শীতের শুরুতেই গাইবান্ধায় খেজুর রস সংগ্রহে ব্যস্ত গাছিরা

Feature Image

জেলা প্রতিনিধি, স্বাধীনবাংলা২৪.কম

গাইবান্ধা থেকে ফরহাদ আকন্দ: হেমন্তের শেষে শীতের আগমনের সাথে সাথে গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্য খেজুর রস সংগ্রহে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন গাইবান্ধার গাছিরা। গ্রামের আকা-বাকা পথের পাশে ডোবা ও পুকুর পাড়ে সারি সারি অপরিচ্ছিন্ন খেজুর গাছ গুলোর পুরানো ডাল পালা কেটে পরিষ্কারের কাজ অনেক আগেই সম্পন্ন হয়েছে। গাইবান্ধা জেলার সাত উপজেলা ঘুরে সরে জমিনে দেখা গেছে শীতের তীব্রতা দেখা না দিলেও এরই মধ্যে অনেক গাছি অভাবের কারণে খেজুর রস সংগ্রহের কাজ শুরু করে দিয়েছেন।

এই শীতকাল গ্রামীণ মানুষের জীবন-জীবিকার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামীণ জীবনে শীত আসে বিশেষ করে গ্রাম অঞ্চলের গাছিদের কাছে সে তো বিভিন্ন মাত্রায় রূপ নিয়ে। নানা স্বপ্ন আর প্রত্যাশায় তাদের অনেকটা সময় কেটে যায় এই খেজুর গাছের সাথে। বলতে গেলে সারাদিন এক গাছ থেকে অন্য গাছ এভাবেই কেটে যায় তাদের দিন। ওতপ্রত ভাবে জড়িত গাছির জীবন সংগ্রামে বহু কষ্টের মাঝে অনেক প্রাপ্তিই মিটে যায় গ্রাম বাংলার এই জনপ্রিয় বৃক্ষ খেজুর গাছের সাথে। গাছিদের জন্য এই সময়টা হয় অনেক আনন্দদায়ক। কারণ এই গাছই তো গাছিদের অন্নদাতা। তাদের খেজুর গাছের যতœাদি না করলে যে রস মিলবে না। আর রস না মিললে গুড় হবে কি করে।

ভোরের হাড় কাপানি ঠান্ডায় গাছ থেকে রসের হাড়ি নামিয়ে হিমশীতল খেজুর রস খাওয়ার স্বাদটা একেবারেই যেন আলাদা। আসলে ভোর বেলায় রস খেলে শীত মনে হয় আরো বেশি জাঁকিয়ে বসে। তবে শীতে শরীর কাঁপানির স্পন্দন যেন চরম মজা আনন্দদায়ক। শীত লাগে লাগুক তবুও রস খাওয়ার কোন বিকল্প নেই। যত শীতই লাগুক রস খেতেই হবে। ঠান্ডা শীতের পরশে এক গ্লাস বা দুই গ্লাস রস খাওয়ার পরে পরেই কাপতে কাঁপতে আরো এক গ্লাস রস চুমুক দিয়ে বাড়ীর উঠানে রোদ তাপানোর আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।

এই শীতের কুয়াশা ঢাকা সকালে গ্রামের ছেলে-মেয়েরা ঘুম থেকে খুব ভোরে উঠে হাতমুখ ধুয়ে খড়কুটোয় আগুন জ্বালিয়ে হাত-পা গরম করে এবং অপেক্ষা করে কখন রোদের তেজ প্রখর হয়ে উঠবে। তাদের রোদ তাপানোর সাথে সাথে আরও অপেক্ষা হলো তাদের প্রিয় খেজুর রস কখন যে আসে আর তখনই খাবে।

সাদুল্যাপুর উপজেলার গাছি জয়নাল মিয়া বলেন, খেজুর গাছ প্রায় ছয়/সাত বছর বয়স থেকে রস দেওয়া শুরু করে পঁচিশ থেকে ত্রিশ বছর বয়স পর্যন্ত রস দেয়। তবে গাছ যতই পুরনো হয় রস দেয়া ততই কমে যায়। পুরনো গাছ রস কম দিলেও পুরনো গাছের রসগুলো খুবই মিষ্টি ও সুস্বাদু হয়। মাঝ বয়সের গাছ থেকে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ রস পাওয়া যায়। বেশি রস সংগ্রহ করা গাছের জন্য অবার অনেক ক্ষতিকর। রস সংগ্রহের জন্য কার্তিক মাসে খেজুর গাছ পরিষ্কারের কাজ শুরু করা হয়। অগ্রহায়ন মাস থেকেই রস পাওয়া যায়। রসের ধারা চলতে থাকে ফাল্গুন মাস পর্যন্ত। শীতের সঙ্গে রস ঝরার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। শীত যত বেশি পড়বে তত বেশি রস ঝরবে। রসের স্বাদও ততই মিষ্টি হবে। অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘ মাস হলো রসের ভরা মৌসুম। অগ্রহায়ণ থেকে ফাল্গুন মাস পর্যন্ত স্থান ভেদে একটি খেজুর গাছে মাসে ৪০-৫০ কেজি রস পাওয়া যায়।

গাছিরা দিনের বেশির ভাগ সময় কাটান এ গাছে থেকে সে গাছে। মাটিতে পা ফেলারও সময় পায় না অভাবী এই মানুষ গুলো। যত সামান্য শীত আসা মাত্রই খেজুর গাছ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে তোলার জন্য অনেক আগে থেকেই সকাল-সন্ধ্যায় যেন লেগে থাকে গাছিরা। খেজুর গাছ বিশেষ কায়দায় কাটতে হয়। আর এই গাছ গুলো কাটে যারা তাদেরকে গাছি বলা হয়। তারা বিভিন্ন উপকরণের সমন্বয়ে খেজুর গাছ পরিচ্ছন্ন ভাবে কাটার জন্য ব্যস্ত থাকেন গাছিরা।

তারা গাছ কাটতে ব্যবহার করেন বিশেষ এক ধরণের লোহা দিয়ে তৈরী দা, দড়ি, আবার দা রাখার জন্য বাঁশ বা প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি এক প্রকার থলি। সে থলি গাছিরা রশি দিয়ে কমড়ে বেধে খুব যতেœ দা রেখে এ গাছ থেকে সে গাছে উঠা নামা করে খুব সহজে। গাছ কাটার জন্য গাছি শরীরের ভারসাম্য রক্ষার জন্য কোমর বরাবর গাছের সঙ্গে দড়ি দিয়ে বেঁধে নেয়। দড়িটা বিশেষ ভাবে তৈরি করা হয়। এই দড়ির দুই মাথায় বিশেষ কায়দায় গিট (বাধন) দেওয়া থাকে। গাছে উঠার সময় গাছি অতি সহজে মহুর্তের মধ্যে গিট (বাধন) দুটি জুড়ে দিয়ে নিজের জন্য গাছে উঠার নিরাপদ ব্যবস্থা করে নেয়।

এই শীতের মধ্যে এতো কষ্ট করে খেজুর রস সংগ্রহ করেই ক্ষ্মান্তনন গাছিরা। এই রস আবার জ্বাল দিয়ে তৈরি হবে গুড়। সেই গুড়ের আবার প্রকারভেদ আছে। পাটালি গুড় ও ঝোলা গুড়। এ সব গুড় বিভিন্ন ভাবে খাওয়া হয়। শীতে খেজুর গাছের রস হতে যে গুড়ে তৈরি করা হয় তা দিয়ে দুধের পিঠা, পায়েস পুলি পিঠা, সেম পিঠা আরো কত কি যে পিঠা তৈরী হয় তা না খেলে একেবারে জীবনই বৃথা। তবে খেজুরের রস দিয়ে তৈরি রসের পিঠা খুবই সুস্বাদু হয়ে থাকে। আর খেজুর গুড়ের প্রচলিত সন্দেশ হয় তার স্বাদ অপূর্ব। বলতে গেলে একবার খেলে স্বাদ সারাজীবন যেন মুখে লেগে থাকে।

শীত তার বিচিত্র রূপ ও রস নিয়ে হাজির হয় গ্রাম বাংলার মানুষের মাঝে। নবান্ন উৎসব কিংবা শীতের পিঠা পায়েশ তৈরির উৎসব শুরু করেই। শীত যেন সৃষ্টির নিয়ামত তা উপলব্ধি করতে চাইলে অবশ্যই গ্রামে যেতে হবে। শীতের নিরবতার অস্তিত্ব সৌন্দর্য মন্ডিত বাংলাদেশের ষড় ঋতুর এক ঐতিহ্য হিসেবে প্রতিয়মান হয় খেজুর গাছ। আশ্বিনের শুরু থেকেই গাছিরা খেজুর গাছ তোলা এবং পরিচর্যায় বেশ ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এই উপযুক্ত সময় তারা নির্ধারণ করে মাঘের শীতেই গুড় বিক্রিয় এবং তৈরীর প্রক্রিয়ার সমাপ্ত ঘটে। গ্রামের বাজার গুলোতেও জমজমাট হয়ে ওঠে খেজুর রস এবং গুড়ে। প্রকৃত পক্ষেই শীতে উৎসব মুখর হয়ে উঠে গ্রাম বাংলায়।

গাছ কাটার জন্য গাছের মাথার এক দিকের শাখা (ডালপালা) খুবই যতœসহকারে কেটে চেছে পরিষ্কার করে সেই কাটা অংশেরই ঠিক মাঝ বরাবর নিচে দুটি ভাজ কাটার প্রয়োজন পড়ে। সে ভাজ থেকে কয়েক ইঞ্চি নিচে একটি সরু পথ বের করা হয়। এই সরু পথের নিচে বাঁশের তৈরি নালা বসানো হয়। এই নালা বেয়ে চুয়ে চুয়ে হাড়িতে রস পড়ে। সাধারণত বিকেলে গাছে হাড়ি বেঁধে রেখে যায় সারা রাতে রসে পূর্ণ হয় কলস। আর প্রতিদিন খুব ভোরে ঘন কুয়াশার মধ্যে গাছ থেকে রসে ভরা হাড়ি নামানো হয়। এসময় শালিক, দোয়েলসহ বিভিন্ন ধরনের পাখিরা গাছে ভিড় করে রস খাওয়ার জন্য।

গাছ কাটার পর দুই তিন দিন রস পাওয়া যায়। প্রথম দিনের রসকে বলে জিরান বা এককাটা। জিরান কাট রস খুবই সুস্বাদু। প্রথম দিনের রস থেকে ভালো পাটালি গুড় তৈরি হয়। দ্বিতীয় দিনের রসকে বলে দোকাটা। তৃতীয় দিনের রসকে বলে তেকাটা। রসের জন্য খেজুর গাছে একবার কাটার পর আবারও পাঁচ ছয় দিন পর কাটতে হয়। গাছের কাটা অংশ শুকানোর জন্য এসময় দেওয়া প্রয়োজন। খেজুর গাছ কাটা অংশ শুকানোর সুবিধার জন্যই সাধারণত পূর্ব ও পশ্চিম দিকে গাছ কাটা হয়। যাতে সূর্যের আলো সরাসরি কাটা অংশে পড়ে।

গাছ থেকে রস সংগ্রহের জন্য সাধারণত মাটির হাড়ি ব্যবহার করা হয়। হাড়িকে আবার অনেকেই ভাঁড় বলে। যে যাই বলুক না কেন ভাঁড়টি আসলেই খুব ছোট আকৃতির কলসের মতো হয়ে থাকে। মাঝারি আকৃতির দশ বা পনেরো ভাঁড় রস জ্বাল দিয়েই এক ভাঁড় গুড় হয়। সেই এক ভাঁড় গুড়ের ওজন ছয় থেকে আট কেজির মতো বলা চলে। গুড় তৈরির জন্য রস জ্বাল দেওয়া হয় মাটির জালায় বা টিনের তাপালে। খুব সকালে রস নামিয়ে এনেই জ্বালানো হয়। জ্বাল দিতে দিতে এক সময় রস ঘন হয়ে গুড় হয়ে যায়। এ গুড়ের কিছু অংশ তাপালের এক পাশে নিয়ে বিশেষ ভাবে তৈরি একটি খেজুর ডাল দিয়ে ঘষতে হয়। ঘষতে ঘষতে এই অংশটুকু শক্ত হয়ে যায়। আর শক্ত অংশকেই আবার কেউ কেউ বীজ বলে থাকে। বীজের সঙ্গে তাপালের বাকি গুড় মিশিয়ে স্বল্পক্ষণের মধ্যে গুড় জমাট বাঁধতে শুরু করে। তখন এ গুড় মাটির হাঁড়ি বা বিভিন্ন আকৃতির পাত্রে রাখার প্রয়োজন পড়ে। সে গুড় দেখলে বুঝা যাবে, একেবারে জমাট বেঁধে পাত্রের আকৃতি ধারণ করেছে।

এই খেজুর গুড় যারা বানায়, তাদের ঐতিহ্যগত পরিচয় তারা গুড়-শিল্পী বা শিউলি। এই শিউলিরা আদতে খেত মজুর। বর্ষার দিনে অনেক অঞ্চলে চাষাবাদের পর ভূমিহীন খেত মজুরদের কোনও কাজ থাকে না। অনাহার-অর্ধাহারে তাদের দিন কাটাতে হয়।এই খেজুর গুড় কমবেশি সারা বাংলাদেশেই পাওয়া যায়।

স্বাধীনবাংলা২৪.কম/এমআর

আরো খবর »