ডিআইজি মিজানকে নিয়ে তোলপাড়, বিব্রত পুলিশ

Feature Image

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার-ডিআইজি মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে নানারকম অপরাধ-অপকর্মে জড়িয়ে থাকার অভিযোগ নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। টিভি উপস্থাপিকা এক তরুণীকে অপহরণ করে নিজের সরকারি ফ্ল্যাটে আটকে জোরপূর্বক বিয়ে করেছেন তিনি। আবার তার ওপর ধারাবাহিক নির্যাতন চালিয়ে জেল খাটিয়ে মামলায়ও ঝুলিয়েছেন। ঘরে একাধিক স্ত্রী বহাল থাকা সত্ত্বেও একের পর এক পরকীয়ায় জড়িয়ে অনেক সম্ভ্রান্ত নারীর সর্বনাশ ঘটিয়েছেন মর্মে নানা অভিযোগ উঠেছে ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে। পুলিশের এই পদস্থ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হওয়ার পর দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে।

অনেকে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেছেন, সিনিয়র পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তা এমন বেপরোয়া হলে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়? এ রকম একজন উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তার চরিত্র ও ক্ষমতার অপব্যবহারের চিত্র যদি জঘন্য পর্যায়ে চলে আসে তাহলে ধরে নিতে হবে তার নিয়ন্ত্রণকারী কেউ নেই।

অস্ত্রের মুখে এক তরুণীকে তুলে নিয়ে বিয়ে করার অভিযোগ উঠেছে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিআইজি) মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে। ভাড়া করা ফ্ল্যাটে ৪ মাস সংসার করার পর পুলিশ কর্মকর্তার সাজানো মামলায় জেলও খাটতে হয় ওই তরুণীকে। এমনকি অপহরণপূর্বক বিয়ে আর নির্যাতনের খবর প্রকাশ করায় ওই তরুণীকে হত্যার হুমকিও দেন ডিআইজি মিজান। তরুণীর নাম মরিয়ম আক্তার ইকো।

জানা যায়, তিনি একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের উপস্থাপিকা। ব্যাংকের উচ্চ পদে চাকরির চেষ্টাকালে জনৈক মহিলার মাধ্যমে ডিআইজি মিজানের সঙ্গে মোবাইল ফোনে প্রথম পরিচয় মরিয়ম আক্তার ইকোর। তবে কিছুদিন পর অশোভন ইঙ্গিতপূর্ণ কথা এবং রহস্যময় আচরণে সন্দেহ হলে পুলিশ কর্মকর্তাকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেন তিনি। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে প্রতারণার আশ্রয় নেন মিজান। ভুক্তভোগী মরিয়ম আক্তার ইকো অভিযোগ করে বলেন, গত ১৪ জুলাই ক্ষমা চাওয়ার নাম করে কৌশলে পান্থপথের বাসা থেকে বের করে আনা হয় তাকে। নিজের গাড়িতে ৩০০ ফুট সড়কের পাশে পূর্বাচলে নিয়ে মারধর এবং নির্যাতন করা হয়। পরে ওড়না দিয়ে চোখ-মুখ বেঁধে গাড়িচালক গিয়াস এবং দেহরক্ষী জাহাঙ্গীরের সহায়তায় বেইলি রোডের সরকারি কোয়ার্টারে নিয়ে আসা হয় মরিয়মকে। সেখানে তিনজন মিলে দফায় দফায় নির্যাতন চালিয়ে তাকে অজ্ঞান করে ফেলা হয়।

জানা যায়, নির্যাতনের সময় আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছিলেন মরিয়ম। নিজের কাপড়ে গ্যাস চুল্লির আগুনও ধরিয়ে দিয়েছিলেন। এ অবস্থায় মরিয়মের মাকে ডেকে এনে অস্ত্রের মুখে ৫০ লাখ টাকা দেনমোহরে বিয়ে করতে বাধ্য করা হয়। উকিল বাবা হিসেবে ছিলেন গাড়িচালক গিয়াস এবং সাক্ষী করা হয় দেহরক্ষী জাহাঙ্গীরকে। পরে সেখান থেকে লালমাটিয়ায় ভাড়া বাসায় রেখে গোপনে ৪ মাস সংসার করেন মিজান। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া সুন্দরী ইকোকে ফাঁদে ফেলে তার কানাডার বিয়ে ভেঙে দেওয়াসহ পুরো পরিবারের সুখ-স্বপ্ন চুরমার করে দেওয়ার নানা রোমহর্ষক কাহিনী বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে।

অনুসন্ধান করতে গিয়ে একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের জনৈক সংবাদ পাঠিকার সংযোগও পাওয়া যায়। যার সঙ্গে পরকীয়ার সম্পর্ককে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে পড়ে। মরিয়মের অভিযোগ, একই সময়ে বিয়ে না করার মিথ্যা কথা বলে আরও কয়েকটি পরকীয়ায় জড়িয়ে ছিলেন মিজান- ফেসবুকে ছবি আপলোড করায় অন্য প্রেমিকারা সটকে যাওয়াতেই মিজান বেশি খেপে ওঠেন। এ ব্যাপারে মরিয়ম বলেন, ‘আমি ডিআইজি মিজানের বৈধ স্ত্রী। সে আমার সঙ্গে এত দিন সংসার করল। কিন্তু স্ত্রী পরিচয় দিয়ে ফেসবুকে ছবি আপলোড করাতেই কেন যে মিজান চরম খেপে উঠল তাও বুঝতে পারছি না। সেই ক্ষোভেই বেইলি রোডের বাসায় ভাঙচুরের মামলায় ১২ ডিসেম্বর পুলিশের হাতে গ্রেফতারের পর কারাগারে যেতে হয় আমাকে। যার চার্জশিটও দেওয়া হয়েছে। এখন শুনছি, আমার বিরুদ্ধে ভুয়া কাবিন করার অভিযোগ এনে আরও একটি মামলা করা হয়েছে।

মরিয়ম আক্তার ইকো বলেন, স্ত্রী-সন্তান থাকা সত্ত্বেও মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে প্রতারণা করেছেন মিজান এবং সরকারি কর্মকর্তা হয়েও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জোরপূর্বক আমাকে বিয়ে করেছেন। মরিয়ম প্রশ্ন তুলেন, কেনইবা সে আমাকে জোর করে বিয়ে করল, কেনইবা ৪ মাস সংসার করল আর কেনইবা আমাকে জেলে পাঠাল-এসবের কিছুই বুঝতে পারছি না। পুলিশ সপ্তাহ শুরুর আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসহ বিভিন্ন মহলে আলোচনার খোরাক এখন ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মিজানুর রহমান। এসব অভিযোগের ব্যাপারে বিভিন্ন গণমাধ্যমকে মিজান বলেন, তার বিরুদ্ধে তোলা অভিযোগ ‘পুরোপুরি মিথ্যা’। ‘আমার স্ত্রীর সঙ্গে আমার ভালো বোঝাপড়া। আমরা পারিবারিক জীবনেও সুখী। আমাকে সমাজে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য স্বামী বানিয়ে মিথ্যা প্রচার চালানো হচ্ছে।’ অভিযোগকারী নারীকে ‘প্রতারক’ আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, ওই নারী ২০১৫ সালে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একটি জিডি করেছিলেন। সেই সূত্রে তার সঙ্গে পরিচয়। ওই নারীর বিরুদ্ধে রমনা থানায় ভাঙচুরের মামলার বিষয়ে মিজান বলেন, গত বছরের ১৬ জুলাই এই নারী বেইলি রোডের তার ভাইয়ের বাসায় জোর করে ঢোকার চেষ্টা করেছিল। তখন থানায় একটি মামলা হয়। অভিযোগপত্র দেওয়ার পর এটি এখন বিচারাধীন। ওই নারী কেন ওই বাসায় ঢোকার চেষ্টা করেছিলেন, সে বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলেননি পুলিশ কর্মকর্তা মিজান। তিনি দাবি করেন, ওই নারী সেসব অভিযোগ করেছিলেন, তা ইতিমধ্যে প্রত্যাহারও করে নিয়েছেন।

তবে মিজানের এই বক্তব্য নিশ্চিত হতে মরিয়ম আক্তার ইকোর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত কোনো অভিযোগ আমি তুলে নিইনি। আমাকে অপহরণপূর্বক তার সরকারি বাসায় আটকে রেখে বিয়ে করা, নির্যাতন চালানো, একের পর এক পরকীয়া প্রেমে জড়িয়ে পড়াসহ ক্ষমতার অপব্যবহার সংক্রান্ত সব অভিযোগই শতভাগ সত্য। এদিকে মিজানের এই বিষয়টি নিয়ে বিভাগীয় কোনো তদন্ত হচ্ছে কি না- জানতে চাইলে পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘পুলিশ সপ্তাহের পরে হয়তো এসব বিষয় নিয়ে কথা উঠতে পারে।’ আলোচিত সংবাদের বিশ্লেষক হিসেবে বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, অবিলম্বে অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। কেননা পুলিশ দিয়ে তদন্ত করলে ভিকটিম ন্যায়বিচার পাবে না। প্রকৃত সত্য বের হবে না। এ ছাড়া তিনি বলেন, ‘ভুক্তভোগী মরিয়ম আক্তার ইকো নিজেই মামলা করতে পারেন। চাইলে আমরাও তাকে আইনগত সহযোগিতা দেব।’

ডিআইজি মিজানের বিষয়ে তদন্ত চলছে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, ‘তুলে নিয়ে বিয়ে করার’ অভিযোগে আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মিজানুর রহমানের বিষয়ে পুলিশের অভ্যন্তরীণ তদন্ত চলছে। তার অপরাধ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গতকাল রাজধানীর নাখালপাড়া হোসেন আলী স্কুলে শীতবস্ত্র বিতরণ শেষে সাংবাদিকদের এ কথা জানান তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যত বড় কর্মকর্তাই হোন না কেন, কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। তিনি (ডিআইজি মিজান) যদি এমন গর্হিত কাজ করেন তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ডিআইজি মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে তুলে নিয়ে বিয়ে করে প্রতারণার অভিযোগ আনেন এক নারী। যদিও পুলিশের ওই কর্মকর্তা অভিযোগ নারীকে প্রতারক বলে দাবি করেছেন।

আরো খবর »