স্বপ্ন উড়ান

Feature Image

বলি হ্যাঁরে অহল্যা, খুব তো বলচিস মেডামের বাড়ীর কাজটা আমার হয়ে তোর মেয়ে এক বচর করবে। কিন্তু সত্যি সত্যিই সেটা হবে তো ? তোর মেয়ে তো কোনদিন কোতাও কাজ করে নিকো! শুদু বইয়ের পাতায় মুখ গুঁজে এতোদিন নেকাপড়াই করে গেচে! তা একন সে ঘর-গেরস্তালীর সব কাজ সামলাতে পারবে! অবশ্য তেমন ভারী কাজ কিচু নেই! কিন্তু নেকাপড়া ছেড়ে এই কাজ করতে সে রাজি। মেডামের কাচে যাবার আগে মেয়েরে সব বুঝিয়ে বলিচিস? দ্যাখ্ বাপু শেষে আমার মুখ যেন না পোড়ে!

রাজুর মায়ের কথা শুনে অহল্যার বুকটা ঢিপঢিপ করে ওঠে! বুড়ী এতোদিন লোকের বাড়ী ঝিয়ের কাজ করে করে একেবারে তুখোড় হয়েগেছে। মানুষ চেনার ক্ষমতাটা তার ভালোইহয়েছে। সদ্য উচ্চ-মাধ্যমিক দেওয়া অহল্যার একমাত্র মেয়ে সবিতা সত্যিই এই কাজ করতে রাজী নয়। পরীক্ষা ভালো হয়েছে বলে সে ভালোফলের ব্যাপারে খুব আশাবাদী। তাই পরবর্তীকালে কি নিয়ে পড়াশোনা করবে বা কোথায় ভর্তি হবে সে ব্যাপারে সবিতা ইতিমধ্যে ভাবনা-চিন্তাও শুরু করেদিয়েছিল। এই সময়ে মায়ের এই কঠোর প্রস্তাবে সবিতা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে, এমন কি ঘরের কোনে বসে একা একা কান্নাকাটিও জুড়ে দিয়েছে। কিন্তু এ কথা রাজুর মাকে বললে কিকাজটা আর পাওয়া যাবে ? যাবে না। তাই মুখে একটা নকল হাসি ফুটিয়ে অহল্যা বলল – মেয়ে কেন রাজী হবে নে গো দিদি ? বিডিও মেডামেরঘরে দিন রাতের কাজের মেয়ের চাগরি পাওয়া কি মুকের কতা বলো ? এ তো আমার মেয়ের সৌভাগ্যি গো! অবিশ্যি সবই তোমার জন্যি হলো!অহল্যা কথার ফাঁকে রাজুর মাকে একটু তুষ্ট করতে কথাটা বলল।

তা সে কথায় কাজও হলো। রাজুর মা সন্তুষ্টহোল। যদিও একইসঙ্গে একটা পুরনো ব্যথায় তারঘা লাগল। টিফিন কেরিয়ারটা ডান হাত থেকে বাঁ হাতে বদলে সাদা থানের আঁচল দিয়ে মুখটা ভালো করে রগড়ে মুছে নিয়ে সে ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল – ঠিকই বলিচিস রে অহল্যা, মেডামের বাড়ীর কাজ তো সোনার কলসী রে, বইতে হলেও ভার লাগে না। সেই সোকাল তেকে একে একে তেনার ঘরে ঝাড়পোঁছের লোক, রান্নার লোক নিজের কাজ করে দে যায়। আমি শুদু সারাদিন সব কাজের তদারকি করি, মেডামের জলটা, ভাতটা এগিয়ে দি আর রাতে মেডাম একা শোয় বলে ওনার ঘরের মেঝেতে ফেনের হাওয়া খেতে খেতে মজাসে ঘুম মারি। আর এর জন্যি মাইনে যে কতো পাই তা তো তোকে বলিচি! সেই সোনার চাগরি আমায় জেনেবুঝে ছাড়তে হচ্চে সেকি আমার কম দুক্কু রে!

রাজুর মা মনের দুঃখে আবার ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। পরক্ষনেই হঠাৎ করে জ্বলে উঠে বলে – সব হলো ওই হতচ্ছাড়া রাজুটার জন্য! আরে বাবা সোনারপুরের চায়ের ইস্টলে কাজ করতে গে পেরেম করে না হয় একডা পনেরো বচরের বাচ্চা মেয়েরে বিয়েই করে এনিচিস, কিন্তু সাত তাড়াতাড়ি তারে মা করার কি দরগারটা ছিল! একন তো বউমা একডা দু’কিলোর দুব্বল বাচ্চা বিইয়ে নিজে বিছানা ধরেছে, আর ব্যাটা গেছে সেই সোনারপুরে কাজ করতে – ঘর সামলাতে সেই আমি! তাই তো বাদ্য হয়ে এক বচরের জন্যি কাজটা ছাড়তে হচ্চে রে! রাজুর মায়ের গলায় রাজ্যের হতাশা।

গরমের দুপুরে সুয্যি ঠাকুরকে মাথার ওপরে ও হাতে ম্যাডামের ভারী ব্যাগটা নিয়ে রাজুর মায়ের সঙ্গে বিডিও অফিসের পথে চলতে চলতে অহল্যার মনে পুরনো স্মৃতি ঘাই দিয়ে যায়। রাজুর বউয়ের মতো এমনই কম বয়সে তারও বিয়ে হয়ে গেছিল। বলা যেতে পারে অহল্যার মা প্রায় বিড়াল পার করার মতোই এক রাজমিস্ত্রীর জোগাড়ের সঙ্গে নমো নমো করে তার বিয়ে দিয়ে দিয়েছিল। দিনের শেষে পঞ্চাশ টাকা রোজগার করা সেই বরেরও কি দেমাক! অহল্যার এখনও মনে আছে, সারাদিন লোকটা তাকে ‘পোড়া কাঠ’, ‘তক্তা সুন্দরী’ এইসব বিশেষনে ব্যঙ্গভরে ভূষিত করত আর সারারাত ধরে সেই অপুষ্ট অপছন্দের শরীরটা থেকেই কাঙালের মতো নিজের ভোগের সামগ্রী খুঁজে নিত। ফলে রাজুর বউয়ের মতো সেও বছর ঘুরতে না ঘুরতে এক কম ওজনের দুর্বল কন্যা শিশুর জন্ম দিয়েছিল। খবর পেয়েই তার বর দিল্লীতে বাড়ী বানাবার কাজ করতে যাবার বাহানায় পাড়ার কনট্রাকট দাদার দলের সঙ্গে ভাগল।

মেয়ে সন্তান জন্ম দেবার অপরাধে অহল্যা যখন ভয়ে কাঁটা হয়ে আঁতুড় ঘরে শুয়ে তখন তার আশঙ্কা সত্যি করে এক সকালে তার শাশুড়ী আঁতুড় ঘরে ঢুকে খরখর করে বলে উঠল – খবর পেয়েচিস বউ ? ছেলে আমার দিল্লীতে কাজে গে তো এক বেধবা মেয়েকে বে করে ফের সমসার পেতেছে! একটা ব্যাটা বিয়োলে তো তোকে এ দিনটা দেখতে হতো নি রে! এবার আমাদের কি হবে! অহল্যা তখন তার একমাত্র সম্বল মেয়েকে বুকে চেপে ধরে দুধ খাওয়াতে খাওয়াতে ভাবছিল, আচ্ছা ওই বিধবা মেয়েটা বোধহয় তার মতো ‘তক্তাসুন্দরী’ নয়, তার শরীরে নিশ্চয়ই অনেক নরম মাংস! সেই লোভেই হয়তো তার বর তাকে ছেড়ে …

– হ্যাঁ রে, বরের কোন খপর পাস ? সে কি মেয়ের কতা কিচু বলে ?

রাজুর মায়ের কথায় অহল্যার সম্বিত ফেরে। মনে মনে ভাবে, দিদি কি অন্তরযামী! একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে বলে – পাই গো দিদি! ওদের কনটাকটার দাদা তো মাজে মাজে এই গেরামে নিজের বাড়ীতে আসে। তেনার কাচেই শুনি … ভালোই আচে … ও পক্ষে পরপর দুটি ছেলে হয়েছে। আমার মেয়ের কতা উটলে বলে ওটা নাকি তার গতজম্মের পাপ। এ জম্মে আর মনে করতেও চায় না।

রাজুর মা মন দিয়ে অহল্যার কথাগুলো শুনে দাঁতে দাঁত চেপে মুখ বিকৃত করে ঘৃণার স্বরে বলে – এক এক সময়ে মনে হয়, সব পুরুষগুলান আসলে এক একটা শুয়োরের বাচ্চা! জানিস অহল্যা আমার বরটাও মদ গিলে রাতে ঘরে এসে আমাকে কি মারত! শেষ অব্দি পেট পচে মরে মুখপোড়া আমাকেও বাঁচিয়েছে। ওসব নোকের জন্য একদম দুক্কু করবিনি!

কথা বলতে বলতে তারা বিডিও অফিসের সামনে পৌঁছে গেল। হাওড়া জেলার প্রত্যন্ত গ্রাম শিমূলতলা ব্লকের বিডিও অফিসটিতে এই মুহূর্তে ব্যস্ততা তুঙ্গে। কতো মানুষ তাদের ব্যক্তিগত, প্রাতিষ্ঠানিক কিংবা গ্রামোন্নয়নমূলক কাজে এখানে এসেছে। প্রায় সকলে দূর-দুরান্তের গ্রাম থেকে এখানে এসেছে; ফলে সবারই কাজ সেরে বাড়ী ফেরার তাড়া, সবার মধ্যেই ব্যস্ততা।

এই গরমে এতো মানুষের উপস্থিতি, তাদের কথাবার্তা, ব্যস্ততার মধ্যেও বিডিও দীপালি রায় অসীম ধৈর্য্য নিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় নিরলসভাবে একটা একটা করে সকলের সমস্যা মেটাচ্ছেন। রাজুর মা তার খাস পরিচারিকা, রোজ দুপুর একটায় টিফিন কেরিয়ারে করে ম্যাডামের জন্য লাঞ্চ আনে। এটা অফিসের দারোয়ান পিওন থেকে সবাই জানে। তাই সে এখন বিনা বাধায় অহল্যাকে নিয়ে অভ্যস্থ পায়ে বিডিওর ঘরে ঢুকে মেঝের এক কোনে থেবড়ে বসে পড়ল। ম্যাডাম তা দেখেও দেখলেন না, তখনও তিনি একা হাতে সব কাজ সামলাচ্ছেন।

অহল্যা প্রথমে নতুন জায়গায় এসে একটু উসখুস করছিল। কিন্তু একটু থিতু হয়ে বসে ক্রমশ দীপালি রায়ের কর্মকাণ্ড দেখতে দেখতে সে একেবারে হতবাক হয়ে গেল। মাগো মা! এ কি কাণ্ড! একটা সুতির চুড়িদার পরা টেনে চুল বাঁধা সাধারন চেহারার বাচ্চা মেয়ে একাই এতোবড় আপিসের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা! শুধু কি তাই! দামড়া দামড়া ব্যাটাছেলে গুলো তাদের ম্যাডামের ভয়ে যেন একেবারে জড়োসড়ো! এ কলম এগিয়ে দিচ্ছে তো সে দৌড়ে ফাইল আনতে যাচ্ছে! এও কি সম্ভব!

বিষ্ময় চাপতে না পেরে অহল্যা এবার মুখ ফুটে বলেই ফেলে – হ্যাঁ গা দিদি! এই তেইশ-চব্বিশ বচরের বাচ্চা মেয়েটা কিনা বিডিও মেডাম। আবার সকলে তারে মান্যিও দিচ্চে! ই কি গো! তুমি না বললে আমি তো বিশ্বেসই করতে পারতেম না যে …

রাজুর মা মালকিনের প্রশংসা শুনে খুব খুশি হয়ে অহংকারের সুরে বলল – মেডাম আমাদের বয়সে কচি হলেও খুব দাপট, জানিস ? নিজের কাজ নে আপিস টেইমের পরেও কতো লোক যে কোয়াটারে যকন তকন আসে! মেডামের সামনে এলে বাঘা বাঘা ব্যাটাছেলেরাও মিউ মিউ করে! হি হি হি।

এই অল্প সময়ে ওনাকে দেখে অহল্যার মনে সেই বিশ্বাসটা পাকা হয়ে গেছিল। তাই সে মুগ্ধ দৃষ্টিতে দীপালি রায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। রাজুর মা নিজের কথার সূত্র ধরে বলে চলে – জানিস, আমাদের মেডামের কিন্তু বিয়ে হয়ে গেচে। বরের বয়সও বেশী নয়। শুনিচি তিনি কলকেতার কোন বড় হাসপাতালে সদ্য ডাক্তার হয়েচেন। কি ভদ্দর ছেলে ভাবতে পারবিনি। আর দুটিতে খুব মিল জানিস! একটু অবসর পেলে শুরু হলো ফোনে গুজুর গুজুর – ফুসুর ফুসুর! হি হি হি! আর ছুটি পেলেই হল, মেম কলকেতায় বরের কাচে যায়, নইলে তিনি একেনে! তকন আমার রাতের বেলায় ছুটি! রাজুর মা চোখ মটকে একটা ইঙ্গিত পূর্ণ হাসি হাসে।

শুনে অহল্যার বুকটা হু হু করে ওঠে। নারীপুরুষের সম্পর্ক যে এতো সুমধুর, এতো বন্ধুত্বপূর্ণ হতে পারে তা তার ধারনায় ছিল না। সে শৈশবে দেখেছে ছেলের জন্ম দেবার অদম্য বাসনায় তার মা পরপর চারটি কন্যা সন্তানের জন্ম দিয়ে সারাজীবন অপরাধবোধে ভুগেছে। তাই হয়ত রাতে মাতাল বরের হাতে মার খেয়েও পরদিন সকালে সেই মুচড়ে যাওয়া হাত নিয়েই স্বামীর মুখ ধোবার জল, ভাতের থালা জুগিয়ে গেছে! অহল্যা বিয়ের পর শাশুড়ীর মুখে শুনেছে তার শ্বশুরও রাজুর বাবার মতো মদ খেয়ে খেয়ে লিভার পচিয়ে একদিন রাতে ড্রেনের পাশে মুখ থুবড়ে পড়ে মরেছিল।

ছেলেবেলা থেকে এসব দেখেশুনে অহল্যারমনেও কেন জানি না একটা ধারণা তৈরী হয়েছিলযে পুরুষ মানেই খারাপ। গরীবের ঘরের মেয়েদেরজন্মই হয় পড়ে পড়ে মার খাবার জন্য। তাই তার বর যখন বিনা ভূমিকায় তাকে ছেড়ে চলে গেছিল তখন সে বিষয়টাকে তার ভবিতব্য বলে মেনে নিয়েছিল। কিন্তু এখন তার মনে হল, আচ্ছা আমিও তো মেয়েকে লেখাপড়া না শিখিয়ে সাত তাড়াতাড়ি বিয়ে দিতে চাইছি! তার কপালেও যদি আমার মতো বর জোটে !

কথাটা মনে হতেই অহল্যা মনে মনে শিউরেওঠে! মনে মনে বলে – ষাট ষাট, এ আমি কিভাবছি! আমাদের কপাল পোড়া বলে না হয় স্বামীসুখ পাইনি! তা বলে সবার কি এমন হবে! কক্ষনো নয়! আমি নিজে দেখেশুনে মেয়ের জন্য ভালো পাত্র জোগাড় করব, মেয়ে আমার খুব সুখী হবে! এরপরেও কিন্তু অহল্যার মনে খুঁতখুঁতানিটা থেকে যায়। তা থেকে মন ফেরানোর জন্য সে সামনের দৃশ্যাবলীতে জোর করে মনঃসংযোগ করে। আর ম্যাডামের সামনে কাঁচুমাচু মুখে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটিকে দেখামাত্র সে অবাক হয়ে আপনমনে বলে ফেলে – ওমা, ভোঁদা মল্লিক না!

লোকটির আসল নাম যাই হোক না কেন, অফুরন্ত পয়সা ও বাড়তি ওজনের জন্য লোকের মুখে মুখে এই নামটা রটে গেছে। হয়ত সাধারণ মানুষের সঙ্গে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণও তার এই অদ্ভুত নামের আর এক কারণ। কিন্তু একি, ভোঁদা মল্লিকের মতো তেজী মানুষও তো এখন ম্যাডামের সামনে দাঁড়িয়ে ভ্যাবলার মতো হাত কচলাচ্ছে! আর ফাইলের দিকে চোখ রেখে ম্যাডাম তাকে রাগত স্বরে যা বলছে তার মধ্যে ‘ইল লিগাল’ শব্দটা কয়েকবার শুনলেও মাথামুণ্ড কিছুই অহল্যা বুঝল না। তবে এটুকু বুঝল যে ভোঁদা মল্লিক আজ ম্যাডামের হাতে বেশ নাকাল হচ্ছে ।প্রতিহিংসার আনন্দে অহল্যার মনটা ভরে উঠল।

অহল্যা যখন প্রথমবার পেটের ভাত জোগাড় করার জন্য বাসন মাজার ঠিকে কাজ ধরেছিল সেটা ছিল এই ভোঁদা মল্লিকেরই বাড়ী। তার বউটি ছিল বড় মুখরা কিন্তু মনটা ভালো। তার দুর্দশার কথা শুনে এককথায় কাজে বহাল করেছিল। সেই সঙ্গে বাঁকা হাসি হেসে বলেছিল – এতো মন্দ নিয়ম নয়, যে লোক তোমাকে এককথায় ছেড়ে চলে গেছে তার মাকেই তুমি বাকী জীবন ভাত কাপড় জোগাবে! অদ্ভুত নিয়ম তো!

তা সেই ‘অদ্ভুত’ নিয়মকেই ভবিতব্য মনে করে দুধের মেয়েকে শাশুড়ীর জিম্মায় রেখে অহল্যা সারাদিন উদয়াস্ত পরিশ্রম শুরু করল। কিন্তু বলতে নেই, পেট ভরা খাবারের সঙ্গে মনের শান্তি ফিরে আসাতে তার চেহারাটা ধীরে ধীরে একটু ভালো হল। আর সেটাই ‘অরক্ষণীয়া’ অহল্যার কাল হল। এক সকালে বউয়ের বাপের বাড়ী যাবার সুযোগ নিয়ে ভোঁদা মল্লিক রান্নাঘরে বিড়ালের মতো তার রাস্তা কাটল। অহল্যা অবাক হয়ে দেখল বউয়ের ভয়ে বাড়ীতে ভিজে বেড়াল সেজে থাকা ভোঁদা মল্লিকের আর একটা নতুন রূপ। উঃ, কি লোভ তার কুতকুতে চোখ দুটোয়, কত অতৃপ্ত কামনা তার সারা শরীর জুড়ে! সেদিন ভোঁদা মল্লিককে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে কিভাবে যে নিজেকে মুক্ত করে বাড়ীর দিকে দৌড় দিয়েছিল তা সে-ই জানে।

রাতের অন্ধকারে ভূমিশয্যায় মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে যখন অহল্যা যতটা সম্ভব নিঃশব্দে গুমরে গুমরে কাঁদছিল তখন পাশে শুয়ে থাকা শাশুড়ী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্বগতোক্তির ঢঙে বলেছিল – কেঁদো নে বউমা! পরের দোরে ঘুরে ঘুরে এঁটো–কাঁটা পোস্কার করি বলে অনেকেই আমাদের ভাঙা হাটে বেচা সস্তা দামের কানা বেগুন ভাবে বউমা! ওসব সতীত্ব–টতীত্ব বোধহয় বড়নোকের মেয়ে বউদের গয়না গো! আমাদের মত ছোটঘরের মেয়েদের জন্যি নয়! শাশুড়ীর এহেন দার্শনিক কথায় অহল্যা চমকে উঠেছিল। তার মনে হয়েছিল, আচ্ছা, উনিও তো যৌবনকালটা তার মতোই পাঁচ বাড়ী কাজ করে পেটের ভাত জোগাড় করেছেন। তবে এই কথাগুলো কি তাঁর নিজের অভিজ্ঞতার ফল ?

– কই রে অহল্যা, বসে বসে কি ভাবচিস! নে এবার ওট্! মেডামকে খেতে দে তোর মেয়ের কতাটা পাড়ব যে! উটে আয়!

রাজুর মায়ের কথা শুনে অহল্যার চমক ভাঙে। মেঝে থেকে উঠে সে ম্যাডামের কাছে ধীর পায়ে হাজির হয়। ইতিমধ্যে ঘর খালি হয়ে গেছে। রাজুর মা টেবিলের ফাইলপত্র সরিয়ে খাবার সাজিয়ে দিয়েছে। এখন অভিভাবকের মতো ছদ্ম ধমক দিয়ে একহাতা ভাত বেশী নিতে ম্যাডামকে বাধ্য করছে। অহল্যা মুগ্ধ হয়ে দৃশ্যটা দেখছিল। দেখো তো, যে মেয়ের ভয়ে এতক্ষণ গোটা অফিস থরহরি কম্প ছিল, এখন সে কেমন লক্ষ্মী মেয়েটির মতো শান্ত হয়ে বসে তৃপ্তি করে ভাত খাচ্ছে! অহল্যার এক মুহূর্তের জন্য মনে হল ম্যাডাম নয়, তার মেয়ে সবিতা তার সামনে বসে আছে!

আজ শনিবার বলে দীপালী রায় অফিস সেরে সোজা কলকাতা চলে যাবে। তাই রাজুর মা মনে করে ব্যাগটাও গুছিয়ে নিয়ে এসেছে। সেই সব ব্যাপারেই সে গলগল করে ম্যাডামের সঙ্গে কথা বলে যাচ্ছিল ।

অহল্যার মন কিন্তু এসবের থেকে অনেক উর্ধ্বে বিচরণ করছিল। তার মনে এমন কিছু নতুন ভাবের উদয় হচ্ছিল যা ইতিপূর্বে সে কখনো কল্পনাও করেনি।

– ও মেডাম, এ হলো অহল্যা। আমার পাড়ায় থাকে। ওর একটাই মেয়ে, সবিতা। ওর বর ওকে ছেড়ে চলে গেচে তো, তাই অনেক কষ্ট করে মেয়েরে মানুষ করেচে।অহল্যা তোমারে কিচু বলতে এসেচে! কই, বল না কি বলবি! রাজুর মা অন্যমনস্ক অহল্যার কনুইটা ধরে নাড়া দেয়।

রাজুর মায়ের ঝাঁকুনিতে অহল্যার সম্বিত ফেরে। স্বপ্নোত্থিতের মতো একটা কল্পনার ঘোরে সে বলে – আচ্ছা মেডাম, তোমার মতো আপিসার হতে গেলে কি অনেক পড়তে হয়! তার অনেক খরচা!

রাজুর মা হতবাক হয়ে অহল্যার দিকে তাকাল। দীপালি রায় খাওয়া থামিয়ে একটু অবাক স্বরে বলল – খরচ একটু হয় বটে কিন্তু মেধা থাকলে নিশ্চই বিডিও হওয়া যায়। কিন্তু এসব কথা কেন জিজ্ঞাসা করছ।

অহল্যা একটু সংকোচের সঙ্গে বলল – মেডাম, আমার মেয়েটার লেখাপড়ায় খুব মাতা। যদি বড় হয়ে সে আপনার মতো বিডিও হতে পারে …

রাজুর মা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। খরখর করে বলে উঠল – বলি হ্যাঁরে অহল্যা, আগে তো বললি তোর মেয়েরে এক বচরের জন্যি আমার হয়ে মেডামের কাজে লাগাবি! তা হটাত একেনে এসে কি ইছিলি–বিছিলি কইচিস!

অহল্যা মাথা নীচু করে অপরাধীর মতো বলল – একার পরিশমে আর সমসারটা চালাতে পারছিলাম না গো দিদি! শাউড়ি বুকের ব্যামোয় শয্যাশায়ী – তার চিকিৎসার খরচা আবার মেয়ের পড়ার খরচা, আমি আর একার হাতে এসব টানতে পারচি না গো দিদি! তাই ভেবেছিলেম মেয়েরে পড়া ছাড়িয়ে যদি মেডামের কাজে লাগাতে পারি তবে একটা পেট বাঁচবে আর বেতনের ট্যাকা মেয়ের বে’র জন্যি জমিয়ে … কিন্তু একেনে এসে মেডামকে দেকে আমার ভাবনাটাই বদলে গেলো গো! একন মনে হচ্চে, অনেক তো কষ্ট করলাম। এভাবে আর ক’বচর চালিয়ে যদি মেয়েটারে দাঁড় করাতে পারি … ! আমি ঝি,আমার মা শাউড়ি সবাই ঝি ছেল, কিন্তুক মেয়েটা মেধার জোরে যদি কোনদিন বাবুঘরের মেয়েদের মতো হতি পারে, সোম্মানের সঙ্গে বাঁচতি পারে … ! অহল্যার চোখ থেকে টপটপ করে জল ঝরে পড়তে লাগল। কান্নার আবেগে ধীরে ধীরে তার গলা বন্ধ হয়ে এল।

দীপালি রায়ের খাওয়া শেষ হয়ে গেছিল। অহল্যার সব কথা শুনে নিঃশব্দে ঘরের কোনের বেসিন থেকে মুখ ধুয়ে এসে তিনি রাজুর মাকে বললেন – আচ্ছা মাসি, তুমি কি করে ভাবলে একটা আঠারো বছরের মেয়েকে কেউ পড়াশোনা ছাড়িয়ে আমার সর্বক্ষনের কাজের মেয়ে হিসেবে রাখবে বললেই আমি রাজি হব! রাজুর মা লজ্জায় মাথা নিচু করল। এরপর দীপালি অহল্যার কাঁধে হাত রেখে নরম স্বরে বলল – তোমার মেয়ে যদি সত্যি সত্যিই পড়াশোনার প্রতি আগ্রহী হয় তবে অবশ্যই হায়ার এডুকেশন করবে, মনের মত চাকরি পাবে। তুমি জানো না তোমাদের মতো পিছিয়ে পড়া মহিলাদের জন্য সরকার পক্ষ্য থেকে অনেক প্রকল্প আছে। তাই প্রশাসনিক দিক থেকে যেটুকু সাহায্য করা যায় তার সবটুকু আমি করব। এছাড়া ব্যক্তিগতভাবে যতটুকু আমার ক্ষমতায় কুলোয় আমি ওকে সাহায্য করব।

চোখের জলে অহল্যার বুকের কাপড় ভিজে যাচ্ছিল। আবেগের সঙ্গে সে বলল – সত্যি বলচো মেডাম! সবাই সাহায্যি কল্লে আমার মেয়েটাও তোমার মতো ওফিসার হতে পারবে ? এও কি সম্ভব! তাহলে আমার মেয়েডারে কোন মোদো মাতাল চরিত্তরহীন সোয়ামীর হাতে পড়ে পড়ে মার খেতে হবে না! কেউ তারে কতায় কতায় অপমান্যি করতে পারবে না! পেটে খিদে নে তারে লোকের বাড়ী বাড়ী ঘুরে এঁটো বাসন মাজতে হবে না! নিজের সম্মান বাঁচাতে তাকে আর কুকুর বিড়ালের মতো এ বাড়ী ও বাড়ী থেকে পালাতে হবে না! … বলতে বলতে অহল্যা আঁচলে মুখ ঢেকে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল। রাজুর মাও নিজের দুর্ভাগ্যের কথা স্মরণ করে চোখ মুছল।

দীপালি রায় অহল্যার কাঁধে হাত রাখে। সান্ত্বনার সুরে বলে – তোমার কষ্টটা আমি বুঝতে পারছি। সত্যি বলতে কি, আমি আর আমার স্বামীও দরিদ্র ঘরে মানুষ হয়েছি। কিন্তু ভাগ্যের হাতে নিজেদের ছেড়ে না দিয়ে শক্ত হাতে লড়াই করেছি। আসলে জেদ ও ইচ্ছাশক্তি থাকলে অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়। আমরা পেরেছি, আশা করি আমার ছোট্ট বোনটাও পারবে । তা কি নাম তোমার মেয়ের?

অহল্যা নিজেকে এবার একটু সামলে নিয়েছিল। চোখের জল মুছে নিয়ে সে বলল – সবিতা দাস মেডাম। পাশ থেকে রাজুর মা তাড়াতাড়ি বলে উঠল – খুব লক্কী মেয়ে আমাদের সবি! রাতদিন শুদু বইয়ের পাতায় মুখ গুঁজেই আচে!

দীপালি হাসিমুখে বলল – সবিতা মানে তো সূর্য! বাঃ খুব ভালো নাম। সূর্যের মতো ওর দীপ্তিও একদিন চারিদিকে ছড়িয়ে পড়বে দেখো। যাইহোক, মেয়ের রেজাল্ট বেরোলে দেরী না করে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করবে। তারপর আমি যা করার করব। আর আজ বাড়ী ফিরে আমার বোনটাকে বলবে এই দিদি ওর উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য অনেক অনেক শুভকামনা জানিয়ে বলেছে, এবার যেন সে নিজের স্বপ্নউড়ানের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়। কি বলতে পারবে তো ?

ম্যাডামের কথায় রাজুর মা হাসিমুখে অহল্যার দিকে তাকাল। অহল্যা অনভ্যস্তভাবে জড়তার সঙ্গে কয়েকবার ‘স্বপ্ন উড়ান’ শব্দটি উচ্চারন করে কুন্ঠাভরে বলল – ঠিক আচে মেডাম! আমি এক্কুনি বাড়ী গে মেয়েরে বলচি তার দীপালি দিদি তারে বলে পাটিয়েচে সোপনো উড়ানের জন্নো পোস্তুত হতে!

সসঙ্কোচে কথাটা বলার সময় অহল্যার দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত ক্ষয়াটে আপাত অসুন্দর মুখটা আনন্দে, গর্বে চকচক করছিল। সেদিকে তাকিয়ে দীপালী রায়ের মনে পড়ল তার চাকরি পাওয়ার খবরটা প্রথমবার পেয়ে তার দারিদ্র্যের সঙ্গে নিরন্তর যুঝতে থাকা বিধবা মায়ের মুখটাও এরকমই গর্জন তেল মাখা দুর্গা প্রতিমার মতো চকচক করছিল। বিডিও দীপালি ম্যাডাম মুগ্ধ দৃষ্টিতে তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা জীবন যুদ্ধে সংগ্রাম করা আর এক লড়াকু মাকে মনে মনে কুর্নিশ জানাল।

পূর্বাশা মণ্ডল, গ্রীণপার্ক, নরেন্দ্রপুর, কোলকাতা – ১০৩

আরো খবর »