৩০০০ জন মহিলার ৫ জন ফিস্টুলা রোগে আক্রান্ত

Feature Image

রুমি আক্তার পলি
১০ অক্টোবর ২০১৮

এনজেন্ডার হেলথ বাংলাদেশের জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রতি ৩০০০ জন বিবাহিত নারীর মধ্যে পাঁচজন নারী প্রসবজনিত জটিল রোগ ফিস্টুলার শিকার হয়।

ইউএনএফপিএর সহযোগিতায় এনজেন্ডার হেলথ বাংলাদেশ এই জরিপ পরিচালনা করে যা থেকে লক্ষ্য করা যায় যে উক্ত রোগটি সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাবে রোগীরা বেশিরভাগ এ রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে।

রংপুর জেলার বদরগঞ্জ উপজেলার বমনা বাজার শেখ পাড়া গ্রামের রামিজা (৪২) নামক হতভাগ্য মহিলা দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে প্রসবজনিত ফিস্টুলায় আক্রান্ত।

তার বিয়ে হয় এবং তিনি অকালে গর্ভবতী হয়ে ওঠেন।দীর্ঘায়িত সময় ও শ্রমের পর তিনি দিনাজপুর হলদিবাড়ি হাসপাতালে একটি মৃত শিশুর জন্ম দেন এবং ফিস্টুলায় আক্রান্ত হন।

তিনি তার স্বামী দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয় এবং আবার বিয়ে করেন কিন্তূ, দুর্গন্ধের কারণে তাকে আবার দু’দিন পর বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হয়।দুর্গন্ধের কারণে তার স্বামী, পরিবার তাকে একা ছেড়ে দেয় এবং সমাজ থেকে বিতাড়িত হন।

কুলসুম বেগমের (প্রকৃত নাম না) বিয়ে হয় মাত্র ১৪ বছর বয়সে।বর্তমানে তিনি ৪০ বছর বয়সী এবং তিন সন্তানের মা।প্রথম সন্তান জন্ম দেয়ার সময় তিনি ফিস্টুলায় আক্রান্ত হয়েছিলেন।

ফিস্টুলার কারণে স্বাস্থ্যে বিভিন্ন জটিলতা দেখা দেয় ফলে কুলসুম তার স্বামীর কাছ থেকে কঠোর আচরণ পান।স্বামীর অবহেলার কারণে কুলসুমকে তার পরিবার থেকে আলাদা হতে বাধ্য হন।তিনি এখন সমাজে একটি বিচ্ছিন্ন ও একাকী জীবন যাপন করছেন।রামিজা ও কুলসুম উভয়েরই কিশোর বয়সে বিয়ে হয়।

রমিজা ও কুলসুমের মত হাজার হাজার কিশোরী অল্প বয়সে গর্ভধারণের জন্য এবং পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা না পাওয়ায় এ রোগের শিকার হচ্ছে।

সেভ দ্যা চিলড্রেনের ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর ইশতিয়াক মান্নান বলেন, অদক্ষ জন্ম পরিচারক দ্বারা অনিরাপদ ও দীর্ঘায়িত ডেলিভারি ফিস্টুলা রোগের কারণ।

তিনি আরও বলেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গরিব মহিলাদের ফিস্টুলা রোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয় কারণ তারা অনিরাপদ ডেলিভারির অভিজ্ঞতার সাথে সাথে পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা পায় না।

ইশতিয়াক মান্নান বলেন, “ফিস্টুলা আক্রান্ত নারীদের অনিয়ন্ত্রিত, অস্থিতিশীল প্রস্রাব হয়।জন্ম নালিটি যখন মূত্রথলির সাথে সংযুক্ত হয় এবং অস্বাভাবিক গর্তের মাধ্যমে মলদ্বারের কাজ সম্পন্ন হয় তখন এটি ঘটে।”

স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক (ডিজিএইচএস) প্রফেসর ডা.আব্দুল কালাম আজাদ বলেন, “দেশে ফিস্টুলার রোগের সঠিক কোনো চিত্র নেই এবং এ রোগীদের সংখ্যা ৭০,০০০ থেকে ২,০০,০০০।”

বিভিন্ন পাবলিক মেডিকেল কলেজে ১০টি ফিস্টুলা সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে, যাতে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ফিস্টুলা রোগীদের নিরাময় করা যায়।ফিস্টুলা রোগীদের চিকিৎসা সুবিধা প্রদানের জন্য আরো ফিস্টুলা সেন্টার স্থাপন করা হবে।

তিনি বলেন,”প্রসবজনিত ফিস্টুলা একটি মারাত্মক ধরণের রোগ।এটি জন্ম থলি এবং মূত্রাশয়ের মাঝে একটি স্থূল ছিদ্র এবং এর কারণ হলো দীর্ঘায়িত ও অনিরাপদ প্রসব।প্রস্রাব ও মল পড়ে যাওয়া, ক্রমাগত শারীরিক সমস্যা, মানসিক কষ্ট ইত্যাদি সমস্যা হয়।

প্রফেসর ডা.আব্দুল কালাম আজাদ বলেন, বাধাগ্রস্ত অবস্থায় ভ্রুনের মাথা ১২ ঘণ্টা বা তার বেশি সময় ধরে জন্ম থলের মধ্যে আটকে থাকে।মাথাটি পেলেভিক হাড়ের বিপরীতে যোনির পাতলা নরম প্রাচীরের উপর চাপ সৃষ্টি করে এবং দীর্ঘ চাপের ফলে যোনি প্রাচীর ধ্বংস হয় এবং গর্তগুলি উৎপন্ন হয়।এ রোগে আক্রান্ত গর্ভবতী মহিলারা ১২ ঘন্টা বা তারও বেশি সময় ধরে ডেলিভারির সময়ে জটিলতা ভোগ করে।তবে
দেশব্যাপী এ রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।

অধ্যাপক আজাদ বলেন, “এটি একটি নিরাময়যোগ্য রোগ এবং আমরা সকল প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সুবিধা প্রদানের পাশাপাশি এ রোগের বিরুদ্ধে আওয়াজ তৈরি করব দেশ জুড়ে।”

আরো খবর »