রায় অনুযায়ী কেনো খালেদা সাজা দেয়া হলো

Feature Image

সরকারি এতিম তহবিলের টাকা এতিমদের জন্য ব্যয় করা উচিত ছিল, কিন্তু খালেদা জিয়া তার ব্যত্যয় ঘটিয়ে অর্থনৈতিক অপরাধ করেছেন। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায়ে আদালত এই মন্তব্য করেছেন।

গত ৮ ফেব্রুয়ারি এই মামলায় খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং তাঁর ছেলে তারেক রহমানসহ পাঁচজনকে দশ বছর করে কারাদণ্ড দিয়ে রায় ঘোষণা করেন ঢাকার বিশেষ জজ-৫-এর বিচারক। গতকাল সোমবার এই রায়ের সার্টিফায়েড কপি (জাবেদা নকল) পেয়েছে আসামিপক্ষ ও রাষ্ট্রপক্ষ।

পূর্ণাঙ্গ রায়ে বিচারক ড. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, মামলার নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, সৌদি কমার্শিয়াল ব্যাংক থেকে প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলে ১২ লাখ ৫৫ হাজার মার্কিন ডলার আসে। ওই ডলারের ডিমান্ড ড্রাফ্্ট (ডিডি) নিজ দখলে নেন খালেদা জিয়া। আর ওই ডিডি নিজ দখলে নেওয়ার মাধ্যমে খালেদা জিয়ার দায় চলে আসে। ওই টাকা পরে একটি ব্যাংক হিসাবে জমা রাখা হয়। পরে তা জমা রাখা হয় স্থায়ী আমানত (এফডিআর) হিসেবে। এরপর ওই টাকা দুই ভাগ করে তাঁর সচিব ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকীর মাধ্যমে বেসরকারি দুটি ট্রাস্টের অনুকূলে দুই কোটি ৩৩ লাখ ৩৩ হাজার ৫০০ টাকা করে ভাগ করে স্থানান্তর করেন। তখনই তিনি সম্পত্তি আত্মসাতের অপরাধে জড়িত হয়ে পড়েন বলে আদালত মনে করেন।

বিচারক রায়ে বলেন, সরকারি এতিম তহবিলের টাকা দেশে প্রতিষ্ঠিত সরকারি এতিমখানায় কিংবা সরকারি অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত এতিমখানায় অবস্থান করা এতিমদের জন্য খরচ করা উচিত ছিল। কিন্তু আসামি খালেদা জিয়া তা করতে ব্যর্থ হন।

আদালত রায়ে বলেন, আসামি খালেদা জিয়া এ দেশের তখনকার প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় তিনি স্বীকৃত মতেই সরকারি কর্মচারী হিসেবে গণ্য হবেন। তাই দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারা (সরকারি সম্পত্তি আত্মসাৎ) এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারার (ক্ষমতার অপব্যবহার) আলোকে সাজা দেওয়ার ক্ষেত্রে যেসব উপাদান থাকা প্রয়োজন তার সবই বিদ্যমান।

আদালত আরো বলেন, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট একটি নামসর্বস্ব ট্রাস্ট। ওই নামে আজ পর্যন্ত কোনো এতিমখানার অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। সেখানে কোনো এতিম বসবাসও করে না। এতিমখানায় কোনো দালানকোঠা বা স্থাপনাও নেই। খালেদা জিয়ার বাসস্থান ৬, শহীদ মইনুল রোড, ঢাকা সেনানিবাস (খালেদা জিয়ার তৎকালীন বাড়ি) কিংবা বগুড়া জেলার গাবতলী উপজেলার দারাইল মৌজায় জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট নামে কোনো ট্রাস্টের উপস্থিতি লক্ষ করা যায় না।

আদালত রায়ে বলেন, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের নামে ১৭টি দলিলে ১৯৯৩ সালের ৪ ডিসেম্বর কেনা দুই একর ৭৯ শতাংশ জমি আজ পর্যন্ত ধানি জমি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। কাজেই আইনের চোখে খালেদা জিয়া কোনো অপরাধ করেননি মর্মে তাঁর পক্ষে যে যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে তা গ্রহণ করার মতো কোনো কারণ পরিলক্ষিত হয় না।

মামলায় খালেদা জিয়াসহ আসামিদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টে সঞ্চিত অর্থ বেড়ে বর্তমানে ছয় কোটি টাকার ঊর্ধ্বে হয়েছে। টাকা খরচ করা হয়নি এবং আসামিরা কোনো সম্পত্তি আত্মসাৎ করেননি। এ প্রসঙ্গে আদালত রায়ে বলেন, ওই যুক্তি আইনের মাফকাঠিতে চলে না। কেননা এটা প্রতিষ্ঠিত আইন যে সরকারি অর্থ অনির্ধারিত সময় ধরে খরচ না করে আটকে রাখা সরকারি সম্পত্তি আত্মসাৎ করাই বোঝায় এবং দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারায় তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আদালত বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলের টাকা বেআইনিভাবে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের তহবিলে স্থানান্তর করা হয়েছে।

আদালত রায়ে বলেন, বিদেশ থেকে প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলে টাকা আসার পর প্রাথমিকভাবে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও তাঁর সচিব ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে দুই ভাগে ভাগ করে দুটি ট্রাস্টের অনুকূলে স্থানান্তর করেন। এর মধ্যে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট অন্যতম। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টে ১৯৯৩ সালের ১৩ নভেম্বর দুই কোটি ৩৩ লাখ ৩৩ হাজার ৫০০ টাকা স্থানান্তর করা হয়। এরপর তারেক রহমান ও মমিনুর রহমান (জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে) ট্রাস্টের হিসাব থেকে টাকা তুলে প্রথমে দুই লাখ ৭৭ হাজার টাকায় দুই একর ৭৯ শতাংশ জমি ক্রয় করেন। পরে বাকি টাকা প্রাইম ব্যাংক লিমিটেড, গুলশান শাখায় স্থানান্তর করেন। পরে আসামি কাজী সালিমুল হক কামাল ও গিয়াস উদ্দিনের হাত হয়ে আসামি শরফুদ্দীন আহমেদের হাতে দুই কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা ৮০ পয়সা চলে যায়। ওই টাকাই আত্মসাৎ করা হয়।

রায়ে বলা হয়, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে নিজেরা প্রত্যেকে লাভবান হওয়ার জন্য সরকারি এতিম তহবিলের টাকা আত্মসাৎ করেছেন। পরিমাণের দিক থেকে আত্মসাত্কৃত টাকার বাজারমূল্য অধিক না হলেও ওই সময় টাকার মূল্যমান অনেক ছিল। খালেদা জিয়া তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী, সালিমুল হক কামাল সংসদ সদস্য, ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। তাঁরা সবাই তারেক রহমান ও মমিনুর রহমান এই দুই অপরাধীকে সহায়তা করেছেন। আসামি শরফুদ্দীন একজন ব্যবসায়ী। প্রত্যেকেই টাকা আত্মসাৎ করার জন্য কৌশল অবলম্বন করেছেন। প্রত্যেকে লাভবান হয়েছেন। এ কারণে আদালত মনে করেন, ছয়জনই রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক অপরাধী হিসেবে গণ্য হবেন। আদালত আরো মনে করেন, অর্থনৈতিক দুর্নীতি রাষ্ট্রের অর্থনীতির স্বাভাবিক গতি ব্যাহত করে এবং এর কুপ্রভাব সমাজের প্রতিটি স্তরে সংক্রমিত হয়।

রায়ে বলা হয়, অর্থনৈতিক অপরাধ করার কারণে আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা প্রয়োজন। এই অপরাধের সর্বোচ্চ সাজা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। কিন্তু আসামিদের বয়স ও সামাজিক অবস্থা এবং আত্মসাত্কৃত টাকার পরিমাণ বিবেচনায় নিয়ে তাঁদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা সমীচীন হবে না বলে আদালত মনে করেন। তাই তারেক রহমানসহ পাঁচজনকে ১০ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেন আদালত। খালেদা জিয়া সম্পর্কে আদালত বলেন, তিনি এ দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন। এ ছাড়া তিনি একটি রাজনৈতিক দলের কর্ণধার। তিনি একজন বয়স্ক মহিলা। ফলে তাঁর স্বাস্থ্যগত অবস্থা, বয়স ও সামাজিক পরিচয় বিবেচনা করে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন আদালত।

রায়ে আরো বলা হয়, আসামিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এই ধারায় শাস্তি দেওয়ার জন্য তিনটি উপাদানের উপস্থিতি থাকতে হয়। এই তিনটির একটি হচ্ছে সরকারি কর্মচারী হতে হবে। অপর দুটি হচ্ছে সম্পত্তির হেফাজতকারী হতে হবে এবং অপরাধজনক বিশ্বাসভঙ্গ প্রমাণ করতে হবে। এই তিনটি উপাদানই আসামিদের বিরুদ্ধে রয়েছে। এ প্রসঙ্গে রায়ে বলা হয়, খালেদা জিয়া সংসদ সদস্য ছিলেন। আইন অনুযায়ী তিনি সরকারি কর্মচারী। ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী সরকারি কর্মচারী। সালিমুল হক কামাল সংসদ সদস্য ছিলেন। তিনিও সরকারি কর্মচারী। তারেক রহমান ও মমিনুর রহমান জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের ট্রাস্টি ছিলেন। সুপ্রিম কোর্টের একটি মামলার নজির উল্লেখ করে আদালত বলেন, কোনো ট্রাস্টের ট্রাস্টি সরকারি কর্মচারী হিসেবে গণ্য হবেন। শুধু আসামি শরফুদ্দীন আহমেদ ব্যবসায়ী। তিনি ছাড়া খালেদা জিয়াসহ পাঁচজনই সরকারি কর্মচারী। তাই দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় তাঁদের শাস্তি দিতে আইনগত বাধা নেই। শাস্তি দেওয়ার সব উপাদানই এই মামলায় রয়েছে। আসামিরা একে অপরকে সুবিধা দেওয়ার লক্ষ্যে দুর্নীতি তথা অবৈধভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করে তাঁদের হেফাজতে থাকা সরকারি অর্থ এক হিসাব থেকে অন্য হিসাবে স্থানান্তর করেছেন। সর্বশেষ আসামি শরফুদ্দীন আহমেদের ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে টাকা উত্তোলন করে আসামিরা পরস্পর লাভবান হয়েছেন। কাজেই দণ্ডবিধির অপরাধের সঙ্গে দুর্নীতিও তাঁরা করেছেন। তবে জেনারেল ক্লজেস অ্যাক্টের ২৬ ধারা অনুযায়ী খালেদা জিয়াসহ পাঁচ আসামিকে যেকোনো একটি ধারায় দণ্ড দেওয়া সমীচীন হবে। হাইকোর্ট বিভাগের একটি মামলার নজির উল্লেখ করে আদালত বলেন, ৪০৯ ধারায় শাস্তি দেওয়া হলে দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় শাস্তি দেওয়ার প্রয়োজন নেই।

আপিল আজ, থাকবে জামিনের আবেদনও

এর আগে খালেদা জিয়ার আইনজীবী অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া জানান, আপিল করার পূর্ণ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আজ মঙ্গলবার হাইকোর্টে আপিল দায়ের করা হবে। তিনি আরো জানান, আপিলের সঙ্গে খালেদা জিয়ার জামিনের আবেদনও থাকবে। খালেদা জিয়ার আরেক আইনজীবী মাসুদ আহমেদ তালুকদার বলেন, ‘আমরা আশা করছি মঙ্গলবার আপিল করব। সঙ্গে জামিনের আবেদনও করব। তবে কবে শুনানি হবে তা নির্ভর করবে আদালতের ওপর।’

এদিকে রাষ্ট্রপক্ষকেও গতকাল রায়ের জাবেদা নকল দেওয়া হয়েছে। খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা নকল সরবরাহ নেওয়ার পর দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল, মীর আবদুস সালাম, মাহমুদ হোসেন জাহাঙ্গীর, রেজাউল করিম প্রমুখ রাষ্ট্রপক্ষে নকল গ্রহণ করেন। মোশাররফ হোসেন কাজল পরে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা রায়ের সত্যায়িত নকল পেয়েছি। এটা দুর্নীতি দমন কমিশনে পাঠানো হবে। কমিশন রায় পর্যালোচনা করবে। পরে সিদ্ধান্ত নেবে সাজা বাড়ানোর জন্য আপিল করা হবে কি না।’ তিনি আরো বলেন, জামিনের আবেদন করা হলে দুদকের আইনজীবীদের শুনানির সুযোগ দেওয়া হবে। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আপিল আদালত জামিনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন।

গতকাল বিকেলেও বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা আদালতে ভিড় করেন। পরে তাঁরা রায়ের কপি নিয়ে হাইকোর্টের উদ্দেশে চলে যান।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয় গত ৮ ফেব্রুয়ারি। এ ছাড়া তারেক রহমানসহ অন্য পাঁচ আসামিকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। সবাইকে সমান অঙ্কের জরিমানাও করা হয়।

রায়ের পর খালেদা জিয়াকে রাখা হয়েছে পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দীন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে।

আরো খবর »