ্গাজল ছিটিয়ে দিতেই ভেতরে এসে সোজা বাথরুমে চলে গেলো। আমি অন্যদিনের মতন চা আর খাবার এগিয়ে দিতে বলল, গন্ধটা এখনো পাচ্ছি। তুমি পাচ্ছ? আমি বললাম বার্ন কেস নাকি? বলল, উফফ, তাকিয়ে দেখতে পারছিলাম না ডোনা। কি ভয়ঙ্কর মৃত্যু। সারা শরীরটা বেগুন পোড়া হয়ে কিরকম বেকে গেছে।
কিছুক্ষন খাবারের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, না আজ আর খাবো না।চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে কি যেন একটা ভেবে বলল পরিষ্কার খুন।

আমি এতক্ষন যে ঘটনার বর্ননা দিলাম তা আজ সসন্ধ্যায় আমার অভিজ্ঞতাই তুলে ধরলাম। গত ১৩ বছর ধরে এরকম বহু অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে তার মধ্যে এটি অন্যতম। বিয়ের সাত বছরের মধ্যে যদি অস্বাভাবিক মৃত্যু হয় তাহলে একজন ম্যাজিস্ট্রেটকে সেই মেয়েটির শরীর ভালো করে দেখে রিপোর্ট তৈরি করতে হয়, সেই রিপোর্টের ওপর নির্ভর করে মেয়েটির পোস্টমর্টেম হয়। আমার হাসবেন্ড যখন সুরৎহাল করে ফেরে,ওর মুখে সব সময় একটা কথাই আমি শুনি, মেয়েটাকে কিভাবে মেরেছে, মারতে গেল কেন, বাবা, মায়ের কাছে পাঠিয়ে দিতে পারত। একটা মেয়ের কথা খুব মনে পরছে আজ, মেয়েটা যে দিন attested করে গেলো পরের দিন অমর্ত্য মেয়েটার সুরৎহাল করে ফিরলো। এরকম বহু মেয়েকে অকালে ঝড়ে যেতে হয় আমাদের চোখের সামনে । প্রসঙ্গত বলি ভারতে পণপ্রথার কারণে নববধূর মৃত্যুহার বিশ্বে সর্বাধিক৷ ২০১৫ সালে ৭৬ হাজারেরও বেশি নববধূকে পুড়িয়ে মারা হয় কিংবা নির্যাতনের মুখে আত্মহত্যায় বাধ্য করা হয়৷ অভিযুক্তদের মাত্র ৩৫ শতাংশের সাজা হয়েছে৷

স্বাধীনতার ৭০ বছর পূর্ণ হতে চলল। অথচ, আশ্চর্য, কলকাতা এখনও পণ-বন্দি !এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বরপক্ষের দাবিমতো পণ না দিতে না পারার কারণে গোটা ভারতে প্রতিদিন গড়ে প্রাণ হারাতে হয় ২০ জন নববধূকে৷ রাজধানী দিল্লিতেই গত কয়েক বছরে পণপ্রথার কারণে প্রাণ হারান ৭১৫ জন নববধূ৷ এই সংখ্যা ক্রমশই উর্ধ্বমুখী৷ এ বছরের অক্টোবর মাস পর্যন্ত পণ সংক্রান্ত কারণে ১০৫ জন নববধূর প্রাণ হারান৷ এই কুপ্রথা এক সামাজিক সংক্রমণের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ এখানে ধনী-দরিদ্র নেই, শিক্ষিত-অশিক্ষিত বা শহর-গ্রামের প্রশ্ন নেই৷ মানুষের অর্থলোলুপতাই একমাত্র কারণ বলে মনে করেন সমাজবিদরা৷ শুধু তাই নয়, পরিবারের সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে গয়না, নগদ অর্থ কিংবা বিলাসবহুল গাড়ি থেকে জমি, গরু, মহিষ কিছুই বাদ যায় না৷ না দিলে সমাজে বরপক্ষের মান থাকে না– এই ধরনের মানসিকতা এর পেছনে কাজ করে৷

জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে হিন্দু, মুসলিম সব সমাজেই পণপ্রথা পারিবারিক হিংসার এক বড় কারণ৷ পাকিস্তান বা বাংলাদেশেও তা বাড়ছে বলে সংবাদ মাধ্যমের সমীক্ষায় উঠে এসেছে, যদিও ইসলাম ধর্মে পণ বা যৌতুকপ্রথা নিষিদ্ধ৷ ২০১৩, ২০১৪ এবং ২০১৫ সালে পশ্চিমবঙ্গে পণপ্রথার বলি হয়েছেন যথাক্রমে ৪৮১, ৫০১ এবং ৪৯৮ জন মহিলা ! ২০১৬ সালে পণজনিত কারণে মৃত্যু হয়েছে ১০ জনের। চলতি বছরে এখনও পর্যন্ত সংখ্যাটা ৫। আরও কত বাড়বে কে জানে ! পণ-সূত্রে নির্যাতিতার সংখ্যাটা ক্রমশই ঊর্ধ্বমুখী। এসব দেখে-শুনে সময়ের ধারণাটা গুলিয়ে যায়। এটা কি একুশ শতক ! ঘরে ঘরে যে এভাবে নিরুপমারা রয়ে গিয়েছেন, নির্যাতিতা হচ্ছেন শ্বশুরবাড়ির লোকজনদের হাতে, ভাবাই যায় না ! অথচ, হালফিলে নারীশিক্ষার ছবি হতাশাজনক নয়। নারীর ক্ষমতায়নও এখন বহুচর্চিত বিষয়। সামগ্রিকভাবেই সামাজিক সচেতনতা বেড়েছে। অথচ, এ সবের ছাপ পণ দেওয়া-নেওয়ার ক্ষেত্রে এখনও সেভাবে পড়েনি।

শিক্ষা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে না। মানসিকতা ও পারিবারিক রুচিটাই আসল। দারিদ্রও পণের ক্ষেত্রে প্রধান বিষয় নয়। এমন বহু পরিবারে পণ-ঘটিত দুর্ঘটনা ঘটতে দেখা যায়, যারা মোটামুটি সচ্ছল বা বেশ সচ্ছল। সমাজ-মানসিকতায় আসলে আজও মনু বহাল তবিয়তে বাস করছেন। মনুর চোখে মেয়েরা মোটেই পুরুষের সমকক্ষ নন। ফলে, আজও বহু পুরুষ মনে করেন, বিয়ে করা মানে, একটি মেয়েকে ‘উদ্ধার’ করা। আর, ‘উদ্ধারে’র মতো এত বড় একটা পুণ্যকর্ম করতে গিয়ে দক্ষিণাস্বরূপ যদি মোটা কিছু না-ই জোটে, তবে আর এত বড় সামাজিক কর্তব্য পালন করে লাভ কী ! এই ‘উপচিকীর্ষু’ মানসিকতাই আসলে ছেলেদের এবং তাঁদের বাড়িকে আজও মনের গোচরে-অগোচরে পণ-প্রবণ করে রেখেছে।

এই অন্ধ ‘সিস্টেমে’র শিকার হয়ে মেয়েরাও কার্যক্ষেত্রে এসব অন্যায় মেনে নিতে একরকম বাধ্য হচ্ছেন। এ দেশ এখনও মেয়েদের হাতে ভাগ্যের নিয়ন্ত্রণভার তুলে দিতে পারেনি। দিলে, পণের সূত্রে বধূ-নির্যাতন বা বধূ-হত্যার ঘটনা নিশ্চিত অনেকটাই কমত। কিন্তু বিষয়টা শুধু মেয়েদের দিক থেকে দেখলে একদেশদর্শিতা ঘটবে। যেসব চাকুরিজীবী পাত্র তাঁদের প্রাপ্য বেতনের নিরিখে ‘বিয়ের বাজারে’ আত্মমূল্য নির্ধারণ করছেন এবং নিলাম হাঁকছেন, তাঁরা আর যাই হোক আধুনিকও নন, মানুষও নন !
ভারতের জাতীয় অপরাধ ব্যুরোর রেকর্ড অনুসারে, গত তিন বছরে পণপ্রথার কারণে প্রাণ হারাতে হয়েছে প্রায় ২৫ হাজার নববিবাহিত বধূকে৷ সবথেকে বেশি হয়েছে ভারতের উত্তরপ্রদেশ রাজ্যে– ৭০৪৮ জন৷ তারপর বিহার ও মধ্যপ্রদেশে, যথাক্রমে ৩৮২০ এবং ২২৫০ জন৷ স্বামী বা শ্বশুর বাড়ির লোকেদের হাতে দৈহিক ও মানসিক পীড়নের অভিযোগের সংখ্যা সাড়ে তিন লাখের মতো৷ সবথেকে বেশি পশ্চিমবঙ্গে– ৬১ হাজারেও বেশি৷ তারপর রাজস্থানে৷ সংসদে এই তথ্য জানান মহিলা ও শিশু বিকাশ মন্ত্রী মানেকা গান্ধী৷

স্বামীর সঙ্গে জ্বলন্ত চিতায় আত্মাহুতি দিলে স্ত্রী যেমন স্বর্গবাসী হয়, পাশাপাশি মা-বাবার স্বর্গের রাস্তাটিও প্রশস্ত হয়। তাইতো অন্তর্জলী যাত্রায় ব্রাহ্মণ তার কন্যাকে সতী করার জন্য এতো ব্যাকুল। কন্যার হাতেই নাকি তার স্বর্গে যাওয়ার চাবিকাঠি। কন্যাকে চিতায় দাহ করেই যে, স্বর্গে যাওয়া নিশ্চিত করতে হবে! তাদের ইহকাল পরকাল সবই তার হাতে। বংশে কেউ সতী হলেই নাকি মুছে যাবে সব পাপ। তাইতো বলতে শোনা যায় ‘জয় সতী মায়ের জয়’। অন্যভাবে বললে ‘জয় পুরুষতন্ত্রের জয়’। আমি নিজের চোখে এরকম একটি ঘটনা দেখেছিলাম । মেয়েটিকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল । আমার হাসবেন্ড গেছিল সুরৎহাল করতে । মেয়েটির বাবা এসে ছেলের পরিবারের কাছ থেকে টাকা নিয়ে লিখে জানিয়ে যায় যে তাঁর মেয়ে আত্মহত্যা করেছে । আমার হাসবেন্ড বাড়ি ফিরে বলেছিল, মনে হচ্ছিল মেয়েটার বাবাকে উত্তম মধ্যম দিই, কিভাবে একজন বাবা এরকম করতে পারে ! মেয়েটির বাবা তাঁর ইহকালকে নিশ্চিত করেছিলেন ।

ভারতের আইন এ ব্যাপারে কী বলছে ? ১৯৬১ সালের পণপ্রথা বিরোধী আইনে বিবাহে পণ দেয়া বা নেয়া নিষিদ্ধ হয়৷ কিন্তু তাতে ইতরবিশেষ কিছু হয়নি৷ সমাজে প্রচলিত বিবাহ ব্যবস্থায় আইনের ছাপ পড়েনি মোটেই৷ বিয়েতে রাজি হবার শর্তই হলো পণ দেওয়া বা নেওয়া, যেটাকে ভদ্র মোড়কে বা পোষাকি ভাষায় বলা হয়ে থাকে ‘উপহার’৷ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আইনে অনেক ফাঁক রয়ে গেছে৷ সেগুলি দূর করে পণপ্রথা বিরোধী আইন আরও কঠোর করা দরকার৷ সেজন্য ১৯৮৩ সালে পণ বিরোধী আইন সংশোধন করা হয়৷ বাঞ্ছিত ফল তবু রয়ে গেছে অধরা৷ আসলে অপরাধীদের শাস্তিদানের আইনি প্রক্রিয়ার গোড়ায় গলদ৷ শুরুতে তদন্ত কাজে ঢিলেমি দেবার জন্য বিচার প্রক্রিয়ার গতি হয়ে পড়ে মন্থর৷ অবশ্য এর অন্য একটা দিকও আছে৷ কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, মেয়েপক্ষ কিংবা পুলিশ পণবিরোধী আইনের অপপ্রয়োগ করেছে৷ বিষয়টি সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায়৷ গত অক্টোবর মাসে শীর্ষ আদালত পণ নেবার অভিযোগে চটজলদি কাউকে গ্রেফতার নিয়ন্ত্রিত করার সাময়িক নির্দেশ দেন৷ চূড়ান্ত রায় এখনো দেননি সুপ্রিম কোর্ট৷

আরো খবর »