কেমন চলছে খালেদাবিহীন বিএনপি

Feature Image

৩১ দিন ধরে কারাগারে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। এক মাস দলের প্রধানবিহীন কেমন চলছে বিএনপি— এ নিয়ে দলের ভিতর-বাইরে চলছে নানা আলোচনা। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলও বিশ্লেষণ করছে। খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে দলের সাংগঠনিক পুনর্গঠন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতিতেও ভাটা। এ নিয়ে কোনো আলোচনাই নেই বিএনপিতে। স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডও স্থবিরপ্রায়। বিএনপির ভাবনায় এখন শুধুই দলের প্রধানের মুক্তির আন্দোলন। সে ক্ষেত্রে সফল হতে পারছে না পুলিশি বাধায়। রাজপথের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতেও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে দলটি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘এটা ঠিক, বিএনপি একটি ক্রাইসিস সময় পার করছে। দলের প্রধান বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবি নিয়ে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনেও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সফল হচ্ছে না। তবে তাদের মধ্যে একটা ইউনিটি দেখা যাচ্ছে। তারা অনেকটা শান্তিপূর্ণ পথেই কর্মসূচি পালন করছে। সরকারকেও আমি বলব, বিএনপির শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে সহযোগিতা করুন।’

বিএনপির শীর্ষ নেতারা বলছেন, দলের শীর্ষ নেতার অনুপস্থিতিতে নেতা-কর্মীরা সব ভেদাভেদ ভুলে এক প্লাটফরমে এসে দাঁড়িয়েছেন। দলের ভিতরকার কোন্দলও কমেছে। বেগম জিয়ার মুক্তি দাবিতে রাজপথের নরম কর্মসূচিতে ছোট-বড় সব নেতাই মাঠে থাকার চেষ্টা করছেন। তবে দলের কেউ কেউ এও বলছেন, শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন আর অনশন কর্মসূচি দিয়ে নেতৃত্ব পরীক্ষা করা যাবে না। রাজপথে হরতাল-অবরোধ দিয়ে কে কতটুকু টিকে থাকতে পারেন, সেটাই হবে অগ্নিপরীক্ষা।

এ প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে বিএনপি নেতা-কর্মীরা আজ ঐক্যবদ্ধ। তাকে মুক্ত করেই নেতা-কর্মীরা ঘরে ফিরবেন। তার মুক্তি দাবিতে রাজপথে শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক কর্মসূচি আমরা পালন করছি। এটাও তারই দিকনির্দেশনা। লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পরামর্শও নেওয়া হচ্ছে। স্থায়ী কমিটিসহ সকল পর্যায়ের নেতার মতামতেই দল চলছে। আশা করি, সরকার শত চেষ্টা করেও এ ঐক্যে ফাটল ধরাতে পারবে না।’ জানা যায়, বেগম জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর থেকে দলের নির্বাচনী প্রস্তুতি নেই বললেই চলে। বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা এখন খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলনেই ব্যস্ত সময় পার করছেন। নেতাদের কেউ কেউ বলছেন, প্রস্তুতিতে পিছিয়ে পড়ার কারণে এর প্রভাব পড়তে পারে আগামী নির্বাচনে। তাই মুক্তি আন্দোলনের সঙ্গে নির্বাচনী প্রস্তুতি নেওয়াও জরুরি বলে মনে করেন তৃণমূলের নেতারা। গত বুধবার বিএনপির সিনিয়র নেতারা বেগম জিয়ার সঙ্গে কারাগারে দেখা করতে গেলেও নির্বাচন নিয়ে কোনো কথাই বলেননি তিনি। এ ব্যাপারে কোনো দিকনির্দেশনাও দেওয়া হয়নি নেতাদের। কারাগারে সাক্ষাৎ শেষে বেরিয়ে এসে বিএনপির এক নেতা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, ‘নির্বাচন নিয়ে বলার সময় এখনো আসেনি। তা ছাড়া আমরা আশা করছি, বেগম জিয়া খুব শিগগিরই মুক্তি পেয়ে যাবেন। তবে তার কারাবাস দীর্ঘায়িত হলে পরবর্তীতে নেতারা দেখা করে এ বিষয়ে বেগম জিয়ার সঙ্গে কথা বলবেন।’ এদিকে বেগম খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে লন্ডনে অবস্থান নেওয়া দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও শক্ত হাতে দলের হাল ধরেছেন। তিনি নিয়মিত সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে কথা বলে পরিবর্তিত কর্মসূচি নিয়েও সলাপরামর্শ দিচ্ছেন। কথা বলছেন তৃণমূল নেতাদের সঙ্গেও। সম্প্রতি গ্রেফতার হওয়া স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি শফিউল বারী বাবু ও ছাত্রদল ঢাকা মহানগর উত্তর শাখার সভাপতি মিজানুর রহমান রাজের পরিবারের সঙ্গে ফোনে কথা বলে তাদের সান্ত্বনা দিয়েছেন। এতে ওই পরিবারের সদস্য ছাড়াও মাঠ পর্যায়ের নেতা-কর্মীরাও খুশি। সিনিয়র ও জুনিয়র সবার মতামতের ভিত্তিতেই দল চলছে। খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবিতে কয়েক দফায় বিক্ষোভ সমাবেশ, মানববন্ধন, অবস্থান, গণঅনশন, গণস্বাক্ষর অভিযান, স্মারকলিপি পেশ, লিফলেট বিতরণ, কালো পতাকা প্রদর্শনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছে বিএনপি। গতকালও ঢাকাসহ সারা দেশে অবস্থান কর্মসূচি পালিত হয়েছে। ঢাকায় অবস্থান কর্মসূচি পুলিশি বাধায় পণ্ড হয়ে গেছে। এ ছাড়া ১২ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসভা ডাকা হয়েছে। কিন্তু এখনো জনসভার অনুমতি পায়নি দলটি। বিএনপির শীর্ষ নেতাদের দাবি, খালেদা জিয়ার নির্দেশনা অনুযায়ীই রাজপথের শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক কর্মসূচি দেওয়া হচ্ছে।

বিএনপির কূটনীতিসংশ্লিষ্ট নেতারা বলছেন, দেশি-বিদেশি কূটনীতিকদের পরামর্শেই রাজপথের সাদামাটা কর্মসূচি দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া বেগম জিয়া নিজেও এমনটাই চান। তবে এটা দীর্ঘ মেয়াদে চলবে না। শিগগির বেগম জিয়ার মুক্তি না মিললে আগস্টের পর বিএনপি কঠোর কর্মসূচির দিকে যাবে। সেটা নির্বাচন পর্যন্ত গিয়ে ঠেকবে। নেতারা আশা করছেন, সরকার যত চেষ্টাই করুক, জামিনযোগ্য মামলায় বেগম জিয়া কিছু দিনের মধ্যেই মুক্তি পাবেন। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন কিনা।

কেন্দ্রীয় নেতাদের একটি অংশ অবশ্য বলছে, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির নামে ঢিমেতালের চলমান কর্মসূচি দিয়ে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে আন্দোলন পৌঁছানো সম্ভব হবে না। এতে একপর্যায়ে নেতাদের সম্পর্কে কর্মীদের আস্থাহীনতার সৃষ্টি হতে পারে। সেখান থেকেই তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মনোবলে ফাটল ধরতে পারে। তবে কঠোর কর্মসূচির বিষয়ে ভিন্নমত পোষণকারী নেতাদের ভাষ্য, এখনই কঠোর কর্মসূচি নিয়ে রাজপথে নামলে তা নির্বাচন পর্যন্ত টেনে নেওয়া কঠিন হবে। নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের আগে কঠোর কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামলে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য পূরণ হবে। জানা গেছে, বিদ্যমান অবস্থায় খালেদা জিয়াকে মুক্ত, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার ইস্যুতে জাতিসংঘ, কমনওয়েলথ, ইউরোপীয় কমিশনে সহযোগিতা চেয়ে চিঠি দিয়েছে বিএনপি। ৮ ফেব্রুয়ারি রায়ের পর কূটনীতিকদের ব্রিফ করার পাশাপাশি সম্প্রতি খালেদা জিয়ার রায়ের বিষয়ে সরকারের বক্তব্যের পাল্টা জবাব দিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কূটনৈতিক মহল থেকে আশানুরূপ বার্তা না পেলেও রায়ের পর শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি করায় কূটনৈতিক মহলে বিএনপি আলোচনার সুযোগ পেয়েছে। ২০১৪ ও ২০১৫ সালের আন্দোলনের বদনাম থেকে মুক্ত হচ্ছে বলে মনে করেন দলটির নেতারা। একই সঙ্গে বিএনপির পক্ষ থেকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সম্পর্কে যে নেতিবাচক ধারণা, তা দূর করার চেষ্টা চলছে। বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘সরকার বুঝতে পারছে তাদের জনসমর্থন শূন্যের কোঠায়। সুষ্ঠু ভোট হলে তাদের ভরাডুবি নিশ্চিত। তাদের সময় শেষ হয়ে এসেছে। তাই তারা যে কোনোভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকতে চাইছে। এজন্য দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ সর্বস্তরের নেতা-কর্মীর ওপর নির্যাতন চলছে। বিএনপির বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র করছে। কোনো কিছুতে কাজ হবে না। এবার দেশের জনগণ তাদের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করবে।’

আরো খবর »