জাটকা : ছোট ইলিশকে জাল বন্ধি কেন ?

Feature Image

গৌতম কুমার রায়:  ইলিশ আমাদেরকে ঐতিহাসিক পরিচয়ে ফিরিয়েছে। ইলিশ আমাদের এখন এক গর্বিত সম্পদ। আমাদের অর্থনতি, কাজের ক্ষেত্র সৃষ্টি এবং আমিষের সহজ যোগানে এই মাছের অন্ত: নেই। যে কারণে ইলিশ এখন জি আই পণ্য তালিকায় বাংলাদেশের একান্ত নিজস্ব পরিচয়ে পরিচিতি পেয়েছে। সরকারের চেষ্টা আর নীতি নৈতিকতায় আগ্রহ এবং পরিকল্পনায় সমুদ্রের স্বার্বভৌমত্ব স্থির হয়েছে ১,১৮,৮১৩ বর্গ কিলোমিটার। আবার ইলিশ ফিরেছে আমাদের নদী, মোহনা এবং সাগরের গভীরতায়। মৎস্য অধিদপ্তর যে জন্য তার জনবলের সবটুকু নিয়োজিত করেছে ইলিশের প্রজননের প্রতিটি ধাপে। এর সাথে সহায়ক ভ’মিকা রেখেছে প্রশাসন, আইন শৃংঙ্খলা বাহিনী, জন প্রতিনিধি। দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া ইলিশের বংশ বিস্তারে সবাই কাঁতার বন্ধি হতে পেরে আমরা ঐতিহ্যে ফিরতে পেরেছি। আমরা অতিত গৌরব পুন:রুদ্ধারের গর্বিত সৈনিক। এবারে আমাদের ইলিশ উৎপাদন ৫.০০ লাখ মেট্রিক টন ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছি। যে কারণে বাজারে ইলিশের কারণে আর্থিক গতি ফিরবে প্রায় ১৮.৪৫ হাজার কোটি টাকার মত। ইলিশের আবাস স্থল, মা ইলিশ সুরক্ষা এবং জাটকা নিধন বন্ধ হওয়ায় ইলিশ এখন জল বেয়ে জাতীয় আর্থিক বিবেচনা এবং কর্ম সৃষ্টির ক্ষেত্র, দেশের আপামর জনগণের সহজ আমিষ পাওয়ার এক উপাদন হিসেবে শৈল্পিক সম্পদে রূপ নিয়েছে। ইলিশ কে ঘিরে আমাদের সংস্কৃতিক পরিমন্ডল ফিরে পেয়েছে তার কৃষ্টিগত ঐতিহ্য। এখন জেলে পল্লীতে নিরবতা নেই, ক্ষুধা নেই, নেই অভাবের রূপছায়া। এখানে এখন আনন্দ আছে, হৈ হুল্ল আছে, আছে সুখের বিশাল ব্যাপ্তি। এখানে এখন এই ইলিশকে নিয়ে জেলেদের সুখ-সান্নিধ্যের পান্ডুলিপি রচিত হচ্ছে।

মা ইলিশ সংরক্ষণ করতে গিয়ে জাটকা সুরক্ষার এক তাগিদ এসে হাজির হয় আমাদের সামনে। আগে জাটকা রক্ষায় অভিযান থাকলেও এখন মৎস্য অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দপ্তরের এটি যেন নিত্য দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত হয়ে গেছে। ইলিশ প্রজননের স্বাচ্ছন্দ্যময় আবাসস্থল, ইলিশের প্রজননে বাধাহীন পরিবেশ, জাটকা সুরক্ষার বিষয়টি মৎস্য অধিদপ্তরের প্রধান এক কর্মযজ্ঞ হিসেবে বিবেচিত হয়ে গেছে। দেশে ঢালচর, মনপুরা, মৌলভীর চর ও কালির চর দ্বীপ সব মিলিয়ে প্রায় ৭০০০বর্গ কি.মি পর্যন্ত এলাকা ইলিশের প্রধান বিচরণ ক্ষেত্র এবং পরিবেশ প্রভাবিত ৫ টি প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্র। মা ইলিশ রক্ষা এবং জাটকা বা খোকা ইলিশ রক্ষা করায় ইলিশ মাছ উৎপাদনে সফলতা এসেছে। মৎস্য অধিদপ্তরের এক হিসেব বলেছে, ২০১৪ সালে ১১ দিনের এই কর্মসূচিতে ১.৬৩ কোটি ইলিশ আহরণ হতে রক্ষা পেয়েছে।

 

ঐ মাছ থেকে প্রায় ৪, ১৭,৭৬৫ কেজি ডিম প্রাকৃতিক উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে।যা থেকে বেঁচে থাকার হার নির্ণয় ধরে ২৬,১০০ কোটি পোনা ইলিশ উৎপাদন সম্ভব হয়েছে বলে অনুমেয়। তাহলে এবারে ২২ দিনের একই কর্মসূচিতে এই উৎপাদন আরো দ্বিগুণ হবে তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু গত ২২ নভেম্বর ২০১৭ দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার এক নিবন্ধে তথ্য প্রকাশ, এবারে ‘মা ইলিশ রক্ষা কর্মসূচী’তে ৪৬.৪৭ শতকরা মা ইলিশ ডিম ছাড়তে সক্ষম হয়েছে।যা কিনা গেল বছরের চেয়ে ২.৪৭ শতকরা বেশি। সে মতে এবাওে ইলিশের পোনা পাওয়া যাবে ৪২ কোটির মত। আর ইলিশ উৎপাদন হবে দেশে ৬.০০ লাখ মেট্রিক টন। বছরব্যাপি যদি এই জাটকা সুরক্ষা দেয়া যায়, তাহলে আবারো ইলিশ দেশের প্রতিটি ঘরের হেঁসেলে হাজির হয়ে পৌছে যাবে মানুষের খাবারের থালায়।

ইলিশ থেকে জাটকা রক্ষার তাগিদ। আরো কি করণিয়। জানতে গেলে ড. মো: অলিয়ুর রহমান, জেলা মৎস্য কর্মকর্তা, মুন্সিগঞ্জ জানালেন, ইলিশের প্রধান প্রধান নার্সারীর ক্ষেত্র যেখানে জাটকা বা খোকা ইলিশ সংরক্ষণ ও মাছের জীববৈচিত্র্যতা রক্ষায় অভয়াশ্রম রয়েছে তাকে টিকিয়ে রেখে আর যে বিষয়গুলো ভাবতে হবে তাহলো, প্রজনন মৌসুমে ইলিশের মোট রেণুর ৫০ শতকরা নষ্ট করে চরগড়া নামের মশারী জাল। এই রেণু ১ ইঞ্চি বা তার নীচের আকারের। অবশিষ্ট ৫০ শতকরার অর্ধেকটা ক্ষতি করে বেহুন্দি জাল বা বাঁধা জাল। যাকিনা ১-১.৫ ইঞ্চি আকারের। বাকি ২৫ শতকরার অর্ধেকটা ধরা পরে কারেন্ট জালে। অর্থাৎ এরা ৭-৮ ইঞ্চি সাইজের জাটকা। কিন্তু শেষ অবশিষ্ট ১২.৫ শতকরা মাত্র ইলিশ যোগ দিয়ে থাকে ইলিশ মাছের ঝাঁকে। এই ঝাঁকের ইলিশ আমাদের উৎপাদনের হিসেবে আসছে। তা হলে জলে জলে ইলিশে সয়লাব করতে হলে অবৈধ জাল নি:শেষ করার কোন বিকল্প নেই। দেশের জলাশয়গুলোতে সার্বজনীন ভাষায় কিংবা আঞ্চলিক ভাষায় যে নামেই জাল থাকুক না কেন, তা সবই এই সময়ে জাটকা নিধনের কাজে ব্যবহৃত হয়। স্বচ্ছ এবং ছোট ব্যসে নাইলনের সুতোর এই জালগুলো মারাত্মক এবং ধ্বংসাত্মকও বটে। এবারে যেভাবে যমুনা এবং তিস্তাসহ কয়েকটি নদীতে ইলিশ এসেছে তাতে জাটকার বিচরণ সর্বত্র হবে এটাই স্বাভাবিক। আমাদের ভাবতে হবে যেখানে জাটকা সেখানেই সুরক্ষা। ইলিশ মাছ টিকে থেকে বংশ সৃজন করাতে হলে প্রথমে দরকার বসবাসের জায়গা, চলাচলের নিশ্চিত নিরাপত্তা, প্রাকৃতিক খাদ্যের নিবিড়তা এবং স্বাচ্ছন্দ্যময় প্রজননের ব্যবস্থা। আর এই বিষয়গুলো নির্ভর করে নদ-নদীর মিষ্টি জলজ পরিবেশে, মোহনার অল্প লবণ জলের পরিবেশে এবং সাগরের অতি লবণ জলের পরিবেশে। এতসব জলে আবার থাকতে হয় জল প্রবাহ, বৃষ্টিপাত,পরিমিত তাপমাত্রা, অক্সিজেন, কার্বন-ডাই-অক্সাইড,পি-এইচ, জলের ঘোলাত্ব, ক্ষারত্ব, ¯্রােতসহ এমন কিছু বিষয়।
আমাদের প্রয়োজনে ইলিশ। যার জন্য জাটকা সুরক্ষা। ইলিশ বাঁচাও, বংশ বৃদ্ধি কর। ইলিশ পেতে হলে জাটকা জলে থাক। আজকে যে জাটকা আগামীতে সেইতো ইলিশ। ছোট ইলিশ মানে অল্প টাকা। বড় ইলিশে বেশি টাকা। যত মাছ, তত কাজ। আমরা আজকে জাটকা সুরক্ষা করি। আগামীতে ইলিশ ধরি। জল আমাদের ইলিশও আমাদের। জাটকা আমাদের হবে শুধু ইলিশ হলে। তার আগে জাটকা জলের থাকুক। জাটকা যেহেতু জল বন্ধি হয়ে ইলিশ দেবে, তাহলে জাটকা জাল বন্ধি হবে কেন ? আসুন আমরা সবাই ইলিশ পেতে জাটকা রক্ষা করি।
লেখক : গবেষক, উদ্ভাবক, পরিবেশ ব্যক্তিত্ব।

Loading...

আরো খবর »