শিক্ষায় পদে পদে ঘুষ বাণিজ্য

Feature Image

দেশের শিক্ষা সেক্টরে পদে পদে ঘুষ বাণিজ্য সব দফতরের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। থানা শিক্ষা অফিস থেকে শুরু করে শিক্ষা অধিদফতর পর্যন্ত সব বিভাগ, শাখা ও ইউনিটেই ‘ঘুষ’ একচ্ছত্র প্রভাব নিয়ে আছে। স্কুলে ছাত্র ভর্তি, শিক্ষক নিয়োগ, বদলি, পদায়ন, শিক্ষকের এমপিওভুক্তি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনুমোদন, জাতীয়করণ এমনকি অবসরের পর পেনশনের টাকা তুলতেও ঘুষ চলছে অবাধে। বিভিন্ন খাতে ডিজিটালাইজেশনে দুর্নীতি কমলেও শিক্ষা খাতে তার ছোঁয়া লাগেনি। ঘুষ-দুর্নীতি নিশ্চিত করতে এমন সব কৌশল আবিষ্কার হয়েছে যা রীতিমতো বিস্ময়কর। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদফতরে কথা বলতে গেলেও ঘুষ লাগে বলে প্রচার আছে। সেখানে কোনো শিক্ষক, শিক্ষা কর্মকর্তা বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে তা আমলে নিতে হলেও চাহিদামাফিক টাকা খরচ করতে হয়। সেসব অভিযোগ তদন্ত করাতে যেমন টাকা লাগে, আবার তদন্ত টিমের কার্যক্রম থামিয়ে দিতেও ঘুষের প্রচলন রয়েছে। শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা রুটিন পরিদর্শনে গেলেও তাদের খুশি না করে উপায় থাকে না। শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তিতে মন্ত্রণালয় পর্যন্ত অন্তত ছয়টি ধাপে ২০ হাজার থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ লেনদেন হয়। আবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে জাতীয়করণে ঘুষ দিতে হয় কমবেশি ২০টি ধাপে। এ নিয়ে তহবিল সংগ্রহের তথ্যও আছে। ভুক্তভোগী শিক্ষকদের অভিযোগ, আগে তাদের এমপিও প্রতি ঘুষ দিতে হতো ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। এখন সেই ঘুষের পরিমাণ দুই থেকে তিনগুণ বেড়েছে। এ ছাড়াও নাম, বয়সসহ নানা বিষয় সংশোধন, টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড পেতে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস থেকে ফাইল পাঠাতে ঘুষ দিতে হয় ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা, জেলা শিক্ষা অফিসারকে দিতে হয় ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা। এসব ক্ষেত্রে মোট ঘুষ দিতে হয় ২৫/৩০ হাজার টাকা। ২০১৫ সালে সারা দেশের এমপিও নয়টি আঞ্চলিক অফিসে বিকেন্দ্রীকরণ করার পর শিক্ষক হয়রানি, ঘুষ লেনদেনের পরিমাণ বেড়েছে কয়েকগুণ। অভিযোগ উঠেছে, এমপিও দেওয়ার আগ মুহূর্তে প্রতিটি আঞ্চলিক কার্যালয়ে প্রায় দেড় কোটি টাকার ঘুষ লেনদেন হয়।

ঘুষ-দুর্নীতির মচ্ছব : ঘুষ ছাড়া শিক্ষা ভবনে কিছুই হয় না। নানা নামে ঘুষ নেন কর্মকর্তারা। রয়েছে বিভিন্ন অঙ্কের রেট। এমপিওভুক্তি, পদোন্নতি, টাইম স্কেল সব এখান থেকেই হয়। রাজধানীসহ বড় শহরগুলোর ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল কিংবা কিন্ডারগার্টেনের অনুমতি নিতে বিশাল অঙ্কের টাকা ঘুষ দিতে হয়। একই অবস্থা হাইস্কুল ও কলেজের ক্ষেত্রেও। এই ঘুষের পরিমাণ সর্বনিম্ন এক লাখ টাকা। কোনো কারণে প্রতিষ্ঠান বা নির্দিষ্ট শিক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে অনুদান বা বেতন বন্ধ হয়ে গেলে তা পুনরায় চালু করতে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়। পেনশনের কাগজপত্র প্রসেসিংয়ে ঘুষ দিতে হয় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের আগে পরিদর্শককে ঘুষ দিতে হয়। এর ফলে প্রতিষ্ঠানের পক্ষে রিপোর্ট দেওয়া হয়। এই ঘুষের পরিমাণ ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকা।

ঘুষ লেনদেন বাণিজ্য সফল করতে শিক্ষা ভবনেই গড়ে উঠেছে আলাদা সিন্ডিকেট। একজন সহকারী পরিচালকের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত আছে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী অ্যাসোসিয়েশনের দুই নেতা। অন্যদিকে তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী সমিতির জাঁদরেল এক নেতার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা আরেকটি সিন্ডিকেটের সঙ্গে সম্পৃক্ত আছে কয়েকজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা। সিন্ডিকেট সদস্যরা সবাই কোটি কোটি টাকার মালিক। মাঠ পর্যায়ের শিক্ষা কর্মকর্তাদের অনেকে অনিয়ম, দুর্নীতি এবং অনৈতিক সুবিধা আদায় করছে বেপরোয়াভাবে। শিক্ষক নিয়োগ, এমপিওভুক্তি, উপবৃত্তি, বই বিতরণ ও বিভিন্ন শিক্ষকের অনিয়ম তদন্ত সংক্রান্ত কাজের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তারা অনিয়ম করছে। তাদের অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়ছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরে। এ ছাড়া শিক্ষা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ, মানববন্ধন এমনকি বিক্ষুব্ধ শিক্ষকদের হাতে শিক্ষা কর্মকর্তা লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। মাউশির একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শিক্ষা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ এলেও সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। অধিদফতরের সিনিয়র কিছু কর্মকর্তার কারণে এসব অনিয়মের তদন্তও হয় না। অনুসন্ধানকালে বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির সভাপতি, রাজধানীর মিরপুরের একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক নজরুল ইসলাম রনি অভিযোগ করেন, ২০১৬ সালের মার্চে ওই পদে এমপিওভুক্তির জন্য তাকেও ঢাকা জেলা শিক্ষা অফিসারকে ১০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। ময়মনসিংহ অঞ্চলের আঞ্চলিক কার্যালয়ের পরিচালক অধ্যাপক মো. আ. মোতালেব তারই অঞ্চলের উপ-পরিচালক এ এস এম আবদুল খালেকের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ দিয়ে লিখিত অভিযোগ করেছেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা অঞ্চলের পরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউসুফকে দিয়ে এক সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে মাউশি। ঘুষ বাণিজ্যে অতিষ্ঠ হয়ে খুলনার আঞ্চলিক কার্যালয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন যশোর জেলার ২০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধান। ওই শিক্ষকরা বলেছেন, ঘাটে ঘাটে ঘুষ দিয়েই এমপিও পাওয়া যায়। উপজেলা, জেলা ও আঞ্চলিক কার্যালয় এই তিন জায়গায় ঘুষ না দিলে এমপিও পাওয়া যায় না।

চিঠিপত্রেও ঘুষ-হয়রানির ফাঁদ : প্রাথমিক শিক্ষক নেতারা বলছেন, মাঝে-মধ্যেই ভুল পরিপত্র ও অসঙ্গতিপূর্ণ নানা ধরনের সরকারি চিঠি জারি করা হয়। এরকম একাধিক পরিপত্রের পরিপ্রেক্ষিতে হাজার হাজার শিক্ষকের বেতন-পেনশন বন্ধ হয়ে আছে। চাকরি হারিয়ে জাতীয়করণকৃত বেসরকারি রেজিস্ট্রার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়ের হাজার হাজার শিক্ষক এখন ধরনা দিচ্ছেন জেলা-উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে। একই কারণে উন্নীত স্কেলে বেতন পাচ্ছেন না সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা। আর তিন ধাপে দেড় বছরের মধ্যে জাতীয়করণের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর স্পষ্ট নির্দেশ থাকলেও তা শেষ হচ্ছে না তিন অর্থবছরেও। এ নিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা রয়েছে।

সব স্তরে ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধ করতে না পেরে সহনীয় মাত্রায় ঘুষ নিতে শিক্ষামন্ত্রী যে আকুতি জানিয়েছেন তাতে শিক্ষা খাতে দুর্নীতির করুণ চিত্রই ফুটে উঠে। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ নানা বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে অনানুষ্ঠানিক একটি নোটও দেন। ওই নোটে তিনি নিজের মন্ত্রণালয়ের সীমাবদ্ধতা, ভুলত্রুটি, ব্যর্থতা স্বীকারের পাশাপাশি বিভিন্ন রকম দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের বিস্তারিত তথ্য জানতে চান। এ ছাড়া দুর্নীতি, অনিয়ম, শিক্ষক হয়রানির কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে যে কোনো স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ারও চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। জানা যায়, শিক্ষামন্ত্রীর এই নোটের পর নড়েচড়ে ওঠেন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা। শিক্ষা সেক্টরের এসব দুর্নীতি ও অনিয়ম রোধে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্টদের ৩৯টি সুপারিশ দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এসব সুপারিশে প্রশ্নপত্র ফাঁস, নোট বা গাইড বই বন্ধ, কোচিং বাণিজ্য রোধ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো নির্মাণ, এমপিওভুক্তি, নিয়োগ ও বদলিসহ বিভিন্ন দুর্নীতির উৎস এবং তা বন্ধের জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দুর্নীতি প্রতিরোধে গঠিত ‘শিক্ষা সংক্রান্ত প্রাতিষ্ঠানিক টিম’-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এসব সুপারিশ উল্লেখ করা হয়েছে।

সুত্র- বিডি প্রতিদিন

আরো খবর »