তন্দুর- দেবশ্রী চক্রবর্তী

Feature Image

 

হাইওয়ের ধরে জয় হিন্দ ধাবায় গান চলছে, “নান্না মুন্না রাহি হু “ ।স্বাধীনতা দিবসে সারা দিন ট্যুরিস্টের চাপ ছিল খুব । ট্যুরিস্টদের আকর্ষন করার জন্য বিশেষ বিশেষ দিনে সেজে ওঠে এই ধাবা । আজ চার দিকে জাতীয় পতাকার ছড়াছড়ি । রাত বারোটার পর ফাকা ধাবা চত্বরে দু একজন ট্রাক ড্রাইভার ছাড়া আর কেউ নেই । লঙ ড্রাইভ সেরে সর্দারজী এসে বসলেন বট গাছের নিচে পাতা খাটিয়ার ওপর । হাইওয়ের আলো এখানে এসে পড়ে না । জায়গাটা একটু অন্ধকার । অন্ধকারে সর্দারের দশাসই চেহারা একটা তরতাজা ষাঁড়ের মতন মনে হয় ।তন্দুরের গন্ধ ভেসে আসছে , সর্দার একটু আড়ামোড়া ভেঙ্গে হাতে তালি দিলো । ইঙ্গিত পেয়ে ধাবা থেকে একটি ছেলে গামছায় মুখ মুছতে মুছতে এগিয়ে গেলো সেই দিকে ।

চুন্নু ক্লান্ত চোখে তাকিয়ে আছে তন্দুরের দিকে । ধাবায় এখন আর কোন লোক নেই । একটা থালা তৈরি করা হচ্ছে , এটা পৌঁছে দিলেই তার ছুটি । ঘুমে সারা শরীর অবস হয়ে আসছে । ক্লান্ত দুটি চোখ মেলে সে তাকিয়ে আছে তন্দুরের দিকে । তন্দুরের কাছে আসলেই সে তার বিজির গায়ের গন্ধ পায় । রেডিওর গান শুনতে শুনতে একটা হাই তুলে সে তাকিয়ে দেখল জাতীয় পতাকার দিকে ।পাখার হাওয়ায় কাগজের পতাকা গুলো ঊড়ছে । তিনটি রঙ আর মাঝ খানে একটা চক্র । চুন্নু আঙ্গুল দিয়ে কিছু একটা লেখার চেষ্টা করল, কিন্তু আবঝা স্মৃতি হাতড়ে কিছুই সে খুজে পেল না । পতাকার রঙ দেখলে চুন্নুর বিজির ওড়না, দুধ আর সর্ষে শাকের কথা মনে হয় । তন্দুর থেকে রুটির হাল্কা গন্ধ আসছে, সে জিভ দিয়ে ঠোঁটটা চেটে তাকালো সেই দিকে । তন্দুরের লাল আলো এসে পড়ছে তার মুখে । মুখে হাল্কা রক্তের স্বাদ আসতেই চুন্নু হাতের আঙ্গুল দিয়ে ঠোঁটের মাঝখানটা চেপে ধরল । অনেকটা রক্ত বেরিয়ে এলো সেখান থেকে । সে নিজের কামিজে রক্তটা মুছে ফেলে তাকিয়ে দেখল ঘড়ির দিকে । সাড়ে বারোটা বাজে । থালার ওপর বাটি সাজানো হচ্ছে । তাতে গরম রুটি আর সর্ষে শাক । চুন্নু পেছন ফিরে দেখল গলায় গামছা দেওয়া ছেলেটার হাতে এক গ্লাস সাদা লস্যি । ছেলেটা লস্যির গ্লাসটা রেখে নিজের গামছা নিয়ে এগিয়ে এলো চুন্নুর দিকে । ছেলেটার মুখে হাসি ,চুন্নু পিছু হটতে গিয়ে চেয়ারে ধাক্কা খেয়ে দাড়িয়ে পড়ল ।

কোমড়ের নিচ থেকে একটা হাল্কা ব্যাথা তার ছোট্ট শরীরে বিদ্যুতের মতন খেলে গেলো । ছেলেটির জিভ তার কালো শুকনো ঠোঁটের মাঝখান দিয়ে বেরিয়ে এসেছে । জিভের কালো দাগের দিকে চেয়ে আছে চুন্নু । বাউজীর পোষা কুত্তা কালুর জিভে এরকম দাগ ছিল । কালুর কথা মনে পড়তেই চুন্নুর চোখে জল এলো । বাইরে থেকে একটা ট্রাকের আলো এসে পড়ল তার মুখে , চুন্নু চোখ বন্ধ করে দেখতে পেলো কত গুলো টর্চের আলো চিনাবের ধার দিয়ে এগিয়ে আসছে তাদের গ্রামের দিকে । কুকুরের ডাক আর শুকনো পাতার খড়খড় শব্দের ভেতর দিয়ে এগিয়ে আসছে কিছু মানুষ । বিজি বসে ছিল তন্দুর আগলে । তন্দুরের লাল আলো এসে পড়ছিল বিজির মুখে ।
রেডিওতে রাতের খবর শুনতে শুনতে বাউজি বলল, খাবার দিয়ে দাও, এত রাতে জেগে থাকা ঠিক না ।

পাশের শষ্যের ক্ষেত থেকে ঠান্ডা হাওয়া বয়ে যাচ্ছে উঠানের ওপর দিয়ে । চুন্নু খাটিয়ার বসে বাউজির পিঠ দাবাতে দাবাতে তাকিয়ে আছে তন্দুরের দিকে । তন্দুরের গন্ধে তার সারা শরীর অবশ হয়ে আসে । রাত দশটার খবর শেষ হলে কারেন্ট চলে গেলো । গ্রামে কারেন্ট চলে গেলে চারদিক কিরকম যেন থম থমে হয়ে যায় ।

বিজি বিড়বিড় করে বলল, চুন্নু, বেটা হেরিকেনটা নিয়ে আয় ।

চুন্নু খাটিয়া থেকে নেমে গিয়ে গেলো দোতলার সিঁড়ির দিকে । সে আস্তে আস্তে উঠে যাচ্ছে সিঁড়ি দিয়ে । কিছুটা ওঠার পর সে তাকিয়ে দেখল পাশের শস্যে ক্ষেতের দিকে । আজ অমাবস্যার রাত, অন্ধকারে শস্যে ক্ষেতের মাঝখান দিয়ে বুটের শব্দ ভেসে আসছে , তার সাথে কুকুরের ফোস ফোস শব্দ । বাউজির কুকুর কালু উঠানের মাঝখান থেকে ডেকে উঠতেই বাউজির খাটিয়ায় খট করে একটা শব্দ হল । অন্ধকারের মধ্যেও সব কিছু স্পষ্ট দেখতে পারছে সে । তন্দুরের আলোটা ঝপ করে নিভে গেলো, মাটিতে জল পড়লে যেমন গন্ধ বের হয় ঠিক সেরকম একটা গন্ধ নাকে এলো , সে দেখতে পেলো তন্দুর থেকে সাদা ধোয়া মিলিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারে । বিজির গলার আওয়াজ পেলো সে ।

বিজি বলল, লুকিয়ে পড় চুন্নু, ভুলেও নিচে আসিস না । চুন্নু শুনতে পাচ্ছে ক্ষেতের মধ্যে দিয়ে বুটের শব্দটা তাদে বাড়ির দিকে এগিয়ে আসছে । চুন্নু দোতলার মাটির কার্নিশের পেছনে লুকিয়ে থাকল । কালু বাড়ি থেকে বেরিয়ে ছুটে গেলো শষ্যে ক্ষেতের দিকে , চুন্নু কালুর দৌড়ের শব্দ শুনতে পারছে , কালু বীরের মতন এগিয়ে যাচ্ছে বুটের শব্দকে লক্ষ্য করে । তারপর পর পর তিনটে গুলির শব্দ । কালু ক্যাউ ক্যাউ করে গুঙিয়ে একেবারে চুপ করে গেলো । চুন্নু অন্ধকারে দেখতে পাচ্ছে কালুর রক্তাক্ত দেহ , সে জিভ বার করে পড়ে আছে রাস্তার ধারে চুন্নু বিজি আর বাউজিকে দেখতে পাচ্ছে না, শুধু শুনতে পাচ্ছে বুটের শব্দ , অন্ধকারে সব কিছু অতো পরিষ্কার দেখা যায় না । সে এবার ধিরে ধিরে উঠে দাঁড়িয়ে পিছু হটতে থাকল , পিছু হটতে হততে সে পৌঁছে গেলো ডানদিকের কার্নিশের দিকে , অন্ধকারে বাড়ির উঠানে বুটের শব্দ, চুন্নু তার ছোট্ট দুটো হাতে ভড় দিয়ে উঠে পড়ল কার্নিশের ওপর । টর্চের আলো এসে পড়ল চুন্নুর ওপর, বিজি চিৎকার করে বলল চুন্নু ভাগ । চুন্নুর মাথাটা কেমন যেন ঘুরে গেলো , চুন্নু পড়ে গেলো নিচের খড়ের গাদায় । বাড়ির ভেতর থেকে গুলির শব্দ ভেসে আসছে , চুন্নুর কানে শুধু বিজির আর্তনাদ, চুন্নু ভাগ, চুন্নু ভাগ । চুন্নু ক্ষেতের পাশ দিয়ে দৌড়তে দৌড়তে এসে উঠল হইওয়েতে ।

চুন্নু চোখ খুলে শুনতে পেলো রেডিওতে গান হচ্ছে “ আও বাচ্চো তুমহে শুনাউ যাকি হিন্দুস্থান কি “ । সে তাকিয়ে দেখল নোংরা গামছাওয়ালা ছেলেটা তখনো মেঝেতে বসে আছে, চুন্নুর দিকে তাকিয়ে সে বলছে চুন্নু, তুই লস্যি, সর্ষের শাক, রুটি খাবি ?

চুন্নুর সারা শরীর কেমন যেন হীম হয়ে গেলো । চুন্নু মাথা নাড়িয়ে বলল না, আমি খাবো না ।

ছেলেটা মুখে কিরকম চপ চপ করে শব্দ করছে । বেটা চুন্নু , যা বেটা থালিটা সর্দারজিকে দিয়ে আয় বেটা । তোকে কাল জিলিপি খাওয়াবো ।

চুন্নুর মুখের চেহারার পরিবর্তন হতে থাকল, ভয়ে সে গুটিয়ে যেতে থাকল নিজের মধ্যে । মাথা নাড়িয়ে সে জবাব দিয়ে চলল ।

এবার গামছাওয়ালা ছেলেটার মুখ থেকে হাসি গায়েব হয়ে গেলো , ও চুন্নুর হাতটা ধরে জ্বলন্ত তন্দুরে ঢুকিয়ে দেবার চেষ্টা করল । চুন্নু জানে তার না বলার শাস্তি কত ভয়ঙ্কর হতে পারে । চুন্নুর গলা থেকে কেঁপে কেঁপে দুটো শব্দ বেড়িয়ে এলো , থালা দাও ।

ছোট্ট চুন্নুর দু পায়ের মাঝখান দিয়ে পাজামার দড়ি ঝুলছে, চুন্নু দু হাতে থালা ধরে ধিরে ধিরে এগিয়ে যাচ্ছে বটগাছের নীচে । রেডিওতে গান হচ্ছে “ যাহা ডাল ডাল পে সোনে কি চিরিয়া করতি বসেরা “ । চুন্নু খোড়াতে খোড়াতে এগিয়ে চলেছে, তার কোমড়ের নীচে খুব যন্ত্রনা হচ্ছে । অন্ধকারে চুন্নু দেখতে পাচ্ছে লোকটা উঠে দাঁড়িয়ে তার লুঙ্গি গোটাচ্ছে । চুন্নু খাটিয়ার পাশের টেবিলে থালাটা রেখে দু আঙ্গুলে ঠোটের মাঝকান টা টিপে দাড়াল । চুন্নুর ঠোট দিয়ে রক্ত গড়িয়ে তার গলা দিয়ে নেমে আসছে । রক্তের স্বাদ তার বড় প্রিয়, তাই জিভ দিয়ে কাটা জায়গাটা চুষছে । রাস্তা দিয়ে বড় বড় ট্রাক যাচ্ছে তাদের আলো এই দিকটায় আসছে না । ধাবার কারেন্টটা হঠাৎ চলে গেলো । চুন্নুকে আর দেখা যাচ্ছে না , অন্ধকার থেকে খাটিয়ার খটখট একঠা শব্দ ভেসে এসে হাইওয়েতে মিলিয়ে যাচ্ছে ।

আরো খবর »