দেবশ্রী চক্রবর্তীর খাতা । পর্ব -১

Feature Image

আজ তিতিরের মন ভালো নেই। ওর মন খারাপ হলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে মন আবার ঠিক হয়ে যায়। প্রায় তিনশো বছরের পুরানো বাড়ির বিশ ইঞ্চি চওড়া কার্নিশের ওপর দু-হাত রেখে সে তাকিয়ে আছে সামনের বটগাছটার দিকে। আজ ভোর থেকে প্রকৃতিরও মন খারাপ, রৌদ্রজ্জ্বল সুন্দর হাসির ঝিলিকের ছিটেফোঁটাও নেই তার মুখে। মেঘলা দিনে তিতিরের মন খারাপ করে। কেন করে অনেক ভেবেও কোনো উত্তর সে পায় না।

বসার ঘরের সাথে বারান্দাটা একটা সাদা চিকোনের পর্দা দিয়ে আলাদা করে রাখা, পর্দার নিচে সে সখ করে ঘুঙ্গুর লাগিয়েছে। রাতের বেলায় পর্দাটা হাওয়ায় যখন দোলে মনে হয় কেউ ঘুঙ্গুর পরে হেঁটে চলে বেড়াচ্ছে। এত বছরের পুরনো বাড়ির মাঝে সাদামাটা জীবন-যাপন করা বোকামির কাজ বলে তার মনে হয়। এই ধরনের বাড়ির প্রতিটি কোনায় রহস্য লুকিয়ে থাকে, যা সাদা চোখে ধরা পরে না, তাই যদি ধরা নাও পরে রহস্যময় পরিবেশ বানিয়ে নিতে হয়। তাহলে প্রতিদিন মজা করে থাকা যায়। এখন যেমন তিতির তাকিয়ে আছে বট গাছটার দিকে। মনে হচ্ছে বট গাছের আশে পাশে মেঘের মতন কিছু একটা জমা হচ্ছে। বৈশাখ মাসে কুয়াশা হবার কথা না। তবে শহর অঞ্চলে এক ধরনের কুয়াশা তৈরি হয় সারা বছর ধরে, এই সব কুয়াশা দূষন থেকে তৈরি হয়। কিন্তু এই সব গ্রাম গঞ্জে দূষণ থাকার কথা না। তাই ব্যাপারটার মধ্যে রহস্যের গন্ধ সে পাচ্ছে।

আজ হাওয়ার দাপটও অন্যদিনের থেকে একটু বেশি। বটের শুকনো পাতা উড়ে জমা হচ্ছে নিচের গাড়ি বারান্দায়। তিতির একটু ঝুঁকে দেখছে সে দৃশ্য। গাড়ি বারান্দার একধার দিয়ে একটা মাধবীলতার ঝাড় উঠে গেছে তিনতলার ছাদ পর্যন্ত। থোক থোক মাধবীলতারা দুলে দুলে বাতাসে ছড়িয়ে দিচ্ছে মিষ্টি গন্ধ। কিন্তু তিতিরের কোনো গন্ধই আজ ভালো লাগছে না।

এ বাড়িতে সে এসেছে আজ তিনদিন পূর্ণ হলো। বটগাছটার পেছন দিয়ে যে নদী বয়ে গেছে, তার নাম কীর্তনখোলা। তেশরা বৈশাখ এই নদী পথে নৌকা করে সে প্রথম পা রেখেছিল এই বাড়িতে। বিয়ের আগে রানার মুখে বহুবার শুনেছে তাদের দেবীপুরের বাড়ির কথা। সে শুনেছে গ্রামের মেয়েদের ইতু পুজো, পূন্যিপুকুরের কথা। তাছাড়াও এ বাড়ির সাথে তার অন্যরকম একটা সম্পর্ক আছে যা সে বোঝার চেষ্টা করেও বুঝতে পারছে না।

জামশেদপুরের মেয়ে তিতিরের সাথে দেবীপুরের ছেলে রানার পরিচয় মায়ামিতে। দু’জনে এক বিশ্ববিদ্যালয়ে রিসার্চ করছিল। আজও সেই দিনটার কথা মনে আছে তার, যেদিন রানার সাথে পরিচয় হয়েছিল। পরিচয় পর্বটা শুরু হয়েছিল অদ্ভূত একটা ঘটনার মধ্যে দিয়ে। এরকম কোনো ঘটনা দিয়ে যে কোনো প্রেম শুরু হতে পারে তা কোনোদিন ভাবতে পারেনি তিতির। দিনটা ছিল উনিশে এপ্রিল। ইউনিভার্সিটির বাঙ্গালি এসোসিয়েশানের ছেলে মেয়েরা বিকেলবেলা ইউনিভার্সিটি স্পোর্টস ক্লাবে একটা মিটিং ডাকে। সবাইকে মুখে মুখে খবর দেওয়া হয় শুধু কাদম্বরীর জন্য তোমরা এসো। ইউনিভার্সিটিতে এই নামে কোনো মেয়ে পড়ে বলে কেউ মনে করতে পারছিল না। সবাই ভাবল বিদেশে এসে হয়তো মেয়েটি বিপদে পড়েছে, তাই তাকে উদ্ধার করার জন্য ডেকে পাঠিয়েছে। কাদম্বরী নামটা শুনেও মনে হচ্ছিল একজন ঘরোয়া বনেদী ঘরের কোনো মহিলা তিনি। তিতির রাজশ্রীর মুখে খবর পেয়ে বিকেল চারটে নাগাদ পোঁছে গেল স্পোর্টস ক্লাবে। বেঙ্গলি এয়াসোসিয়েশানের সেক্রেটারি সিদ্ধার্থ দা সেদিন যা বলেছিলেন, তা শুনে সবাই বেশ অবাক হয়েছিলো। তিনি বললেন, আজ রবীন্দ্রনাথের বৌঠান কাদম্বরীর মৃত্যু দিন। যিনি নাকি আত্মহত্যা করে মারা গেছিলেন। সিদ্ধার্থ দা জানালেন তাদের একটি গ্রুপ আছে, যারা প্ল্যানচেট করে বিভিন্ন আত্মাদের ডাকেন এবং কথা বলেন। আজ তারা ঠিক করেছেন যে কাদম্বরীকে প্ল্যানচেট করে তারা ডাকবেন এবং তার সাথে কথা বলে তার মৃত্যু রহস্য জানার চেষ্টা করবে। সিদ্ধার্থ দার কথা শেষ করার আগেই বেঙ্গলি এসোসিয়েশানের বারোজন সদস্যের মধ্যে সাতজন উঠে চলে গেল। তিতিরদের সাথে রিসার্চ করত বরুন যাবার আগে সিদ্ধার্থ দাকে চার অক্ষর , পাঁচ অক্ষরের কয়েকটা গালিও দিয়ে গেল। রাজশ্রী আর ওর এক বান্ধবী টিয়া যাবার সময় বেশ বিরক্তি দেখিয়ে সিদ্ধার্থদাকে বলল এভাবে ডেকে পাঠানোর কোনো মানে হয়! এখন থেকে বেঙ্গলি এসোসিয়েশান যদি প্লানচেট করে বেড়ায় তাহলে তারা আর এর মধ্যে নেই। নীল বলে একটা ছেলে বলেছিল তার আবার ভূতে খুব ভয়, তাই ভূতের সাথে যারা সম্পর্ক রাখে তাদের সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই।

এই ভাবে যাদের যাবার তারা যখন চলে গেল তিতির দেখল সে, সিদ্ধার্থ দা, আজাদ দা, সারিকা দি আর একজন শুধু থেকে গেল। সিদ্ধার্থ দা নতুন ছেলেটিকে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো ওর নাম রানা সেন। ও বাংলাদেশের বরিশাল থেকে এখানে এসেছে । রানাকে প্রথম দেখায় খুব ভালো লেগে গেছিল তার । মাঝারি রঙের ছিপছিপে লম্বা লাজুক ছেলেটির শান্ত নীরব উপস্থিতি বেশ শান্তি দিচ্ছিল তাকে। তিতির অনুভব করেছে যাদের প্রথম দেখায় ওর ভালো লাগে তাদের সাথে ওর সম্পর্ক থেকে যায় । আর যাদের সাথে কথা বলার সময় প্রথম দিন থেকে সে অস্বস্তি অনুভব করে , ও দেখেছে কোন না কোন ভাবে তারা ওর ক্ষতি করেছে । প্রতিটি মানুষ কোন না কোন বিশেষ গুন নিয়ে জন্মায় । তিতিরের মনে হয় তার বিশেষ গুন সে এক দেখায় মানুষ চিনে নিতে পারে ।

সেদিন মিটিংয়ে ঠিক হয় রাত বারোটার সময় সমুদ্রের ধারে পুরনো গীর্জায় তারা সবাই মিলিত হবে। এগারোটা পনেরো নাগাদ সারিকা দি সবাইকে ইউনিভার্সিটি গেটের সামনে থেকে তুলে ড্রাইভ করে নিয়ে যাবে গীর্জায় । মিটিংয়ে এই টুকু কথা হবার পর সবাই চলে যায় । তিতির কিছুক্ষণ বসে থাকে চেয়ারে । ওর সবকিছুর গভীরে ঢুকে একটু ভাবতে ভালো লাগে । প্রতিটা মুহূর্ত মন দিয়ে বাঁচতে ইচ্ছে করে । কারন যে মুহুরত একবার চলে যায় তা আর ফিরে আসে না । আর প্রতিটা মুহূর্তকে মন দিয়ে অনুভব করলে তার মধ্যে থেকে নতুন অনেক রহস্য অনুভব করা যায় । তিতির প্রথম ভাবলো রবীন্দ্রনাথের কথা । সে রবীন্দ্রনাথকে প্রথম চিনেছিল তাদের বাড়ির বসার ঘরের দক্ষিনের দেওয়ালে রবিঠাকুরের একটা ছবি দিয়ে । রবীন্দ্রনাথ পেছনে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন । তারপর সে চিন্তা করল রবীন্দ্রনাথের বৌদির কথা । এই বৌদির সম্বন্ধে সে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রথম আলোতে পড়েছিল । যে মহিলা এত বড় কবির লেখার সব থেকে বড় প্রেরনা এবং সমালোচক ছিলেন সে নিশ্চই খুব ব্যক্তিত্বময়ী ছিলেন । তবে আত্মহত্যা করলেন কেন ? আত্মহত্যা যারা করে তারা তো দূর্বল মনের মানুষ হয় । তারপর তিতির ভাবল অনেক সময় কিছু মুহূর্ত অনেক ব্যক্তিত্বময়ীকেও দূর্বল করে দেয় । কথাগুলো ভাবতে ভাবতে সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মোবাইল অন করে দেখল চারটে পঁয়তিরিশ বাজে । মানে এখনো প্রায় ছয় ঘন্টা হাতে আছে । বাড়ি গিয়ে সে একটু ফ্রেস হয়ে ঘুম দিয়ে নিতে পারবে । সে উঠে দাঁড়িয়ে পেছন ফিরে দ্যাখে রানা নামের ছেলেটি ঠিক তার পেছনের চেয়ারে বসে আছে । ছেলেটির মুখে একটা দুষ্টুমী হাসি । তিতিরের মনে হল , না , এবার তো আর ভালো ছেলে মনে হচ্ছে না একে । চুপি চুপি মেয়েদের পেছনে এসে বসা , আবার দুষ্টু হাসি মুখে রেখে অপরিচিতার দিকে তাকানো । ভালো ছেলেরা এ কাজ করে না । এখানে তার ক্যালকুলেশানটা ভুল হয়ে গেলো ।

তিতির রানাকে প্রথম কথাইয় বলেছিল, কি ব্যাপার বলুন তো, আপনি না আমার ডানদিকে বসেছিলেন, পেছনে এসে বসলেন যে?

রানা বলল, আমি সাইকলজির ছাত্র, মানুষের চরিত্রে কোনো ব্যতিক্রম দেখলে তাকে জানতে ইচ্ছে করে। আমি দেখলাম সবাই চলে গেছে কিন্তু আপনি গেলেন না, তখন আমার একটু সন্দেহ হয়। তারপর দেখি মাথা নিচু করে এক মনে বিড়বিড় করে নিজের সাথে কথা বলে চলেছেন। তখন আর কোন সন্দেহ থাকল না। বুঝলাম ব্যতিক্রমী কেস। তাই একটু কাছে বসে শোনার চেষ্টা করছিলাম আপনি কি বলছেন।

তিতিরের খুব অবাক লাগল শুনে যে সে আপন মনে কথা বলে। এতদিন ব্যাপারটা সে বুঝতে পারেনি। ভাগ্যিস ছেলেটা লক্ষ্য করে তাকে জানিয়েছে। তিতির আরো ভাবল সে নিজে কথা বলে তা সে জানে না, কিন্তু ছেলেটা জানে। এ-ও এক রহস্য। ব্যাপারটার গভীরে যাওয়া দরকার। তার ওপর ছেলেটি মানুষের মনের ব্যতিক্রম নিয়ে গবেষনা করছে।

রানা পাশের সিট থেকে ব্যাগটা নিয়ে কাঁধে তুলে বলল, আপনাকে আরেকটা কথা বলি, আমি যে পাশের সিট থেকে উঠে আপনার পেছনে এসে বসলাম, আপনি কিন্তু টের পাননি, কারন আপনি এখানে থেকেও অন্য কোথাও ছিলেন।

রানা দু’পা হেঁটে তিতিরের ডান দিকে এসে দাঁড়াতে তিতির অনুভব করেছিল ছেলেটার জুতোতে একটা ক্যাচ ক্যাচ আওয়াজ হচ্ছে , যা সে শুনতে পায়নি। তিতির বুঝতে পারল একটা কাউন্সিলিং করিয়ে নেওয়া ভালো। ছেলেটা যখন বেরিয়ে যাচ্ছে তিতির ওকে পেছন থেকে ডেকে বলল, আমার মনে হচ্ছে কোথাও একটা গন্ডোগোল আছে।

রানা চলতে চলতে তিতিরের দিকে তাকিয়ে বলে, আমারও তাই মনে হচ্ছে । আপনি বরং একটা কাউন্সিলিং করিয়ে নিন।

তিতির বলে, একটু দাঁড়ান, আমি বলছি আপনার সাথে রোজ যদি একটু সময় করে কথা বলা যায়, তাহলে খুব ভালো হয়।

রানা দাঁড়িয়ে বলে, আচ্ছা, আজ রাতে তো দেখা হচ্ছে, তখন জায়গা ঠিক করে নেবো। কারন আমারো আপনার কেসটা ইন্টারেস্টিং লেগেছে। তাছাড়া কাউন্সিলিং এর জন্য একটু নিরিবিলি জায়গা হলে ভালো হয়।

সেদিন রুমে ফিরে স্নান সেরে এক কাপ ম্যাগি খাওয়ার পর তিতিরের খুব ঘুম পেলো । মানুষ যখন খুব ক্লান্ত থাকে তখন সে ঘুমোলে কোন স্বপ্ন দ্যাখে না। তিতির রোজ খুব ক্লান্ত হয়ে এই সময় ঘুমিয়ে পড়ে, কোনো স্বপ্ন সে দ্যাখে না। কিন্তু সেদিন সে একটা স্বপ্ন দেখলো। সে দেখলো, নদীর ধারে একটা বিশাল বট গাছ । সে একটা ভাঙ্গা দেওয়ালের ঘুলঘুলি দিয়ে সেই বট গাছটাকে দেখছে , সেই সাথে নদীটাকেও দেখতে পাচ্ছে । নদী দিয়ে একটা নৌকা চলে যাচ্ছে। তিতির ভালো করে দেখলো , না নৌকায় কোনো মাঝি নেই । নৌকাটা নিজে নিজেই যাচ্ছে। অনেক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর সে ঘুঙ্গুরের শব্দ পেলো। তার মনে হল সে যেন সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে যাচ্ছে । তিতির ঘুলঘুলি থেকে চোখ সরিয়ে ভেতরের দিকে তাকালো, ভেতরটা খুব অন্ধকার, অনেক্ষণ আলোর দিকে তাকিয়ে থাকার পর সে যখন অন্ধকার ঘরে তাকালো, সে কিছু দেখতে পেলো না। অনেক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর সে দেখলো একটা সিঁড়ির মধ্যে যে দাঁড়িয়ে আছে । সিঁড়িটা নিচের দিকে নেমে গেছে । তিতির সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে যাচ্ছে, সে যত নিচে নামছে সব কিছু পরিস্কার দেখতে পাচ্ছে । অনেক পুরানো দিনের সেই বাড়ি, সিঁড়িটা দেখেই তা মনে হচ্ছে । নিচে নেমে এসে সে দেখল একটা বড় ঘর । ঘরের মাঝে একটা কাঠের বাক্স । বাক্সের গায়ে নানা রকম কারুকার্য করা । তিতির বাস্কটার সামনে গিয়ে বসে ভাবছে বাক্সটা খুলবে কি না । সে ঠিক করল যে সে বাক্সটা খুলবে । এমন সময় এক ঝাক বাদুর তার দিকে অন্ধকার থেকে ছুটে এলো । তারা তিতিরের দু চোখে আক্রমন করছে । তিতিরের মনে হল সে অন্ধ হয়ে গেল।

এমন সময় এলার্ম ঘড়িটা বেজে উঠতেই তিতির উঠে বসে দেখল ঘড়িতে রাত সাড়ে দশটা বাজে । তিতিরের খুব অবাক লেগেছিল যে সে এইটুকু স্বপ্ন এতক্ষন ধরে দেখলো । সারিকা দি সাড়ে এগারোটার সময় আসবেন । তার মানে আর এক ঘন্টাও নেই । তিতির ফ্রিজ থেকে চিকেনকারিটা বার করে মাইক্রোভেনে দিয়ে রাইস কুকারে ভাতটা বসিয়ে টয়লেটে গেল। হেয়ার ক্যাচারটা খুলে তিতির চুলের ভেতর হাত দিয়ে ম্যাসাজ করতে করতে সাওয়ারটা অন করল । সত্যি সাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে থাকলে মনে হয় সব টেনশন গুলো মাথা থেকে বেড়িয়ে ভেতরটা পরিস্কার হয়ে যাচ্ছে । কিছুক্ষন দাড়ানোর পর একটু বডি ওয়াশ হাতে নিয়ে সে যখন গালে দিলো , মনে হল এক থাবা লঙ্কা বাটা সে গালে লাগিয়েছে, যন্ত্রনায় ছটফট করতে করতে সে জল দিয়ে ভালো করে মুখটা ধুয়ে আয়নার সামনে এসে দাঁড়াল। তিতির নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। সে যা দেখছে তা কি সত্যি না চোখের ভুল। মানুষের মনে বিকৃতি আসলে সে এরকম ভুল দ্যাখে। তিতির গা মুছে একটা গাউন পড়ে বাইরে এসে আবার আয়নার সামনে দাঁড়াল । না চোখের ভুল না সত্যি ওর সারা মুখে আচড়ের দাগ । এমনি সে কোন যন্ত্রনা অনুভব করছে না, কিন্তু বডি ওয়াসটা লাগানোর জন্য যন্ত্রনা হচ্ছিল । কিন্তু এরকম হল কি করে। তিতির তার বিছানা ভালো করে দেখলো, কোথাও কিছু নেই । ঘরের ভেতরেও সে একা থাকে , তবে কে ওকে এভাবে আচড়ে দিয়েছে ? তখন তার স্বপ্নের কথা মনে হল । তবে কি সেটা শুধু স্বপ্ন না , স্বপ্ন ছাড়াও অনেক কিছু ছিল?

মাইক্রোভেনে বিপ বিপ শব্দ হল ।

রাত পৌনে বারোটা নাগাদ তিতির চার্চের সামনে পৌঁছল। সারিকা দির সময় জ্ঞান খুব বেশি, সে ঠিক সাড়ে এগারোটার সময়ই এসে পৌঁছেছিল। গাড়ি থেকে নামার সময় তিতির সমুদ্রের গর্জন শুনতে পায়। প্রায় পাঁচশো বছরের পুরনো চার্চের সামনে দাঁড়িয়ে সমুদ্রের তীব্র গর্জন শুনে মন বেশ রোমাঞ্চিত হয়ে ওঠে। চার্চের ডান দিকে একটা বিশাল গাছ। কি গাছ অন্ধকারে বোঝা যাচ্ছে না, গাছটা কি গাছ তা জানার কোনো ইচ্ছা এই মূহুর্তে তার নেই। চার্চের বাইরের দেওয়ালের ছোট ছোট কাঁচের জানালা দিয়ে যে হাল্কা হলুদ আলো আসছে তা এসে পড়ছে সামনের চত্ত্বরটায়। মনে হচ্ছে যেন টাইম ট্রাভেল করে তারা মধ্যযুগের ইউরোপের কোনো এক বন্দর শহরে পৌঁছে গেছে। তিতিরের মনে হল গাছের নিচে কেউ একজন দাঁড়িয়ে তাকে হাত নাড়ছে। গাছের প্রতি আকর্ষণ না থাকলেও গাছের নিচের ব্যক্তির প্রতি সে তীব্র আকর্ষণ অনুভব করলো। তিতির কিছু না বুঝেই হাত নাড়িয়ে এগিয়ে চলল গাছের দিকে। সমুদ্রের হাওয়ায় তার চুল উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে, সে দু-হাত দিয়ে চুলগুলো টেনে একটা খোপা করে নিলো। এসব জায়গায় চুল খুলে না রাখেই ভালো, ঠাকুমার মুখে সে শুনেছে যুবতী মেয়েরা রাতেরবেলা চুল খুলে বেরালে ভূতে ধরে। তিতিরের মনে হচ্ছে, আজকের রাতটা তার জীবনের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা রাত। তাই ভূতে ধরার আগে তার গাছের নিচে পৌছনোটা খুব জরুরি। তিতির যা ভেবেছিল, ঠিক তা-ই। রানা গাছের নিচে তার জন্য অপেক্ষা করছে।

চার্চের হাল্কা হলুদ আলো রানার মুখে এসে পড়ছে, সেই আলোয় রানার চোখ দুটো খুব আকর্ষনীয় হয়ে উঠেছে। তিতির তাকিয়ে আছে সেই চোখের দিকে। রানা তিতিরের দৃষ্টি বোঝার চেষ্টা করছে। সাদা সুতির গাউনে তিতিরকে খুব মোহময়ী দেখাচ্ছে। কপালের পাশ দিয়ে হাল্কা চুলগুলো উড়ছে, যা রানাকে চুম্বকের মতন আকর্ষণ করছে ওর দিকে। কিন্তু এই নিয়ে দ্বিতীয়বার দেখা হচ্ছে দু-জনের। এখনই নিজের দূর্বলতার প্রকাশ করা ঠিক হবে না। রানা জানে যে কোনো সম্পর্কে যার মানসিক জোর যত বেশি সে সব সময় দূর্বল জনকে নিয়ন্ত্রণ করে। তার মনে হল, এই মেয়েটি এত রাতে তার হাতের ইশারায় যখন ছুটে এসেছে, এ আসা শুধু শুধু হতে পারে না, মেয়েটির তীব্র কোনো মানসিক চাহিদা হয় তো আছে। তাই তার এখনই দূর্বল হওয়া বোকামি হবে।

তিতির রানার চোখের দিকে তাকিয়ে যেন অবশ হয়ে গেছে, কোনো কথা তার মুখ দিয়ে বের হচ্ছে না। তার মনে হচ্ছে এই চোখ দুটি ঠিক যেন তার স্বপ্নে দেখা পুরনো বাড়িটার ঘুলঘুলি। যা দিয়ে সে নদী, নৌকা আর বটগাছকে দেখতে পাচ্ছে। অনেকক্ষণ এই ভাবে দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক হচ্ছে না, ছেলেটা হয় তো তাকে বেহায়া, অসভ্য মেয়ে ভাবছে। কিন্তু তিতিরের এরকম এর আগে কোনো দিন হয়নি। সে নিজেকে কন্ট্রোল করে মাথা নিচু করে বলল, আপনি কিছু মনে করেননি তো?

রানা বলল, কেন, মনে করার কি আছে?
আপনার আমাকে দেখতে ভালো লাগছিল, তাই আপনি দেখছিলেন। এতে আর দোষ কি। তাছাড়া আজকাল আমার দিকে সেভাবে কেউ তাকিয়ে দ্যাখে না। আপনি দেখছিলেন, আমি খুশি হয়েছি।

তিতির এবার ধিরে ধিরে রানার দিকে তাকিয়ে বলল, আপনাকে আমার কিছু কথা বলা খুব দরকার। যদি কিছু মনে না করেন…

রানা বলল, এসব কথা এরকম খোলামেলা পরিবেশে বলা হয় না, অনেক সাইকোলজিক্যাল কথা আছে যা সুস্থ্য মানুষজন শুনে ফেললে আপনাকে কিংবা আমাকে পাগল ভাবতে পারে। তাই চারদেওয়ালের মধ্যে হলে ভালো হয়।

তিতির বলল, কাদম্বরী আজ অতীত, কিন্তু আমি বর্তমান। আমার মধ্যে কিছু সমস্যা তৈরি হয়েছে যার সমাধান এখন না হলে আমিও হয়তো…

কথাটা শেষ করার আগে রানা বলল, এসব প্ল্যানচেটে আমার কোনো বিশ্বাস নেই। মানসিক বিকারগ্রস্থরা এসব করে। এই সব পাগলদের মধ্যে যে মানসিক ভাবে সব থেকে বিকারগ্রস্ত হয়, সে মিডিয়াম হিসাবে কাজ করে আর ভুলভাল কল্পনা করে, তারপর তার অনুভূতি দূর্বলদের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়।

তিতির রানার মুখে এসব কথা শুনে অবাক হয়ে গেছিলো। সে বলল, আপনি তাহলে এখানে এসেছেন যে?

রানা কিছুক্ষণ তিতিরের চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে কিছু একটা বলতে গিয়েও নিজেকে কন্ট্রোল করে বলল, সে এক কারণ আছে, পরে বলবো। এখন চলো, চার্চের পেছন দিকে ফাদারের ঘর আছে। এখন ওখানে কেউ থাকে না। ঘরটা-ই কেয়ার টেকার থাকে। আমি আজ সিদ্ধার্থদার সাথে বিকেলে চার্চে এসেছিলাম। তখন কেয়ারটেকারের সাথে কথা বলার সময় ওর ঘরটা আমার খুব পছন্দ হয়। আমি ওকে কিছু টাকা দিয়ে আজ রাতের জন্য ঘরটা নিজের জন্য নিয়ে নিয়েছি।

তিতির বলল, তোমার মতলব আমার ভালো ঠেকছে না। তুমি ওখানে আমাকে নিয়ে যেতে চাইছ কেন? এখানে তো কেউ নেই, গাছের তলায় বসেই আমরা কথা বলতে পারি।

রানা এবার একটু শক্ত হলে বলল, এখানে সমুদ্রের আওয়াজ আসছে, সেই সাথে ঝড় বাতাস। এসবের মধ্যে কাউন্সিলিং হয়না। তাছাড়া ফাদারের ঘরের একটা বিশেষত্ব আছে। যা আমি তোমাকে এখনো বলিনি।

তিতির আর কোনো কথা বলল না। রানার প্রতি তার বিস্ময় আরো যেন বেড়ে গেল।

রানা তিতিরের মুখের দিকে একটু ঝুঁকে বলল, তিতির ফাদারের ঘরে আজ পর্যন্ত যে ফাদাররা এসে থেকেছেন, কারুকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। এই জন্য এই চার্চটা আজ প্রায় দুশো বছর ধরে এরকম অবস্থায় পড়ে আছে। কেয়ারটেকার যে আছে, সে নিজেও রাত্রে থাকার সাহস পায় না। আমি তোমাকে এরকম একটা পরিবেশে কাউন্সিলিং করাতে চাই, কারণ এরকম একটা পরিবেশে তোমার ভেতর থেকে অনেক আবর্জনা বেরিয়ে আসবে আর তুমি কাল সকাল থেকে সুস্থ হয়ে উঠবে।

ফাদারের ঘরে এসে তিতিরে কিন্তু ভয় লাগেনি, বরং ঘরটা বেশ রোমান্টিক লেগেছিল তার কাছে। সে মনে মনে ভেবেছে, রানার মতন একটি ছেলের সাথে এরকম পরিবেশে রাত কাটানো কি খুব সাধারণ কোনো ঘটনা, না এর পেছনে ঈশ্বরের অন্য কোনো ইচ্ছে আছে?

তিতির সে রাতে রানাকে নিজের স্বপ্নের কথা জানিয়েছিল। রানা তার দু-হাতের নখ দেখে বলেছিল, যে সে কাজ তিতির নিজে করেছে। মানুষ অনেক সময় নিজে কোনো কাজ করে ভুলে যায়, তারপর সে ভাবে সেই কাজ অন্য কেউ করেছে। তিতিরের ক্ষেত্রেও তাই হচ্ছে। রানা তিতিরকে বলে, তোমার সাথে যেটুকু কথা বলে বুঝেছি তোমার কোনো সঙ্গী নেই। এই বয়সের কোনো মেয়ের পুরুষ বন্ধু না থাকা অস্বাভাবিক। নিঃসঙ্গতা থেকে অনেক সময় এরকম সমস্যা তৈরি হয়।

রানা কথাগুলো শেষ করার আগেই ঘরের আলোটা নিভে যায়। সে অন্ধকারে কথা বলে চলেছে। তিতির সেই কথা অনুসরণ করে রানার পাশে এসে বসে। সে বলে, আলোটা হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল কেন? এরকম হবার কথা তো না।

রানা তিতিরের হাত দুটো ধরে বলল, কোথায় আলো বন্ধ হয়েছে, আমি তো সব কিছু পরিষ্কার দেখতে পারছি। তাছাড়া এতো বেশি আলো কাউন্সিলিং-এর সময় থাকা উচিত না।

তিতিরের খুব ভয় করছে, ভয়ে তার ঘাম হচ্ছে। মানুষ যখন খুব ভয় পায়, তখন তার গলার মাংশপেশি সঙ্কুচিত হয়ে যায়। এই মুহূর্তে তারও তাই হচ্ছে। সে রানার আরেকটু কাছে এসে বসল। তারপর বলল, এ আপনি কি বলছেন, আমি তো দেখছি চারদিক অন্ধকার।

রানা তিতিরের দু-হাত শক্ত করে ধরে বলে, তোমার মানসিক সমস্যা আছে। তুমি নিজের মনে কথা বলো, তুমি বোঝনা, কিন্তু আমি প্রথম দেখায় তা বুঝতে পেরেছি। আমি একজন সাইকোলজিস্ট, আমি যা বুঝতে পারছি তা তুমি বুঝবে না।

তিতির তার শরীরে একজন পুরুষ গরম নিঃশ্বাস অনুভব করছে। এতো কাছাকাছি সে এর আগে কোনো পুরুষের আসেনি। রানার শরীর দিকে এই মূহুর্তে তীব্র কোনো হরমোন ক্ষরণ হচ্ছে, যার গন্ধ তিতিরের শরীরকে উত্তেজিত করছে। তিতিরের জিভ শুকিয়ে যাচ্ছে। এটা যে শুধু ভয় থেকে হচ্ছে না তা বোঝার মতন বুদ্ধি তার আছে। তিতিরের সারা শরীর কাঁপছে। সে অনুভব করছে, তার সামনে যে বসে আছে, সে তার মতন এতো উত্তেজিত না, সে স্থির হয়ে আছে। দূর্যোগ আসার আগের মূহুর্তে প্রকৃতি যেমন স্থির থাকে, এই মূহুর্তটাও যেন ঠিক সেরকম। তিতিরের নিজেকে সাইক্লোনের মতন মনে হচ্ছে আর রানাকে কোনো এক বন্দর।

রানা ঠিক করে নিয়েছে, সে কোনো দূর্বলতা দেখাবে না, যা ঘটার তা ঘটবে। কিন্তু এর কোনো দায় তার না, কারণ সে নিজে থেকে এগিয়ে কিছু করেনি। দিনকাল যে ভালো না সে তা জানে। এই একই ভাবে তার এক বন্ধু ফেঁসে গেছিল। তাই রানা সেদিন শুধু তিতির নামের সাইক্লোনের অপেক্ষায় বন্দরের মতন বসেছিল।

সব কিছু খুব তাড়াতাড়ি হল। তিতির নিজের হাত রানার থেকে ছাড়িয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল তার বুকে। কি হচ্ছে সে বুঝতে পারছে না। মনে হচ্ছে এতদিন ধরে এই অবলম্বন সে খুঁজেছে। রানা তিতিরের মুখ দু-হাতে ধরে তার ঠোঁটে চুমু খেলো। এই প্রথম চুমুর স্বাদ পেলো তিতির। সারা শরীরটা কাঁপছে। রানা অনুভব করছে তিতিরের তৃষ্ণা সহজে মেটবার না। আর তার আনাড়ি চুমু খাওয়া দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে এটাই তার প্রথম অভিজ্ঞতা।

কতক্ষণ যে তারা এরকম ভাবে ছিল তিতিরের মনে নেই। এক সময় সে রানাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, একবার যখন পেয়েছি, তোমাকে ছাড়বো না রানা।

রানা বলেছিল, তিতির তোমার সাথে আমার অনেক কথা হয়েছে আজ, কিন্তু তুমি একবারও তোমার বাবা, মায়ের কথা আমাকে বলোনি।

রানা অনুভব করছে তিতির কাঁদছে। সে রানাকে আরো জোরে জড়িয়ে ধরেছে। রানা অনুভব করছে মেয়েটি সম্পূ্র্ণভাবে নিজেকে সমর্পণ করতে চায় তার কাছে। রানা তাকে প্রশ্ন করলো, তুমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করো?

তিতির বলল, আমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করি বলেই তো তোমাকে পেয়েছি।

রানা বলল, তুমি জানো যারা মানসিক রুগী হয় তারা ঈশ্বরে সব থেকে বেশি বিশ্বাস রাখে। তুমিও রাখো। দেখেছো তো আমি ঠিক ধরেছি। আজ থেকে আর করো না কেমন। আজ থেকে আমাকে বিশ্বাস করো দেখবে তুমি সুস্থ হয়ে উঠবে। রানা বুঝতে পারছে তিতির ঘুমিয়ে পড়েছে। তার চোখ দুটো বন্ধ। সে তিতিরের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, তিতির এখন দেখো তো তুমি আলো দেখতে পাচ্ছ নাকি? আমি জানি তুমি এখন সব কিছু দেখতে পাবে।

তিতির যেন এতক্ষণ একটা ঘোরের মধ্যে ছিল। সে চোখ খুলে দ্যাখে ঘরের ভেতর আলো জ্বলছে সে রানাকে জড়িয়ে বসে আছে। এতক্ষণ কি ঘটেছে, সে কিছু বুঝে উঠতে পারলো না। একবুক আশঙ্কা আর লজ্জা নিয়ে তিতির উঠে ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার জন্য দরজার দিকে গেল, ঠিক তখন রানা বলে উঠল, তিতির, কাল তাহলে ঠিক এই সময় দেখা হবে।

তিতির দাঁড়িয়ে পড়ে , বলে, কোথায়?

রানার মুখে রহস্যময় হাসি, সে বলে সেটা সময় মতন তোমাকে জানিয়ে দেবো, কেমন?

তিতির লক্ষ্মীমেয়ের মতন মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে দরজার ফাঁক দিকে সমুদ্রের ঠান্ডা হাওয়া ঘরে এসে ঢোকে।

সেদিন ভোরে চার্চ থেকে ফেরার পর তিতিরের জ্বর আসে। তিন দিন ইউনিভার্সিটি যাইনি আর ইচ্ছে করেই মোবাইল ফোন সুইচ অফ করে রেখেছে। তার ধারণা রানা নামের ছেলেটির কোনো খারাপ প্রভাব তার ওপর এসে পড়েছে। এরকম ভাবা অস্বাভাবিক কিছু না। কারণ ছেলেটির সাথে দেখা হবার পর থেকে তারমধ্যে নানা রকম মানসিক সমস্যা তৈরি হয়েছে। ছেলেটিকে সে তার নাম জানায়নি, তাও ছেলেটি তাকে তার নাম ধরে ঢেকেছে। তিতির নামটার সাথে ইউনিভার্সিটির কেউ পরিচিত না। সবাই তাকে এখানে রোহিনী নামে চেনে। ছেলেটি কি করে তার নাম জানতে পেরেছে এটাই এখন লাখটাকার প্রশ্ন। গত তিন দিন সে কোনো স্বপ্ন আর দ্যাখেনি, এর অর্থ ছেলেটির সাথে তার যোগাযোগ হয়নি, তাই হয়তো সে স্বপ্নও দ্যাখে নি। যেমন করেই হোক ছেলেটির মধ্যে খুব নেগেটিভ কোনো এনার্জি আছে, যার প্রভাব তার ওপর এসে পড়েছে। ঠাকুমার মুখে সে শুনেছে, নিশিরা মানুষকে ডেকে ঘর থেকে বাইরে নিয়ে যায়, তারপর তাকে গলা টিপে মেরে ফেলে দেয়। মাঠের মধ্যে সেই দেহ পড়ে থাকতে দেখে কৃষকরা বাড়িতে খবর দিতো। তিনবার ডাকার পর উত্তর না দিলে নিশির ডাকের আর কোনো প্রভাব পড়ে না। আজ তৃতীয় দিন হল রানার সাথে আর তার কোনো যোগাযোগ নেই। আজকের দিনটা কাটিয়ে দিতে পারলে আশা করা যায় আর কোনো খারাপ প্রভাব তার ওপর পড়বে না। ভয়ে মোবাইল ফোনও সে খোলে নি, কারণ এসব ছেলেদের বিশ্বাস নেই, যেকোনো জায়গা থেকে ফোন নাম্বার জোগাড় করে ফোন করতেই পারে। অস্বাভাবিক কিছু না । মাঝে সে একবার অনলাইন একটি বই কিনেছে, বইটির নাম “The collected papers of Milton H. Ericks “ , বইটির লেখক এম এইচ এরিকশন এম ডি । বইটি সে নিজের ল্যাপটপ থেকে কিনেছে। ভুলেও মোবাইল ফোন খোলেনি।

বইটি অর্ডার করার আধ ঘন্টার মধ্যে সে হাতে পেয়েছে। গত তিন দিন ধরে সে বইটি পড়ছে। বইটির লেখক একজন স্বনাম ধন্য সাইকোলজিস্ট, যিনি তার রুগীদের নানারকম গল্প বলে তাদের রোগ সারিয়ে দিতেন। তিনি যে গল্পগুলি মনের রোগ সারাতে বলতেন, সেই গল্পগুলি এই বইতে লেখা আছে। তিতিরের মনে হচ্ছে রানা নামের ছেলেটি নানারকম গল্প বানিয়ে তাকে হিপনোটাইস করে মানসিক রূগীতে পরিনত করার চেষ্টা করছিল। এই গল্পগুলির মধ্যে দিয়ে সে বোঝার চেষ্টা করছে রানার বলা কোনো কথা তাকে কিভাবে প্রভাবিত করেছে।

সারাদিন বই পড়ে তৃতীয়দিন রাতে একটু তাড়াতাড়ি তিতির ঘুমতে গেল। সেই রাতে তিতির আবার স্বপ্ন দেখলো। সে দেখলো, একটা নদী, নদী দিয়ে একটা নৌকা যাচ্ছে, নৌকায় নতুন বৌ বসে আছে, বৌয়ের মুখ ঢাকা, সে তার মুখ দেখতে পাচ্ছে না, কিন্তু তার লাল বেনারসী দেখতে পাচ্ছে, বউয়ের হাত দুটো খুব ফর্সা। নদীর ছলাত জলের শব্দ তার কানে আসছে। নৌকাটা তীরের দিকে এগিয়ে আসছে, তীরে একটা পুরনো দিনের বাড়ি। বাড়িটাকে দেখে মনে হয় তিনশো বছরের পুরনো তো হবেই, তিনশ বছর ধরে তার কোনো পরিচর্যা না হওয়ায় বাড়িটার ছালবাকল উঠে গেছে। নৌকা এগিয়ে আসছে তীরের দিকে, নদীর ঢেউ জোরে জোরে বাঁধানো ঘাটে এসে লাগছে। তিতির দেখতে পাচ্ছে বাঁধানো ঘাটের পাশে একটা বট গাছ। বটের ডালে লম্বা মতন কিছু ঝুলছে। তিতির ভালো করে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করছে জিনিসটা আসলে কি? নৌকা নিজে থেকে তীরে এসে ঠেকতেই তিতির দেখতে পেলো রানা গলায় ফাঁস দিয়ে গাছের ডালে ঝুলছে, তার ঠোঁটের ডান কোণা থেকে রক্ত বেরোচ্ছে। রানার পরনে বিয়ের জোড়। মনে হচ্ছে নৌকায় বসে কেউ কাঁদছে, তিতির পেছন ফিরে দ্যাখে নতুন বৌয়ের ঘোমটার ফাঁক দিয়ে কান্নার আওয়াজ আসছে, বৌয়ের মুখ দেখা যায় না, ঘোমটার ভেতর শুধুই অন্ধকার। অন্ধকারে তিতিরের ভয় লাগে, সে ভয়ে চিৎকার করে ওঠে।

এলার্ম ঘড়িটা বেজে ওঠে। তিতির উঠে দ্যাখে সকাল ছটা বাজে।

গত রাতে সে ন’টার সময় ঘুমতে গেছে, উঠেছে সকাল ছ’টা। এতক্ষণ ধরে সে এই একটা স্বপ্নই দেখেছে। গত স্বপ্নে সে পুরনো বাড়ি, বটগাছ, নদী, নৌকা যা যা দেখেছে, এই স্বপ্নেও সে তাই তাই দেখেছে, শুধু সিঁড়ি আর বাক্স দ্যাখেনি। তবে এই স্বপ্নে সে রানার মৃত্যু দেখেছে। যা তাকে খুব চিন্তায় ফেলেছে। তিতিরের মনে হচ্ছে রানার সাথে তার সবকিছু খোলাখুলি আলোচনা করা দরকার। সে সিদ্ধার্থদাকে ফোন করে রানার নম্বর নিয়ে তাকে চার্চের সেই গাছটার নিচে দেখা করার জন্য বলেছে, কিন্তু রানা তাকে বলেছে আজ তারা ক্রুশ রেস্টুরেন্টে দ্যাখা করবে। সে আগে থেকেই বুঝতে পেরেছিল যে তিতির তাকে ফোন করবে, তাই সে দুটো টিকিট কেটে রেখেছে। তারা মাঝ সমুদ্রে গিয়ে যখন পোঁছাবে, তখন সে তিতিরের সব কথা শুনবে।

সেদিন দেখা হবার পর তিতির তাকে সবার আগে প্রশ্ন করেছিল, তুমি কি করে বুঝলে আমি তোমাকে আজ ফোন করবো?

উত্তরে রানা বলেছিল, মেয়েরা তিন দিনের বেশি কোনো আবেগ ধরে রাখতে পারে না। তুমি তিন দিন সব রকম ভাবে চেষ্টা করেছো আমার থেকে দূরে থাকার। এতে তোমার মধ্যে জমে থাকা আবেগ আরো তীব্র হয়েছে, তাই তারা চতূর্থ দিনের দিন বেরিয়ে এসেছে। এটা শুধু তোমার জন্য না, সবার জন্য পরীক্ষিত সত্য।
তিতির উত্তরে বলেছিল, আমি স্বপ্নে তোমার মৃত্যু দেখেছি, তাই আমার মনে হয়েছে তোমাকে ব্যাপারটা জানানো খুব প্রয়োজন, তাই তোমার সাথে দেখা করতে চেয়েছি। এতে অবনর্ম্যাল কিছু তো নেই।

রানা পাইন্যাপেলের জুসে চুমুক দিয়ে বলেছিল, দূর, মৃত্যু দেখলে মৃত্যু হয় না। সারাদিন কত লোক মৃত্যুর স্বপ্ন দ্যাখে, কিন্তু তারা একে অপরকে কি জানায়, হুম? তোমার আমার সাথে দেখা করতে ইচ্ছা করেছে তাই এসেছো। শুধু যদি মৃত্যু সংবাদ দেওয়ার থাকতো তা তুমি ফোনেও দিতে পারতে। তা তুমি করোনি।

তিতির বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখল তাদের ক্রুশ মায়ামি শহর থেকে বেড়িয়ে মাঝ সমুদ্রে এসে পৌঁছেছে, এখান থেকে আর শহর দেখা যাচ্ছে না, চারিদিকে শুধু নীল সমুদ্র। নিজের দেশ থেকে এত দূরে, মাঝ সমুদ্রে দুই বাঙালি যুবক, যুবতি শুধু স্বপ্ন নিয়ে আলোচনা করতে এসেছেন না এর পেছনে ভগবানের অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে? তিতিরের সেই সুন্দর মূহুর্ত কথা বলে নষ্ট করতে ইচ্ছা করেনি, ক্রুশে সুন্দর একটা মিউজিক চলছিল, তিতিরের মিউজিক শুনতে শুনতে সমুদ্র দেখতে ইচ্ছা করছিল। সে অনুভব করেছিল রানা তার হাতের আঙ্গুল স্পর্শ করছে, সে সেই স্পর্শকে উপোভোগ করে সমুদ্র দেখছে। মানুষের জীবনে কিছু কিছু এমন মূহুর্ত আসে যখন সব কিছু তার কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়। সে বুঝতে পেরেছিল রানাকে প্রথম দেখায় সে তাকে ভালোবেশে ফেলেছে, এইজন্য তাকে হারানোর ভয়ে সে রানার মৃত্যুর স্বপ্ন দেখেছে, এর পেছনে অন্য কোনো কারণ নেই।

সেদিনের সেই ক্রুশ যাত্রা দিয়ে তাদের জীবনের এক নতুন যাত্রার সূচনা হয়েছিল। তিতির আর রানার দেখা হবার তিন বছর পর তারা বিয়ে করবে বলে মনস্থির করে। তিন বছরের মধ্যে তিতির অনেক স্বপ্ন দেখেছে, কিন্তু তার স্বপ্নে বটগাছ, নদী, পুরনো বাড়ি কিংবা রানার মৃত্যু সে আর দ্যাখেনি। কিন্তু তাদের বিয়ের এক সপ্তাহ পর তারা হানিমোন করতে মিচু পিচু যায়।যেদিন তারা সেখানে পৌছায়, সেদিন রাতে সে আবার একটা স্বপ্ন দ্যাখে। পাহাড়, জঙ্গলের মাঝে রহস্যময় পরিবেশের প্রতি তাদের দুজনেরই গভীর আকর্ষণ, এই কারণে তারা বিয়েরপর এক সপ্তাহের জন্য মিচু পিচুর জঙ্গলে একটি রিসর্ট ভাড়া নেয়। ঘন জঙ্গল আর পাহাড়ের চূড়ায় এই রিসর্ট থেকে পুরো মিচু পিচু পরিষ্কার দ্যাখা যায়। সন্ধেবেলায় তারা দুজন বসেছিল ব্যালকনিতে, দূরে কোথাও থেকে একটা খুব সুন্দর বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজ আসছিল, রানার কাঁধে মাথা রেখে তিতির বলেছিল এই আওয়াজটা তার কাছে যেন বহুদিনের পরিচিত, তার অতীত থেকে এই আওয়াজ তার কাছে এসে পৌছাচ্ছে। মিচু পিচির ওপর পড়ন্ত বিকেলের শেষ আলো এসে পড়ছে, পরিবেশটা আলো আঁধারির মধ্যে খুব রহস্যময় দেখাচ্ছে। রানা বলল, এই আওয়াজটা একটা বাঁশের বাদ্যযন্ত্রের। ইনকারা এই ধরনের বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে গান করতো। তুমি জানো তিতির, আমি এই মিচু পিচুকে বহুদিন আমার স্বপ্নে দেখেছি। কিন্তু তার মধ্যে এই রঙ ছিল না। কারণ স্বপ্নে দেখা কোনো কিছুর তো রঙ হয়না, সে তো শুধুই সাদা কালোর এক জগৎ।

তিতিরের মন ভারাক্রান্ত হয়ে উঠছিল। সে রানাকে বলল, তার কারুর জন্য খুব মন খারাপ লাগছে, কিন্তু সে বুঝে উঠতে পারছে না কার জন্য তার এতো মন খারাপ!

এই তিন বছরে একবারও তিতির তার পরিবারের কারুর সাথে কোনো যোগাযোগ করেনি, রানা বহুবার তার কাছে জানতে চেয়েছে তার পরিবারের কথা, তিতির নীরব থেকে গেছে। সে রানাকেও তার পরিবার সম্পর্কে কোনো দিন কোনো প্রশ্ন করেনি। রানা সিদ্ধার্থদা এবং তিতিরের বন্ধুদেরও গোপনে বহুবার প্রশ্ন করেছে তিতিরের পরিবারের কথা। সবাই শুধু এইটুকুই জানে যে তিতির জামশেদপুরের মেয়ে, আর কিছু তারা জানে না। তাদের বিয়ের সময়ও দু-পক্ষ থেকে বন্ধুরা ছাড়া আর কেউ উপস্থিত ছিল না। রেশিডেন্সিয়াল কাগজ দেখাতে পারেনি বলে তাদের রেজিস্ট্রেশানও হয়নি। শুধু পুরোহিত ডেকে হিন্দু মতে বিয়ে সারা হয়েছে, এইটুকুই। বিয়ের পর রানা মাঝে মাঝে তিতিরকে তার পার্শে রাখা একটি ছবির সাথে কথা বলতে আর কাঁদতে দেখেছে। এই এক সপ্তাহে তার প্রশ্ন করে ওঠা হয়নি, ছবির লোকটি কে? আরেকটু সময় রানা নিতে চেয়েছিল।

আজ মিচু পিচু পাহাড়ের সন্ধ্যা নামার দৃশ্য দেখে রানার মনও খুব ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েছে। তার চোখ থেকে দু-ফোঁটা জল যখন গড়িয়ে পড়েছে তিতিরের কপালে, তিতির তার চোখের দিকে তাকিয়ে এক গভীর হতাশা দেখেছে।

সেদিন প্রথম সে তিতিরকে জানিয়েছিল তাদের দেবীপুরের বাড়ির কথা, যে বাড়ির একধার দিয়ে বয়ে যাচ্ছে কীর্তনখোলা নদী। নদীর ধারে হাজার বছরের পুরনো এক বটগাছ, যার ঝুড়িতে দোল খেয়ে রানার শৈশব কেটেছে। সব শেষে সে জানিয়েছে তার মা আর কাকিমার কথা।
রানা তিতিরকে বলেছিল, সে যে বাড়িটার স্বপ্ন দ্যাখে, রানার দৃঢ় ধারণা সে বাড়ি তাদের দেবীপুরের বাড়ি। আর তিতির যখন এ বাড়িকে স্বপ্নে বারবার দেখতে পাচ্ছিল, এর পেছনে নিশ্চই কোনো কারণ আছে। সেটাই তাকে তিতিরের এত কাছকাছি নিয়ে এসেছে।

সেদিন বহু রাতে তারা ঘুমোতে আসে, তিতির ঘুমোনোর আগে রানাকে প্রশ্ন করে,
-রানা, আমরা স্বপ্নে যা দেখি তার কোনো রঙ হয় না তাই না?

রানা বলে, হুম, হয় না। কারণ সেগুলো আমাদের কল্পনা।

তিতির নিজের বালিশ থেকে উঠে এসে রানার হাতের ওপর মাথা রেখে বলে, রানা, আমি যে স্বপ্নগুলো দেখেছিলাম, সেইসব গুলোর রঙ ছিল। লাল বেনারসী, সবুজ বটপাতা, তোমার মৃতদেহ, সব কিছুর রঙ ছিল।

রানা তিতিরকে জড়িয়ে ধরে বলল, তিতির অনেক রাত হলো, ঘুমিয়ে পড়ো।

সেদিন রাতে তিতির আবার স্বপ্ন দেখল। এ স্বপ্ন তার দেখা অন্য স্বপ্নগুলোর থেকে একটু আলাদা। তিতির দেখলো, নদীর ধারে প্রাচীন শিব মন্দির, মন্দিরের ভেতর বিশাল শিব লিঙ্গ, তার মধ্যে দুধ, বেল, ফুল, বেলপাতা স্তুপ হয়ে আছে। গর্ভগৃহ অন্ধকার। শিবের সামনে শুধু একটা তেলের প্রদীপ জ্বলছে। গর্ভগৃহের এক কোণ থেকে বাচ্চার কান্নার আওয়াজ আসছে। তিতির অন্ধকার দিকে তাকিয়ে দ্যাখে লাল চেলি আর চন্দন পরা গোটা ছয়েক বালিকা বসে কাঁদছে।প্রদীপের হাল্কা আলোয় তিতির তাদের মুখ দেখতে পাচ্ছে, ওদের চোখের কোণ থেকে কাজল গোলে গাল দিয়ে পড়ছে। আর তিতির কড়া গাঁজার গন্ধ পাচ্ছে। প্রদীপটা নিভে যেতেই চারদিক অন্ধকার। সে আর বাচ্চাদের কান্নার আওয়াজ পাচ্ছে না। তিতিরের মনে হচ্ছে, তার কোনো শরীর নেই। সে ইচ্ছে করলেই যেকোনো জায়গায় চলে যেতে পারে। সে বন্ধ দরজা ভেদ করে বেরিয়ে এসে দ্যাখে, মন্দিরের চাতালে প্রদীপ হাতে দুই মহিলা বসে আছেন। তারা তিতিরকে দেখে উলু দিতে শুরু করল, চারদিক থেকে শাঁখ বেজে উঠল। তিতির পেছন ফিরে দেখল মন্দিরের ভেতর থেকে আলতা মাখা পায়ের ছাপ এসে পড়েছে চাতালে। শাঁখের আওয়াজ তীব্র হচ্ছে। তিতির এই আওয়াজ নিতে পারছে না। কানে হাত দিয়ে চিৎকার করার চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না।

ঘুম ভাঙলে তিতির দ্যাখে মিচু পিচু পাহাড় থেকে মন খারাপের সঙ্গীত ভেসে আসছে। সে রানার কাধে মাথা রেখে শুয়ে আছে।

তিতিরের মনে হল সে বহুক্ষণ এখানে থেকেও উধাও হয়ে গেছিল, তাই পঞ্চ ইন্দ্রিয় সজাগ থাকলেও সে কোন কিছু অনুভব করে উঠতে পারেনি। খুব ঝড় হচ্ছে, মাধবীলতার ঝাড়টা ঝোড়ো হাওয়ায় খুব জোরে জোরে দুলছে। ঝড় শুরু হওয়ার আগে পাখিরা ছোটাছুটি করে, কিন্তু এই অঞ্চলে চারপাশে ঘণ গাছপালা থাকলেও তিতির কোন দিন কোন পাখির ডাক শোনেনি। চিকোনের পর্দার নিচে যে ঘুঙ্গুরগুলো লাগানো আছে তাতে ঝম ঝম আওয়াজ হচ্ছে, দরজার ভেতরে কিছু দেখা যাচ্ছেনা, ঘরে আলো জ্বালানো হয় নি। এ বাড়িতে টিয়া নামের একটি কাজের মেয়ে আছে, টিয়া তার বাবা বলরামের সাথে এবাড়ির নিচতলার ঘরে থাকে। বলরাম প্রায় তিরিশ বছর এ বাড়িতে থাকে। বলরামের মতন তার বাবা বাসুদেব এই বাড়ির দারোয়ান ছিল, বাবার মৃত্যুর পর ছেলে দারোয়ান হয়েছে। টিয়ার মাকে তিতির কোন দিন দ্যাখেনি। তিতিরের মনে হয় টিয়ার মা নেই। মেয়েটার সাথে খোলা মনে কথাও বলা যায় না, তার মনে হয় মেয়েটা যেন তাকে ভয় পায়। কোন কিছু বলার থাকলে দূর থেকে বলে, আর যখন সে কথা বলে তার গলা কাপে, কপালে ঘাম হয়। তিতির যখন নিজের ঘরে থাকে মেয়েটা তখন বাইরের সব কাজ সেরে নেয়। তিতিরের অনুপস্থিতিতে সে তিতিরের ঘরে কাজ করতে আসে।

আজ মেয়েটা এখনো ওপরে আসে নি, হয় তো চারদিক অন্ধকার হয়ে গেছে বলে ভয়ে আসছে না। তিতিরের ঘরের ভেতর যেতে ইচ্ছে করছে না। কীর্তনখোলা নদীর ওপর ঘন মেঘ জমেছে, নদীর মাঝখানে এখন বৃষ্টি শুরু হয়েছে, আর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে দেবীপুরে বৃষ্টি শুরু হবে। জামসেদপুরের মেয়ে তিতিরের কোন দিন বৃষ্টিতে ভেজা হয় নি, জীবনের সব কিছু ভালোলাগার স্বাদ সে নিতে চায়, তাই হয় তো আজ বৃষ্টিতে ভেজার অপেক্ষায় সে আছে। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পরও বৃষতি কিছুতেই এগিয়ে আসছে না তাদের বাড়ির দিকে, পাখির ডাক, বৃষ্টি সব কিছুর থেকে যেন এ অঞ্চল বঞ্চিত। এখানে আসার পর কোন ফুলের গাছও তার চোখে পরেনি। তাহলে কি এখানে কোন ফুলও ফোটে না। অনেকক্ষণ নদীর দিকে একভাবে তাকিয়ে থাকার সময় তিতির মন্দিরের ঘন্টার আওয়াজ পেল। ঝোড়ো হাওয়ায় খুব জোরে জোরে ঘন্টাগুলো বাজছে।রানাদের কুলদেবতা বিশ্বেশ্বরের মন্দির থেকে মনে হয় এই আওয়াজ আসছে, ওদের এখানে আসার পর এত দিন কেটে গেছে, কিন্তু রানা কোন দিন তাকে সেই মন্দিরে নিয়ে যায়নি, নতুন বৌ প্রথম বাড়িতে এলে তাকে আগে কুলদেবতার দর্শন করাতে নিয়ে যায় সবাই, কিন্তু এ বাড়িতে রানা ছাড়া আর তো কেউ নেই যে তাকে নিয়ে যাবে। আর সে তো গ্রামে তার মায়ের নামে একটা মানসিক হাসপাতাল তৈরির কাজে সারা দিন ব্যস্ত। তিতিরের মনে হল সাদা চিকোন পর্দার ভেতর দিয়ে একটা মৃদু আলো সে দেখতে পাচ্ছে, অন্ধকারের মধ্যে ছোট্ট একটা আলো। তিতির পর্দা সরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই তার পেছনে পর্দাটা ঝম করে একটা শব্দ তুলল। ক্ষনিকের জন্য একটু চমকে গেছিল সে। কিন্তু একটু গা ছমছম পরিবেশ না হলেও যেন ঠিক জমে না। কথাগুলো মনে মনে ভেবে তিতিরের খুব মজা লাগলো, তার মতন ভাগ্যবান মানুষ হাতে গুনে কয়েকজনই হয়, যারা এরকম পরিবেশে থাকার সুযোগ পায়। বসার ঘর থেকে বেরিয়ে শুরু হয় লম্বা বারান্দা, বারান্দার শেষ প্রান্তে জ্বলছে আলো। একটা খস খস শব্দ সে শুনতে পেলো, খুব দ্রুত শব্দ হচ্ছে, তিতিরের মনে হল এখন ওখানে যাওয়াটা ঠিক হবে না, আর কিছুক্ষণ বরং এসব কিছুর মধ্যে থাকা যাক, তারপর না হয় গিয়ে দেখা যাবে, তিতির মনে মনে হাসলো আর বলল, গেলেই তো সব শেষ আর কি। সে বারান্দার এক কোনে বসে পড়ল, তিতির দেওয়ালে হেলান দিয়ে তাকিয়ে আছে তার মাথার ওপরের ঝাড়বাতিটার দিকে, বাইরে এত হাওয়া, সেই হাওয়া বারান্দায় এলেও ঝারবাতি দুলছে না। এই লম্বা বারান্দায় গোটা দশেক ঝাড়বাতি তো আছেই, কিন্তু তারা যেন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ যে কোনদিন তারা দুলবে না। এই বাড়ির গঠনটা অন্য জমিদার বাড়ি থেকে একেবারে আলাদা। কিরকম যেন একটা গোলোক ধাঁধার মতন, বাড়ির কোন একটা নির্দিষ্ট দিককে কোন একটি দিক থেকে ঠিকঠাক দেখা যায় না। সে এবার উঠে দাঁড়াল, তার মনে হচ্ছে পশ্চিমের বন্ধ দরজার ভেতর থেকে আলো আসছে, সে কিছুটা গিয়ে দেখল আজও দরজা বন্ধ, কিন্তু দরজার ফাঁক দিয়ে আলো বের হচ্ছে। এই দরজাটা সব সময় বন্ধ থাকে, সে বহুবার খোলার চেষ্টা করেও পারেনি। কিন্তু আজ একটা ধাক্কা দিতেই দরজাটা খুলে গেলো। ঘরের ভেতরে তিতির যা দেখল তা যদি সত্যি হয় তাহলে নয় তিতিরের মানসিক কোন সমস্যা আছে আর তা যদি না হয় তাহলে এই বাড়ির ভেতরে কোন সমস্যা আছে যা খালি চোখে ধরা যাচ্ছে না। ঘরের ভেতরে ঢুকে সে দেখল টিয়া মেঝের ওপর বসে ছবি আঁকছে, ছবিতে কোন রঙ নেই, স্কেচ করা হচ্ছে, মেয়েটি খুব দ্রুত স্কেচ করে চলেছে তাই দূর থেকে কিছু একটা ঘসার শব্দ সে পেয়েছে। টিয়া ছোট মেয়ে , সে ছবি এঁকেছে, তাতে কোন অস্বাভাবিক কিছু হয়নি, কিন্তু যা অস্বাভাবিক তাহচ্ছে, যে টিয়া তিতিরকে দেখলে ভয় পায়, তার কাছে আসার সাহস টুকুও তার মধ্যে নেই, সেই টিয়া তিতিরকে ঘরে ঢুকতে দেখে ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে বলে, “মামনি, আজ আমি দুটো ছবি একেছি, তুমি দেখবে?” আরেকটা অস্বাভাবিক ব্যাপার হচ্ছে এই ঘরের পরিবেশ, এই ঘরে ঢোকার আগে সময়টা ছিল বিকেল বেলা, সে আকাশে মেঘের ঘনঘটা দেখেছে, চারিদিক অন্ধকার করে এসেছিল। কিন্তু এই ঘরে ঢুকে মনে হল যেন সবে সকাল হয়েছে, চারদিক আলোয় ঝলমল করছে, এই প্রথম সে এই বাড়ির জানালায় এক চড়ুই পাখিকে দেখতে পেল, বাইরে থেকে পাখির ডাক আর আলো এসে ঝলমল করছে এই ঘর। তিতির টিয়ার মাথার মাঝখানে চুমু খেয়ে বলল, “তুমি কি বলে ডাকলে আমাকে ? আরেকবার ডাকো।” টিয়া বলল, “কেন, তুমি জানো না, তুমি তো আমার মামনি হও।’’ এই প্রথম তিতির নিজের মধ্যে মাতৃত্ব অনুভব করলো। সে প্রথম টিয়াকে খুব কাছ থেকে দেখলো, তাকে ছুয়ে অনুভব করল। টিয়াকে দেখে কোনভাবেই মনে হয় না এ বাড়ির কাজের মেয়ে। তার শরীরের ঘঠন, কথা বলার ভঙ্গিমা দেখলে তাকে মনে হয় কোন সম্ভ্রান্ত বংশীয়া। মনে একবার খটকা লাগলো, সে যাকে দেখছে সে টিয়া তো ? কিন্তু টিয়া ছাড়া আর কারুর তো আসা সম্ভবও না এই বাড়ির ভেতরে। মেয়েটিকে যতবার সে দেখেছে দূর থেকে দেখেছে, তাছাড়া এ বাড়ির অন্য ঘরগুলো দিনের বেলায়ও এত অন্ধকার থাকে যে সামনা সামনি কেউ দাড়িয়ে থাকলেও তার মুখ ঠিকঠাক দেখা যায় না। তিতির টিয়াকে বলল, টিয়া তুমি কি কি ছবি এঁকেছ, আমাকে দেখাও। টিয়া মেঝের ওপর বসে মেঝের ওপর জোরে জোরে আওয়াজ করে তিতিরকে বলল, “বসো, আমার পাশে এসে বসে আগে আমাকে আদর করো, তারপর আমি তোমাকে সব ছবি দেখাবো।’’ তিতিরের মনে হল এই মেয়েটির সাথে ওর বহুদিনের কোন গভীর সম্পর্ক আছে, যা সে এই মুহূর্তে মনে করতে পারছে না। মনে করার দরকারও নেই, কারন যে কোন সম্পর্ককে নতুন করে আবিষ্কার করতে তিতিরের ভালো লাগে, এতে সম্পর্ক গুলো পুরনো হয় না। সে টিয়ার পাশে বসে ওকে জড়িয়ে ধরে টিয়ার কপালে, গালে সব জায়গায় চুমু খেলো। টিয়ার চোখ দুটো খুব বড়, ঘন কালো চোখের পাতা টিয়ার চোখকে অন্য একটা মাত্রা দিয়েছে। সে সদ্যজাত শিশুর মতন তাকিয়ে আছে তিতিরের দিকে। আদরকরা শেষ হলে টিয়া তার আকা ছবি দেখায়, ছবিতে একটা মন্দির, মন্দিরটা বেশ সুন্দর, তার চারপাশে বাগানে ফুল ফুটে আছে কিন্তু টিয়া ফুলে কিংবা মন্দিরে কোন রঙ করেনি। আরেকটা ছবিতে একটা জানালা, জানালা দিয়ে মন্দির আর তার বাগান দেখা যাচ্ছে। ছবির জানালাটা এই ঘরের জানালার মতন দেখতে। জানালা গুলো মেঝে পর্যন্ত, এই বাড়ির সব কটা জানালা এক হলেও এই ঘরের জানালার মধ্যে দুটো রড নেই। আর বাকি রড গুলো একটু বাকা। ছবির জানালাটাও অবিকল এক রকম, জানালার রড গুলো যে জায়গায় যেমন বাকা, ছবিতেও ঠিক এক ভাবে আকা হয়েছে। ছবিটা ভালো করে দেখলে মনে হবে যেন ছবিটা জানালার জেরক্স কপি। তিতির উঠে গিয়ে জানালার সামনে গিয়ে দাড়াল, এই খান থেকে একটা সাদা রঙের মন্দির দেখা যাচ্ছে, মন্দিরের সামনে অনেকটা জায়গা নিয়ে বাগান, বাগানে নানা রঙের ফুল ফুটে আছে। মন্দিরের ডানদিকে একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ আছে, পুরো গাছটা ফুলের ভারে কেমন যেন কমলা হয়ে আছে। তিতির মনে মনে ভাবছে, সামনে শিবরাত্রির পূজা আছে, সেই দিন মন্দিরে গিয়ে সে মহাদেবকে পূজো দেবে। টিয়া খিলখিল করে হেসে ফেললে, তিতির একটু চমকে গেলো, সে বলল, “কি রে হাসছিস কেন ?” “তুমি ঠিকই ধরেছ এটা মহাদেবের মন্দির। গতবছর বিশ্বশ্বরের মন্দিরের প্রতিষ্ঠা হয়েছে, আগে তো এ গ্রামে কোন মন্দির ছিল না, পাশের গ্রাম পলাশপুরের শিব মন্দিরে সবাই পায়ে হেটে পূজা দিতে যেতো। গ্রামবাসীর যাতে সুবিধা হয়, তাই তো বড় ঠাকুর এই মন্দির তৈরি করলেন।” তিতিরের মনে হল মেয়েটা মনের কথা বুঝতে পারে । টিয়া বলল, “সে একটু একটু বুঝতে পারি বৈকি ।’’ তিতির মনে মনে ভাবলো, সে কোন একটা বইতে পড়েছে যাদের মনযোগ খুব বেশি থাকে, তারা মানুষের মনের কথা পড়তে পারে। এই মেয়ের সেরকম কোন ক্ষমতা নিশ্চই আছে। তাই এর সামনে আর কিছু ভাবা ঠিক হবে না। টিয়া দরজার দিকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বলল, “ঐ দ্যাখো, তোমাকে তোমার বর ডাকছে, তুমি এখন এসো বুঝেছ?”

মেয়েটার মুখে সবসময় একটা মায়া মাখা হাসি থাকে, সে কত সুন্দর গুছিয়ে কথা বলতে পারে । এ বয়সী কোন মেয়ের কাছে এসব আশা করাই যায় না। তিতির বলল, “পাকা বুড়ি একটা, কোথায় আমাকে ডাকছে?” মেয়ের মুখের হাসির সাথে চোখ দুটো আরো উজ্জ্বল হয়ে উঠল, সে বলল, “দরজাটা বন্ধ তো, তাই বুঝতে পারছো না তুমি।” তিতির দেখল দরজায় খিল দেওয়া, কিন্তু সে তো দরজা বন্ধ করে নি, তবে? তিতির উঠে দরজাটা খুলতেই অন্ধকার বারান্দার ওপর পাশের ঘর থেকে আসা লন্ঠনের আলো দেখতে পেলো। সে পেছন দিকে তাকিয়ে দেখে ঘরের দরজা বন্ধ। দু’তিনবার ধাক্কা দিয়েও সেই দরজা আর খুললো না অথচ দরজায় বাইরে থেকে কোন তালা ঝোলানো নেই। তাহলে সে এতক্ষন কার সাথে কথা বলছিল! তিতিরের খুব ভয় করছে, সারা গা দিয়ে তার ঘাম ঝড়ছে, সে তাড়াতাড়ি হাটতে লাগল, সামনে সিড়ির ধারে টিয়া দাড়িয়ে আছে।

তিতির চীতকার করে বলল, “টিয়া, তুই এখানে কি করছিস? তিতিরের মনে হল টিয়ার সারা শরীর ভয়ে কাপছে, সে পাশের টেবিলের ওপর হ্যারিকেন রেখে কাপা গলায় বলল, “মামি ভুল হয়ে গেছে, আর আসবো না, আমাকে মাফ করেন।” তিতির এই টিয়াকে তার দেখা সেই টিয়ার সাথে কিছুতেই মেলাতে পারছে না। আগের টিয়া তাকে মামনি বলে ডাকছিল, এই টিয়া তাকে মামি বলে ডাকছে।“কিরে টিয়া কাছে আয়, আমাকে দেখে ভয় পাচ্ছিস কেন? কি হয়েছে তোর?” টিয়া মনে হল দু’পা পেছনে সরে গেলো।পেছন দিকটা খুব অন্ধকার, সিঁড়ি তে ধুপধাপ শব্দ হল, টিয়া ভয়ে নিচে চলে যেতেই টেবিলের লন্ঠনের আলোটা নিভে গেলো। লন্ঠনে তেল না থাকার কোন কারন নেই, বাইরের হাওয়াও এখানে এসে পৌঁছচ্ছে না, তাহলে ! তিতিরের খুব ভয় করছে। তার মনে হল খসখস করে আবার সেই শব্দটা আসছে কানে। সারা শরীর ভয়ে কাপছে তার, মনে হচ্ছে গলা বন্ধ হয়ে আসবে এবার। নদীর বুকে যেন বাজ পড়ল, সেই নীল আলোয় প্রাসাদের ভেতরটা ভয়ঙ্কর এক রূপ ধারণ করল, তারপর চারদিক অন্ধকার, এখানে আর এক মূহুর্ত তার থাকা ঠিক হবে না। তিতির সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসল নীচে, বারান্দায় এসে সে টিয়াকে দেখতে পেলো, টিয়া ভয়ে গুঙ্গিয়ে উঠে ঢুকে গেলো তার ঘরে। তিতির বাগানে এসে দ্যাখে বাইরের গেট বন্ধ। সে বলরামের নাম ধরে বেশ কয়েকবার ডাকার পর বলরাম ঘর থেকে বারান্দায় বেরিয়ে আসে। বলরামের মুখ অন্ধকারে বোঝা যাচ্ছে না, শুধু অবয়ব দেখে বোঝা যায় সে একজন পুরুষ। তিতির বলে, “ বলরাম , দরজা খুলে দাও। আমি একটু বাইরে যাবো।” কিছুক্ষন সব চুপচাপ। তারপর বলরাম বলে, “ছোট ঠাকুরের নিষেধ আছে, আপনি ওপরে যান।” তিতিরের খোলা চুল হাওয়ায় উড়ছে, অন্ধকারে তাকে কোন এক তান্ত্রিক দেবীর মতন দেখাচ্ছে। সে অসহায়ের মতন বলে, “আমি তো বলছি, দরজা খুলে দাও।” বলরাম কিছুক্ষন চুপ করে দাড়িয়ে ভেতরে চলে গেলো। তিতির চারদিকে তাকিয়ে দেখল বড় বড় গাছ গুলোকে অন্ধকারে দৈত্যের মতন দেখাচ্ছে, গাড়ি বারান্দার এক কোনে মাধবী লতাটা দুলতে দুলতে হঠাত স্থির হয়ে গেলো, চারদিক চুপচাপ, কোনো সাড়াশব্দ নেই। সবাই যেন তাকে লক্ষ্য করছে। বাইরে কোথাও বৃষ্টি হলেও এই বাড়ির ভেতর হচ্ছে না, এতক্ষন হাওয়ায় গাছে পাতা নড়ছিল, এখন সব নিস্তব্ধ। সময় যেন থমকে গেছে। তিতিরের খুব কান্না পেলো, মনে হচ্ছে সে পাগল হয়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষন অন্ধকারে দাড়িয়ে থাকার পর তিতির অনুভব করল তার চুল গুলো আবার উড়তে থাকল। সে যেখানে দাড়িয়ে আছে তার ঠিক ডানদিকে মাধবীলতার গাছটা খুব জোরে জোরে দুলতে লাগল, সেই সাথে বাগানের গাছের পাতার আওয়াজ সে পেলো। এরকম কয়েক সেকেন্ড চলার পর আবার সব স্তব্ধ হয়ে গেলো। এরকম কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধ থাকার পর এবার যেন সাইক্লোন শুরু হল বাগানের ভেতরে।তিতির সিঁড়ি দিয়ে বাড়ির ওপরে উঠে আসছে , সে খুব জোড়ে দৌড়েছে বলে কিছুক্ষন চোখ বন্ধ করে হাফাতে থাকল। সে চোখবন্ধ করে রবীন্দ্রনাথের গান শুনতে পেলো। “রাত্রি এসে যেথায় মেশে দিনের পারাবারে
তোমার আমার দেখা হল সেই মোহনার ধারে।” তিতির চোখ খুলে দ্যাখে সারা বাড়ি আলোয় ঝলমল করছে। গানটা সেই বন্ধ ঘরটার দিক থেকে আসছে। তিতির ধিরে ধিরে সম্মোহনের মধ্যে দিয়ে যেন এগিয়ে গেলো সে দিকে। দরজার সামনে পৌছতেই গানটা বন্ধ হয়ে গেলো। দরজার নিচ থেকে আলো বেরচ্ছে, সে দরজায় ধাক্কা দিতেই দরজাটা খুলে গেলো, আলোয় ঝলমল করছে সে ঘর। খাটের মধ্যে দুই ভদ্রমহিলা বসে গল্প করছেন, দুজনের পড়নে হাল্কা সবুজ রঙের মসলিন শাড়ি, দুজনের নাকে নথ আর সারা শরীরে ভাড়ি গয়না। তিতিরের দৃষ্টি গেলো মানতাসার দিকে, দুজনে এক ডিজাইনের মানতাসা পড়েছে। একজন জাতা দিয়ে সুপারি কাটছে আরেকজন পানের ডাবর থেকে মশলা বার করে মুখে পুরলেন । তিতিরকে ঘরে ঢুকতে দেখে দুজনেই হাসি মুখে সেই দিকে তাকালেন, যিনি সুপারি কাটছিলেন তিনি বললেন আয় মামনি, তোর জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। তিতির ওদের দিক থেকে মুখ সরিয়ে জানালার দিকে গেলো, বাইরে থেকে নানা রকমের আওয়াজ আসছে। যেন কোন উৎসব হচ্ছে। তিতির জানালার দিকে তাকিয়ে দ্যাখে জানালার রড গুলো সব কে ঠিক করে দিয়েছে, সে সেই রড ধরে তাকালো বিশ্বেশ্বরের মন্দিরের দিকে। মন্দির প্রাঙ্গনে মেলা বসেছে।সে মন দিয়ে গ্রামের মেলা দেখছে, কত রকম দোকান, দোকানিরা নানা রকম জিনিসের পসরা নিয়ে বসেছে।এমন সময় ঘরের ভেতরে গ্রামাফোনটা হঠাৎ বেজে উঠল। তাতে গান হচ্ছে “সেইখানেতে সাদায় কালোয় মিলে গেছে আধার আলোয়,
সেইখানেতে ঢেউ উঠেছে এ পারে ওই পারে।” তিতির পেছন ফিরে তাকিয়ে দ্যাখে টিয়া খাটে বসে পা দোলাচ্ছে, দুই ভদ্রমহিলা সেখানে আর নেই, টিয়া তিতিরের তিকে তাকিয়ে খিলখিল করে হাসছে, “কি গো মিলে গেলো তো এপারে আর ওপারে? হ্যা?” মেয়েটার হাসির মধ্যে ভয়ঙ্কর একটা ধার আছে, সেই ধারটা তিতিরের বুকের ভেতরটা যেন চিড়ে দিলো। চারিদিক অন্ধকার হয়ে গেলো আবার, কিন্তু গ্রামাফোনের গানটা চলতে চলতে আওয়াজ গুলো কেমন জড়িয়ে অন্য রকম শব্দ বের হতে লাগল। এ যেন এক পুরুষের গলার শব্দ, সে শিব স্তোত্র উচ্চারন করে চলেছে, মন্দিরে শিঙ্গা বেজে উঠল, সেই সঙ্গে উলু ধ্বনী। মন্ত্রের ধ্বনী যত তীব্র হল সেই সঙ্গে উলুধ্বনী আর সিঙার শব্দ যেন চারদেওয়ালে প্রতিধ্বনীত হতে লাগল, সে এখন মন্দিরের গর্ভগৃহে দাড়িয়ে আছে, চারিদিকে ঘন অন্ধকার। সে শুধু শিব লিঙ্গ দেখতে পাচ্ছে। তিতির জ্ঞান হারালো।

খাতা পর্ব৫

দেবশ্রী চক্রবর্তী

বলরাম বলেছে , তাকে দরজা খুলে দেওয়ার জন্য বেশ কয়েকবার বলা হয়েছিল কিন্তু সে সদর দরজা খুলে দেয় নি। কিন্তু তার কথা বিশ্বাস করার মতন কোন যুক্তি সে খুঁজে পাচ্ছে না। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ, কিন্তু একটা জলজ্যান্ত মানুষ এত বড় বাড়ি থেকে পুরো গায়েব হয়ে যায় কি করে! এই বাড়ির এমন কিছু জায়গা আছে যেখানে এই প্রজন্মের কারুর যাওয়া সম্ভব না, সেই সব জায়গা গুলো বাদ দিয়ে আর সে জায়গা গুলো যাওয়া সম্ভব তা ভালো করে খুঁজেও যখন তাকে পাওয়া গেল না, তখন রানা বড় সার্চ লাইটটা নিয়ে বেড়িয়ে পড়ল গ্রামের পথে, সে মনে মনে কিছুর যে একটা আশঙ্কা কে নি তা নয়, সে যা ভাবছে তা যদি ঠিক হয় , তাহলে তার ধারনা সে ঠিক পথেই চলেছে।

ডানদিক দিয়ে ছুটে চলেছে কীর্তনখোলা, নদী আজ উত্তাল হলেও নদীর ধারের ঘন গাছপালার ওপর তার কোন রকম প্রভাব পরে নি। সবাই যেন আজ নির্বাক, রানার মাঝে মাঝে মনে হয় দেবীপুর গ্রামের মানুষের মতন এখানকার প্রকৃতিও খুব একটা স্বাভাবিক না। এ গ্রামের বহু মানুষ প্রতি বছর মানসিক ভাবে বিকারগ্রাস্থ হয়ে পরে,রানা এই ব্যাপারটা নিয়ে বহু গবেষণা করেও কোন উত্তর খুঁজে পায়নি।

নদীর ধারদিয়ে যে পথ ধরে সে এগিয়ে চলেছে তার দুই দিকে ঘন জঙ্গল। দু ধারের ঝোপের ভেতর থেকে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকের সাথে সাথে ব্যাঙের ডাকও পাওয়া যাচ্ছে, নদীর ওপাড়ে বৃষ্টি হলেও ছিটেফোঁটা তার আচ এদিকে এসে পড়েনি। রানা টর্চের আলোটা ঘড়ির ওপর ফেলে দেখতে পেলো রাত আটটা বাজে, এই সময়টা গ্রামের মানুষজনের কাছে মাঝরাত, তাই পথঘাট সব কিছু শুনশান। এ পথে এইসময় কেউ আসে না। কিন্তু রানার মনে হল ওর পেছন পেছন কেউ যেন আসছে, যার উপস্থিতি সে অনুভব করতে পারছে। এই ভাবে কিছুক্ষণ যাবার পর রানা ইচ্ছে করেই থমকে দাঁড়াল, এবার সত্যি একটু অন্যরকম লাগছে ওর, চোর ডাকাতের তো অভাব নেই এই অঞ্চলে, ঝোঁকের মাথায় এইভাবে একা আসা ঠিক হয়নি। দারওয়ানকে সঙ্গে আনলে ভালো হত। খুব জোড়ে নিঃশ্বাস নিলে যেমন একটা শব্দ হয়, এরকম শব্দ সে শুনতে পেলো। রানা এবার মনের জোড়ে পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখল তার থেকে তিন চার হাত দূরে একটি কালো কুকুর দাঁড়িয়ে আছে, এই কুকুরটির শ্বাসের শব্দ সে পেয়েছে।

বাঁদিকে একটা সরু পথ দিয়ে জঙ্গলের মধ্যে কিছুক্ষণ চলার পর একটা পেঁচার ডাক সে শুনতে পেলো। পেঁচাটা ডাকতে ডাকতে মন্দিরের চূড়ায় গিয়ে বসল। রানা এখানে দাঁড়িয়ে নিজের বাড়ি দেখতে পেলো। এই বাড়ি আর মন্দিরের মাঝে একসময় মেলা বসত, এসব অবশ্য কয়েকশ বছর আগেকার কথা। প্রায় দুশো বছর এই জঙ্গল পরিষ্কার করার মতন কোন উদ্যোগ এই বাড়ির কারুর মধ্যে দেখা যায় নি। মন্দিরে পূজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে এই মন্দির আর রাজবাড়ির মাঝে এই জঙ্গল দিয়ে বিধাতা এক অলিখিত আড়াল তৈরি করে দিয়েছেন। রানা টর্চের আলো ফেলে দেখল বাড়ির পূর্ব দিকের ঘরের জানালাটা খোলা, তার বাঁকা শিক ধরে কে যেন দাঁড়িয়ে রানাকে দেখছে। যে দাঁড়িয়েছিল সে হুট করে সরে যাওয়ায় রানা তাকে ঠিক করে দেখতে পায়নি। একবার মনে হল তিতির না তো? কিন্তু তার তো ঐ ঘরে ঢোকা সম্ভব না। কিছুক্ষণ ভাবার পর মনে হল সব দুর্বল মনের ভ্রম। মন যখন দুর্বল থাকে মানুষ এরকম অনেক কিছু দেখতে পায়, সেগুলো কোনটাই সত্যি না। পেঁচাটা মন্দিরের ওপর থেকে উড়ে রানার মাথার ওপরের গাছের ডালে এসে বসে ডেকে উঠল। রানা কিছুটা ঘাবড়ে গিয়েছিল, কিন্তু সেটা খুব সামান্য কিছু সময়ের জন্য। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে সে এগিয়ে চলল মন্দিরের দিকে। ভাঙ্গা মন্দিরের ইটের ফাঁক গুলো চিরকাল সাপখোপের খুব প্রিয় বাসস্থান, তাই একটু সাবধানে এগিয়ে যেতে হবে। সিঁড়ি দিয়ে কিছুটা ওঠার পর রানা মন্দিরের চাতালের ঝোপের মধ্যে তিতিরের হলুদ রঙের শাড়িটা দেখতে পেলো। রানার সারা শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেলো। মনের মধ্যে এবার দুশ্চিন্তারা দানা বাধছে। কত গুলো কার্য কারণকে সে এক করে যে চিত্র দাড় করালো তা ভেবেই হাতপা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে। মন্দিরের চাতালের গাছগুলোও সব শোয়ানো, যেন ভাঁড়ি কিছু এর ওপর দিয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

সে মন্দিরের ভেতর শিব লিঙ্গের বাঁদিকে তিতিরকে অর্ধোলঙ্গ অবস্থায় উদ্ধার করল।

বাড়ি ফিরে সে তিতিরের সারা দেহ পরীক্ষা করে দেখেছে, কোথাও কোন অস্বাভাবিক দাগ কিংবা সন্দেহজনক কিছু সে খুঁজে পায় নি। তিতিরকে কেউ যেন সেখানে কোলে তুলে শুইয়ে দিয়ে এসেছে। পালস ঠিকঠাক চলছে, কিন্তু এখনো তিতির ঘুমচ্ছে। তার নাকডাকার শব্দ ঘরের চার দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। রানা ইচ্ছে করেই ঘরের সব আলো নিভিয়ে দিয়েছে, শুধু নীল রঙের ডিম আলোটা জ্বলছে। অন্ধকারে কয়েকবার বলরামের মুখটা কল্পনা করেও কোনভাবে তিতিরের এই কেশের সাথে তাকে জড়াতে সে পারছে না। প্রায় পাঁচশ বছরের বিশ্বাস যার সাথে জড়িয়ে আছে সেই বিশ্বেশ্বরের দিব্যি খেয়ে কেউ এত বড় মিথ্যে কথা বলতে পারে না। তাছাড়া বলরামের পরিবারের-বলিদানের কথা ভোলা উচিৎ না। এই মুহূর্তে একটা সিগারেট খাওয়া খুব দরকার। সিগারেট না খেলে ঠিকঠাক চিন্তা আসে না। তাছাড়া তিতিরের কেসটা বুঝতে গেলে বাস্তব জগতকে ধোয়াময় করে দিয়ে আরেকটু গভীর ভাবে ব্যাপারটা ভাবতে হবে।

রাতে তার খাওয়া হয় নি। তাছাড়া এতটা পথ তিতিরকে কোলে তুলে আনতে গিয়ে তার বুকের ছাতি শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। বিছানার পাশে টেবিলে রাখা জলের বোতল থেকে রানা জ্বল খেয়ে একটা সিগারেট জ্বালিয়ে জানালার সামনে এসে দাঁড়াল। বাইরের জঙ্গল থেকে ঝিঁঝিঁ পোকা আর ব্যাঙের ডাক আসছে। রানা সিগারেটের সাদা ধোয়ার মধ্যে দিয়ে দুটো উজ্জ্বল আলো দেখতে পেলো। আলো দুটো বাড়ির ভেতরের বাগান থেকে আসছে, রানা টর্চ-লাইটের আলো ফেলতেই দেখতে পেলো কালো কুকুরটা রানার দিকে তাকিয়ে আছে। তার মানে সে যখন বাড়িতে ঢুকছিল, কুকুরটা তার পেছন পেছন এসে ঢুকেছে। এ বাড়ির কারুর কোন কালে এই জীবটিকে পছন্দ না। মা, কাকিমা কোন দিন এ বাড়ির চত্বরে কুকুর ঢুকতে দেয় নি। ওরা যখন বেঁচে ছিলেন কোন রকম অরাজকতা সহ্য করতেন না। সব কিছু কঠোর নিয়মানুবর্তিতার মধ্যে চলত। কিন্তু তিতিরের চরিত্র ঠিক এদের উলটো। রানা সিগারেটে টান দিয়ে একবার ভাবলো, তিতির যদি এদের মতন হত, তাহলে এত ভাবতে হত না। কথাটা মনে আসতেই রানা নিজের ভাবনার পরিবর্তন করে নিয়ে আবার ভাবলো, তিতিরকে ওদের মতন হতে হবে না। এক বছরের মধ্যে যেভাবে এক সাথে সে তার খুব কাছের এই দুই মহিলাকে হারিয়েছে, তা সত্যিই ভাবা যায় না। এ বাড়ির কোন কিছুর ছায়া যেন তার স্ত্রীর ওপর না পরে।

কুকুরটা এখনো এক ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। কুকুরের লেজটা কেমন যেন সোজা, ডোভাবম্যান কুকুরের লেজ নাকি এরকম সোজা হয়, তাই কেটে দিতে হয়। কিন্তু এর চেহারা ছবি দেখে তো ডোভারম্যান মনে হচ্ছে না। অবশ্য কুকুর সম্বন্ধে তার বিশেষ জ্ঞান নেই। একটি প্রজাতির কুকুরের বিশিষ্ট অন্য প্রজাতির মধ্যে থাকা অস্বাভাবিক না। তাই এই বিষয়টিকে নিয়ে মাথার গন্ডোগোল করা নিরর্থক।

অতীতে এ বাড়িতে ঘটে যাওয়া ঘটনার কোনরকম প্রভাব মনের ওপর ফেলা ঠিক না। সে “দ্যা সিকরেট” নামে একটি বই পড়েছিল, যাতে লেখা আছে সব সময় পজিটিভ চিন্তা করা উচিৎ। কারণ মানুষ নিজে যা যা চিন্তা করে তার ভবিষ্যৎ জীবনের ওপর তার প্রভাব পরে। এতদিন এই পরিবারের সবাই একটা সংস্কারের বশবর্তী হয়ে যাযা ভেবেছে তাদের জীবনে তাই ঘটেছে। এটা পুরোপুরি সায়েন্স। যা প্যারা সাইকোলজির অংশ। মানুষ নিজের জীবনের টেলিপ্যাথিক জোড়ের মাধ্যমে বহু অসম্ভবকে সম্ভব করতে পেরেছে।

সিগারেটটা শেষ করে রানা ঘরের আলো জ্বালিয়ে আলমারি খোলে। আলমারির ডান দিকে নানারকম ব্যাগ ঝুলছে। তার মধ্যে একটা হলুদ রঙের পার্স রানা খুলে একটি ছোট্ট কালো চামড়ার কভার বারকরে। ঘরের আলো বন্ধ করে সে টর্চের আলো ফেলে ছবিটার ওপর । একজন মাঝবয়সী ভদ্রলোক। ছবি দেখে ঠিক বয়স বোঝা যাচ্ছে না, সাদা কালো ছবির জন্য গায়ের রঙ বোঝা যাচ্ছে না। মাথায় সাদা পাকা চুল আছে, কিন্তু ভদ্রলোক যে তিতিরের বাবা তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তিতিরের মুখ কেটে যেন এনার মুখের ওপর বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। রানা ছবিটা মোবাইল ক্যামেরায় তুলে নিলো। তারপর কভার থেকে ফটোটা বারকরে তার পেছন দিকটা দেখার চেষ্টা করল। যা অনুমান করেছে তাই, পেছনে একটা স্ট্যাম্প আর সিগনেচার দেওয়া আছে। সাধারণত ছবির সামনে এয়াটেস্টেড করা হয়, কিন্তু এখানে ছবির পেছনে করা হয়েছে। রানা সেই ছবিও মোবাইলে তুলে জিনিশ গুলো যথা স্থানে রেখে দিলো।

আজ এক সপ্তাহ হল তিতিরের জ্বর কমেনি। সব সময় যেন একটা ঘোড়ের মধ্যে সে থাকে, কারসাথে কথা বলে কিছু বোঝা যায় না। গত পাঁচদিন রানা বাড়িতে বসে বসে অনেক কথা ভেবেছে, কিন্তু বাড়িতে বসে থাকলে কোন সমস্যার সমাধান ঠিক মতন করা সম্ভব না, তাই আজ সে হাসপাতালের কাজ দেখতে গেছে। গত পাঁচটি রাত সে কুকুরটিকে জানালার নীচে একভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছে, কিন্তু সকালে তাকে খুঁজে পাওয়া যায়না। বলরাম জানিয়েছে বাড়ির ভেতরে সে কোন কুকুর খুঁজে পায়নি যে তাকে সে তাড়াবে। এসব শোনার পর রানার মনে হয়েছে বহু বছরের কিছু সংস্কারের তীব্র প্রভাব তার ওপর এসে পরছে।এর জন্য একটা সামগ্রিক পরিবর্তন আনা খুব জরুরি। প্রথম যে কাজটা করতে হবে তা হচ্ছে এই বাড়ি আর মন্দিরের মাঝের জায়গায় যে ঘন জংগল তা কেটে পরিষ্কার করতে হবে, বড় গাছ গুলি যা কয়েক বছরের পুরনো, সেগুলো কাটার কোন দরকার নেই, ঝোপ ঝাঁর গুলো ভালোকরে পরিষ্কার করে মন্দিরের সংস্কারের কাজে হাত লাগাতে হবে। এত বড় একটি মন্দির, শুধুমাত্র সংস্কারের বশে এসে মানুষ তাকে এইভাবে পরিত্যাগ করতে পারে না। কিন্তু মন্দিরে সংস্কার কিংবা জঙ্গল পরিষ্কারের জন্য একটা বড় অঙ্কের টাকা দরকার, যা রানার পূর্বপুরুষরা তারজন্য রেখে গেলেও খরচা করা এই মূহুর্তে ঠিক হবে না, কাড়ন হাসপাতালের কাজ আগে শেষ করা দরকার। কিন্তু মন্দির যদি সরকারকে দিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে তারা উদ্যোগ নিয়ে তার সংস্কার নিশ্চয়ই করবে। এসব অনেক কথা ভেবে রানা আজ বেড়িয়েছে।

টিয়া মাধবীলতার ঝাড়ের পাশে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখেছে ছোট ঠাকুরকে চলে যেতে। আজীবন সে এই বাড়িতে তার বাবার সাথে থেকে এসেছে, দেবীপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যখন সে পড়ত, তখন তার সহপাঠীদের সে তাদের বাড়িতে আসার জন্য বহুবার আমন্ত্রণ জানিয়েছে, কিন্তু সে অনুভব করেছে তার বন্ধুরা এ বাড়িতে আসতে ভয় পায়। এই বিদ্যালয় ছিল তার সাথে সারা পৃথিবীর যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। কিন্তু তিন বছর আগের ভয়ংকর বন্যায় সব কিছু শেষ করে দিলো। স্কুল বাড়িটাও রক্ষা পেলো, না। কীর্তনখোলার পেটে তারও স্থান হল। বন্ধুবান্ধবদেরও মনে হয় এক অবস্থা, শিউলি নামের মেয়েটির কথা আজও টিয়ার মনে আছে, এই মেয়েটাই একদিন সাহস করে তার সাথে এ বাড়িতে এসেছিল। সে টিয়াকে বলেছিল আরেক দিন সে আসবে এই বাড়িতে। কিন্তু বন্যারপর তারও আর কোন খোঁজ নেই। সত্যি সবকিছু যেন যাদুর মতন, এই আছে, এই নেই। ঠিক যেভাবে মাকে সে হারিয়েছে। একই ভাবে সে হয় তো শিউলিকেও হারিয়ে ফেলেছে। নতুন মামিকে দেখলে তার ভয় লাগে, কিন্তু সেও নাকি ভয় পেয়েছে। আজ সাত দিন সে অসুস্থ, এই সময় তার পাশে একটু থাকা দরকার, টিয়ার যখন শরীর খারাপ হয়, তখন তারও মনে হয়, যদি শাখা পলা পড়া দুটো হাত তার মাথার ওপর থাকত, তাহলে খুব ভালো হত। মামিও তো ভয় পায়, তাই মামিকে ভয় পাওয়ার মতন কিছু নেই। সেও মানুষ টিয়াও মানুষ। বিদ্যালয়ের মাস্টার মশাইয়ের ভাষায়, সব মানুষ এক মাটি দিয়ে তৈরি। মামির পাশে এখন একটু থাকা দরকার, তাকে সেবা যত্ন করে তাড়াতাড়ি সারিয়ে তুলতে হবে, না হলে মামিয়েও হয় তো হারিয়ে যাবে।

টিয়া ঘরে ঢুকে দ্যাখে তিতির এক দৃষ্টে দরজার দিকে তাকিয়ে আছে। টিয়াকে দেখে তিতির তাকে হাত তুলে ডাকলো, টিয়া আজ আর ভয় পেলো না, সে এগিয়ে গেলো মামির খাটের দিকে।

-মামি আপনের শরীর এখন কেমন আছে?

কথাটা শুনে তিতিরের শরীরটা যেন আরো ভালো হয়ে গেলো। তিতির বলল,
-তোকে দেখেই আমি অনেকটা সুস্থ হয়ে গেছিরে। তুই একটু আগে তো শাড়ি পড়ে এলি, এইটুকু সময়ের মধ্যে আবার জামা পড়ে এলি কি করে, এবার এটা বল।

-কিযে বলেন মামি, বুঝি না। আমি জীবনে কোন দিন শাড়ি পড়ি নি, আমি তো শাড়ি পরতেই জানি না। আপনার মতন তো কেউ ছিল না যে আমাকে এসব শিখিয়ে দেবে।

-তোর মা কোথায় রে টিয়া?

-বাগানের পশ্চিম দিকে একটা জামরুল গাছ আছে, আপনি হয় তো দ্যাখেন নাই, ঐ জামরুল গাছের নীচে মাকে কবর দেওয়া হয়েছিল।

-তোরা তো হিন্দু , তা হলে কবর দিলো যে?

-মায়ের ইচ্ছা ছিল তাকে কবর দেওয়া হোক, কাড়ন মা আগুনকে খুব ভয় পেতো । মা, আগে কিন্তু আগুনকে ভয় পেতো না, কিন্তু ছোট ঠাকরুনের মৃত্যুর পর দিন দিন মাকে অগুণের ভয় আরো বেশি করে পেয়ে বসল। মায়ের ধারনা ছিল , আগুনকে ছুঁলে তার শরীরে খারাপ ব্যাধি আসবে। হয়েছিলও তাই, বাবা রাগ করে একদিন মাকে দিয়ে জোড় করে রান্না করিয়েছিল, কাড়ন বাবা একজন পুরুষমানুষ হয়ে তার পক্ষে এইভাবে রান্না করা সম্ভব ছিল না।

-কি হয়েছিল তোর মায়ের?

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে টিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেছিল, মায়ের বুকের বাঁদিকে ক্যানসার হয়েছিল।

-টিয়া আমার গলা শুঁকিয়ে আসছে, একটু জ্বল খাওয়াবি?

-হ্যাঁ মামি, আমি ঘরের বাইরে কুঁজোতে ঠাণ্ডা জ্বল রেখেছি, এখুনি নিয়ে আসছি। ঠাণ্ডা জ্বল খেয়ে আপনার শান্তি লাগবে।

জ্বল খেয়ে তিতিরের শরীরটা বেশ ভালো লাগছে, সে শুয়ে আছে, টিয়া তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।

-টিয়া, তোর খুব মন খারাপ লাগে তাই না, একা একা থাকিস, এত কাজ করিস।

-কি যে বলেন মামি, আপনি আছেন তো, ভয় কি! আপনি কথা বলবেন না, চুপ করে শুয়ে থাকেন। আমি কালো কলাইয়ের খিচুড়ি আর ডিমের ঝোল বানিয়েছি, একটু পরে এসে খাইয়ে দিয়ে যাবো, মজা করে খেয়ে একটু ঘুমিয়ে নেবেন।

-টিয়া তুই আমাকে দেখে ভয় পেতিস কেনো? এটা আমার জানতে ইচ্ছে করে।

-মামি আপনি সব নিজে থেকেই জানতে পারবেন, একটু সুস্থ হোন, সারা বাড়ির মধ্যেই আপনার প্রশ্নের সব উত্তর আছে। আপনি এখন একটু শান্তি করে শুয়ে থাকুন, আমি খাওয়ার নিয়ে আসি।

তিতিরের মনে হয় এই টিয়ার মতন দেখতে এই বাড়িতে আরেকজন টিয়া আছে, যে হয় তো এই টিয়ার যমজ বোন, আরেকটু সুস্থ হলে সে খোঁজ নিয়ে সব কিছু বিচার করে দেখবে। টিয়ার মতন আরেকজনের থাকা কোনভাবেই অস্বাভাবিক কিছু না, পৃথিবীতে এক রকম দেখতে বহু মানুষ আছেন। কথা গুলো ভাবতে ভাবতে সে ঘুমিয়ে পড়ল। এবার ঘুমের মধ্যে তিতির আরেকটা স্বপ্ন দেখল, স্বপ্নে একজন মহিলাকে সে দেখল, এ মহিলা সেই মহিলা যাকে সে আগের স্বপ্নে সুপারি কাটতে দেখেছে, মহিলার বুক থেকে শাড়ির আঁচল নামানো, বুকের বাঁদিকে একটা লম্বা সেলাই, বোঝ যাচ্ছে, বাঁদিকের বুকটা কেটে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভদ্রমহিলা যন্ত্রণায় কাৎরাচ্ছে, ঘরের কোনায় তিতির নিজের উপস্থিতি অনুভব করছে , তিতিরকে দেখে সে তার ডান হাতটা এগিয়ে দিয়ে ডাকছে, তিতিরের ভয় করছে, ভদ্রমহিলার কাছে গেলে সেও সংক্রামিত হবে কোন ভয়ঙ্কর রোগে, তিতির পেছন সরতে সরতে বেড়িয়ে গেলো ঘরটা থেকে, এবার সে আরেকটা ঘরে এসে ঢুকে পরেছে, এই ঘরের বিছানায় আরেকজন ভদ্রমহিলার মৃত দেহ পরে আছে, তার শরীর থেকে মৃতদেহের গন্ধ আসছে, তিতিরে বমি পাচ্ছে। এই ভদ্রমহিলার বুকের আচলও সরানো, বুকের বাঁদিকে একটা লম্বা সেলাই। তিতির এবার ঘর থেকে বেড়িয়ে গেলো না, সে এগিয়ে আসছে দেহটার দিকে, দেহটা তাকে চুম্বকের মতন আকর্ষণ করছে। সে ঝুঁকে দেখছে বুকের দিকে। এমন সময় মহিলার চোখ দুটো খুলে গেলো, সে তাঁর দুই হাত দিয়ে তিতিরকে জড়িয়ে ধরল, বাহুর বন্ধন এত দৃঢ় যে তিতির তাকে কিছুতেই ছাড়িয়ে উঠতে পারছিল না। তিতির চিৎকার করছে, কিন্তু মৃতদেহ তাকে ছাড়ছে না। তিতির অনুভব করছে মৃতদেহের মুখ তাঁর বুকের বাঁদিকে এগিয়ে আসছে, সে মৃতার দাঁত দেখতে পাচ্ছে, সেই দাঁত ভয়ঙ্ক, যার ব্যাখ্যা দেওয়া তারপক্ষে সম্ভব না। তিতির প্রানপনে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করার সময় মৃতা তাঁর মুখে বমি করে দিলো, তিতিরের ঘুম ভেঙ্গে গেলো। সে দেখল টিয়া তাঁর মুখে জল ছেটাচ্ছে। টিয়া কাঁদছে। তিতিরকে জেগে উঠতে দেখে টিয়া তিতিরকে জড়িয়ে ধরে বলল, মামি গো, আমি তো ভেবেছিলাম তুমিও পাগল হয়ে গেছো।

খাতা পর্ব ৬

দেবশ্রী চক্রবর্তী

বিষ্টুপুরই তো লেখা ছিল, হুম, এতটা তো ভুল হবার কথা নয়, সিদ্ধার্থ ভালো করে চিন্তা করল, তিতির বিষ্টুপুরের কথাই বলেছিল। এর বেশি তো আর কিছু সে বলে নি। যত দূর চোখ যাচ্ছে জায়গাটা একেবারে পশ্চিম বঙ্গের যে কোন বাঙ্গালী পাড়ার মতন লাগছে। মেয়েটা বড্ড বেশি অন্যরকম, এত বছর সবার সাথে কাটিয়ে গেলো, কিন্তু নিজের খাপ খুব বেশি সে খোলে নি। আর রানা তো আরো অদ্ভুত , সে একটা মেয়েকে বিয়ে করার আগে তার সম্বন্ধে কোন খোঁজ খবর কিছুই নিলো না। শুধু কি তাই বিদেশে মনস্তত্ত্ব নিয়ে পড়াশুনা করতে সে এসেছিল গ্রামে গিয়ে পাগলা গারদ খুলবে বলে। সিদ্ধার্থ মনে মনে একবার হেসে নিলো। সামনে মনে হচ্ছে একটা দূর্গামন্ডপ, দু একটি ছেলে বসে আছে, এদের জিজ্ঞাসা করলে হয় তো কিছু বলতে পারবে, কিন্তু যে মেয়ে প্রায় পাঁচ বছর আগে এখান থেকে চলে গেছে, তাকে কি এরা চিনতে পারবে। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে সিদ্ধার্থর মনে হল রানাকে একবার ফোন করে নিলে ভালো হয়। রানা বাংলাদেশ গিয়ে একবার ফোন করেছিল, নাম্বারটা মনে হয় সেভ করা আছে। সিদ্ধার্থ তার ফোনে একটু খুঁজেই রানার নাম্বারটা পেয়ে গেলো।

রানা তার হাসপাতালের একতলার ঘরে বসে বসে অনেক কিছু ভাবছিল। এই ঘরটার মধ্যে একটা অন্যরকম শান্তি আছে যা হয় তো সারা পৃথিবীর কোন কোথাও নেই। এই বাড়িটা একসময় তার ঠাকুরদার বাবা ব্যক্তিগত কোন কারণে বানিয়েছিলেন। শেষ জীবনে নাকি তিনি এই বাড়ির মধ্যে নিজেকে বন্দী করে ফেলেছিলেন। কারুর সাথে দেখা পর্যন্ত করতেন না। দেবীপুর গ্রামের মানুষ মনে করেন শেষ জীবনে তিনি তন্ত্র সাধনায় মগ্ন হয়েছিলেন, এমন কি এই সাধনায় তিনি গ্রামের বহু কুমারী মেয়ের বলী চড়িয়ে ছিলেন। সে সব আজ অতীত, রানার একতলার এই ঘরে বসে বেশ ভালো লাগছে, দক্ষিণের জানালা খোলা, সেই জানালার সামনে একটা বিশাল জারুল গাছ। চিত্রপট পুরো বেগুনী হয়ে আছে। সারা ঘরটায় আলো আর ছায়ার এক অদ্ভুত খেলা চলছে। দুপুরের এই সময় নানারকম পাখির ডাক শোনা যায়। এরকম পরিবেশে মানসিক চিকিৎসা খুব ভালোভাবে করা যায়। এইসব রুগীরা যত প্রকৃতির কাছাকাছি সুন্দর পরিবেশে থাকবে, তত তাড়াতাড়ি তারা সুস্থ হয়ে উঠবে। পরিবারের মধ্যে থাকলে কতরকম সমস্যায় পরে সুস্থ মানুষ অসুস্থ হয়ে ওঠে, তাহলে যারা মানসিক ভাবে অসুস্থ, তাদের অবস্থা তো আরো করুণ। কথা গুলো চিন্তা করতে করতে রানা একবার ভাবল, একজন মানুষ সারা দিন কত রকম চিন্তা করে, মনোবিজ্ঞানে বলে একজন মানুষ সারাদিন প্রায় ৬০,০০০ চিন্তা করতে পারে। ভাবা যায়, সারা দিনে আমরা ৬০,০০০ চিন্তা একসাথে করি। এই মুহূর্তে রানার তিতিরের ব্যাগের সেই ছবিটার কথা খুব মনে হচ্ছে। কথাটা মনে আসতেই সে মোবাইল ফোনটা টেবিলের ওপর থেকে নিয়ে অন করে তাকিয়ে দেখল ছবিটার দিকে। লোকটার নাম তিলক মুখার্জী, কারণ তিতিরের ফাইলে তার সার্টিফিকেটে বাবার নামের জায়গায় তাই লেখা ছিল। এবার রানা এটেস্টেড কপির ফটোটা দেখল , এস কে গুপ্তা নামে কোন একজন সাব ডিভিশানাল ম্যাজিস্ট্রেটের সই করা।

ছবিটা দেখতে দেখতে মোবাইল স্ক্রিনে একটা নম্বর ভেসে উঠল, ভারতের নম্বর। নম্বরটা একদম অচেনা। একবার ভাবলো ফোনটা ধরবে না, কেটে দেবে। কিন্তু পরক্ষনে মনে হল না কোন দরকারি ফোনও তো হতে পারে। রানা ভারতের রাঁচির মানসিক হাসপাতালের সাথে যোগাযোগ করেছিল। ওখান থেকে ডঃ রামেশ্বর মজুমদার এবং মানকুন্ডু থেকে ডঃ শেখর চট্টরাজকে এখানে বছরে একবার আনার চেষ্টা সে করছে। এই দুজন ডাক্তার ছয়মাস অন্তর একবার এসে, কয়েকদিন থেকে যদি রুগী দেখে যান তাহলে খুব ভালো হয়।

বেশিক্ষণ আর না ভেবে রানা ফোনটা ধরে ফেলল।

-রানা, আমি সিদ্ধার্থ বলছি রে।

-আরে তুমি ভারতে এসেছ নাকি?

-আর বলিস না। বিয়ে করতে এসেছি। বাপ মা ভেবেছিল ছেলে এবার কোন মেমের গলায় মালা ঝুলিয়ে পরিবারের মুখে চুনকালি লেপেই ছাড়বে। তাই আর রিস্ক নিলো না।

-যাক, তুমি শেষ পর্যন্ত বিয়ের পিঁড়িতে যে বসেছ, শুনে আমি খুব খুশি হয়েছি। নাহলে তো ভেবেছিলাম ভূত প্রেত নিয়েই জীবনটা কাটিয়ে দেবে।

-তা একপ্রকার ঠিকই বলেছিস। আমি এই মুহূর্তে তোর শ্বশুর বাড়ির পাড়ায় আছি, বুঝিলি। তিতিরের মুখেই একবার শুনেছিলাম, জায়গাটার নাম কেষ্টপুর। বিয়ে করতে যখন জামশেদপুরে এসেছি, তখন তিতিরের বাড়ি তো আমাকে দেখতেই হবে।

-আমি বুঝতে পারছি, তুমি কেন কথা গুলো বলছ। তোমার মতন মানুষের কাছে এটাই স্বাভাবিক। সবাই তো আর আমার মতন না।

-তবে একেবারে না জেনে শুনে এরকম একটা ডিসিশন নেওয়া মনে হয় খুব রিস্কের, তুই খুব ভাগ্যবান তাই কিছু হয় নি, তবে হলেও হতে পারত।

রানা কিছু একটা ভেবে নিয়ে বলল, তুমি ফোন করলে কেন বলো।

-তোর শ্বশুর মশাইয়ের নাম কি?

-তিলক মুখোপাধ্যায়।

-আচ্ছা, আমি এখন রাখি, পরে ফোন করছি।

সিদ্ধার্থের ফোন রাখার পর রানা ভাবল, হলে তো অনেক কিছুই হতে পারে। মানুষের জীবনে কোন কিছুই তো ভেবেচিন্তে হয় না। কখন যে কি হয় কে বলতে পারে। এক বছরের মধ্যে মা আর কাকিমার মৃত্যু ভাবা যায়, এক বছরের মধ্যে! লোকজনকে বললে গল্প কথা ভাববে। কিন্তু তাই তো হয়েছে, একেবারে চোখের সামনে। আর এক রোগ। সেই দুরারোগ্যে আক্রান্ত গোটা পরিবার। কয়েক প্রজন্ম ধরে এক রোগ কালো ছায়ার মতন যেন ঘিরে ধরে রেখেছে গোটা পরিবারটাকে। ঠাকুমা, মা, কাকিমা এদের আগের আগের বহু প্রজন্ম সেই এক রোগ , বুকের বাঁ দিকেই আক্রান্ত।

না না , কোন যূক্তি দিয়ে বিবেচনা দিয়ে কোন পরিস্থিতিকে বিচার করা যায় না। এগ্রামের কারুকে প্রশ্ন করলে সে বলবে অভিশাপ, সেই অভিশাপের খেসারৎ দিচ্ছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। বলরামের বাবা মড়ার আগে পাগল হয়ে গেছিল। মাঝরাত হলে সে গ্রামের রাস্তা দিয়ে উন্মাদের মতন চীৎকার করে বলতে বলতে যেত, পরের ঘরের লক্ষ্মী নিয়ে খেললে এই হয়, বেঁছে বেঁছে তোদের লক্ষ্মীছাড়া করে ছেড়েছে। বলরামের বাবাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। অনেকে বলে ওর বাবাকে রানার কাকা রঘুনন্দন সেন কীর্তনখোলার চরে পুঁতে দিয়েছিল। সেই পাপও তো তাদের ছাড়েনি। থাক, এসব কথা আর ভাবতে ভালো লাগছে না। মাথার ভেতরটা ঝিমঝিম করছে। রানা টেবিলের ওপরে রাখা গ্লাস থেকে জল খেয়েএকটু উঠে দাঁড়িয়ে জানালার সামনে গেলো। পেছনে কীর্তন খোলা, আর সামনে বেগুনী ফুলে ঢাকা জাড়ুল। হাতের আঙ্গুল গুলো মটকাতে মটকাতে রানা ভাবলো, সব টেলিপ্যাথি। তিতিরের বাবার ছবি, সিদ্ধার্থ দার ফোন আর রাঁচির পাগলা গারদ সব কিছু যেন ইন্টার কানেকটেড।

সিদ্ধার্থ পূজা মণ্ডপের সামনে এসে ছেলে দুটিকে প্রশ্ন করল, তোমরা বাঙ্গালী ?

ছেলে দুটি একে অপরের দিকে চাওয়াচায়ি করল, তারপর একজন বলল, দাদা, কারুকে খুঁজছেন?

সিদ্ধার্থ অনুভব করল পকেটে মোবাইল ফোনটা কেঁপে উঠল। সে মোবাইলটা অন করে দেখল রানা ফেসবুকে ম্যাসেজ করেছে, একটা ছবি, নীচে লেখা তিলক মুখোপাধ্যায়।

সিদ্ধার্থ ছবিটা তুলে ছেলে গুলোকে দেখিয়ে বলল, দ্যাখোতো এনাকে চেনো নাকি?

ছেলে দুটি ভালো করে তাকিয়ে দেখল ছবিটার দিকে,এমনিতেই ভিন রাজ্যের বাঙ্গালী পাড়া, তাই সবাই সবাইকে মোটামুটি চেনে। কিন্তু এই লোকটিকে ছেলে দুটি চিনতে পারলো না।

-না দাদা, এনাকে আমরা দেখিনি।

সিদ্ধার্থ একবার ভাবল, হয় তো এখানে চাকরি করেন না, কিংবা অনেক দিন আগে মাড়া গেছেন, তাই হয় তো চিনতে পারছে না। একজন বৃদ্ধ লোক এসে সিদ্ধার্থে পাশে দাঁড়াল।

-কি হয়েছে বাবা, কারুকে খুঁজছ নাকি?

সিদ্ধার্থ মোবাইলের ছবিটা ওনাকে দেখিয়ে বলল, দেখুন তো এনাকে চেনেন নাকি?

ভদ্রলোক অনেকক্ষণ ধরে ছবিটা দেখার পর বললেন, বিলক্ষণ চিনি। এ তো তিলক মুখার্জী। কিন্তু তুমি একে খুঁজছ কেন?

-আমি আমেরিকায় থাকি, এনার মেয়ে সাথে আমেরিকায় আমার পরিচয়। তাই একটু খোঁজ নিচ্ছিলাম।

লোকটি ওর দিকে তাকিয়ে কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গিয়ে বললেন আমার সাথে এসো।

পূজা মণ্ডপের পাশেই লোকটির বাড়ি। জায়গাটা বেশ থমথমে। রাস্তাঘাটে ধুলো খুব বেশী। বাড়ি গুলো সব এক রকমের প্যাটার্নে। অনেকটা টেনামেন্ট ধরনের। বৃদ্ধের বাড়ির সামনে কত গুলো টবে ফুল গাছ লাগানো। গাছ গুলো বড় বেশী অপরিষ্কার। সব কটা গাছ ধুলো বালি মাখা। বোঝা যায় যত্ন করার মতন কেউ নেই। বৃদ্ধ দরজার তালা খুলে ভেতরে ঢুকলো, সিদ্ধার্থ ওনাকে অনুসরণ করল।

-এই দিকে এসো। এই জানালা দিয়ে পরিষ্কার দেখা যায়।

সিদ্ধার্থ বৃদ্ধের পেছনে গিয়ে দাঁড়িয়ে দেখল এই বাড়িটার মতনই আরেকটা বাড়ি। দুটো বাড়ির অবস্থা প্রায় এক। কিন্তু সামনের বাড়ির দরজা জানালা গুলো সব বন্ধ।

– ঐটে হল তিলকের বাড়ি।ওরা এখানকার না, তিলক এখানে স্টিল প্ল্যান্টে চাকরি করত। প্রথম প্রথম কোথায় যেন মেসে না ভাড়া বাড়ি কিসে একটা থাকত। আমি দুর্গা পূজার সময় দু একবার ওকে দেখেছিলাম। বড় শান্ত স্বভাবের ছেলে এই তিলক। এক দেখাতেই যেন কিরকম একটা আকর্ষণ হত ছেলেটির প্রতি। আমি তোমাকে ঠিক বোঝাতে পারবো না। চলো সোফায় গিয়ে বসে কথা বলি।
-চলুন।

-হুম যা বলছিলাম(বৃদ্ধ সোফায় হেলান দিয়ে বসল), ভারি ভালো ছেলে ছিল এই তিলক, আমাকে কল্যানদা বলে ডাকত। কোন একটা অনুষ্ঠানে ওর সাথে আমার আলাপ হয়েছিল। এই মুহূর্তে মনে করতে পারছি না। সম্পর্ক বেশ ভালোই চলছিল, আমি আর গিন্নি থাকতাম, এই বাড়িতে প্রায় ওর আনাগোনা ছিল। আমি তখন ক্লাব প্রেসিডেন্ট। একদিন সন্ধ্যের দিকে এসে বলল, দাদা, বিয়ে করছি একটা বাড়ি দেখে দাও কিনবো। এই সোসাইটিটা তখন সবে তৈরি হচ্ছে, বেশ কিছু টেনামেন্ট ফাঁকা পরে আছে। আমি আর গিন্নী যোগাযোগ করে সামনের বাড়িটা ওদের কিনিয়ে দিলাম। মেয়েটি ওর সাথেই চাকরি করত।
এই দ্যাখো, আমি জিজ্ঞাসা করতে একদম ভুলে গেছি, তুমি চা খাও তো ?

সিদ্ধার্থ একটু সঙ্কোচের সাথে বলল, তা একটু খাই, আপনার যদি অসুবিধা না হয়, আমাকে দেখিয়ে দিন, আমি দুকাপ বানিয়ে নিচ্ছি।

-তোমাকে অতো ভাবতে হবে না, আমার ফ্লাক্সে ওটি সব সময় মজুত থাকে। গিন্নির যাওয়ার পর থেকে রাস্তার ওপারের রেস্তোরাঁ থেকে আমার সব খাবার যেমন আসে, তেমনি চাও আসে।

বৃদ্ধ চা কাপে ঢালতে ঢালতে বলল, নতুন বিয়ে হয়েছে মনে হচ্ছে।

-হুম, গত সপ্তাহে বিয়ে হয়েছে। ফিরানি সারতে এসেছি, কলকাতা ফিরেই ব্যাক টু প্যাভেলিয়ান।

-তো বাপু, তোমার বৌটিকে তো ভালো বলতে হয়, তোমাকে টো টো করতে ছেড়ে দিলে? হ্যাঁ?

– হা হা হা, তা না করে যে আর উপায় নেই। আমি বেশিক্ষণ আটকা ঘেরার মধ্যে আবার থাকতে পারি না। তাছাড়া এই কেসটা খুব ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে। আই এম নট সিওর।

-হুম ইন্টারেস্টিং তো বটেই। (চায়ের কাপ এগিয়ে দিলো সিদ্ধার্থের দিকে) শোন, বিয়ের পর ওরা ভালোই ছিল। দুবছর সুন্দর কাটল, তারপর তিতিরের জন্ম। ওর তিতির নামটা ওর বাবার দেওয়া। মেয়েটাকে বড় ভালোবাসতো তিলক। একদিন ওরা নেতার হাট বেড়াতে গেলো, আমার গিন্নী দেখেছিল গাড়ি থেকে মা আর মেয়ে নেমেছে, তিলক নামে নি। পরের দিন দেখি বাড়িতে পুলিশ এলো।

-একটু থামাচ্ছি, আপনার কথা মত যদি ধরি আপনাদের দুই পরিবারের মধ্যে বেশ আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। কিন্তু বাড়িতে পুলিশ এলো, আপনাকে কেউ কিছু জানালো না?

-না, কেউ কিছু জানালো না। যার জানানোর কথা তার জন্যই যে সেদিন পুলিশ এলো। (চায়ে চুমুক দিয়ে) কল্যাণ বাবু বললেন, নেতার হাট বেড়াতে গিয়ে তিলক হারিয়ে গেলো। তার আর কোন খবর পাওয়া গেলো না। তাই স্ত্রী এসে স্থানীয় থানায় মিসিং ডায়রি করল।

-সেকি একজন জলজ্যান্ত মানুষ উধাও হয়ে গেলো!

-বাবা যখন ছিল মেয়েটা খুব উচ্ছল ছিল। এত হাসিখুশি বাচ্চা এই অঞ্চলে খুব কম ছিল। কিন্তু বাবা হারিয়ে যাওয়ার পর মেয়েটাও নিজেকে কেমন যেন গুটিয়ে নিলো। কারুর সাথে কথা বলা তো দূরে থাক, স্কুলে যাওয়াও বন্ধ করে দিলো। সারা দিন ঐ ঘরের মধ্যে। ওর মা অফিস যাওয়ার সময় বাইরে থেকে তালা দিয়ে যেতো। এইভাবে চলে থাকে, আমরাও আর যোগাযোগ রাখতাম না। গিন্নী দুবার গেছিল, কিন্তু তৃষ্ণা , মানে তিতিরের মা কিংবা দরজা খুলত না। গিন্নী আর আমি দেখতাম মেয়েটা বন্ধ কাঁচের জানালার ভেতর দিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে দেখত। খুব মায়া হত দেখে। গিন্নী বেশ কয়েকবার খাওয়ার নিয়ে যেত, কিন্তু ও জানালা খুলতে পারত না। বলত ভেতর থেকে বন্ধ।

-ভেরি ইন্টারেস্টিং, মেয়েকে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিলো, আবার ভেতর থেকে দরজা জানালা বন্ধ করে রাখত!

-হুম। একদিন রাতে আমরা সবে শুতে গেছি।এমন সময় দেখি কে যেন কলিং বেল টিপছে। একটানা কলিং বেল বাজিয়ে যাচ্ছে। আমি দরজা খুলে দেখি তিতির, সে ভয়ে ঘরের ভেতর এসে ঢুকল। আমি দরজা দিয়ে দিলাম। ও আমাদের চিনতো, তাই হয় তো বিশ্বাস করেছিল। সে এসে যা বলল, তা শুনে নিজের কানকে প্রথম বিশ্বাস করতে পারি নি। আমি পুলিশ স্টেশনে ফোন করি। মাঝ রাতে পুলিশ তিলকের বাড়ি থেকে তার পচাগলা দেহ উদ্ধার করে। সারা দেহে পচন ধরে পোকা ধরে গেছিল। প্রতি অমাবস্যার রাতে নাকি তৃষ্ণা সেই দেহকে জাগাত। ভাবতে পারো, এই একরত্তি মেয়েটার ওপর দিয়ে কি গেছে!

-আমি তো অবাক হয়ে যাচ্ছি শুনে, একটা পচাগলা দেহ আর বাচ্চাটা সারা দিন বাড়িতে বন্দী। এই জন্যই হয় তো কোন কিছু আমাদের জানাতে চায়নি সে। তো কিভাবে সেই দেহ রেখেছিল? গন্ধ বেড়িয়ে যায়নি?

-সেটাই তো কথা, দেহের মধ্যে এমন কিছু করা ছিল যে এক ফোটা গন্ধ আমরা কেউ পাইনি।এরপর তিতিরকে হোমে নিয়ে যাওয়া হয়। আমার স্ত্রী চেয়েছিল ওকে আমাদের কাছে রেখে দেবে।কিন্তু আমি ওকে না করলাম। যে পরিবেশে ঐ মেয়ে ছিল, তার দ্বারা সে এফেকটেড হবেই হবে। একে নিজের কাছে রাখা মহা বিপদ। আর আমার ভবিষ্যৎ বানী সত্যি হয়েছিল।

-তিতির তাহলে হোমে থেকে পড়াশুনা করেছে। মেয়ের ক্যালি আছে বলতে হয়, জি আর ই দিয়ে বিদেশ পাড়ি দিলো। আবার নিজে দেখে বিয়েও করেছে।

-কোথায় আছে সে এখন?(বেশ গম্ভীর আর চিন্তিত গলার শ্বর)।

-এখন তিতির বাংলাদেশে আছে, নিজের শ্বশুর বাড়িতে।

-যে ছেলেটি ওকে বিয়ে করেছে সে নয় বদ্ধ উন্মাদ , না হয় অন্য কোন গল্প আছে। তবে একটা কথা তোমায় আমি বলবো, ছেলেটির বিপদ ঘনিয়ে এসেছে।

-বিপদ? সেকি, আপনি আমাকে সব পরিষ্কার করে একটু বলুন।

-না আমি আর কোন কথা তোমায় বলবো না।এই বুড়ো বয়সে আমি আর বিপদ বাড়াতে চাইনা বাবা।তুমি এবার এসো।

কল্যানবাবুকে বেশ ক্লান্ত ও গম্ভীর দেখাচ্ছে। সিদ্ধার্থ উঠে দাঁড়াল।
-আমি চলে যাবো কল্যানবাবু, যাবার আগে শুধু একটা প্রশ্ন তৃষ্ণা দেবীর কি হল? আপনি কিন্তু ওনার কথা কিছু বললেন না।

কল্যানবাবু চোখ বন্ধ করে মাথা পেছনে হেলিয়ে বলল, তৃষ্ণাকে পুলিশ খুঁজে পায়নি,কোথাও পায়নি।

-তুমি এবার এসো সিদ্ধার্থ। আমি খুব ক্লান্ত।

খাতা পর্ব ৭

দেবশ্রী চক্রবর্তী

আজ সকাল থেকে আকাশে মেঘের ঘনঘটা। আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছে একটা নিম্নচাপ তৈরি হয়েছে। ধুসর ঘোলা কুণ্ডলীকৃত মেঘেরা এক জায়গায় কুণ্ডলী বেঁধে ঘুরপাক খাচ্ছে। মাঝখানটা যেন একটা গর্ত তৈরি হয়েছে, তার থেকে হাল্কা সাদা আলো ধোঁয়ার মতন বেড়িয়ে আসছে। তিতির টিয়াকে সঙ্গে নিয়ে নদীর পারে গেছে। নদীর ধারে একটা উঁচু জায়গা আছে, তার ওপর দুজনে বসে বসে পা দোলাচ্ছে আর নদী দেখছে। যে জায়গার ওপর তারা বসে আছে তা একটা ইটের পাঁচিলের মতন। জায়গাটার চারিদিকে এবড়ো খেবড়ো ভাঙ্গা ইটের ইমারতের ধ্বংসাবশেষ পরে আছে। তিতির টিয়াকে বলল,

-দ্যাখ, আকাশ আর নদী প্রেম করছে।

টিয়া মিটিমিটি হেসে বলল, কি করে বুঝলে তুমি?

ও আমি বুঝি।

টিয়া জেদ করে বলল, কি করে বুঝলে, বলো না গো। আমার যে খুব জানতে ইচ্ছে করছে।

-আকাশের দিকে তাকিয়ে দ্যাখ, যে ছবি তুই দেখতে পাচ্ছিস, সেই ছবি তুই নদীর মধ্যেও দেখতে পাবি। এটাই তো ব্যাপার। প্রেমে পরলে দুজন একরকম অনুভব করে।

-কি যে বলো, মানুষ আর প্রকৃতি যেন এক!

-একই তো তুই,আমি, নদী,আকাশ, গাছ সব কিছুই তো এক তাই একরকম ভাবি।

টিয়া কিছু বুঝতে না পেরে তিতিরের কাছ থেকে উঠে গিয়ে পাশের তেঁতুল গাছটায় উঠতে থাকল। পাকা তেঁতুলের গন্ধে তিতিরের জিভে জল এলো। সে বলল,

– টিয়া কাচা লঙ্কা,নুন আর ধনে পাতা দিয়ে মেখে জমিয়ে খাওয়া যাবে, দুপুর বেলা এসব না খেলে কি জমে।

টিয়া যেন এসব খাবারের সাথে চির অভ্যস্ত, সে এসব কিছু এক সাথে মেখে রোজ খায়, তাই এর স্বাদও তার পছন্দ। সে তাকিয়ে দেখছে টিয়া তড়তড় করে গাছে উঠে যাচ্ছে, গাছের ওপর ঘন সাদা কুয়াশা। তিতিরের মন বলল, নানা, কুয়াশা না, এতো মেঘ। টিয়া উঠতে উঠতে মেঘের মধ্যে মিলিয়ে গেলো। পেছন দিয়ে সরসর করে কে যেন চলে গেলো। তিতির উঠে দ্যাখে নদীর ঘাট সুন্দর করে বাঁধানো। সে যেখানে বসে আছে সেটি একটি আম বাগান। বাগানের এক কোণায় সুন্দর একটি বাড়ি। তার পেছনে যে তেঁতুল গাছ তার সাথে একটা সাদা ঘোড়া বাঁধা আছে। ঘোড়াটাকে দেখে মনে হয় কোন অভিজাত পরিবারের এই ঘোড়া। কিন্তু এই সময় এখানে ঘোড়াটা এলো কিভাবে? সে উঠে দাড়াতে গিয়ে অনুভব করল তার পায়ে নূপুর বাঁধা আছে। কিন্তু সে তো নূপুর পড়েনি। এবার তিতিরের একটু সন্দেহ হল , সে নিজেকে ভালো করে দেখল। তিতির সবুজ রঙের একটি মসলিন শাড়ি পরে আছে। শাড়িটা যেন অন্য রকম ভাবে পরা। এভাবে শাড়ি এখন কেউ পরে না। কিন্তু সে পরেছে। তিতিরের গায়ে কোন ব্লাউজ নেই, তার ডানদিকের খোলা হাতে একটা বাজুবন্ধ পরা, দু হাতে নারকেল ফুলের নক্সাকাটা দুটি সোনার বালা ,কানে পাশা, কমরে সোনার কমর বন্ধ। সে মাথায় হাত দিয়ে দেখল তার চুল গুলো ডানদিকে চুড়া করে বাঁধা, তাতে জুঁই ফুলের মালা প্যাঁচানো। তিতিরের মনে হল তার ডান হাত ধরে টেনে তাকে কেউ একটা আমগাছের পেছনে নিয়ে গেলো।

আমের বনে অন্ধকার নেমে এসেছে। ঝমঝম করে বৃষ্টি পরছে।বৃষ্টির জল তার চুল ,নাক দিয়ে গড়িয়ে বুকের ওপর এসে পড়ছে। সে রানার বাহুবন্ধ হয়ে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। এ রানার অন্য এক রূপ, তার লম্বা চুল কাঁধ পর্যন্ত। সেই চুল দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে তার উত্তরীয় এবং সাদা ধুতির ওপর। রানার কানে, হাতে, গলায় ভারী সোনার গয়না। তিতির গভীর আকর্ষণ অনুভব করছে তার প্রতি। তিতির রানার ঠোটে গভীর চুম্বন করল। তিতির শুনতে পাচ্ছে এক বৃদ্ধ তাকে ডাকছে। একই সাথে সে শুনতে পাচ্ছে গাছের ওপর থেকে টিয়া তাকে ডাকছে। বৃদ্ধের গলার আওয়াজ খুব কর্কশ, সে তাকে মৃগনয়নী নামে ডাকছে। এ নাম যে তার তাতে কোন সন্দের নেই। তিতিরের মাথার ওপর ভাঁড়ি কিছু এসে পড়তে সে চোখ খুলে ওপরে তাকিয়ে দ্যাখে টিয়া তেঁতুল ছুড়ে ফেলছে। সামনে রানাকে আর দেখতে পাচ্ছে না। আমগাছটা তেঁতুল গাছ হয়ে গেছে। বৃদ্ধ তার দিকে এগিয়ে আসছে, তার কাপালিকের মতন লাল বসন। কপালে লাল টিপ। বৃদ্ধে চোখের রং জবা ফুলের মতন লাল। সে তিতিরের হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে চলেছে বাগানের ভেতরের সেই অট্টালিকায়। তিতির তার ডানদিকে তাকিয়ে দেখল সাদা ঘোড়ায় চড়ে রানা চলে যাচ্ছে নদীর ধারে।

টিয়া গাছের ওপর থেকে অভিমান করে বলছে, মামি, তোমার যে কি হয় বুঝি না, তেঁতুল খাবে বললে, এখন না খেয়েই চলে যাচ্ছ।

তিতিরের অস্বাভাবিক লাগে। তার মনে হয় টিয়া কি কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। লোকটা তাকে টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছে। তিতির চীৎকার করার চেষ্টা করছে, কিন্তু সে চীৎকার করতে পারছে না। লোকটার সাথে সে অট্টালিকায় প্রবেশ করল। সেখানে একটা তেলের প্রদীপ জ্বলছে। মাঝে প্রদীপ আর দু পাশে আসন পাতা। তিতিরকে জোড় করে লোকটি আসনের ওপর বসিয়ে দিয়ে উলটো দিকের আসনে নিজে গিয়ে বসল। তাদের দুজনের মাঝে প্রদীপ জ্বলছে। তিতির অনুভব করল তার সারা শরীর থেকে উদ্যম যৌবনের ছটা প্রতিফলিত হচ্ছে লোকটির চোখে। এতক্ষণ সে লক্ষ্য করেনি, এখন করল, লোকটির গলায় মৃত মানুষের হাড়ের মালা। বুঝতে অসুবিধে হয় না যে এই লোকটি তান্ত্রিক। লোকটির চোখে চোখে রেখে এক গভীর আকর্ষণ সে অনুভব করছে, এক শারীরিক আকর্ষণ। কিন্তু এতো পাপ। সে মনেপ্রাণে ভালোবাসে অমৃতায়ূধকে। একদিকে গভীর আকর্ষণ তো অন্যদিকে হীনমন্যতা তাকে গ্রাস করতে থাকল।

কাপালিক বলল,

-মৃগনয়নী, মনকে শান্ত কর। চারিদিকে কিছু নেই, যা আছে, সব মিথ্যে। যদি সত্যি কিছু থাকে, তা হচ্ছে আমি আর তুমি। আমি একজন পুরুষ আর তুমি নারী। আমাদের দুজনের মুক্তি একমাত্র সম্ভব আমাদের যৌথ সাধনায়। তাই আমাদের এঁকে অপরকে সাধনার পথে সাহায্য করতে হবে, না হলে তা কোনদিন সম্ভব না। এই পথে আমি সাধক, তুমি সাধিকা। এসো আমার কাছে এসো মৃগনয়নী। এই তো তন্ত্র সাধনার মহাক্ষন। চন্দ্র গ্রহণ শুরু হয়ে গেছে, তাই কাল বিলম্ব করা ঠিক হবেনা। তিতির নিজের সারা শরীর থেকে ধীরে ধীরে সব বস্ত্র খুলে ফেলছে, উলটো দিকে তান্ত্রিকও তাই করছে। কিছুক্ষণের মধ্যে দুজনে সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে গেলো। তিতিরের শরীরে প্রদীপের আলোর প্রতিফলন এসে পড়ছে। সে তার মাথার চুড়া খুলে ফেলতেই এক ঢাল চুল তার পিঠকে আবৃত করে ফেলল। তিতির ধীরে ধীরে গিয়ে কাপালিকের কোলের ওপর বসে পড়ল। এ পদ্ধতির সাথে যেন সে বহুল প্রচলিত। দুজন আলিঙ্গন বদ্ধ হয়ে এঁকে অপরকে চুম্বন করে বসে থাকল। দুজনেই যেন একটা ঘোরের মধ্যে বিরাজ করছে, এই চূড়ান্ত পর্যায় পৌঁছে গেলো মনে হলেও এই সেই পর্যায় থেকে নেমে এলো। এইভাবে সময় কাটতে লাগল, এক সময় প্রদীপটাও নিভে গেলো। তখন মনে হয় মাঝ রাত হবে, কাপালিক তিতিরের বুকে মাথা রেখে বললেন, আমার তপস্যা সার্থক হয়েছে, তুমি আমাকে মুক্তি দিতে পেরেছ মৃগনয়নী। এখন তুমিও মুক্ত। তোমার যেখানে যেতে ইচ্ছে হয় তুমি যাও। আজকের পর থেকে আমাদের মধ্যে আর কোন সম্পর্ক নেই।

তিতির ধীরে ধীরে উঠে দরজার দিকে এগিয়ে গেলো। দরজা খুলতেই ঝিঁঝিঁ পোকার আর ব্যাঙের ডাক সে পেলো, সঙ্গে সোঁদা মাটির গন্ধ। তিতির তার উলঙ্গ শরীর নিয়ে এগিয়ে চলল নদীর ঘাটের দিকে। আজ সে সব কিছু থেকে মুক্ত। ধর্ম,সমাজ,পরিবার, অমৃতায়ুধ, কাপালিক সব কিছু থেকে সে মুক্ত। যুগেযুগে তিতিররা নানা রূপে ফিরে এসে মুক্তি দেয় মানুষকে, তারপর এক বুক হাহাকার নিয়ে নেজের মুক্তির পথও তাকে খুঁজে নিতে হয়। কিন্তু সত্যিই কি মুক্তি হয়? তাই তো বারবার ফিরে আসতে হয় কখনো, মা,বোন, প্রেমিকা আবার কখনো স্ত্রী রূপে। তিতির দেখল নদীর জলটা অন্য দিনের থেকে আজ বড় বেশী শান্ত, টলটলে। এই জলেই যেন চিরশান্তির শয্যা কেউ বিছিয়ে রেখেছে তার জন্য। তিতির জলে ঝাঁপ দিতেই সে তলিয়ে যেতে লাগল নদীর গভীরে, অন্ধকার আর অতলে সে ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে যেতে দেখল সোনালী ধানের ক্ষেতের মধ্যে দিয়ে সে এগিয়ে চলেছে, পরনে তার সাদা রঙের শাড়ি। দূরে কেউ বাঁশি বাজায়। কিন্তু কে বাজায় এই বাঁশি? ধানক্ষেত পার করে এক বিশাল শিব মন্দির, মন্দিরে শিঙ্গা বাজিয়ে পূজো হচ্ছে, সারা গ্রামের মানুষ বসে আছে মন্দিরের চাতালে। তিতির দেখতে পাচ্ছে পুরোহিত মশাই আরতি করছেন। তিতিরের পাশ দিয়ে একটি ছোট্ট মেয়ে গোলাপি রঙের শাড়ি পড়ে এগিয়ে গিয়ে পুরোহিত মশাইকে কানেকানে বলছে, মেয়ে হয়েছে। মেয়েটির ফিসফিস করে বলা কথাও সে শুনতে পাচ্ছে। পূজা সেরে মন্দির থেকে পুরোহিত মশাই এগিয়ে চলেছেন নদীর ধার দিয়ে। তিতির পুরোহিতের পেছন পেছন গিয়ে দেখল, আমবাগানের ভেতর ছোট্ট কুঁড়ে ঘর, তার মধ্যে এক সদ্যজাতা তার মায়ের কোলে শুয়ে কাঁদছে, তিতির একটা তেঁতুল গাছের নীচে দাঁড়িয়ে আছে, তার পেছনে এক ভাঙ্গা অট্টালিকা। চারিদিকে ধ্বংসস্তূপের মাঝে আলোকরে রেখেছে এই কুঁড়ে ঘর। পুরোহিত মশাই সেই ঘরে ঢুকতেই বাচ্চাটা হাসতে আরম্ভ করল। তেঁতুল গাছের নীচে দাঁড়িয়ে তিতির সব কিছু অনুভব করতে পারছে। বাবাকে দেখে মেয়ে খুব খুশি হয়েছে, বাবা তার সদ্যজাতকে বুকে ধরে আছে। মেয়ের চোখে মুখে এক অলৌকিক শান্তি।

তিতির আবার তার ডান হাতে একটা হ্যাঁচকা টান অনুভব করল। কেউ যেন তাকে হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলো। তিতির দেখল সে মাটির ওপর পরে আছে আর টিয়া এক মুখ বিরক্তি নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে।

-আমি আর কোন দিন তোমার সাথে আসবো না।

তিতির মাটি থেকে উঠে বলল, আমি কোথায় যেন চলে গেছিলাম, এক সাথে দু দুটো জায়গা ঘুরে এলাম।

টিয়া তিতিরের কাছে এসে বলল, চলো বাড়ি যাই। আগে তেঁতুল মাখি, তারপর খেতে খেতে সব কথা শুনবো। এখন আমার তেঁতুল মাখা খেতে খুব ইচ্ছে করছে, তাছাড়া এইভাবে বেশিক্ষণ বৃষ্টিতে ভিজলে শরীর খারাপ করতে পারে। মামি তুমি চলো, তাছাড়া ছোট ঠাকুর ফিরে আসতে এখনো এক সপ্তাহ দেড়ি, তোমার কিছু হলে অনেক সমস্যা আছে।

সিদ্ধার্থর সাথে যেদিন ফোনে কথা হল, সেদিন রাতে রানা রাঁচির মানসিক হাসপাতাল থেকে একটা মেল পায়। সে যে দুজন ডাক্তারকে এখানে আনতে চায়, তাদের একজন তাকে মেল করে ডেকে পাঠিয়েছে বিশেষ কোন প্রয়োজনে। তিতির বুঝতে পারছে, রানা না থাকলে তার শরীর খারাপ হলে কিকি সমস্যা হতে পারে বলে মেয়েটি আশঙ্কা করছে। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে, এ গ্রামে কোন ভালো ডাক্তার নেই। তাই, তিতিরের শরীর যদি খারাপ হয়, তাহলে তাকে শহরে নিয়ে যেতে হবে, যা রানা ছাড়া সম্ভব না। মাঝে মাঝে তিতিরের মনে হয়, টিয়া ওর থেকে অনেক বেশী বুদ্ধিমতী। এত সুন্দর করে সে তিতিরকে এখন সামলে রাখে যা তিতিরের মা কোন দিন পারত না। মায়ের কথা মনে আসতেই তিতির গাবলা থুথু ফেলল। তারপর টিয়ার পেছন পেছন চলল।

এখন চারদিক অন্ধকার। ঘরে আলো জ্বলছে, কিন্তু বারান্দা অন্ধকার। বাইরে মুশল ধারায় বৃষ্টি পড়ছে। তিতির আর টিয়া পাশাপাশি বারান্দার দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে তেঁতুল মাখা খাচ্ছে। চারিদিক অন্ধকার, তার মাঝে তেঁতুল খাওয়ার টকটক শব্দ হচ্ছে। টিয়া কথা বলে উঠল।

-তোমার সব কথা শুনে মনে হচ্ছে তোমাকে আমার অসুখ ধরেছে। তুমি যেমন অনেক কিছু দেখতে পাও, আমিও পাই। যেমন ধরো, ঐ যে বাগানে কদম গাছ, তার নীচে মায়ের কবর থেকে মা প্রতি রাতে উঠে আসে। আমি মাকে দেখতে পাই। মা কদম গাছের নীচ থেকে উঠে আমার গালা থেকে রক্ত চুষে সেই রক্ত দিয়ে সাধনা করে।দেখবে আমার গলায় দাঁতের দাগ আছে।

টিয়া চুল সরিয়ে দেখাল। তিতির দেখল সত্যি দুটো দাগ। টিয়া বলতে থাকল, অন্ধকারে টিয়ার গলাটা অন্যরকম শোনাচ্ছে। সে বলল, তাই তো মাকে সরিয়ে দিলাম।

-সরিয়ে দিলি মানে?

-মানে আর কি, যেদিন বুঝলাম আমাকেও বাবার মতন মা মেরে ফেলে দেবে, সেদিন আমিও মার গলা কেটে দিলাম। মা ঘুমচ্ছিল। আমি নারকেল কাটার দা বসিয়ে দিলাম গলায়। তারপর সব শেষ।

তিতির মন দিয়ে টিয়ার কথা শুনছে, সত্যিই তো, টিয়ার জায়গায় অন্য কেউ থাকলেও তাই করত।

টিয়া বলল,
-আমার বাবাকে খুন করে মা বাবার লাশ ঘরের মধ্যে রেখে তন্ত্র সাধনা করত। একদিন রাতে আমি উঠে দেখি বাবার মৃত দেহকে মা জাগাচ্ছে। বাবার মৃতদেহ আর্তনাদ করছে, যন্ত্রণায়, তার সারা শরীরে ছুঁচ গাঁথা। বাবার যন্ত্রণা দ্যাখে আমার খুব কষ্ট হয়েছিল। তাই তো করলাম। তারপর দুজনের দেহ টেনে নিয়ে গিয়ে কদম গাছের নীচে পুঁতে দিলাম। তুমি ভয় পাবে বলে বলি নি। ওখানে দুটো লাশ আছে। হা হা হা।

তিতির আঙ্গুল চাটতে চাটতে বলল, তাহলে বলরাম তোর বাবা না ? তাই তো?

টিয়া হাসি মুখে বলল, বলরামই তো আমার বাবা, কিন্তু সে আর বেঁচে নেই।

খাতা পর্ব ৭

দেবশ্রী চক্রবর্তী

আজ সকাল থেকে আকাশে মেঘের ঘনঘটা। আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছে একটা নিম্নচাপ তৈরি হয়েছে। ধুসর ঘোলা কুণ্ডলীকৃত মেঘেরা এক জায়গায় কুণ্ডলী বেঁধে ঘুরপাক খাচ্ছে। মাঝখানটা যেন একটা গর্ত তৈরি হয়েছে, তার থেকে হাল্কা সাদা আলো ধোঁয়ার মতন বেড়িয়ে আসছে। তিতির টিয়াকে সঙ্গে নিয়ে নদীর পারে গেছে। নদীর ধারে একটা উঁচু জায়গা আছে, তার ওপর দুজনে বসে বসে পা দোলাচ্ছে আর নদী দেখছে। যে জায়গার ওপর তারা বসে আছে তা একটা ইটের পাঁচিলের মতন। জায়গাটার চারিদিকে এবড়ো খেবড়ো ভাঙ্গা ইটের ইমারতের ধ্বংসাবশেষ পরে আছে। তিতির টিয়াকে বলল,

-দ্যাখ, আকাশ আর নদী প্রেম করছে।

টিয়া মিটিমিটি হেসে বলল, কি করে বুঝলে তুমি?

ও আমি বুঝি।

টিয়া জেদ করে বলল, কি করে বুঝলে, বলো না গো। আমার যে খুব জানতে ইচ্ছে করছে।

-আকাশের দিকে তাকিয়ে দ্যাখ, যে ছবি তুই দেখতে পাচ্ছিস, সেই ছবি তুই নদীর মধ্যেও দেখতে পাবি। এটাই তো ব্যাপার। প্রেমে পরলে দুজন একরকম অনুভব করে।

-কি যে বলো, মানুষ আর প্রকৃতি যেন এক!

-একই তো তুই,আমি, নদী,আকাশ, গাছ সব কিছুই তো এক তাই একরকম ভাবি।

টিয়া কিছু বুঝতে না পেরে তিতিরের কাছ থেকে উঠে গিয়ে পাশের তেঁতুল গাছটায় উঠতে থাকল। পাকা তেঁতুলের গন্ধে তিতিরের জিভে জল এলো। সে বলল,

– টিয়া কাচা লঙ্কা,নুন আর ধনে পাতা দিয়ে মেখে জমিয়ে খাওয়া যাবে, দুপুর বেলা এসব না খেলে কি জমে।

টিয়া যেন এসব খাবারের সাথে চির অভ্যস্ত, সে এসব কিছু এক সাথে মেখে রোজ খায়, তাই এর স্বাদও তার পছন্দ। সে তাকিয়ে দেখছে টিয়া তড়তড় করে গাছে উঠে যাচ্ছে, গাছের ওপর ঘন সাদা কুয়াশা। তিতিরের মন বলল, নানা, কুয়াশা না, এতো মেঘ। টিয়া উঠতে উঠতে মেঘের মধ্যে মিলিয়ে গেলো। পেছন দিয়ে সরসর করে কে যেন চলে গেলো। তিতির উঠে দ্যাখে নদীর ঘাট সুন্দর করে বাঁধানো। সে যেখানে বসে আছে সেটি একটি আম বাগান। বাগানের এক কোণায় সুন্দর একটি বাড়ি। তার পেছনে যে তেঁতুল গাছ তার সাথে একটা সাদা ঘোড়া বাঁধা আছে। ঘোড়াটাকে দেখে মনে হয় কোন অভিজাত পরিবারের এই ঘোড়া। কিন্তু এই সময় এখানে ঘোড়াটা এলো কিভাবে? সে উঠে দাড়াতে গিয়ে অনুভব করল তার পায়ে নূপুর বাঁধা আছে। কিন্তু সে তো নূপুর পড়েনি। এবার তিতিরের একটু সন্দেহ হল , সে নিজেকে ভালো করে দেখল। তিতির সবুজ রঙের একটি মসলিন শাড়ি পরে আছে। শাড়িটা যেন অন্য রকম ভাবে পরা। এভাবে শাড়ি এখন কেউ পরে না। কিন্তু সে পরেছে। তিতিরের গায়ে কোন ব্লাউজ নেই, তার ডানদিকের খোলা হাতে একটা বাজুবন্ধ পরা, দু হাতে নারকেল ফুলের নক্সাকাটা দুটি সোনার বালা ,কানে পাশা, কমরে সোনার কমর বন্ধ। সে মাথায় হাত দিয়ে দেখল তার চুল গুলো ডানদিকে চুড়া করে বাঁধা, তাতে জুঁই ফুলের মালা প্যাঁচানো। তিতিরের মনে হল তার ডান হাত ধরে টেনে তাকে কেউ একটা আমগাছের পেছনে নিয়ে গেলো।

আমের বনে অন্ধকার নেমে এসেছে। ঝমঝম করে বৃষ্টি পরছে।বৃষ্টির জল তার চুল ,নাক দিয়ে গড়িয়ে বুকের ওপর এসে পড়ছে। সে রানার বাহুবন্ধ হয়ে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। এ রানার অন্য এক রূপ, তার লম্বা চুল কাঁধ পর্যন্ত। সেই চুল দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে তার উত্তরীয় এবং সাদা ধুতির ওপর। রানার কানে, হাতে, গলায় ভারী সোনার গয়না। তিতির গভীর আকর্ষণ অনুভব করছে তার প্রতি। তিতির রানার ঠোটে গভীর চুম্বন করল। তিতির শুনতে পাচ্ছে এক বৃদ্ধ তাকে ডাকছে। একই সাথে সে শুনতে পাচ্ছে গাছের ওপর থেকে টিয়া তাকে ডাকছে। বৃদ্ধের গলার আওয়াজ খুব কর্কশ, সে তাকে মৃগনয়নী নামে ডাকছে। এ নাম যে তার তাতে কোন সন্দের নেই। তিতিরের মাথার ওপর ভাঁড়ি কিছু এসে পড়তে সে চোখ খুলে ওপরে তাকিয়ে দ্যাখে টিয়া তেঁতুল ছুড়ে ফেলছে। সামনে রানাকে আর দেখতে পাচ্ছে না। আমগাছটা তেঁতুল গাছ হয়ে গেছে। বৃদ্ধ তার দিকে এগিয়ে আসছে, তার কাপালিকের মতন লাল বসন। কপালে লাল টিপ। বৃদ্ধে চোখের রং জবা ফুলের মতন লাল। সে তিতিরের হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে চলেছে বাগানের ভেতরের সেই অট্টালিকায়। তিতির তার ডানদিকে তাকিয়ে দেখল সাদা ঘোড়ায় চড়ে রানা চলে যাচ্ছে নদীর ধারে।

টিয়া গাছের ওপর থেকে অভিমান করে বলছে, মামি, তোমার যে কি হয় বুঝি না, তেঁতুল খাবে বললে, এখন না খেয়েই চলে যাচ্ছ।

তিতিরের অস্বাভাবিক লাগে। তার মনে হয় টিয়া কি কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। লোকটা তাকে টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছে। তিতির চীৎকার করার চেষ্টা করছে, কিন্তু সে চীৎকার করতে পারছে না। লোকটার সাথে সে অট্টালিকায় প্রবেশ করল। সেখানে একটা তেলের প্রদীপ জ্বলছে। মাঝে প্রদীপ আর দু পাশে আসন পাতা। তিতিরকে জোড় করে লোকটি আসনের ওপর বসিয়ে দিয়ে উলটো দিকের আসনে নিজে গিয়ে বসল। তাদের দুজনের মাঝে প্রদীপ জ্বলছে। তিতির অনুভব করল তার সারা শরীর থেকে উদ্যম যৌবনের ছটা প্রতিফলিত হচ্ছে লোকটির চোখে। এতক্ষণ সে লক্ষ্য করেনি, এখন করল, লোকটির গলায় মৃত মানুষের হাড়ের মালা। বুঝতে অসুবিধে হয় না যে এই লোকটি তান্ত্রিক। লোকটির চোখে চোখে রেখে এক গভীর আকর্ষণ সে অনুভব করছে, এক শারীরিক আকর্ষণ। কিন্তু এতো পাপ। সে মনেপ্রাণে ভালোবাসে অমৃতায়ূধকে। একদিকে গভীর আকর্ষণ তো অন্যদিকে হীনমন্যতা তাকে গ্রাস করতে থাকল।

কাপালিক বলল,

-মৃগনয়নী, মনকে শান্ত কর। চারিদিকে কিছু নেই, যা আছে, সব মিথ্যে। যদি সত্যি কিছু থাকে, তা হচ্ছে আমি আর তুমি। আমি একজন পুরুষ আর তুমি নারী। আমাদের দুজনের মুক্তি একমাত্র সম্ভব আমাদের যৌথ সাধনায়। তাই আমাদের এঁকে অপরকে সাধনার পথে সাহায্য করতে হবে, না হলে তা কোনদিন সম্ভব না। এই পথে আমি সাধক, তুমি সাধিকা। এসো আমার কাছে এসো মৃগনয়নী। এই তো তন্ত্র সাধনার মহাক্ষন। চন্দ্র গ্রহণ শুরু হয়ে গেছে, তাই কাল বিলম্ব করা ঠিক হবেনা। তিতির নিজের সারা শরীর থেকে ধীরে ধীরে সব বস্ত্র খুলে ফেলছে, উলটো দিকে তান্ত্রিকও তাই করছে। কিছুক্ষণের মধ্যে দুজনে সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে গেলো। তিতিরের শরীরে প্রদীপের আলোর প্রতিফলন এসে পড়ছে। সে তার মাথার চুড়া খুলে ফেলতেই এক ঢাল চুল তার পিঠকে আবৃত করে ফেলল। তিতির ধীরে ধীরে গিয়ে কাপালিকের কোলের ওপর বসে পড়ল। এ পদ্ধতির সাথে যেন সে বহুল প্রচলিত। দুজন আলিঙ্গন বদ্ধ হয়ে এঁকে অপরকে চুম্বন করে বসে থাকল। দুজনেই যেন একটা ঘোরের মধ্যে বিরাজ করছে, এই চূড়ান্ত পর্যায় পৌঁছে গেলো মনে হলেও এই সেই পর্যায় থেকে নেমে এলো। এইভাবে সময় কাটতে লাগল, এক সময় প্রদীপটাও নিভে গেলো। তখন মনে হয় মাঝ রাত হবে, কাপালিক তিতিরের বুকে মাথা রেখে বললেন, আমার তপস্যা সার্থক হয়েছে, তুমি আমাকে মুক্তি দিতে পেরেছ মৃগনয়নী। এখন তুমিও মুক্ত। তোমার যেখানে যেতে ইচ্ছে হয় তুমি যাও। আজকের পর থেকে আমাদের মধ্যে আর কোন সম্পর্ক নেই।

তিতির ধীরে ধীরে উঠে দরজার দিকে এগিয়ে গেলো। দরজা খুলতেই ঝিঁঝিঁ পোকার আর ব্যাঙের ডাক সে পেলো, সঙ্গে সোঁদা মাটির গন্ধ। তিতির তার উলঙ্গ শরীর নিয়ে এগিয়ে চলল নদীর ঘাটের দিকে। আজ সে সব কিছু থেকে মুক্ত। ধর্ম,সমাজ,পরিবার, অমৃতায়ুধ, কাপালিক সব কিছু থেকে সে মুক্ত। যুগেযুগে তিতিররা নানা রূপে ফিরে এসে মুক্তি দেয় মানুষকে, তারপর এক বুক হাহাকার নিয়ে নেজের মুক্তির পথও তাকে খুঁজে নিতে হয়। কিন্তু সত্যিই কি মুক্তি হয়? তাই তো বারবার ফিরে আসতে হয় কখনো, মা,বোন, প্রেমিকা আবার কখনো স্ত্রী রূপে। তিতির দেখল নদীর জলটা অন্য দিনের থেকে আজ বড় বেশী শান্ত, টলটলে। এই জলেই যেন চিরশান্তির শয্যা কেউ বিছিয়ে রেখেছে তার জন্য। তিতির জলে ঝাঁপ দিতেই সে তলিয়ে যেতে লাগল নদীর গভীরে, অন্ধকার আর অতলে সে ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে যেতে দেখল সোনালী ধানের ক্ষেতের মধ্যে দিয়ে সে এগিয়ে চলেছে, পরনে তার সাদা রঙের শাড়ি। দূরে কেউ বাঁশি বাজায়। কিন্তু কে বাজায় এই বাঁশি? ধানক্ষেত পার করে এক বিশাল শিব মন্দির, মন্দিরে শিঙ্গা বাজিয়ে পূজো হচ্ছে, সারা গ্রামের মানুষ বসে আছে মন্দিরের চাতালে। তিতির দেখতে পাচ্ছে পুরোহিত মশাই আরতি করছেন। তিতিরের পাশ দিয়ে একটি ছোট্ট মেয়ে গোলাপি রঙের শাড়ি পড়ে এগিয়ে গিয়ে পুরোহিত মশাইকে কানেকানে বলছে, মেয়ে হয়েছে। মেয়েটির ফিসফিস করে বলা কথাও সে শুনতে পাচ্ছে। পূজা সেরে মন্দির থেকে পুরোহিত মশাই এগিয়ে চলেছেন নদীর ধার দিয়ে। তিতির পুরোহিতের পেছন পেছন গিয়ে দেখল, আমবাগানের ভেতর ছোট্ট কুঁড়ে ঘর, তার মধ্যে এক সদ্যজাতা তার মায়ের কোলে শুয়ে কাঁদছে, তিতির একটা তেঁতুল গাছের নীচে দাঁড়িয়ে আছে, তার পেছনে এক ভাঙ্গা অট্টালিকা। চারিদিকে ধ্বংসস্তূপের মাঝে আলোকরে রেখেছে এই কুঁড়ে ঘর। পুরোহিত মশাই সেই ঘরে ঢুকতেই বাচ্চাটা হাসতে আরম্ভ করল। তেঁতুল গাছের নীচে দাঁড়িয়ে তিতির সব কিছু অনুভব করতে পারছে। বাবাকে দেখে মেয়ে খুব খুশি হয়েছে, বাবা তার সদ্যজাতকে বুকে ধরে আছে। মেয়ের চোখে মুখে এক অলৌকিক শান্তি।

তিতির আবার তার ডান হাতে একটা হ্যাঁচকা টান অনুভব করল। কেউ যেন তাকে হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলো। তিতির দেখল সে মাটির ওপর পরে আছে আর টিয়া এক মুখ বিরক্তি নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে।

-আমি আর কোন দিন তোমার সাথে আসবো না।

তিতির মাটি থেকে উঠে বলল, আমি কোথায় যেন চলে গেছিলাম, এক সাথে দু দুটো জায়গা ঘুরে এলাম।

টিয়া তিতিরের কাছে এসে বলল, চলো বাড়ি যাই। আগে তেঁতুল মাখি, তারপর খেতে খেতে সব কথা শুনবো। এখন আমার তেঁতুল মাখা খেতে খুব ইচ্ছে করছে, তাছাড়া এইভাবে বেশিক্ষণ বৃষ্টিতে ভিজলে শরীর খারাপ করতে পারে। মামি তুমি চলো, তাছাড়া ছোট ঠাকুর ফিরে আসতে এখনো এক সপ্তাহ দেড়ি, তোমার কিছু হলে অনেক সমস্যা আছে।

সিদ্ধার্থর সাথে যেদিন ফোনে কথা হল, সেদিন রাতে রানা রাঁচির মানসিক হাসপাতাল থেকে একটা মেল পায়। সে যে দুজন ডাক্তারকে এখানে আনতে চায়, তাদের একজন তাকে মেল করে ডেকে পাঠিয়েছে বিশেষ কোন প্রয়োজনে। তিতির বুঝতে পারছে, রানা না থাকলে তার শরীর খারাপ হলে কিকি সমস্যা হতে পারে বলে মেয়েটি আশঙ্কা করছে। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে, এ গ্রামে কোন ভালো ডাক্তার নেই। তাই, তিতিরের শরীর যদি খারাপ হয়, তাহলে তাকে শহরে নিয়ে যেতে হবে, যা রানা ছাড়া সম্ভব না। মাঝে মাঝে তিতিরের মনে হয়, টিয়া ওর থেকে অনেক বেশী বুদ্ধিমতী। এত সুন্দর করে সে তিতিরকে এখন সামলে রাখে যা তিতিরের মা কোন দিন পারত না। মায়ের কথা মনে আসতেই তিতির গাবলা থুথু ফেলল। তারপর টিয়ার পেছন পেছন চলল।

এখন চারদিক অন্ধকার। ঘরে আলো জ্বলছে, কিন্তু বারান্দা অন্ধকার। বাইরে মুশল ধারায় বৃষ্টি পড়ছে। তিতির আর টিয়া পাশাপাশি বারান্দার দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে তেঁতুল মাখা খাচ্ছে। চারিদিক অন্ধকার, তার মাঝে তেঁতুল খাওয়ার টকটক শব্দ হচ্ছে। টিয়া কথা বলে উঠল।

-তোমার সব কথা শুনে মনে হচ্ছে তোমাকে আমার অসুখ ধরেছে। তুমি যেমন অনেক কিছু দেখতে পাও, আমিও পাই। যেমন ধরো, ঐ যে বাগানে কদম গাছ, তার নীচে মায়ের কবর থেকে মা প্রতি রাতে উঠে আসে। আমি মাকে দেখতে পাই। মা কদম গাছের নীচ থেকে উঠে আমার গালা থেকে রক্ত চুষে সেই রক্ত দিয়ে সাধনা করে।দেখবে আমার গলায় দাঁতের দাগ আছে।

টিয়া চুল সরিয়ে দেখাল। তিতির দেখল সত্যি দুটো দাগ। টিয়া বলতে থাকল, অন্ধকারে টিয়ার গলাটা অন্যরকম শোনাচ্ছে। সে বলল, তাই তো মাকে সরিয়ে দিলাম।

-সরিয়ে দিলি মানে?

-মানে আর কি, যেদিন বুঝলাম আমাকেও বাবার মতন মা মেরে ফেলে দেবে, সেদিন আমিও মার গলা কেটে দিলাম। মা ঘুমচ্ছিল। আমি নারকেল কাটার দা বসিয়ে দিলাম গলায়। তারপর সব শেষ।

তিতির মন দিয়ে টিয়ার কথা শুনছে, সত্যিই তো, টিয়ার জায়গায় অন্য কেউ থাকলেও তাই করত।

টিয়া বলল,
-আমার বাবাকে খুন করে মা বাবার লাশ ঘরের মধ্যে রেখে তন্ত্র সাধনা করত। একদিন রাতে আমি উঠে দেখি বাবার মৃত দেহকে মা জাগাচ্ছে। বাবার মৃতদেহ আর্তনাদ করছে, যন্ত্রণায়, তার সারা শরীরে ছুঁচ গাঁথা। বাবার যন্ত্রণা দ্যাখে আমার খুব কষ্ট হয়েছিল। তাই তো করলাম। তারপর দুজনের দেহ টেনে নিয়ে গিয়ে কদম গাছের নীচে পুঁতে দিলাম। তুমি ভয় পাবে বলে বলি নি। ওখানে দুটো লাশ আছে। হা হা হা।

তিতির আঙ্গুল চাটতে চাটতে বলল, তাহলে বলরাম তোর বাবা না ? তাই তো?

টিয়া হাসি মুখে বলল, বলরামই তো আমার বাবা, কিন্তু সে আর বেঁচে নেই।

খাতা পর্ব৮
দেবশ্রী চক্রবর্তী

পঞ্চ পাণ্ডব পাহাড়ে সূর্যাস্ত হচ্ছে। পাহাড় টুকু বাদ দিয়ে সারা জংগলে অন্ধকার ঘনিয়ে এলো। এ এক অসাধারণ চিত্রপট । রানা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে সেই দিকে। হোটেলের বারান্দায় বসে চা খেতে খেতে সূর্যাস্ত দেখার আলাদা একটা মজা আছে। সে মাচুপিচুর জঙ্গলই হোক কিংবা নেতার হাটের জঙ্গল, এক একটা জায়গায় এক এক রকম তার সৌন্দর্য। সেবার মাচুপিচুতে তিতির সংগে ছিল। এবার সে সঙ্গে না এলেও, সে তার সাথেই আছে। কিভাবে আছে বলা একটু মুশকিল, তবে এখানে আসার পর থেকে কিছু অদ্ভুত একটা ব্যাপার রানার সাথে হচ্ছে। এই যেমন এখন রানা বসে চা খাচ্ছে, এখন তিতির তার থেকে কয়েক হাজার মেইল দূরে আছে , কিন্তু সে পরিষ্কার তিতিরের মনে অবস্থা বুঝতে পারছে। তার মনে হচ্ছে তিতির এখন বারান্দায় বসে মজা করে তেঁতুল খাচ্ছে আর বৃষ্টি দেখছে। তিতির শুধু তেঁতুল খাচ্ছে না, সেই সাথে সে বলরামকে নিয়ে চিন্তা করছে। তিতির ভাবছে, বলরাম মৃত। কিন্তু সে যাকে দেখতে পাচ্ছে সে আসলে তার আত্মা। না আত্মার কথাও সে ভাবছে না, তিতির এই মুহূর্তে ভাবছে, বিশেষ কোন উপায়ে এই মৃত দেহকে জাগিয়ে রাখা হয়েছে।

এ তো গেলো এখন কার কথা, সে দুপুরে শুয়ে শুয়ে ভাবছিল, তিতিরকে একটা আস্ত ময়াল সাপ গিয়ে খেয়েছে। সে সেই ময়াল সাপটার পেটের ভেতর দিয়ে অতীতে ছুটে চলেছে। অন্ধকারে কিছুটা যাবার পর বৃষ্টি শুরু হল, এক সাদা ঘোড়া, এক কাপালিক, তারপর অনেক কিছু সে দেখেছে যা দেখেছে তা সে আর মনে করতে চায় না। মনে করলে মাথার ভেতর যন্ত্রণা করে। কিন্তু এসব সে কেন দেখছে। তিতিরের মন কি তার মনের সাথে কোন ভাবে যুক্ত হয়ে গেছে। যেভাবে হাজার হাজার স্যাটেলাইট এঁকে অপরের সাথে যুক্ত, কিংবা এই মহাবিশ্ব এঁকে অপরের সাথে যুক্ত হয়ে আছে। কিন্তু তিতির যাযা দেখছে ভাবছে তার প্রভাব তার নিজের মনের ওপর ভয়ংকর ভাবে পড়ছে।

আরেক কাপ চা খেলে মন্দ হয় না। চায়ে চুমুক দিতে দিতে মাথা ঠাণ্ডা করে সে বিষয়টার আরও গভীরে ঢুকে চিন্তা করবে। চায়ের পটে এখনো যা চা আছে, তা আরও দু বার খাওয়া যাবে। রানা কাপে চা ঢালার সময় লক্ষ্য করল চা দিয়ে গরম ধোঁয়া উঠছে। জল,চিনি, চা আর দুধের এই মিশ্রণ গরম করলে তা দিয়ে আবার ধোঁয়া বের হয়। এই ধোঁয়া আবার বাতাসে মিলে যায়, যা আমরা আর দেখতে পাইনা। চারিদিকে কত রহস্য। এই যে সে চায়ের গন্ধ পাচ্ছে আসলে তা বাতাসে দ্রবীভূত চায়ের অংশ এই মুহূর্তে তার নাক দিয়ে ঢুকছে। সিদ্ধার্থদার মেল পেয়ে সারা রাত সে অনেক ভেবেছে। তারপর বেশ কিছু খণ্ড চিত্র তার মাথায় ঘুরপাক খেতে খেতে কোথায় যেন এক হয়ে একটি সামগ্রিক চিত্রে পরিণত হয়েছে। জামশেদপুরে এসে সে সিদ্ধার্থদাকে সঙ্গে নিয়ে সবার আগে দেখা করেছে কল্যাণ বাবুর সাথে। তারপর তিনি কল্যানবাবুর সহায়তায় সেই সময়ের তদন্ত অফিসারের সাথে দেখা করে জেনেছে, তিতিরের বাবা নেতার হাটের রাজ হোটেল থেকে নিরুদ্দেশ হয়ে গেছিলেন। পরে যার পচা গলাদেহ জামশেদ পুরের বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়। এই হোটেল প্রায় ১৯ বছর বন্ধ ছিল। হোটেলের ৯০% এক সময় আগুন লেগে পুড়ে গেছিল। ১৯ বছর ধরে হোটেলটি ফেলে রাখার পর মালিক তা বিক্রি করে দেন এক মাড়োয়াড়ি ব্যবসায়ীকে। সেই ব্যবসায়ী এত অল্প দামে সেই হোটেল পেয়ে তাকে সুন্দর করে সাজিয়ে নতুন করে ব্যবসা শুরু করেন। কিন্তু নতুন মালিক হলেও হোটেলের নাম সেই এক রয়ে গেছে। একটা জায়গায় একটু খটকা লাগছে, তা হচ্ছে ১৯ বছর আগে ১৯ এ ফেব্রুয়ারি তিতিরের বাবাও নিরুদ্দেশ হয়ে গেছিলেন।তিন আর তিনে যেমন ছয় হয়, তেমনি তিন আর দুইয়েও ছয় হয়। কিন্তু নিয়মটা একটু অন্যরকম।

দরজায় কে যেন নক করছে। রানা উঠে গিয়ে দরজা খুলে দ্যাখে একটি ছেলে চায়ের ট্রে নিতে এসেছে। ছেলেটির নাম সোমনাথ, কৃষ্ণনগরের ছেলে। কাল রাতে আসার পর থেকে সোমনাথে সাথে রানার অনেক কথা হয়েছে। ছেলেটি খুব মিশুকে প্রকৃতির, রানা বাংলাদেশ থেকে এসেছে শুনে ও খুব খুশি হয়েছে। সোমনাথ রানাকে জানিয়েছে সোমনাথের মা বাংলাদেশী।সোমনাথের বাবা রানাঘাটের ব্রজবালা স্কুলে ঘণ্টা বাজাত, সেই সময় কুপার্স ক্যাম্পের এই মেয়েটির সাথে তার পরিচয় , তারপর বিয়ে। সোমনাথের বাংলাদেশ যাবার খুব ইচ্ছে, টাকার অভাবে এখনো যাওয়া হয়নি, তবে সে যাবে।

সোমনাথ ট্রেতে চায়ের সরঞ্জাম গোছাচ্ছে, রানা তাকে প্রশ্ন করল, সোমনাথ এই হোটেলে এক সময় আগুন লেগেছিল তাই না?

সোমনাথ, গোছাতে গোছাতে বলল, আপনি ভয় পাবেন না, স্যার। ভূত টুতের ভয় নেই।

রানা হাসার মতন করে বলল, ভূতের ভয় পাচ্ছি না। আমার জানতে ইচ্ছে করছে। মানে, একটু লেখা লেখির সখ আছে, তাই বলছি, যদি এই নিয়ে একটা উপন্যাস লেখা যায়, বেশ জমাটি একটা লেখা হবে।

সোমনাথ ট্রে হাতে তুলে বলল, এ ব্যাপারে বিহারী আপনাকে অনেক তথ্য দিতে পারে।

বিহারীর সাথে আমি দেখা করব। সম্ভব হলে আজই, কারণ আমার হাতে সময় খুব কম।

সেরাতে সোমনাথ রানাকে এই হোটেলের ১৯ বছর আগের বৃদ্ধ দারোয়ান বিহারীর সাথে দেখা করতে নিয়ে যাচ্ছে। বিহারী এই হোটেলের পেছনে একটা ভাঙ্গা ঘরে থাকে। হোটেল বন্ধ হয়ে যাবার পরও সে সেখান থেকে উঠে যায় নি। দীর্ঘদিন এখানে থাকার জন্য তাকে নতুন হোটেল মালিকও উঠে যেতে বলেনি। মারোয়াড়ী হলেও এই লোকটার মধ্যে কিছুটা হলেও বিবেক অবশিষ্ট ছিল। সে বিহারীর ঘরটাও সারিয়ে দিতে চেয়েছিল, কিন্তু বিহারী তাতে রাজি হয় নি। সে পূর্বের স্মৃতিকেই যেন আগলে বেঁচে থাকতে চায়।

পাহাড়ি পথ ধরে হোটেল থেকে বেড়িয়ে কিছুটা নীচের দিকে নেমে তারপর ডানদিকে বাক নিয়ে হোটেলের পেছন দিকে একটা ভাঙ্গা ঘর, তাতে টিমটিম করে একটা বাল্ব জ্বলছে।

সোমনাথ ডাক দিলো বিহারী, ও বিহারী।

রানা দেখল বাড়িটার সামনে কোন দরজা নেই, দরজার ফ্রেম আছে, কিন্তু পাল্লা কোন কারণে নেই, তার জায়গায় একটা বেড়া দেওয়া। সেই বেড়া ফাঁক করে এক হাড় গিলগিলে বৃদ্ধ বাইরে এসে দাঁড়াল। সোমনাথ এগিয়ে গিয়ে কিছু একটা বলতেই বৃদ্ধ হাত তুলে রানাকে ভেতরে ডাকলেন।

ঘরের ভেতরে উনুনে লিট্টি বানানো হচ্ছে। বৃদ্ধ লিট্টি ওল্টাতে ওল্টাতে বলল, অনেক দিন পর আমার ঘরে কেউ এলো, আজ লিট্টি না খাইয়ে ছাড়ব না তোমাদের। সোমনাথ বলল, বিহারীর হাতের লিট্টি না খেলে খুব ভুল করবেন। এত ভালো লিট্টি আমি কোথাও খাইনি।

রানারা লিট্টি খাচ্ছে, ঘরের কোণায় উনুনের কয়লার ভেতর থেকে মৃদু আলো দেখা যাচ্ছে। একটু আগে লোডশেডিং হয়ে গেছে।

বিহারী বলল, এ তো রোজকার ব্যাপার, সারা দিন কারেন্ট যায়। হোটেলের মালিক আমার ঘরে আলো আর পাখার ব্যবস্থা করে রেখেছে। এরকম ভগবান তুল্য মানুষ আমি আর দুটি দেখিনি। কেউ করবে বলুন, আমি তো কোন কাজ করে দিতে পাড়ি না, তাও সে আমার কথা এত ভাবে। আমি একদিন বলেছিলাম, কেন আমার জন্য এত কিছু করেন আপনি ? শুনে কি বলেছিল জানো? বলেছিল, ওদের বাড়িতে এক চাকর ছিল, যাকে নাকি আমার মতন অবিকল দেখতে। সে বৃদ্ধ হয়ে গেছিল বলে তাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। তখন মালিক অনেক ছোট, তাই কিছু করে উঠতে পারেনি। কিন্তু বড় হয়ে সে সেই বৃদ্ধের অনেক খোঁজ করেও কোন সন্ধান পায়নি। তার ধারনা, আমি নাকি সেই চাকরের আরেক রূপ। এই ভাবে সে আমাকে দান করে নিজের পূর্বপুরুষদের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে চায়। কিন্তু আমি যে নিতে নিতে ঝুঁকে গেছি, আর মাথা তোলার ক্ষমতা নেই।

কিছুক্ষণ চুপচাপ, এখনো কারেন্ট আসেনি। সোমনাথ কথা বলল।

-বিহারী, এবার তুমি বলো, সেই রাতের কথা। এই বাবু লেখালেখি করেন। উনি তোমার বর্ণনার ওপর গল্প লিখবেন।

কিছুক্ষণ আবার সব চুপচাপ, তারপর বিহারী বলতে শুরু করল।

-সে রাতের কথা ভোলার না। আমি সেই স্মৃতি বহন করে চলেছি তো চলেছি। এজন্মে আর আমার কাঁধ থেকে এ আর নামার না। তখন রাজ হোটেল আজকের হোটেলের মতন এত বড় ছিল না। তা ছিল তিনটি রুম নিয়ে একটি ছোট গেস্ট হাউস। সাধারণত স্টিল কোম্পানির বাবুরা তাদের পরিবার নিয়ে সপ্তাহান্তে ছুটি কাটাতে আসতেন। সে সপ্তাহে একটি পরিবার এসেছিল। স্বামী,স্ত্রী আর ছোট্ট একটি মেয়ে। যেদিন ওরা এলো তার পরের দিন সকালে জঙ্গল দেখতে গেল। আমি তখন গেস্ট হাউসের দেখাশোনা করতাম আর মাঝে মাঝে রান্নাও করে দিতাম। যেদিনের ঘটনা, সেদিন রান্নার মেয়েটি দিন বুঝে কামাই করল। ও লোকজন কম এলে আসত না। তখন আমাকেই রান্নার কাজ সব কিছু সামলাতে হত। সেদিনও আমি রান্না করছিলাম। রাতে খাওয়াদাওয়ার পর মেয়েটি বাইরে খেলছিল। ঘরের ভেতর থেকে ওর বাবা,মায়ের গলার আওয়াজ আসছিল। বেশ জোরে কথা কাটাকাটির শব্দ। আমি অবাক হয়ে মেয়েটিকে দেখছিলাম। মেয়েটি এত আনন্দ করছিল, মনে হচ্ছিল ওর বাবা মায়ের অশান্তির কোন প্রভাব ওর ওপর পড়ছে না। আমি ওকে দূর থেকে দেখছিলাম। মেয়েটি আপন মনে ঘুরতে ঘুরতে বাড়িটির দিকে তাকিয়ে থেমে গেল। ওর মুখ আমি দেখতে পাচ্ছিলাম না, কিন্তু ও স্থির ভাবে দাঁড়িয়ে দেখছিল। ভেতরে ভয়ংকর অশান্তি হচ্ছে। এক সময় বাড়িটা দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। এত তাড়াতাড়ি আগুন চারপাশে ছড়িয়ে যাচ্ছিল যে কি বলব। মেয়েটির মা কোনক্রমে বেড়িয়ে এলেও ওর বাবা বেরতে পারেন নি। কিন্তু বাবু, এ এক আশ্চর্য্যময় ঘটনা। আগুন নিভে গেলেও কোন লাশ ভেতরে পাওয়া যায়নি।

-আপনি শেষ কখন মেয়েটির বাবাকে দেখেছেন?

-সকালে ওনাকে শেষ দেখেছিলাম,কারণ উনি রাতে খেতে আসেন নি।

-জঙ্গল থেকে ফিরে আসার সময় তাহলে দ্যাখেন নি?

-না, দেখি নি। আমি রান্না নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম।

সেদিন রাতে হোটেলে ফিরে এসে রানা আর কিছু খায়নি। বিহারীর দেওয়া লিট্টি, চোখা খেয়ে ওর পেট ভরে গেছিল। শুধু পেট ভরেছে বললে ভুল হবে, ওর মনের কোনে যে দানা খিচখিচ করছিল, তাও কিছুটা হলেও দূর হয়েছিল। এখানে আর থাকার কোন অর্থ হয়না। যে কাজের জন্য তার নেতারহাট আসা, তা সম্পূর্ণ হয়েছে। মনের ভেতর কিন্তু একটা সঙ্কট চলছে,যা সে অনুভব করতে পারছে। জট অনেকটা খুলে আসলেও ভেতরে আরও জট তৈরি হচ্ছে, যেগুলো চেষ্টা করেও সে খুলতে পারছে না। এই মুহূর্তে মায়ামি বিশ্ব বিদ্যালয়ের প্রখ্যাত মনবীদ প্রফেসর স্মিথের কথা তার মনে পড়ছে। প্রফেসর একটি মেয়েকে সম্মোহনের মাধ্যমে তার বেশ কিছু জন্মের তথ্য সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন। এবং তার সেই অভিজ্ঞতা মেনি লাইফ মেনি মাস্টার্স বইতে লিখে গেছেন।প্রফেসরের কাছে দীর্ঘদিন গবেষণা করে তার সাথে একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কও গড়ে উঠেছিল তার। তাই,এই মুহূর্তে তার মনে হচ্ছে প্রফেসরকে পুরো ঘটনাটা জানিয়ে একটা চিঠি লেখা খুব দরকার। সেই রাতে রানা প্রফেসর স্মিথকে সমস্ত ঘটনা জানিয়ে একটি মেল করে দিল।

রানার ভারতে যাবার পর তিতির রাতে একা ঘুমায় না, সে টিয়াকে সঙ্গে করে ঘুমায়।টিয়া এখন তার পাশে শুয়ে আছে, বাংলাদেশ আসার পর তিতির নতুন সিম নেয়নি। সে মনে মনে প্রস্তুত হয়েছি যে বিয়ের পর আর সোশ্যাল মিডিয়ায় সে থাকবে না। নিজের সম্পূর্ণ সময় তার স্বামী এবং পরিবারকে দেবে। রানাও তাকে জোড় করেনি। মোবাইল ফোনটা তার জীবনে এখন গুরুত্বহীন। কারণ এই জিনিশটা তার জীবন থেকে যাওয়ার পর সে চোখ কান খুলে মন দিয়ে জীবনকে আরও অনুভব করতে পারছে। যা সাধারণ মানুষের চোখে পড়েনা, এমন বহু জিনিষ সে অনুভব করতে পারে। যেমন আজ জেগে জেগে সে স্বপ্ন দেখে কত দূর চলে গেছিল। কাপালিকের কথা তার মনে আছে, সে কাপালিকের কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুমের ঘোড়ে তিতির স্বপ্ন দেখল। সে কাপালিকের অট্টালিকা থেকে বেড়িয়ে এলো আমবাগানে। সে শেষ বারের মতন পিছু ফিরে তাকিয়ে দেখল। সে এখন মৃগনয়নী। মৃগনয়নী তাকিয়ে আছে অট্টালিকার দিকে। কাপালিকের মুক্তি হয়ে গেছে। সত্যিই কি মুক্তি সে পেয়েছে। মৃগনয়নী মনে মনে হাসল, সে মনে মনে ভাবল মুক্তি কি এত সহজে মেলে। এবার তার মুখ থেকে হাসি গায়েব হয়ে গেল। সে দৃঢ় ভাবে ভেয়ে আছে সেই অট্টালিকার দিকে। দেখতে দেখতে সেই অট্টালিকায় আগুন জ্বলে উঠল। সেই আগুন ছড়িয়ে যাচ্ছে আমবাগানের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জড়ে। মৃগনয়নী এগিয়ে যেতে যেতে শুনতে পাচ্ছে কাপালিকের আর্তনাদ। চারিদিকে আগুনের লেলিহান শিখা, মাঝখান দিয়ে সে এগিয়ে চলেছে নদীর দিকে। মৃগনয়নী ধীরে ধীরে নদীতে নেমে যাচ্ছে। গভীরে, আরও অনেক গভীরে, যেখানে পায়ের তলায় আর মাটি নেই, জল তার নাক মুখ দিয়ে প্রবেশ করছে।

রানা ছটফট করছে বিছানায়। তার দমবন্ধ হয়ে যাচ্ছে, এভাবে, মৃত্যু আসন্ন, কিন্তু সে তো বাঁচতে চায়। শরীরের সব টুকু শক্তি দিয়ে সে ওঠার চেষ্টা করছে। রানা চীৎকার করে উঠে বসল। না নদী না, সে নেতারহাটের রাজ হোটেলের ২১ নম্বর ঘরে বসে আছে। উঠে বসে সে বাথরুমে গেলো।

আরো খবর »