ধানের চাতাল : ঢেঁকি বেয়ে যখন তা শিল্প হলো

Feature Image

 

গৌতম কুমার রায় : বাংলাদেশটা ভাটি এলাকার দেশ। এখানে জলের সাথে পলি বাহিত হয়ে উর্বরতা সৃষ্টি হয়। যে পলির উর্বরতায় উৎপাদিত হতো ফল ও ফসল। আবার জীবনের প্রয়োজনে মিষ্টি জল, জল পথে সহজ চলাচলের জন্য মানুষ নদী তীরবর্তী এলাকাকে বসবাসের জন্য বিবেচনা করতো। গঙ্গা- ভাগিরথী, গঙ্গা-করতোয়া, গঙ্গা- বম্মপুত্র, গঙ্গা- মেঘনা অববাহিকাতে তাই মানুষের বসতি স্থাপন শুরু হয় সেই আদি সময় হতে। এই অববাহিকার মানুষ সুপায়ি জল, জলের মাছ এবং জলে উৎপাদিত ফল ও ফসলে জীবন ধারণ করতো বেশ স্বাচ্ছন্দে।

উত্তরাঞ্চলের চাতালের অনবদ্ধ্য নাম দিনাজপুর জেলা :   বাংলদেশের জেলাগুলোর পরিচয়ে এক একটি জেলা কৃষি উৎপাদনের সাফল্যের পরিচয়ের সাথে পরিচিত। এভাবে দিনাজপুর জেলাকে দেশের ধান উৎপাদনের উদ্বৃত্ত জেলা হিসেবে বলতে পারি। জেলার মোট আবাদি জমির প্রায় ৭০.৮ ভাগ জমিতে ধান উৎপন্ন করা হয়। অন্য যে কোন ফসলের তুলনায় ধান এ জেলাতে বেশী হয়। এখানকার উৎপাদিত ধানের সুখ্যাতি রয়েছে দেশ ছেড়ে বিদেশেও। বিশেষ করে জেলায় উৎপাদিত “ কাটারী ভোগ” ধানের আদর এখন অনেক স্থানে ছড়িয়ে গেছে। উত্তর বঙ্গের আদি এবং ভাল ধান উৎপাদনকারী এবং চাউল সরবরাহের জেলা হিসেবে দিনাজপুর জেলার নাম রয়েছে ইতিহাসের ধারা বেয়ে সেই আদি সময় হতে। যে জন্য এক দিকে যেমন উৎপাদন আপরদিকে চাউল সরবরাহের তাগিদে এখানে চাতাল শিল্পের আবির্ভাব ঘটেছিল বহু আগে। দিনাজপুরের ধান কিংবা চাউল এমনকি এসবকে ঘিরে যে চালাল শিল্প তার বর্ণনা করতে গেলে একটু মূল উপকরন ধান সম্পর্কে বলতেই হয়, কবির ভাষায় ঃ-

“ দিনাজপুরের চিড়ে খাব,

বগুড়াতে দৈ মাখি,

বাংলাদেশের অভাব কি ?

অর্থাৎ দিনাজপুরের কাটারী ভোগ ধানের চিড়ে খেয়ে কবি মুগ্ধ হয়েছিলেন । এখানকার কাটারী ভোগ ধানের চাল খেয়ে সম্রাট আওরঙ্গজেবের পুত্র আহমদ শাহ বাংলা ছাড়তে রাজি হননি সহজে। তিনি দিনাজপুরকে তুলনা করেছিলেন গোলাপের পারস্যের সাথে।

 

জেলার ৩৪৩৭.৯৮ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের দিনাজপুরের ৪,১৮৪৪৭ হেক্টর জমিতে ধান উৎপাদন করা হয়। ১৩টি উপজেলার প্রয়োজনীয় ৪,৫৯.৪৮৬ মেট্রিক  টন ধানের চাহিদা মিটিয়ে আরো ৭,৭৫,২২৮ মেট্রিক টন ধান উদ্ধৃত্ত উৎপাদন করে তা বাইরে বিক্রি করা হয়ে থাকে।

আদিকাল হতেই বিভিন্ন জাতের ধান উৎপাদন করা হতো এখানে। আউশ ,আমন, এবং বোরো জাতের ধানের মধ্যে বিভিন্ন প্রজাতের ধান উৎপাদন করা হয়। আদিকালে অনেক প্রজাতির ধান উৎপাদন করা হলেও বর্তমানে হাইব্রিড জাতের ধান প্রধান উৎপাদনী ফসল হিসেবে জায়গা দখল করে নিয়েছে।

ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা যায় ধান দিনাজপুরের নিজস্ব সম্পদ। প্রাগৈতিহাসিক কালে কখন মানুষ হিমালয় পর্বতের গুহা থেকে নেমে এসে ধান চাষ শুরু করেছিল তা জানা যায় নাই।  বিখ্যাত ভৌগলিক বেজর্গ ইবনে শাহারিয়ার রচিত ‘আজায়েবুল হেন্দ” গ্রন্থ থেকে জানা যায় দিনাজপুরের অতি প্রাচীন কৃষিজাত দ্রব্যই ধান। এই গ্রন্থের রচনা ৯২১ খঃ । ধান চাষের জন্য দিনাজপুরর সাথে অনেক কথা প্রচলিত হয়ে আছে। কেউ কেউ মত প্রকাশ করেন প্রচীন কালে চীন এবং মিশর হতে চারা এনে দিনাজপুরে ধান চাষ শুরু করা হয়েছিল। আবার কারো কারো মতে মোঘল বাদশাহদের আমলে আফ্রিকার ব্রেজিলে নাকি দিনাজপুর হতে ধানের বীজ পাঠিয়ে সেখানে ধান চাষ শুরু করা হয়েছিল।

দিনাজপুরের চাষ যোগ্য মাটিকে দু’ভাগে ভাগ করা যায় প্রথমত খেয়ার দ্বিতীয়তঃ পলি। তদ্রুপ এখানে তিন জাতের ধান উৎপন্ন হয়। যেমন আউশ, আমন এবং বোরো।

আউশ জাতের ধানের মধ্যে সরূকরাস, চিন্তামন, ঢুলকলি, শনি, জসবাভাদই, প্রচুর উৎপন্ন হতো। বর্তমানে এ জাতের ধানের মধ্যে পারি, বি আর- ২৪,২১,২৬,১৬,১৪,১ ও ২,  ইরাকন-২৪,বিরি-২৮,জবা, পৌষা, পূর্বাচি ধান উৎপাদন হয়ে থাকে।

আবার আমন জাতের ধানের মধ্যে বিন্নি, চেঙ্গা, মালকিরা, নারী পর্যাত, সালনা, খৈয়ান, বাগুন বিবিয়া, সামরোট, ভাদরা, আঘুন পাক, লয়াজং, রেঙ্গন, মর্গিমালসেরা, কাঁকুয়া, কনচুষ, কলম, ভশেওয়া, দুপশার, পানিসাইল, দাঁড়িকাসাইল, ইন্দ্রসাইল, কার্ত্তিক সাইল ,কাটারীভোগ, দাউদখানী, কালনুনিয়া প্রভূতি ধান অধিক উৎপাদন করা হলেও বর্তমানে বি আর-১১, বি আর আর আই-৩০,৩১,৩২,৩৩,৩৪, স্বর্না ,পাজাম, কাঠারী, সাপাহার, ফিলিপাইন কাঠারী, বাতরাজ, শিলকুমার, কলম, বোল্ডার , মাগুর শাইল, বাদশাভোগ, ইন্ডিয়ান রঞ্জিত প্রভুতির উৎপাদন হচ্ছে।

নদীর চর এবং বিল এলাকাই বোরো ধান উৎপাদন করা হয়। যেমন বি আর- ১,২,৩,৮,৯,১৫,১৬,১১,১৪, ইরাউশ -২৪ , বি আর আর আই- ২৮,২৯,৩৩,৩৬, পাজাম, পারী পৌষা, পূর্বাচি , মিনিকেট, ইন্ডিয়ান -৫০, বিনা-৬, সোনার বাংলা, জাগরনী , হীরা, বাশমতি , জিরা কাটারী প্রভুতি।

এ জেলার অর্থনীতি কৃষি তথা ধান নির্ভর বলা যায়। জেলার বহু মানুষ ধান চাষ , ধান বাজার জাত, ধান হতে তৈরী বিভিন্ন খাদ্য দ্রব্য তৈরী করে সৃষ্ট ব্যবসার সাথে জড়িত। আদি থেকে বর্তমান পর্যন্ত প্রতি নিয়ত নিত্য নতুন ধানের সুঘ্রাণ বইছে দিনাজপুরের বাতাসে। এত সবের পরেও এই ধান উৎপাদন এবং ধান ব্যবসায় রয়েছে হাজারো সমস্যা। বাজার জাতের সমস্যা, পূঁজি স্বল্পতা , পদ্ধতিগত আধুনিকায়নের অভাব, প্রাকৃতিক দূর্যোগ মোকাবেলার অক্ষমতা , আবাদী জমির পরিমান কমে যাওয়া, মাটির পি-এইচ সংরক্ষন করতে না পারা, কীট নাশকের জন্য পরিবেশের ভারসাম্যহীনতা  প্রভৃতি, এ সকল বিষয়ে সম্মিলিত সহযোগীতা দেওয়া জরুরী প্রয়োজন । কেননা ইতিপূর্বে দুঃর্ভিক্ষের সময় এ জেলার ধান খেয়ে মানুষ প্রাণে বেচেছিল। তদ্রুপ যেহেতু উদ্বৃত্ত জেলা তাই প্রতি বৎসর এখানকার ধান দেশের মানুষের আহার যোগার করে আসছে। এখন শুধু প্রয়োজন নিত্য নতুন ধানের সুঘ্রাণে কৃষকের মুখের নির্মল হাসি।

বর্ষার জলে বন্যা, শীতে শুষ্কতার অঞ্চল হিসেবে পরিচিত দেশের এক সময়ে মঙ্গা এলাকা নামে খ্যাত উত্তরাঞ্চলে এলাকা হিসেবে অভাবি জনপদের নাম কুড়িগ্রাম,নওগাঁ,জয়পুরহাট,লালমনিরহাট, রংপুর, দিনাজপুর, চাপাইনবাবগঞ্জ, বগুড়া জেলার নাম ছিল। তবে এখন সেই মঙ্গার নামটা বর্তমান সরকারের বদৌলতে ঘুঁচেছে।  বর্ষা মৌসুমে এখানে জনপদ জলে ডুবে থাকতো। পলির আস্তর পরে এখানকার মাটি উর্বর হতো। তবে এখানে এক ফসলা ধানের উৎপাদন হতো বেশ। বছরের অর্ধেকটা সময় এখানে মানুষ খেতে পারলেও আর অর্ধেকটা সময় তারা থাকতো অভাবি। ধান উৎপাদনে দেশের বিশেষ করে দিনাজপুর জেলা পারস্যের গোলাপ নামে পরিচিত হয়েছিল অনেক আগেই। এখানে সহজে শ্রমের ব্যবহারের কারণে এখানকার মানুষ অনেক আগেই নিজের প্রয়োজনে ধান এবং তা থেকে চাউল তৈরীর চেষ্টা রপ্ত করতে অনেকটা বাধ্য হয়েছিল। কাজের ক্ষেত্র খুজতে গিয়ে এই এলাকার মানুষেরা শ্রম বাজার খুজতে গিয়ে দেখেন, চাউলের বাজার দেশের অনেক স্থানে থাকলেও তা ছিল প্রয়োজনের চেয়ে কম। উত্তর বঙ্গের মানুষেরা বিশেষ করে মহিলারা চাউল তৈরী করে নিজেদের এলাকার মানুষের এবং বাড়তি চাউল দেশের প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের চাহিদার যোগান দিতে উদ্বুদ্ধ হতে লাগল। সে সময়ে দেশের কোন চাউল বাজারে বিক্রেতা- ক্রেতা- ভোক্তার আধিক্ষ্য ছিল না। অভাবি মানুষেরা নিজেদের জমিতে উৎপাদিত ধান শুকিয়ে তা ঢেঁকিতে ভেঙ্গে নিজেরা খেত এবং অন্যত্র তা বিক্রি করতো। সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা হিসেবে তখন বাজার বলতে রেল যোগাযোগের দিকে ঝুকতো। সেই চিন্তায় উত্তর বঙ্গের মানুষেরা পূর্ব বঙ্গের বাজার পেতে কুষ্টিয়া জেলার পোড়াদহ নামের বাজারটিকে খুজে পেয়েছিল। শিলিগুড়ি, সীমান্ত নামের রেলে চেপে তারা রাত জেগে পোড়াদহে এসে চাউল বিক্রি করে আবার ফিরে যেত নিজ ঠিকানায়। এক এক দিন গড়িয়ে এই ভাবে গড়ে ওঠে কুষ্টিয়া জেলায় পোড়াদহ চাউলের বাজার। আর যাই হোক দেশের সব এলাকায় চাউলের বাজার তৈরী করতে গিয়ে ঢেঁকিতে ধান ভাঙ্গার যে প্রচলন তাতে উত্তর বঙ্গের মানুষের অবদান সর্বাগ্রে।

একটা সময় ছিল ছেলে-মেয়ের বিয়েতে বিশেষ করে ছেলের সাথে মেয়ের বিয়ে দিতে গিয়ে ছেলের স্বচ্ছলতার বিষয়টি দেখা হতো যেন সোম বছর বা সারা বছর ছেলেরা ঘরের ধানে খায় কিনা। তাহলে মনে করা হতো, অন্ত: মেয়েটা দুটো মোটা ভাত আর মোটা কাপড়ে টিকে থাকতে পারবে। তবেই আত্মীয়তা করা হতো।

ষাটের দশকের কথা। একবার পদ্মায় বড় বন্যা হলো। নদী ভাঙ্গনে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের চিলমারি চরের বিস্তৃর্ন এলাকা নদী গর্ভে বিলিন হলে এখানকার মানুষ নূন্যতম বাঁচার প্রয়োজনে শ্রম বিকিতে শহর মূখী হতে লাগল। সারা দিন কাজ করে তারা পোড়াদহে চাউল কিনতে যেত। পঞ্চাশ দশক হতে কুষ্টিয়াতে পিএডিসি’র (বর্তমান বিএডিসি’র হাট) হাট নামে এক ধানের হাট বসতো। এই হাটে ধানের সহজ লভ্যতা থাকায় নদী ভাঙন এই মানুষেরা এই হাট হতে ধান কিনে উত্তর বঙ্গের চাউল বিক্রেতাদের কাছ থেকে উৎসাহিত হয়ে তখন জেলার কবুরহাট, খাজা নগর, পোড়াদহে চাউল তৈরী করে বিক্রি করতে লাগল। দিনে দিনে এই এলাকায় চাঁদপুর,ভৈরব,মানিকগঞ্জ, মানিকগঞ্জের দৌলৎপুর, কুমিল্লা, ফরিদপুরের ভাঙ্গা,ফরিদপুর এলাকার নদী ভাঙন, অভাবি মানুষেরা বসতি তৈরী করে খাজা নগর চাউলের মোকাম এলাকায়।

দিনে দিনে শহরে মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকে। যত মানুষ বাড়ে তত বাড়ে চাউলের চাহিদা। বাজারে চাউলের যোগান দিতে ঢেঁকি নির্ভরতা থেকে চাতালে ধান শুকানোর জন্য অভ্যস্থ হতে থাকে। ব্যবহার বাড়তে থাকে চাতালের। চাউলের ভোক্তার সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে চাউলের বাজারের সংখ্যা বাড়তে থাকে। সে কারণে সাপ্তাহিক বাজার থেকে হাতের কাছে চাউলের দোকান এসে বসে।

দিন যেয়ে দিন এসে ঢেঁকি বিকল হয়ে প্রচলন আসে হাসকিং মিলের। এই মিলে চাতালের ব্যপক ব্যবহার হতে থাকে। এই মিলে দেশের স্থানীয় ধনীক শ্রেনী, বড় বড় ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ করতে লাগলেন। দেশের আনাচে কানাচে হাসকিং মিল তৈরী হলো। চাতাল তখন মানুষের খুব কাছে পৌছে গেল। যে কারণে দেশে এখন প্রায় ৪০০ টি হাসকিং মিল আছে বলে জানা যায়। যদিও এই মিল মালিকেরা এখন এই মিলের ডিজিটাল সংস্করণ হিসেবে অটো রাইচ মিলের দিকে ঝুকছে। অনেকে হাসকিং মিলের ব্যবসা থেকে নিজেকে গুটিয়েও নিয়েছে। অটো মিলে চাতালের তেমন ব্যবহার নেই বললেই চলে। ধান থেকে চাউলের যে কারবার তা ঘরে ঘরে ঢেঁকি থেকে  হাসকিং মিল এবং তা থেকে অটো রাইচ মিলে এসে ঠেকেছে। কাঠের ঢেঁকির ধান কল আজ অটো মিলে রূপান্তরীত হতে গিয়ে মিলে পরিণত হয়েছে।

চাউলের মোকাম কুষ্টিয়া

কুষ্টিয়া চাউলের মোকাম বলতে খাজানগরের নাম বোঝালেও এই মোকাম কে ঘিরে রয়েছে আরো কয়েকটি এলাকার চাতাল ও মিল। তন্মধ্যে বটতৈল, কদম তলা, কবুরহাট, দোস্ত পাড়া, খাজা নগর, সন্তোষপুর,বল্লভপুর ও বড় আঁইলচাড়া। এর মধ্যে কবুরহাট ও খাজানগর কল চাতাল বিশেষ ভাবে পরিচিত।

কবুরহাট : স্থানীয়দের মতে এই জায়গায় প্রথমে চিলমারির অভাবি মানুষ এলে তাদেরকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়া হয়। এই এলাকার নাম মূলত: কবিরহাট। এই এলাকায় একটি খর¯্রােতা নদী ছিল। তবে তার নাম কেও বলতে পারেন না। নদীর তীরৈ ছিল বট বৃক্ষ। এই বড় বট গাছের তলে নিদৃষ্ট দিনে কবিদের মেলা বসতো। বড় বড় নৌকায় চেপে জমিদারেরা এখান থেকে তাদের মনোবিলাসের জন্য কবি সংগ্রহ করতেন। এই ১-১.৫ শত বছর আগের কবিরহাট এখন হয়েছে কবুরহাট। গরিব লোকের শ্রমের সাধনায় কবুরহাটে চাউল কিনিবিকির থেকে চাতালের জন্ম হয়। সৃষ্টি হয় ধান-চাউলের পসরা। আবার ১৯৭৫ সালে ঢেঁকিকে বিদায় দিয়ে স্থানীয় তৈয়ব আলী এবং মুনসুর আলী বিশ্বাস হাসকিং মিল দিয়ে চাতালের জন্ম দিলেন এখানে।

চাউলের মোকামের এক দস্তি নাম খাজানগর : কবুরহাটের যখন রমরমা মনুষ্য বসতি, তখনও খাজা নগর পতিত জমি বলে দাবি কবুরহাটের স্থানীয় জনৈক মোহসীন নামের এক সমাজ সচেতন ব্যাক্তির। তবে একথা সত্য ১৯৪৯ সালে দেশে বড় এক বন্যার কবলে পরে,কুমিল্লা, ফরিদপুর, চাঁদপুর, নোয়াখালির বানভাসি মানুষের আগমন ঘটে এখানে। কুষ্টিয়ার দৌলৎপুরের চিলমারির মানুষ এখানে আসেন ১৯৫৪ সালে। তখন পদ্মার তীব্র ভাঙনে বাস্তহারা মানুষ কাজের খোজে এখানে আশ্রয় নিতে থাকে।এই চিলমারিতে ফরিদপুরের মোহন মিয়ার জমিদারি ছিল। তিনি ফরিদপুরের অভাবি মানুষকে ভাত-কাজের সংস্থান করতে এই সময়ে ফরিদপুর হতে চিলমারিতে পাঠিয়ৈ দেন।

কবির হাটের পতিত জমি খাজানগর হতে গিয়ে আছে এক চমকপ্রদ কাহিনী। ভারতের আজমির শরিফের  বিখ্যাত ইসলামি আধ্যাত্মিক গুরু খাজা মঈনুদ্দিন চিশতির দরবারে যাতায়াত করতেন দেশের বিখ্যাত লাঠিয়াল স¤্রাট ওস্তাদ সিরাজুল হক চৌধুরী এবং খাজানগরের বসতি অনেক মুরিদান। পতিত জায়গার জনবসতি এলাকার নাম নিয়ে চিন্তা করতে গিয়ে ১৯৫৪ সালে এই মুরিদেরাই সর্ব সম্মতিক্রমে এই এলাকার নাম দেন ‘‘খাজানগর।’’

এখানকার মানুষ প্রথমে এই এলাকায় কৃষি কাজ শুরু করেন ১৯৬৫ সালে। এই এলাকার উপর দিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিখ্যাত গঙ্গা-কপোতাক্ষ বা জিকে সেঁচ খাল প্রকল্পের কাজ শূরু হয়। সেঁচ খালের কাজ দিয়ে জীবিকা সংগ্রহ করে খাবারের প্রয়োজনে প্রথমে ঢেঁকি ছাঁটা চাউল উৎপাদন করে নিজেরা নিজেদের এবং পরে এলাকার সকলের তারপরে আশপাশ এলাকার মানুষের খাবার যোগান দিতে গিয়ে চাউলের উৎপাদনে আসে। এভাবে জেলার মানুষের চাউলের যোগান আসতে থাকে এই খাজানগর হতে।

১৯৭৬ সালের কথা। এলাকার নেতৃত্বদানকারী ব্যবসায়ী দাদা রমিজ উদ্দিন প্রধান এবং আরো কয়েকজন মিলে খাজানগরের স্থাপন করেন প্রথম হাসকিং মিল ‘ খাজা নগর রাইচ মিল।’ এই রমিজ উদ্দিনের সাথে আরো ছিলেন আলী বক্স প্রধান,আক্কাস মেম্বর,হাজী আব্দুস সালাম প্রমূখ।

দেশে মিনিকেট ধান থেকে চাউলের যাত্রা :

নব্বই দশকের সময় ভারত হতে এদেশে মিনিকেট ধান এবং চাউল আমদানি শুরু হয়। এই সময়ে খাজানগরের মিলারেরা ভারত হতে মিনিকেট ধানের বীজ সংগ্রহ করে তা দেশের বিশেষ করে যশোর,বেনাপোল,ঝিনাইদহ এমন আরো কিছু এলাকার কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করতেন। তখন মেহেরপুর সীমান্তের দু’পাড়ের কৃষকেরা এই ধান রোপন করতেন। আমাদের কৃষকেরা এখান থেকে মিনিকেট ধান উৎপাদন করার পদ্ধতি জেনে দেশে তা রোপন শুরু করে।এরপর উত্তর বঙ্গের কৃষকদেরকে একউ সহযোগিতা দিয়ে ঐ এলাকায় মিনিকেট ধানের উৎপাদন শুরু করা হয়।এই কুষ্টিয়ার খাজানগর নামে পরিচিত চাউলের মোকামের নাম এখন বিশ্বজুড়ে। এই মিল সমুহ হতে উৎপাদিত চাউল দেশের মোট চাউলের চাহিদার ২১ শতকরা যোগান দিয়ে আসছে।

হাসকিং মিল এবং চাউলের চাতালের সাথে জড়িয়ে আছে মধ্যম ও নি¤œ মধ্যম শ্রেণীর মানুষের রুটি-রুজির বিষয়টি। দেশের বিপুল সংখ্যক হতদরিদ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি আজ জড়িয়েছে হাসকিং মিলের চাউল উৎপাদনের প্রয়োজনে। দিন বদলে হাসকিং বদলে যাচ্ছে। আসছে অটো রাইচ মিল। অটো রাইচ মিলের দাপটে মানুষ শ্রম হারাচ্ছে। আবার বিলুপ্ত হচ্ছে ঢেঁকি শিল্পের। ঘরে ঘরে এখন আর ঢেঁকি পাঁড়ের শব্দ যেমন শোনা যায় না। আবার মেয়েদের গানের সুরে সুর মিলিয়ে চাউল কোটার সংস্কৃতিও মিলে যাচ্ছে দিন দিন। এই মানুষদের খাদ্যই বি আর ২৮ এবং বি আর ২৯ ধানের মোটা চাউল।

ধান-চাউল-চাতাল-হাসকিং মিল। এই বিষয়গুলো এখন আর কোন নিদৃষ্ট এলাকা বা জায়গাতে সীমাবদ্ধ নেই। দেশে এক সময় নঁওগা,জয়পুরহাট, বগুরা, দিনাজপুর চাউলের মোকামের কাজ সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন স্থানীয়ভাবে চাহিদার উপর ভিত্তি করে চাউলের যোগান আসে স্থানীয় পর্যায়েই।

চাতালের শ্রমিকদের মধ্যে পুরুষের পাশাপাশি নারীদের সংখ্যা নিতান্তই কম নয়। তবে এখানে নারীরা পরিশ্রম বেশি করে কম মজুরী পেয়ে থাকে। আবার তারা পুরুষ শ্রমিক, কখনও কখনও মালিকের দ্বারা নির্যাতিত হয়ে থাকে। এমনও দেখা গেছে নারী শ্রমিকের অনেকে মালিকের রক্ষিতা হিসেবে রয়ে গেছে। নিগ্রহের প্রতিবাদ করলে সামাজিক দূর্নামের দায় সহ নির্যাতনের ধরণ পাল্টে প্রতিশোধ নেয়া হয়। তাই এথানে অনেক শ্রমিক তাদের নির্যাতন নিরবে সহ্য করে থাকে। চাতালে শ্রমিকদের জন্য  ঝুঁকি থাকলেও তা মোকাবেলা করার জন্য সহায়তার ব্যবস্থা নেই। বীমা কিংবা কল্যাণ তহবিলের বা আপদ সময়ের জন্য তাদের আহারের ব্যবস্থা নেই এতটুকুও। এ বিষয়ে কথা হলো কুষ্টিয়া খাজানগর জেলা চাউল কল মালিক সমিতির সেক্রেটারী জয়নাল আবেদিনের সাথে। তিনি বললেন, চাতাল বা চাতাল সংশ্লিষ্ট হাসকিং মিলের এখন খুবই দূর্রাবস্থা। অনেক মিল এখন বন্ধ। যে জন্য অনেক শ্রমিক বেকার। বিশেষ করে পূঁজি হারিয়ে মিল মালিকেরা নি:স্ব হয়ে গেছে। মিলের চড়া সুদে নেয়া ব্যাংক ঋণ মৌকুফ করে চাতাল চালুর আগ্রহ তৈরী করা দরকার। মলিক শ্রমিকদেরকে কারিগরি শিক্ষার জন্য প্রশিক্ষণ অপরিহার্য্য । সরকারের পৃষ্টপোষকতায় শ্রমিকদেরকে স্বাস্থ্য সেবা দেয়া দরকার। চাল মিলের জন্য নিজস্ব বিদ্যুৎ ব্যবস্থা আবশ্যক। মিল মালিকদেরকে স্বল্প সুদে ঋণ দেয়ার ব্যবস্থা করা খুবই জরুরী। কেননা তার কথায়,‘আমরা খাদ্যের নিশ্চয়তা দেই। শ্রমিকদের কাজ দেই। আমরা স্থানীয় এবং দেশীয় অর্থনীতিকে সচল রাখি। শ্রমিকের পারিবারিক থেকে সামাজিক উন্নয়নে আমরা পথ তৈরী করে দেই। দেশীয় ধানের জাত রক্ষায় গবেষণা প্লট তৈরী করা দরকার। তিনি আরো জানালেন, কুষ্টিয়ার আবহাওয়া, মাটি, পানির গুণাগুণ বেশ ভাল, সে জন্য এখানকার উৎপাদিত ধান এবং তার চাউল বেশ স্বাস্থ্য সম্মত ও স্বাদের হয়ে থাকে। এখানে পর্যাপ্ত বিনিযোগ নিরাপত্তা দেয়ার জন্য একটি চাউল এলাকার জন্য পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন করা জরুরী।’

বাংলাদেশ অটো মেজর এন্ড হাসকিং মিল মালিক সমিতির কেন্দ্রিয় সভাপতি আব্দুর রশিদ জানালেন,‘দেশে এখন হাসকিং মিল এক আর্থিক ঝুঁকির মধ্যে। তিনি ২০০৪ সালে প্রথম খাজানগরে অটো মিল স্থাপন করেন। যা এখন এক ক্যাম্পাসে চার ইউনিটে সম্প্রসারিত হয়েছে। দেশে বর্তমানে ৩১ টি অটো রাইস মিল রয়েছে। তিনি জানালেন হাসকিং মিলে শ্রমিক দরকার হয় ৫০ জন। তার মধ্যে পুরুষ এবং নারী শ্রমিকের অনুপাত হলো, ৩৫ : ১৫ জন। আবার তার অটো মিলে শ্রমিক কাজ করে ৮০০ জন এখানে পুরুষ এবং নারী শ্রমিকের অনুপাত হলো, ৬৫০ : ১৫০ জন। তিনি আরো জানালেন দেশে প্রতিদিন চাউল চাহিদার ৭০ হাজার মেট্রিক  টনের মধ্যে খাজানগর যোগান দেয় ১৫ হাজার মেট্রিক টন। যে কারণে এখানকার গুরুত্ব একটু বেশি।’

চাতাল শিল্পে শ্রমিকদের মানবাধিকার নিশ্চিত হয় না। বছর বছর কাজ করেও তারা পূঁজিহীন।এই মিলে মালিকেরা শুধু তদারকির অভাবের সুযোগে নিজেরা বাজারকে অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করে অতি মুনাফার দিকে ঝুঁকে থাকেন বলে অভিযোগ করেছেন কেও কেও। যে জন্য চাউলের বাজার অস্থিরতা এলে তাতে প্রকারান্তে ক্ষতিগ্রস্থ হয় সব সময় ভোক্তারাই। এখানে এখন পূঁজির যোগান দেয় স্থানীয় ধনিক শ্রেণী। এনজিও। চড়া সুদের মুনাফা খোড়েরা । অথচ অটো মিলের আগমনে চাতাল শিল্পের কেও কেও শিল্পপতি পরিণত হলো।এখানে অনেক ব্যাংক ঢুকলো। ঋণ এলা তবে তা চড়া সুদেই।

ঢেঁকি, ধান এবং চাতাল। এই তিনে বাঙালির সংস্কৃতিক ইতিহাস। ছেলে মেয়ের বিয়েতে হলুদ শাড়িতে রং বে-রং এ সেজে ঢেঁকির পাড়ে ধাপুর দুপুর হলুদ কুঁটে নিরক্ষণ দেয়া নেয়ার ক্ষেত্রে থাকে আনুষ্ঠানিকতা। আজ তা অপ্রচলিত হতে চললেও বাঙালির প্রবাদ কথায় রয়ে গেছে ‘ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে।’ কথাটা এখনও করিৎ কর্মা মানুষের জন্য উৎসাহ যোগায়।যারা ঢেঁকিতে ধান ভেঙে জীবিকা নির্বাহ করত এখন তারা অনেকেই তাদের পৈত্রিক এ পেশা ছেড়ে দিয়েছে, তারা এখন অনেকে ভিক্ষা করে দিন অতিবাহিত করছে। শুধুকি তাই শরীরি পরিশ্রমের সহজতার কারণে এখন আমাদের গড় আয়ু যেমন কমছে। আবার নানাবিধ অসুখ শরীরে বাসা বাধার কারণে জীবন ঝুঁকি বেড়েছে অনেক। কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার সদরপুর গ্রামের আমোদ আলী (৬০) ও লালবানু  (৪৫) জানায়, এই বয়সে এসে পিঠা খাবার জন্য ঢেঁকিতে গুড়ো কোটার সমস্যায় শখের পিঠা ইচ্ছে করলেই খেতে পারছি না। ঢেঁকিতে ধান ভানার কারণে যে তুষ পাওয়া যেতো তা জ্বালানির কাজে ব্যবহৃত হতো। কুষ্টিয়ার গ্রামাঞ্চল থেকে গ্রামীণ জনপদের ঢেঁকিশিল্প হারিয়ে যাচ্ছে।

তারপরেও দেশী ধান গেছে। গেছে দেশী কল ঢেঁকিও। অহরহ মানুষের খাবার যোগার করতে গিয়ে হিমসিম উৎপাদন। প্রযুক্তি দিয়ে ধান চাষ, ধান থেকে চাউল তৈরী। এতসবের পরে প্রযুক্তির সর্বশেষ সংযোজন অটো রাইস মিল। অর্থাৎ ঢেঁকি হলো ধান, চাউল, চাতালের পরে হয়েছেশিল্পের শিল্পিত এক অঙ্গন।

 

লেখক : গবেষক, উদ্ভাবক, পরিবেশ ব্যক্তিত্ব।

Loading...

আরো খবর »