চৌরঙ্গী নামকরনের ইতিহাস ও অন্যান্য গল্প

Feature Image

সেখ রাসেল:  চৈতন্যদেবের আমলে কুমারখালীর নাম ছিল তুলসী গ্রাম। নবাব মুর্শিদ কুলি খাঁ এ অঞ্চলের রাজস্ব আদায়ের জন্য কালেক্টর নিযুক্ত করেন কমরকুলি খাঁ কে। তার নাম থেকে আঞ্চলিক সদরের নাম হয় “কুমারখালী”। তখন চৌরঙ্গী যে চারটি গ্রাম নিয়ে গঠিত তা ছিল মূলত একটি গ্রাম । যার নাম ছিল বাটিকগ্রাম । গ্রাম চারটি ভালুকা, বল্লভপুর, বহলবাড়িয়া ও লক্ষিপুর। কমরকুলি খা রাজস্ব আদায়ের জন্য বাটিক গ্রামের ভালুকা অংশে ডাকুয়া নদীর তীরে কাচারী বাড়ি স্থাপন করেন। এখানে তিনি খাজনা আদায়ের জন্য প্রজাদের উপর ভালুক দিয়ে অত্যাচার করতেন। সেখান থেকেই ভালুকা নামের উৎপত্তি। রাজা রাজবল্লভ কাচারি পরিদর্শনে এসে যে এলাকায় তার দলের তাবু স্থাপন করেন সে অঞ্চলের নাম বর্তমানের বল্লভপুর, লক্ষীপুর অঞ্চলে প্রচুর ফসল উৎপাদন হত একারনে রাজা রাজবল্লভ ধনের দেবী লক্ষীর নামানুসারে এ অঞ্চলের নাম রাখেন লক্ষীপুর।

“চৌরঙ্গী” মূলতঃ একটি আন্দোলনের নাম। এর আশেপাশের মানুষের একত্রিভুত হবার নাম। ভালুকা, বল্লভপুড়,বহলবাড়িয়া,লক্ষীপুর,বড়ইচারা,রসুলপুর,পরাণপুর ও বেড়মামিনক এ সকল এলাকার মানুষের মনন ও চিন্তার মধ্যে একসুত্র স্থাপনের একটি আন্দোলনের নাম “চৌরঙ্গী”। যে মানুষটি তার চিন্তা,মনন. স্বপ্ন ও কাজে চোরঙ্গী প্রতিষ্ঠার জন্য সারাজীবন ব্যয় করেছেন তিনি হলেন শেখ সদর উদ্দিন। যে মানুষগুল চৌরঙ্গী প্রতিষ্ঠার অন্যতম যোদ্ধা তারা হলেন মানিক আলী মন্ডল, আঃ জলিল মোল্লা, আঃ জলিল সেখ, লোকমান আলী, সামসুজ্জামান, এস এম তোরাব আলী, আয়েন উদ্দিন মিয়া, আকরাম হোসেন মোল্লা, আঃ আজিজ,বাবর আলী সেখ, সামসুদ্দিন ফকির, সিরাজুল ইসলাম, লুৎফর রহমান, ইউসুফ আলী মোল্লা, আঃ রহমান, আফজাল হোসেন জোয়াদ্দার, মসলেম উদ্দিন, আছির উদ্দিন, আঃ হাকিম মোল্লা, হোসেন আলী ফকির ও বাবু নিমাই চন্দ্র মন্ডলের নাম অবিস্মরনীয়।

প্রায় ১০০-৮০ বছর পূর্বে বর্তমানের চৌরঙ্গী বাজার ছিল ডাকুয়া নদীর তীরে ভালুকা সাঁজিপাড়া তে। নৌ পথে বাণিজ্যিক মালামালের পরিবহণের সুবিধার্থে নদীর তীরে এ বাজার গড়ে উঠেছিল ।১৯৬০ সালে গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ পরিকল্পনার সেচ খাল খনন করা হয়। সেচ খাল খনন করতে গিয়ে ডাকুয়া নদীতে বাঁধ দেওয়া হয়, ফলে ডাকুয়া নদীর মৃত্যু হয়। তৎকালীন সময়ে নৌপথ বন্ধ, ডাকাতির প্রকোপ ও সামাজিক অস্থিরতার কারনে বাজারটি স্থানান্তর করা হয় বড় ভালুকার বেলতলাতে। সাজিপাড়া বাজারে মানিক আলী মন্ডলের সর্ব বৃহৎ বেনিয়ার দোকান ছিল। সাঁজিপাড়া বাজার বন্ধ হয়ে গেলে মানিক আলী মন্ডলের বেনিয়ার দোকানটি আঃ জব্বার মৃধা সাহেবের বাড়ীর জমি থেকে প্রদানকৃত এক শতাংশ জমির উপর প্রতিষ্ঠিত করেন এবং আয়েন উদ্দিন মিয়া সাহেবের হেমিও ডাক্তারি দোকানের মাধ্যমে ১৯৬২-১৯৬৩ সালে গোড়াপত্তন করা হয় আজকের চৌরঙ্গী বাজারের। তখন এ বাজারটির নাম চৌরঙ্গী ছিল না। সেকারনে চৌরঙ্গীর রুপকার শহীদ শেখ সদর উদ্দিন যখন ১৯৬৬ সালে এখানে পোষ্ট অফিস প্রতিষ্ঠা করেন তখন চৌরঙ্গী নামটি ব্যবহার করেননি। পোষ্ট অফিসটির নামকরণ করেন ভালুকা পোষ্ট অফিস। মানিক আলী মন্ডল ছিলেন প্রথম পোষ্টমাস্টার এবং উনার দোকানটিই ছিল পোষ্ট অফিস। আমাদের পূর্ব পুরুষগণ এ বাজার কে বলতেন “তেমাথা”। তাহলে কেমন করে উৎপত্তি হল চৌরঙ্গী নামটির ?

ইতোমধ্যে বাজারটিতে আরো অনেক দোকান প্রতিষ্ঠিত হল। তবে বাজারের নামটি রয়েই গেল তেমাথা। এরই মধ্যে দানা বেধে উঠে স্বাধীনতা যুদ্ধ। চৌরঙ্গী এর আশপাশের গ্রামগুলো মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের অন্যতম ঘাটি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হল। এ অঞ্চলের দামাল ছেলেরা দেশমাতৃকার টানে ঝাপিয়ে পরে মুক্তিযুদ্ধে। ১৯৭১ সালের ২৯ অক্টোবর বড়ইচারাতে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি ঘাটির সন্ধান পায় রাজাকার ও হানাদার বাহিনী। বর্তমান চৌরঙ্গী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পিছনের মাঠে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু হয় রাজাকার ও মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে। স্বাধীনতার পর মুক্তিযোদ্ধারা ফিরে আসেন নিজ এলাকাতে। বল্লভপুর চাষী ক্লাবে প্রতিষ্ঠিত হয় মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প। শহীদ শেখ সদরউদ্দিনের নেতৃত্বে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় স্থানীয় স্বাধীনতা বিরোধিদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভেঙ্গে নিয়ে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে হবে। শেখ সদর উদ্দিন সাহেবের ছিল নেতৃত্ব দেবার দারুন গুণ এবং সাংগঠনিক ক্ষমতা। এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে তিনিই ছিলেন উচ্চ শিক্ষিত এবং তার লেখনি ক্ষমতা এতটাই প্রখর ছিল তিনি কোন আবেদন লিখলে যার বরাবর আবেদন করা হত তিনি বিমুগ্ধ হয়ে যেতেন। তেমনি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয়ী শক্তি ও শেখ সদর উদ্দিনের নেতৃত্ব গুন, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং লেখনি ক্ষমতা একিভূত হয়ে দারুন এক মুর্ছনার সৃষ্টি করল। বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ সর্ব জনাব মোঃ আছির উদ্দিন (নেপাল), আদিল উদ্দিন, হাসান আলী মন্ডল,খয়বর আলী, আঃ কাদের মৃধা, কিয়মুদ্দিন, মিনহাজ উদ্দিন,আনছার আলীসহ জনাব মোঃ লোকমান আলী, সামসুজ্জামান, মকসেদ আলী, এস এম তোরাব আলী, আকরাম হোসেন মোল্লা, আঃ আজিজ,আব্দুস সাত্তার, আঃ রহমান, আফজাল হোসেন জোয়াদ্দার,আকমল হোসেন জেয়াদ্দার, হোসেন আলী ফকির ,সামসুদ্দিন ফকির,আছির উদ্দিন, আঃ হাকিম, হায়দার আলী, কিরন চন্দ্র মন্ডল, অমল কুমার, লুৎফর রহমান এবং আরো অনেকে শেখ সদর উদ্দিনের নেতৃত্বে চৌরঙ্গী বাজারে অবস্থিত স্বাধীনতা বিরোধীদের মিল ঘর ভেঙ্গে চৌরঙ্গী বাজারের পশ্চিম পার্শে জি কে সেচ খালের নিকট শাহাদৎ আলী ও বিশু সেখের জমির উপর রাখা হয়। যে কয়েকজন মুরুব্বি এই কাজটির পরোক্ষ নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন সর্বজনাব মানিক আলী মন্ডল, আব্দুল জলিল মোল্লা, আয়েন উদ্দিন মিয়া, বাজুর আলী বিশ্বাস, ইয়াছিন আলী দারোগা, আঃ জলিল সেখ,বাবু নিমাই চন্দ্র মন্ডল প্রমুখ। ভাংঙ্গা ঘড়টি কোথায় স্থাপিত হবে এবং বিদ্যালয়টির নাম কী হবে, তা নিয়ে মতবিরোধ সৃষ্টি হল। কারণ তখনও চৌরঙ্গী নামকরন হয়নি। অবশেষে বিশু সেখকে রাজি করান হল এবং ডাঃ আব্দুল জব্বার শাহাদৎ আলীদের নিকট হতে ক্রয় করে কিছু জমি দান করলেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য জমি দান করলেন সামসুদ্দিন ফকির ও হোসেন আলী ফকির। জনাব মোঃ সামসুজ্জামান ও আব্দুস সাত্তারকে দায়িত্ব দেওয়া হল বিশু সেখের নিকট থেকে ক্রয় কৃত ও ডাঃ আব্দুল জব্বার সাহেবের দানকৃত সর্ব মোট ২৭ শতাংশ জমির উপর ভেংগে আনা ঘড় স্থাপনের। মানিক আলী মন্ডল সাহেব ও ডাঃ আব্দুল জব্বার সকলের নিকট হতে আদায় করে ও নিজে ২৪০০ টাকা দিলেন জনাব মোঃ সামসুজ্জামান ও আব্দুস সাত্তারকে। ১৬০০ টাকা ব্যয়ে জনাব মোঃ সামসুজ্জামান ও আব্দুস সাত্তার মাধ্যমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ঘড় প্রতিষ্ঠা করালেন এবং অবশিষ্ট টাকা ফেরৎ দিলেন। সভা আহবান করা হল বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদ গঠনের উদ্দেশ্যে। স্বাধীনতাবিরোধীদের ভয়ে কেহ বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি হতে রাজি হলেন না। শেখ সদর উদ্দিন দারস্থ হলেন তাঁর উপদেষ্টা সিরাজুল ইসলাম মেম্বরের, সিরাজুল ইসলাম সাহেব সবসময় শেখ সদর উদ্দিনের সকল কাজে বট বৃক্ষের মত ছায়া দিয়েছেন, নির্দেশনা ও সূ-পরামর্শ দিয়েছেন। সিরাজুল ইসলাম সাহেব তার প্রানপ্রিয় ছোট ভায়ের আবদারে তাঁর নিকট আত্মীয় ইয়াসিন আলী দারোগা সাহেবকে রাজি করালেন। সকলের অনুরোধে ইয়াসিন আলী দারোগা সাহেব অলংকৃত করলেন চৌরঙ্গী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতির পদ। তখন পর্যন্ত ঠিক করা গেল না কী হবে স্কুলের নাম। কারণ স্কুলটি প্রতিষ্ঠিত হল বল্লভপুর মৌজাতে । একদিকে মুক্তিযোদ্ধা আছির উদ্দিন ও লোকমান আলী সাহেব চাইছিলেন স্কুলটির নামকরন বল্লভপুর হোক। অপরদিকে বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সেখ সদর উদ্দিন এর বাড়ী ভালুকাতে, তিনি চাইছিলেন ভালুকা নামকরণ হোক।
১৯৭২ সালের ১,জানুয়ারি বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সভা আহবান করা হল। আলোচ্য বিষয় বিদ্যালয়ের নামকরণ নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা নিরসন ও প্রথম শিক্ষক নিয়োগ। নামকরন সম্পর্কিত জটিলতা নিরসনের জন্য মানিক আলী মন্ডলের নেতৃত্বে শেখ সদর উদ্দিন ও মোঃ লোকমান আলীর সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠিত হল। কমিটির প্রধান পর্যালোচনা হল এর চারপাশের চারটি গ্রাম(ভালুকা, বল্লভপুর, বহলবাড়ীয়া ও লক্ষীপুর) এবং চৌরঙ্গীকে চারটি অংশে বিভক্তকারী চারটি রাস্তা ও এর মিলনস্থল (কুমারখালী – পান্টি সড়ক ও বাশগ্রাম – খোকসা সড়ক)। কি নাম নির্ধারন করা হলে চারটি গ্রামের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করা যায় এর অখন্ডতা রক্ষা করা যায়। মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে করিমপুর ইয়ূথ ক্যাম্পে প্রশিক্ষনকালীন সময়ে শেখ সদর উদ্দিন মাঝে মাঝে কলকাতার “চৌরঙ্গী স্ট্রিটে” গোলাম কিবরীয়া ও এম এ বারী সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে যেতেন। তিনি চৌরঙ্গী নামটির কথা লোকমান আলীকে জানান। মোঃ লোকমান আলী প্রস্তাব করেন বিদ্যালয় ও এই এলাকার নামকরন হোক “চৌরঙ্গী”। সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হল নামটি এবং ঐদিন থেকেই জন্ম হল আমাদের স্বপ্নের “চৌরঙ্গী”।
নামকরনের বিষয়টি সুরাহা হবার পর বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদ বসলেন বিদ্যালয়ের প্রথম শিক্ষক নিয়োগে। তৎকালীন সময়ে শিক্ষা বিভাগের নির্দেশনা ছিল বিদ্যালয়ে অবশ্যই প্রথম পর্যায়ে বিজ্ঞানের শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। মোঃ সামসুজ্জামান তখন বিজ্ঞান বিভাগ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে স্নাতক (বিএসসি) এর ছাত্র। টগবগে যুবক, তরুণ, মার্জিত, সুদর্শন এক স্বপ্নদ্রষ্টা পুরুষ, বুকে লালিত স্বপ্ন চৌরঙ্গীকে প্রতিষ্ঠিত করবেন। ১ জানুয়ারি, ১৯৭২ চৌরঙ্গী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হল জনাব মোঃ সামসুজ্জামান কে। শেখ সদর উদ্দিনের লিখিত ইয়াসিন আলী দারোগা সাহেবের স্বাক্ষরিত নিয়োগপত্র প্রথম শিক্ষক মোঃ সামসুজ্জামানের হাতে তুলে দিলেন মানিক আলী মন্ডল। দ্বিতীয় শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ পেলেন আমাদের প্রিয় আঃ রহমান স্যার।

কিছু শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হল কিন্তু স্নাতক ও বিএড না থাকায় প্রধান শিক্ষক নিয়োগ করা সম্ভব হচ্ছিল না। বাবু নিমাই চন্দ্র মন্ডল তখন ডাঁশা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। স্বাধীনতা যুদ্ধের কারণে তিনি তখনও ভারতে অবস্থান করছিলেন। আয়েন উদ্দিন মিয়া ও আঃ জলিল মোল্লা সাহেব দায়িত্ব নিলেন বাবু নিমাই চন্দ্র মন্ডল কে ফিরিয়ে আনা এবং ডাঁশা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের চাকরি হতে অব্যহতি গ্রহনের। জানুয়ারি, ১৯৭২ এর শেষ সপ্তাহে ভারত থেকে দেশে ফিরলেন বাবু নিমাই চন্দ্র মন্ডল। এলাকাবাসীর অনুরোধে ডাঁশা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষকের পদ থেকে অব্যহতি নিলেন এবং প্রধান শিক্ষক হিসাবে যোগদান করলেন চৌরঙ্গী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে।
যথারীতি বিদ্যালয়ের পাঠদান শুরু হয়ে গেল। বিদ্যালয়টি ১৯৭১ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও রেজিষ্ট্রেশনের স্বার্থে বিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠার বছর সকল কাগজপত্রে ১৯৬৯ সাল লিপিবদ্ধ করলেন বাবু নিমাইচন্দ্র মন্ডল। প্রথম ব্যচের ছাত্র ৮ জন (মোঃ আবু জাফর, ফিরোজ আহমেদ, মোঃ আবু হনিফ, মোসাব উদ্দিন, সূর্যকুমার, মকবুল হোসেন, আঃ জব্বার ও মনোয়ার হোসেন)। বিদ্যালয়ের ঘর প্রতিষ্ঠিত যে জমির উপর সেটুকু ব্যাতিত কোন জমি নেই, নেই কোন খেলার মাঠ। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর, খুলনা অঞ্চল, খুলনা ও যশোর শিক্ষা বোর্ড থেকে প্রতিনিধি দল আসবেন। উপ-পরিচালক, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর, খুলনা জানিয়ে দিলেন যদি বিদ্যালয়ে খেলার মাঠ ও প্রয়োজনীয় জমি থাকে তিনি বিদ্যালয়ের রেজিষ্ট্রেশন দেবেন,অন্যথায় নয়। প্রতিষ্ঠাতাদের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। শেখ সদর উদ্দিন ও বাবু নিমাই চন্দ্র মন্ডল প্রথম ও দ্বিতীয় ব্যাচের ছাত্রদের সাথে বিষয়টি নিয়ে পরামর্শ করলেন। এলাকার তেজী,বুদ্ধিদীপ্ত যুবক মহসিন আলী ফকির সকল দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। প্রথম ব্যাচের ৮ জন এবংদ্বিতীয় ব্যাচের আঃ রহিম, শাহজাহান আলী ও রেজওয়ান আলী একত্রিত হল , যাদের সংগঠক ও নেতা মহসিন আলী ফকির। মহসিন আলী ফকির তাঁর দলের সকল সদস্যদের নির্দেশ দিলেন সবাই যেন কোদাল নিয়ে আসে ও ফুটবল খেলার গোল পোষ্ট তৈরীর জন্য প্রয়োজনীয় বাঁশ ও কিছু লাঠি সংগ্রহে রাখে। আবু জাফর এই সকল সরঞ্জামাদী সংগীয় ছাত্রদের সাথে পূর্বেই সংগ্রহ করে স্কুলের কক্ষে লুকিয়ে রাখেন। বিদ্যালয়ের সামনে মাঠ, ধান দুলছে বাতাসে, প্রায় শীষ বের হওয়ার পথে। কয়েকদিনের মধ্যেই ধানের শীষে ভরে উঠবে মাঠ। জমিগুলোর মালিক বাছের আলী শেখ। কয়েক দফায় বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সভা হল। সভায় কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব হল না । বেড়িয়ে এলেন শেখ সদর উদ্দিন, আগেই পরামর্শ গ্রহণ করা ছিল মহসিন আলীর সংগে। মহসিন আলী ফকির পূর্বেই তিনটি ফুটবল এনে রেখেছিলেন। তিনি ফুটবল, কোদাল, গোল পোষ্ট তৈরির বাঁশ ও প্রথম এবং দ্বিতীয় ব্যাচের ছাত্রদের নিয়ে নেমে গেলেন ধানের ক্ষেতে। কোদাল দিয়ে আইল সমান করে উত্তর ও দক্ষিন দিকে গোল পোষ্ট তৈরি করে ধানের ক্ষেতেই শুরু হল ফুটবল খেলা। দর্শক সারিতে অবস্থান নিলেন বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ। ধানক্ষেত সমান হয়ে পরিনত হল বিদ্যালয়ের খেলার মাঠ। শেখ সদর উদ্দিন ও মহসিন আলী প্রায় একমাস প্রথম ও দ্বিতীয় ব্যাচের ছাত্রদের নিয়ে পাটি বিছিয়ে বিদ্যালয়ের মাঠেই রাতে অবস্থান করতেন। পরিদর্শনে আসলেন উপ-পরিচালক, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর, খুলনা, তিনি বিদ্যালয়ের মাঠ দেখে খুশি হলেন, রেজিস্ট্রেশন পেল চৌরঙ্গী মাধ্যমিক বিদ্যালয়। ২৪ ডিসেম্বর , ১৯৭৫ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের পদ হতে অব্যহতি নিয়ে ভারতে চলে যান বাবু নিমাই চন্দ্র মন্ডল, ২৫ ডিসেম্বর, ১৯৭৫ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের দায়ীত্ব গ্রহন করেন মোঃ সামসুজ্জামান। ১৯৭৬ সালে অনুষ্ঠিত এসএসসি পরীক্ষায় বিদ্যালয়ের প্রথম ব্যাচের আট জন ছাত্র অংশগ্রহন করে। যেদিন ফলাফল প্রকাশিত হল, চৌরঙ্গী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রথম ব্যাচের সকল পরীক্ষার্থী কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হল। আনন্দে বেঞ্চ মাথায় করে ছাত্রদের সাথে নাচ শুরু করলেন শিক্ষক শেখ সদর উদ্দিন ও মোঃ সামসুজ্জামান।

ইতোমধ্যে চৌরঙ্গী বাজারের কলেবর অনেকটা বৃদ্ধি পেয়েছে। সপ্তাহে দুই দিন শনিবার ও মঙ্গলবার বাজার বসতো চৌরঙ্গীতে এবং সোম ও বৃহঃস্পতিবার দুই দিন বাজার বসত বহলবাড়ীয়াতে লক্ষীপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে। শেখ সদর উদ্দিন, আঃ আজিজ, সিরাজুল ইসলাম মেম্বর , আঃ হাকিম, খয়বর আলী, এতেম আলী, খলিলুর রহমান মেম্বর ও আফজাল হোসেন জোয়াদ্দার পরামর্শ করলেন যে দুই দিন বহলবাড়ীয়াতে বাজার লাগে ঐ দুই দিন ব্যাতিত সপ্তাহের বাকি পাঁচ দিন বাজার বসবে চৌরঙ্গীতে। সে মোতাবেক চৌরঙ্গী বাজারে ঢোল পিটিয়ে দেওয়া হল। বেঁকে বসলেন বহলবাড়ীয়ার আঃ জলিল সেখ ও বাবর আলী সাহেব। মতবিরোধ সৃষ্টি হল ভালুকা ও বহলবাড়ীয়ার মানুষের মধ্যে। সেখ সদর উদ্দিন ও আঃ আজিজ প্রতিদিন বাজার লাগিয়ে দিলেন চৌরঙ্গীতে। শেখ সদর উদ্দিন, আঃ আজিজ, সিরাজুল ইসলাম মেম্বর , আঃ হাকিম ও খয়বর আলী রাস্তায় পাহারা দিতেন ভালুকার কোন লোক যাতে বহলবাড়ীয়া বাজারে না যায়। এ নিয়ে একটি গন্ডোগোল বাধার উপক্রম হল। ভালুকার লোকজন লাঠিসোটা, ঢাল /ফালা নিয়ে উপস্থিত হল পূর্ব ভালুকা হিন্দুপাড়া মাঠের মধ্যে এবং বহলবাড়ীয়ার লোকজন সমবেত হল বহলবাড়ীয়া কালী মন্দিরের পাশের মাঠে। শক্ত ভূমিকা নিলেন আঃ জলিল মোল্লা, লোকমান আলী ,এসএম তোরাব আলী ও আকরাম হোসেন মোল্লা সাহেব। তাঁরা দুই পক্ষকেই নিবৃত করলেন এবং ফিরিয়ে দিলেন। ভালুকার জনাধীক্য , বাজারের অবস্থান ও বল্লভপুর, রসুলপুর, লক্ষীপুরের মানুষের গোপন সমর্থন এসব কারনে ভেঙ্গে গেল বহলবাড়ীয়া বাজার। সেই থেকেই সপ্তাহে সাত দিন বাজার বসছে চৌরঙ্গীতে।

শেখ সদর উদ্দিন সাহেবের অকাল মৃত্যু, অপরাজনৈতিক করাল রাহুগ্রাস, ভ্রাতৃত্ববোধের অভাব নানা কারণে থমকে আছে চৌরঙ্গীর উন্নয়ন। আমরা আমাদের মাকে আবার উজ্জিবিত করতে চায়। আমাদের পূর্বশুরীদের মত চৌরঙ্গী কে কুষ্টিয়া জেলার সর্বশ্রেষ্ঠ এলাকা হিসাবে গড়ে তুলতে চাই। বাস্তবায়ন করতে চাই আমাদের স্বপ্নের পূর্ণাঙ্গ থানা। চৌরঙ্গী নামক যে ঐক্য আর আন্দোলন শুরু হয়েছিল আমরা তা অটুট রাখার দৃর প্রত্যয় ব্যাক্ত করছি। আসুন সবাই মিলে গড়ে তুলি আমাদের মা কে।

সেখ রাসেল
এসএসসি ব্যাচ-১৯৯৩
উপ-পরিচালক, মৎস্য ও প্রানি সম্পদ মন্ত্রনালয়।

(পাঠক কলাম বিভাগে প্রকাশিত মতামত একান্তই পাঠকের, তার জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়)

আরো খবর »