‘অধস্তন আদালতে সুশাসন চ্যালেঞ্জে’

Feature Image

স্বাধীনবাংলা২৪.কম

ঢাকা: অধস্তন আদালতের ওপর একইসঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট এবং আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধান বিদ্যমান রয়েছে। বর্তমানে বিচারকদের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির বিষয়গুলো আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে, যা কিছু ক্ষেত্রে অধস্তন আদালত ব্যবস্থার কার্যক্রমকে প্রভাবিত করে। ফলে বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে ঝুঁকির সৃষ্টি করছে।

এছাড়া অবকাঠামো, লজিস্টিকস, বাজেট, জনবল, প্রশিক্ষণ ও কার্যকর জবাবদিহিতা এবং স্বচ্ছতার ঘাটতি, মামলা সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজে ঘুষ বা নিয়মবহির্ভূত অর্থের লেনদেনসহ নানাবিধ দুর্নীতি ও অনিয়মের ফলে অধস্তন আদালত ব্যবস্থায় সুশাসনের চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) পরিচালিত ‘বাংলাদেশের অধস্তন আদালত ব্যবস্থা : সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গবেষণার পর্যবেক্ষণে এসব কথা বলা হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়।

পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সংবিধানে ১০৯, ১১৫ ও ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অধস্তন সব আদালত ও ট্রাইব্যুনালের উপর হাইকোর্ট বিভাগের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ বিদ্যমান। এই দ্বৈত প্রতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ফলে অধস্তন আদালত সংক্রান্ত কোনো উদ্যোগ বা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দুটি প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক সমন্বয়ের ঘাটতি ও টানাপোড়েন রয়েছে। ফলে কিছু ক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণ বা দীর্ঘসূত্রতা প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ক্ষেত্রে ঘাটতির সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া কর্মচারীদের জন্য পৃথক আচরণবিধি না থাকা, বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় অধস্তন আদালতগুলোর অংশগ্রহণের বিধান না থাকাসহ বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা পরিলক্ষিত হয়েছে।

বিচারক ও কর্মচারীদের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা, কিছু ক্ষেত্রে কর্মচারী নিয়োগে পদ অনুযায়ী দক্ষ ও যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের নিয়োগ না দেয়া, কর্মচারীদের নিয়মিত বদলি না হওয়া, রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের নিয়োগে রাজনৈতিক বিবেচনার প্রাধান্য গবেষণায় পরিলক্ষিত হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অনেক প্রতিকূলতা সত্ত্বেও অধস্তন আদালত বিচার ব্যবস্থা বাংলাদেশের মানুষের ন্যায় বিচার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির পক্ষ থেকে অধস্তন আদালতগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও শুদ্ধাচার চর্চা নিশ্চিতকরণে ১৮ দফা সুপারিশ পেশ করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, উপদেষ্টা-নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের এবং গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হাসান।

গবেষণা প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন টিআইবির গবেষণা ও পলিসি বিভাগের প্রোগ্রাম ম্যানেজার শাম্মী লায়লা ইসলাম ও অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রোগ্রাম ম্যানেজার নাজমুল হুদা মিনা।

তবে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ উঠে এসেছে গবেষণায়, তা হলো- অধস্তন আদালত ব্যবস্থার কার্যকরতা বৃদ্ধিতে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা জজ আদালত ভবন নির্মাণ ও ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণে প্রকল্প গ্রহণ, কেস ম্যানেজমেন্ট কমিটি গঠন, সব জেলার আদালতের জন্য ওয়েবসাইট তৈরি, ডিজিটাল পদ্ধতিতে মামলার শুনানি ধারণ ও সংরক্ষণ, ই-জুডিসিয়ারি প্রকল্প গ্রহণ, বিচারিক কর্মকর্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দেশে-বিদেশে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, বিকল্প বিরোধ-নিষ্পত্তি ব্যবস্থা চালু, জাতীয় হেল্পলাইন স্থাপন এবং আদালত প্রাঙ্গণে আইনগত সহায়তার তথ্য সম্বলিত বিলবোর্ড স্থাপন, কয়েকটি জেলার আদালত ভবনে মাতৃদুগ্ধ পান কক্ষের ব্যবস্থা, আদালত কক্ষের বাইরে বসার ব্যবস্থা, কক্ষ নির্দেশিকা টাঙ্গানো, মামলার তালিকা টাঙানো এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে সিসি ক্যামেরা স্থাপন।

গবেষণাটি চলতি বছরের জানুয়ারি-অক্টোবর সময়ের মধ্যে পরিচালিত হয়। দেশের ৬৪টি জেলা থেকে বিভাগীয় প্রতিনিধিত্ব এবং মামলার সংখ্যার আধিক্য বিবেচনায় মোট ১৮টি জেলা নির্বাচন করা হয়। অধস্তন আদালতের বিভিন্ন পর্যায়ের বিচারক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিচারপ্রার্থী, আইনজীবী, রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী, আইনজীবীর সহকারী/মুহুরি, জেলা আইনগত সহায়তা কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, এনজিও প্রতিনিধি, গণমাধ্যমকর্মী ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনসহ মোট ৪৩৭ জন মুখ্য তথ্যদাতার সাক্ষাৎকার গৃহীত হয়েছে এই গবেষণায়। এছাড়া, প্রাসঙ্গিক গবেষণা প্রতিবেদন, প্রবন্ধ, ওয়েবসাইট ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন পর্যালোচিত হয়েছে।

গবেষণার উদ্দেশ্যে হলো- বাংলাদেশের অধস্তন আদালত ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও শুদ্ধাচার চর্চার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা পর্যালোচনাসহ সুশাসন নিশ্চিতে কার্যকর ও বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশমালা প্রদান।

গবেষণার আওতাভুক্ত জেলাসমূহের অধস্তন আদালতগুলোতে পর্যাপ্ত জনবলের অভাব, বদলি, অবসর গ্রহণ, ছুটি ইত্যাদি কারণে কিছু পদ সাময়িকভাবে দীর্ঘদিন শূন্য থাকা, ৬২১টি আদালতে ১১৪ জন বিচারকের সাময়িক ঘাটতি এবং ৫৭৯ জন সহায়ক কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদ শূন্য, লিগ্যাল এইড অফিসে পর্যাপ্ত জনবলের ঘাটতি ও অনেক ক্ষেত্রে লিগ্যাল এইড অফিসারের অনুপস্থিতির কারণে সেবা প্রদান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার চিত্র উঠে এসেছে প্রতিবেদনে।

স্বাধীনবাংলা২৪.কম/এমআর

আরো খবর »