এ যুগের রাজপ্রাসাদ

Feature Image

বিলাসবহুল বাড়ি বলতে বোঝায়, যেখানে বিলাসিতার কোনো কমতি নেই। প্রতিদিনের জীবনযাপনে যা কিছু দরকার তার সবই পাওয়া যাবে সেই বাড়িতে। এমন বাড়ি কি আর যেনতেন মানুষের হয়? একমাত্র রাজপ্রাসাদগুলোতেই হয়তো এই বিলাসিতার সুযোগ মিলবে। কিন্তু এখন তো রাজার আমল নেই, তাহলে কি জগত্ থেকে রাজপ্রাসাদও বিলীন হয়ে গেছে? উত্তর হলো ‘না’। এ যুগে সেসব প্রাসাদে যোগ হয়েছে আধুনিক সব বিলাসিতা। দামের দিক দিয়েও সবচেয়ে এগিয়ে। দেখে নেওয়া যাক আজকের যুগের রাজপ্রাসাদগুলো।

বাকিংহাম প্যালেস, যুক্তরাজ্য

১৭০২ সালে নির্মিত বাকিংহাম প্যালেস ছিল রানী শার্লটের বাসভবন। প্রাসাদটি এ পর্যন্ত বহুবার সংস্কার করা হয়েছে। কিন্তু কখনোই এর মূল স্থাপত্যের জাঁকজমক একটুও ক্ষুণ্ন হয়নি। বর্তমানের বাকিংহাম প্রাসাদ এডেনবার্গের রানী এবং ডিউকের বাসভবন। শুধু তাই নয়, এই প্রাসাদ ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের প্রশাসনিক সদর দফতর। রানী এই স্থানে তার অতিথিদের আপ্যায়ন ও সাক্ষাত্ করেন। বাকিংহাম প্যালেসে ৪৫ মিনিটের চেঞ্জিং গার্ড অনুষ্ঠান দেখতে প্রতি বছর বহু স্থানীয় এবং বাইরের পর্যটকের আগমন ঘটে। প্যালেসটি লন্ডনের সেন্ট জেমস পার্ক, গ্রিন পার্ক এবং হাইড পার্কের মধ্যে অবস্থিত। এই প্রাসাদে রয়েছে মোট ৭৭৫টি কক্ষ। সে যুগেই বাড়িটির নির্মাণ ব্যয় ছিল ১.৫৫ বিলিয়ন ডলার। বর্তমানে লন্ডনের বাকিংহাম প্যালেসটি বিশ্বের অত্যন্ত সমৃদ্ধ চিত্র ও শিল্পকলা সংগ্রহের অধিকারী। প্রাসাদের পশ্চিমে রয়েছে অত্যন্ত পরিদর্শনযোগ্য সুবিশাল রাষ্ট্রীয় ভোজনশালা। এখানে বহু বিশিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে রানী ভোজন করেছেন। প্রাসাদটিতে রয়েছে সংগীত কক্ষ, রাজকীয় আড়ম্বরপূর্ণ বৈঠকখানা এবং বিস্ময়কর বো কক্ষ বা লাইব্রেরি। সেখানে রাজকীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠান যেমন—রাষ্ট্র দর্শন ও অভিষেক অনুষ্ঠিত হয়। প্রতি বছর ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ বিভিন্ন ভোজসভায় অতিথি হিসেবে যোগদান করেন। দর্শনার্থীদের জন্য সকাল সাড়ে ৯টা থেকে বিকাল সাড়ে ৬টা পর্যন্ত খোলাও থাকে প্যালেসটি ।

আন্তিলিয়া, ভারত

ভারতের শীর্ষ ধনকুবের রিলায়েন্স শিল্পগোষ্ঠীর কর্ণধার মুকেশ আম্বানি অ্যান্তালিয়া নামের বাড়ির মালিক। আটলান্টিক মহাসাগরের একটি মনোরম দ্বীপের নামানুসারে বাড়িটির নাম রাখা হয়েছে। ২৭তলা বাড়িটির নির্মাণ ব্যয় এক বিলিয়ন ডলার। অত্যাধুনিক এই বাড়িটি ৪০ হাজার স্কয়ার ফুটের। বাড়িতে থাকা ছয়তলা পার্কিংয়ে আম্বানির ১৬৮টি গাড়ি থাকে। নয়টি এলিভেটর ও প্রতি তলায় ব্যক্তিগত জিমনেশিয়াম আছে। বাড়িটি দেখভালের জন্য রয়েছে ৬০০ চাকর। স্ত্রী নীতা আম্বানির জন্যই মুকেশ এই বাড়ি বানান। কী নেই প্রিয়জনের জন্য বানানো এই বাড়িতে? হেলিপ্যাড, সুবিশাল পাঠাগার, বিরাট খাবার ঘর, দুর্লভ মার্বেল পাথরের মেঝে, স্নো-রুম, হলঘর, স্পা, থিয়েটার, অতিথির জন্য বিলাসবহুল কামরা এবং বেশ কয়েকটি উঁচু বাগান রয়েছে। বাড়ির কিছু তলা স্বাভাবিক উচ্চতার চেয়ে দুই বা তিনগুণ বেশি। যে কারণে পুরো বাড়ির উচ্চতা ৪০তলা উঁচু ভবনের সমান।

জানাডু ২.০, যুক্তরাষ্ট্র

বিশ্বের সেরা ধনী বিল গেটসের বাড়ি ‘জানাডু ২.০’। ৬৩ মিলিয়ন ডলার খরচ করে সাত বছরে বাড়িটি বানানো হয়। যুক্তরাষ্ট্রের লেক ওয়াশিংটনের কোলঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা জানাডু সিরিজের এই বাড়ি দেখতে সাদামাটা। ৬৬ হাজার স্কয়ার ফিটের জানাডুতে রয়েছে আলট্রা ইলেক্ট্রনিক্স এবং কম্পিউটার সিস্টেমের ব্যবহার। জানাডুর বাড়ি দ্বিতলের বেশি হয় না। ব্যবহার করা হয়েছে প্রায় ৫০০ বছরের পুরনো ডগলাস ফির নামক কাঠ। ঘরের ছাদে দেওয়া হয়েছে বিশেষ ধরনের স্টিলের সিট। ৩৯০০ স্কয়ার ফিটের সুইমিং পুলে আন্ডার সাউন্ড সিস্টেম রয়েছে। এ ছাড়া ২৫০০ স্কয়ার ফিটের জিমে আছে স্টিম রুল, পুরুষ-নারীর আলাদা লকার এবং একটি ট্রাম্পোলিন রুম। বিশাল একটি লাইব্রেরিও আছে, যাতে থরে থরে সাজানো রয়েছে বই। সেখানে স্থান পেয়েছে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির ব্যবহূত ১৬ শতকের একটি নোটবুক। এটি সংগ্রহ করতে ৩০ মিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে। পুরো বাড়িতে বেডরুম ২২টি আর বাথরুম আছে ২৪টি। প্রতিটি রুমে রয়েছে টাচ সেনসেটিভ লাইটিং, মিউজিক এবং ক্লাইমেট চেঞ্জিং সুইচবোর্ড। আগত অতিথিরা একটি ইলেক্ট্রনিক পিন পরিধান করেন, যার মাধ্যমে শরীরের তাপমাত্রা বুঝে এসি অটো টেম্পারেচার দেয়। দেয়ালের সঙ্গে দরজাগুলো এমনভাবে সেট করা, হঠাত্ দেখলে তা খুঁজে পাওয়াও দুস্কর।

ট্যুর ওডেওন, মোনাকো

ট্যুর ওডেওন নামের ভবনটি বর্তমানে বিশ্বের সব থেকে দামি বাড়ি হিসেবে ধরা হয়। মাত্র ৩৮ হাজার জনসংখ্যার ক্ষুদ্র এই দেশে এত দামি বাড়ির গল্প শুনে অনেকেরই চোখ ছানাবড়া হওয়ার কথা। এই বাড়ির বর্তমান বাজারমূল্য ২.৯৩৪ বিলিয়ন ডলার। ১৭০ মিটার উঁচু এই ভবনটি নির্মিত পাহাড়ের কোলঘেঁষে সমুদ্র উপমুখে। আশ্চর্যজনক এই ভবনটির মতো লাক্সারিয়াস ভবন আগামী পাঁচ বছরেও বিশ্ববাসীর দেখার সম্ভাবনা নেই।

পুরো ভবন ৫০তলায় বিভক্ত। এখানে ২৫৯টি আবাসিক, ৭৩টি প্রাইভেট অফিসের স্পেস রয়েছে।

১২০০ বর্গমিটারের দুটি চারকোনা জায়গাজুড়ে এই ভবনের ভিত্তি গড়ে তোলা হয়েছে। বিশাল পার্কিং স্পেস রয়েছে যেখানে একসঙ্গে ৫৪৩টি গাড়ি রাখা যায় খুব সহজে। খুচরো পণ্য বিক্রির দোকান, অফিস এবং ব্যবসা কেন্দ্র রয়েছে এই ভবনে। স্পা, ব্যায়ামাগার, একটি ফিটনেস সেন্টার ও একটি সুইমিং পুলও রয়েছে এখানে। ভবনের লবিতে ফ্রান্সের শিল্পী মাটেও মরনারের প্রতিমূর্তি স্থাপিত। ট্যুর ওডেওন প্রকল্প শুরু হওয়ার পর আকাশচুম্বী এই ভবন নিয়ে আলোচনা কম হয়নি। বিশেষ করে বিসাউলিলের আশপাশের ফরাসি শহর বাসিন্দারা ভবনটির ভিউ নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা চালিয়েছে। ভবনটি নির্মাণ শেষে অনেকে তার নাম দেন ওডিজি টাওয়ার।

এলিসন এস্টেট, ক্যালিফোর্নিয়া

ক্যালিফোর্নিয়ার উডসাইটে এই ভবনের অবস্থান। ওরাকল ও ফোর্বসের কো-প্রতিষ্ঠাতা ল্যারি এলিসন ক্রয়সূত্রে এই ভবনের মালিক। তিনি ২০১৩ সালে বিশ্বের তৃতীয় ধনী ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি পান। তাই তার পক্ষে বাড়িটির মালিকানা নিজের করে নেওয়াটা ব্যাপার ছিল না। এলিসন এস্টেটের মূল নকশা করা হয়েছে ১৬ শতকের জাপানি রাজপ্রাসাদের স্থাপত্যশৈলীর সঙ্গে মিল রেখে। এই ভবনের একটি বিশেষ অংশ কিয়োটো গার্ডেন ভিলা, জাপান। ৮৫ মিলিয়ন ডলার মূল্যের ভিলাটি জাপানের অধিগ্রহণে থাকায় তা আলাদাভাবে পরিশোধ করতে হয়েছে কিনা জানা নেই। পুরো ভবনটির মূল্য ২০০ মিলিয়ন ডলার। ২০০৪ সালে এখানে ২৩ একর জায়গার ওপর ১০টি ভবন নির্মাণ করা হয়। তারপর একটি লেক, পুকুর, টি-হাউস এবং গোসল ঘর দিয়ে সাজানো হয়। এমনকি ১৯ বড় গলফ কোর্স এই বাড়ির অন্তর্গত।

ফেয়ার ফিল্ড, নিউ ইয়র্ক

যুক্তরাষ্ট্রের এই বাড়িটির মূল্য প্রায় ২৪৮ মিলিয়ন ডলার। বাড়িটি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে আয়তনের জন্য। প্রায় ৬৩ একর এলাকাজুড়ে আমেরিকার সবচেয়ে বড় রেসিডেন্সিয়াল কম্পাউন্ডে বাড়িটি তৈরি করা হয়। ২৯টি বেডরুম, ৩৯টি বাথরুম, নিজস্ব পাওয়ার প্লান্ট, ১৬৪ সিটের হোম থিয়েটার, ৩টি টেনিস কোর্ট, বাস্কেটবল কোর্ট, বৌলিং এলি, ৯১ ফুট লম্বা ডাইনিং রুমের বাড়িটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এই বাড়ির মালিক বিলিওনিয়ার ইরা রেনার্ট। ইরা রেনার্টের বিশাল আলিশান বাড়ি হিসেবে অনেকেই চেনে এটিকে। ১৯৯৯ সালে তিনি এই ভবনের নির্মাণ কাজ শুরু করেন। আশপাশের প্রতিবেশীদের দ্বারা বিব্রত হলেও ২০০৪ সাল পর্যন্ত তিনি এই বাড়িতেই পরিবারসহ বসবাস করেন। প্রতিবেশীদের দাবি ছিল এত আয়তনে নির্মিত মাত্র একটি বাড়ি অন্যদের হীনম্মন্যতার কারণ হবে।

পালাজ্জো ডি আমুর ক্যালিফোর্নিয়া

ক্যালিফোর্নিয়াতে রিয়েল এস্টেট ব্যবসার মুঘল জেফ গ্রিন বেভারলি হিলে ১৯৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করে ২৫ একর জমি নির্ধারণ করেন। সেখানে একটি অভাবনীয় প্রজেক্ট দাঁড় করিয়ে ফেলেন। এটি তখন দেশটির জন্য সবচেয়ে বেশি ব্যয়বহুল কোনো প্রজেক্ট হিসেবে পরিগণিত হয়। পালাজ্জো ডি আমুরের ভবন নির্মাণ ভূমধ্য শৈলীতে। যার চূড়ান্ত স্থান ৫৩ হাজার বর্গফুট। এর ১৫ হাজার বর্গফুট জুড়ে রয়েছে একটি বিনোদন কক্ষ। যার মধ্যে একটি ঘূর্ণায়মান নৃত্য মেঝে ও বলরুম রয়েছে। বাড়িটির ১২টি বেডরুম, ২৩টি বাথরুম, বৌলিং অ্যালে, থিয়েটার, টেনিস কোর্ট, সুইমিং পুল, রিফ্লেক্টিং পুল, ঝর্ণা ও কমপক্ষে ২৭টি কার ধারণক্ষম একটি গ্যারেজ আছে। অনেকেই বলেন, এই বাড়ির সব সম্পদ দিয়ে কমপক্ষে ১ হাজার লোককে চালানো সম্ভব। নিজস্ব ওয়াইন উত্পাদন ব্যবস্থাও আছে এই বাড়ির।

কেসিংটন প্যালেস, লন্ডন

ভারতীয় ইস্পাত শিল্পপতি লক্ষ্মী মিত্তাল কেসিংটন প্যালেস গার্ডেনের বাড়িটির মালিকানা পাওয়ার পর নাম রাখেন ‘তাজ মিত্তাল’। ২০০৪ সালে ৫৭ মিলিয়ন ডলার যা বর্তমানে প্রায় ৮৯.৪ মিলিয়ন ডলারের সমান মূল্যে ক্রয় করেন।

বার্নি এক্কেলেস্টন নামের এক ব্রিটিশ ধনাঢ্য ব্যবসায়ীর কাছ থেকে এটি কেনেন। বাড়ির চারপাশে সারিবাধা ‘বিলিওনিয়ার রো’ বা মূল্যবান কঠের গাছ আছে। বিশ্বের নামি দামি লোকের বাড়িতে সাধারণত এ ধরনের গাছ শোভা পেয়ে থাকে। যেমন রোমান অ্যাবরাভোমিচ, লিওনার্দো ব্লাভাটনিকে বাড়িতে এই গাছ ছিল। বাড়িটির আয়তন ৫৫ হাজার বর্গফুট। মূল দালানে ১২টি শয়নকক্ষ, একটি তার্কিস বাথ, সুইমিং পুল, ছবির গ্যালারি, বলরুম রয়েছে। বাড়িটি কেনার পর মিত্তাল নতুন করে সাজিয়ে নেন। ব্যবহার করেন তাজমহলে ব্যবহূত পাথরের মতো পাথর।

আরো খবর »