যানজট খেয়ে ফেলে বছরে ৯৮ হাজার কোটি টাকা

Feature Image

রাজধানীর মিরপুর-১১ থেকে গুলিস্তান পর্যন্ত পথের দূরত্ব ১৮ কিলোমিটার। এই পথে বাস থামার নির্ধারিত স্থান রয়েছে ১৮টি। সকাল ৭টা থেকে ১০টার মধ্যে মিরপুর থেকে রওনা হয়ে গুলিস্তানে পৌঁছতে গড়ে প্রতিটি বাসের লাগে আড়াই ঘণ্টা। এর বড় একটা অংশই ব্যয় হয় ট্রাফিক সিগন্যালগুলোতে।

মিরপুর-১২ থেকে আসাদগেট হয়ে গুলিস্তান চলাচলকারী বাসচালক বাবুল মিয়া বলেন, দিনে ১০টি সিগন্যালেই ঘণ্টার বেশি সময় পার হয়ে যায়। উত্তরা থেকে ফার্মগেট পথে ফ্লাইওভার আছে তিনটি। এর মধ্যে মহাখালী ফ্লাইওভার ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনের সড়ক পার হতেই ঘণ্টা পার হয়ে যায় বলে জানান নিয়মিত চলাচলকারী যাত্রী আশিকুর রহমান।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, যানজটে রাজধানীতে দিনে গড়ে ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। মহানগরীর ৭৩টি মোড়ে আটকে যাচ্ছে গাড়ি ও মানুষের গতি। বিভিন্ন সংস্থার গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানীতে যানজটে বছরে আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে ৯৮ হাজার কোটি টাকা। জ্বালানি পুড়ছে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকার। ভারতের বেঙ্গালুরুতে যেখানে ঘণ্টায় বাসের গতি ১২ কিলোমিটার, সেখানে ঢাকায় তা ৯ কিলোমিটারের নিচে, লন্ডনে তা ১৮ কিলোমিটার।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, ছুটির দিনে ও রাতে তীব্র যানজট হচ্ছে মিরপুর, তালতলা, বিজয় সরণি, বাংলামোটর, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে, ধানমণ্ডি ২৭ নম্বর, আসাদগেট, সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী, সোনারগাঁও মোড়, ফার্মগেট, মহাখালী লেভেলক্রসিং, মহাখালী ফ্লাইওভার, মগবাজার, মৌচাক, গাবতলী ও প্রগতি সরণিতে। আবার চালকরা অব্যাহত হর্ন বাজানোর কারণে এসব স্থানে শব্দদূষণের মাত্রাও ব্যাপক, ১০০ ডেসিবেলের বেশি। তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, মিরপুর, কাকরাইল, গুলিস্তান, মতিঝিল, সদরঘাট, শাহবাগে শব্দের মাত্রা ৮০ থেকে ১০০ ডেসিবেল। নগরীতে শব্দদূষণের মাত্রা সবচেয়ে কম বারিধারায়, এর পরও তা গ্রহণযোগ্য মাত্রার দ্বিগুণ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, নিয়ন্ত্রণহীন ছোট গাড়ি, উপযোগী অবকাঠামো না থাকা, পর্যাপ্ত বাস ও ট্রাক টার্মিনালের অভাব, যেখানে সেখানে ব্যক্তিগত গাড়ি রেখে সড়কের জায়গা দখল, নির্দিষ্ট স্থান ছাড়াও বাস থামানো, ট্রাফিক আইন না মানায় যানজটের এমন ভয়াবহতা। যানজট কমাতে নেওয়া মেগা প্রকল্পগুলোর জন্য ব্যবস্থাপনা জোরালো না থাকায় নগরীর গতি থেমে থাকে স্থানে স্থানে।

যানজটে সময় অপচয়, কাজের গতি ও উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, যানবাহনের অতিরিক্ত পরিচালন ব্যয়, দুর্ঘটনার ক্ষতি নিরূপণে ইকোনমেট্রিক মডেল অনুসারে বাংলাদেশ বিনিয়োগ বোর্ড (বিওআই) জরিপ চালিয়ে বের করেছে, কর্মদিবসে অফিস চলাকালে ঢাকায় ঘণ্টায় চার-পাঁচ কিলোমিটার পথ চলাচল করা সম্ভব। ভারতের বেঙ্গালুরুতে গাড়ির গতি ঘণ্টায় ১২ কিলোমিটার। বিওআইয়ের হিসাবে রাজধানীতে যানজটে বছরে আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে ৯৮ হাজার কোটি টাকা।

ঢাকা যানবাহন সমন্বয় বোর্ড ডিটিসিএর হিসাবে যানজটের কারণে গাড়ি পরিচালনায় অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে বছরে ছয় হাজার ৯০ কোটি টাকা। যানজটে নষ্ট হওয়া কর্মঘণ্টায় আর্থিক ক্ষতি ৮১ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা। মোট ক্ষতি ৮৭ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) নগর পরিস্থিতি বিষয়ক গবেষণায় জানা গেছে—বিমানবন্দর থেকে পোস্তগোলা (ভায়া গুলশান, মহাখালী ও গুলিস্তান) রুটে অপেক্ষাকৃত কম ব্যস্ত সময়ে গাড়ির গতিসীমা থাকে ২২ কিলোমিটার। ব্যস্ত সময়ে তা নেমে আসে ৯ কিলোমিটারে। ধীরগতির কারণে এই পথে মাসে আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে ২২৭ কোটি টাকা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউট (আইবিএ) ও নর্দান ইউনিভার্সিটির যৌথ সমীক্ষায় বের হয়েছে, যাতায়াতকারী প্রতিটি মানুষের দুই ঘণ্টা ৩৫ মিনিটের মধ্যে গড়ে এক ঘণ্টা ৩০ মিনিটই যানজটে নষ্ট হচ্ছে। জরিপের তথ্য বলছে, ব্যক্তিগত গাড়ি যানজটে আটকে থাকে গড়ে দেড় ঘণ্টা করে। বাস-মিনিবাস আটকে থাকে সাড়ে তিন ঘণ্টা, অটোরিকশা ও ক্যাব আড়াই ঘণ্টা করে। এতে শুধু জ্বালানি অপচয় হয় ১১ হাজার ৮৪৪ কোটি টাকার। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ-বিআরটিএ সূত্রে জানা গেছে, ঢাকায় সাত বছরে গাড়ি দ্বিগুণ হয়েছে। এর বিপরীতে সড়ক বেড়েছে মাত্র ২৯ কিলোমিটার। গাড়ির তুলনায় সড়ক তেমনটা না বাড়ায় জট তৈরি হচ্ছে স্থানে স্থানে। তার ওপর বিভিন্ন প্রকল্পের কাজের জন্য বিদ্যমান সড়কের অর্ধেক পথ বন্ধ হওয়ায় যানবাহন চলাচলে আরো অচল অবস্থা দেখা দিয়েছে।

আরো খবর »