পিরিয়ড সম্পর্কে স্কুল ছাত্রীদের সচেতনতায় সেনোরার ‘স্কুল প্রোগ্রাম’

Feature Image

ঢাকা : মানুষের জন্ম তার মায়ের পেটে। অর্থাৎ সন্তান জন্ম দানের জন্য দরকার এক জন মা বা নারী। এক জন নারী সন্তান জন্মের মাধ্যমেই এই পৃথিবীটাকে সুন্দর করেছে। এই সন্তান জন্ম দান আসে তার ‘পিরিয়ড’ থেকে। অর্থাৎ একজন নারী হলে তার পিরিয়ড হবেই, পিরিয়ড হলেই সন্তান জন্ম দানে সক্ষম হন একজন নারী। মাতৃত্বের স্বাদ পাওয়া একজন নারীর সবচেয়ে চাওয়া। একটা নির্দিস্ট বয়স হলেই কেবলমাত্র একজন নারীর পিরিয়ড হয়। এটাই সৃস্টি কর্তার নিয়ম। কৈশোরে যখন প্রথমবার একজন নারীর পিরিয়ড হয় তখন এ বিষয়ে তার কোন ধারনাই থাকেনা। ভয় কিংবা লজ্জা পায়। কিন্তু এটা লজ্জার কোন বিষয় নয়। পৃথিবীর চিরাচরিত নিয়ম। প্রথম পিরিয়ডের সময়টা মোটেই সুখখর নয়। কেননা এ সময় হয়তো এ বিষয়ে একজন নারীর কোন ধারনাই থাকেনা। বিশেষ করে স্কুল জীবনে ছাত্রীরা একটা লজ্জা ও আতঙ্কে ভোগে। যেমন সালমা। তের বছর বয়সী সালমার দূরন্তপনায় তার বাবা-মা সহ স্কুলের শিক্ষকরা পর্যন্ত অস্থির হয়ে থাকেন। প্রায় প্রতিদিনই স্কুলের সহপাঠীদের কেউ না কেউ শিক্ষকদের কাছে নালিশ করে সালমার বিরুদ্ধে। কিন্তু পড়ালেখায় ভালো হওয়ায় শিক্ষকরা তাকে খুব বেশি বকাঝকাও করেন না। কাছে ডেকে বুঝিয়ে বলেন শুধু। অভিযোগ গুরুতর হলে ডাক পড়ে বাবা অথবা মায়ের। বাবা কখনো গায়ে হাত না তুললেও মা ঠিকই মারেন। তারপরও সালমা দমার পাত্রী নয়।

কিন্তু হঠাৎ একদিন সালমা কান্না করতে কারতে বাড়ি ফিরে আসে। মাও খুব অবাক। বারবার জিজ্ঞেস করেও কোন উত্তর নেই সালমার। পরে রাতে মা তাকে কাছে ডেকে অনেক আদর করে জানতে চাইল কি হয়েছিল স্কুলে। তখন সালমা তার স্কুল ড্রেসের পাঁয়জামা দেখায় মাকে। সেখানে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ। ভয়ে মেয়ে আবার কান্না শুরু করে দেয়। মা অনেক বুঝিয়ে তাকে শান্ত করল।

সালমার মত বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ মেয়ে পিরিয়ড নিয়ে ভয় এবং অনিশ্চয়তায় থাকে। ভয়ে তারা এ বিষয়টি নিয়ে কারো সাথে কথা পর্যন্ত বলে না। এমনকি মাকেও তারা এ বিষয়ে কিছু জানায় না। বিরাট কোন অসুখ হয়েছে ভেবে তারা চুপ করে থাকে। আবার অনেক মেয়ে বিষয়টি নিয়ে মা, খালা, ফুফু অথবা বড় বোনের সাথে আলাপ করলেও তারাও সঠিক পথ দেখাতে পারেন না। তারা নিজেরা যেভাবে এ সমস্যার মোকাবেলা করেছেন, সেই পথই দেখিয়ে দেন মেয়েটিকে। কিন্তু মেয়েটি সেই অন্ধকার তিমিরেই থাকে।

আবার অনেক মেয়ে এ সময় ভয়ে স্কুল যাওয়াও ছেড়ে দেয়। নিজের মত করে এ সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করে। এর ফলে দেশের অনেক মেয়েই ভুগে জটিল আরো অনেক রোগে।
মেয়েদের এসব সমস্যার কথা মাথায় রেখেই স্যানিটারী ন্যাপকিন প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ‘সেনোরা’ চালু করেছে ‘স্কুল প্রোগ্রাম’ নামের এক কর্মসূচী। বিগত প্রায় ১৩ বছর আগে চালু হওয়ার পেছনে মূল উদ্দেশ্য ছিল মেয়েরা যেন পিরিয়ড নিয়ে সচেতন হয়। ভয় না পেয়ে কীভাবে এই পিরিয়ডকালীন সময়ে সঠিক পরিচর্যা করা যায় সে বিষয়ে মেয়েদের জানানো। এবং এই পিরিয়ড নিয়ে মেয়েরা যেন স্কুলের শিক্ষিকা এবং তার মা অথবা বোন অথবা অন্য কোন কাছের আত্মীয়ার সাথে খোলামেলা আলোচনা করতে পারে।

মুন্সীগঞ্জ জেলার লৌহজংয়ের একটি গার্লস স্কুলে প্রথম এই প্রোগ্রামের যাত্রা শুরু হয়। এরপর থেকে দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়ে এই কর্মসূচী। প্রথমে শিক্ষিকা এবং ছাত্রীরা আলোচনা করেন খোলামেলাভাবে। কারন পরিবারের পর এই স্কুল শিক্ষিকারাই ছাত্রীদের কাছের হন। দিনের একটি বড় অংশ ছাত্রীরা শিক্ষিকাদের সাথে সময় কাটান। এরফলে ছাত্রীরা সহজেই তাদের শিক্ষিকাদের কথা বুঝতে পারেন এবং এসময় তাদের লজ্জ্বাও কম হয়।
এরপর শুরু হয় মূল পর্ব। প্রাথমিক পরিচয় শেষে ছাত্রীদের একটি ভিডিও দেখানো হয়। ভিডিও দেখানো শেষে একজন গাইনি রোগ বিশেষজ্ঞ ছাত্রীদের সাথে কথা বলেন। ছাত্রীদের পিরিয়ডের সাথে পরিচিত করেন। এ সময় কীভাবে নিজের পরিচর্যা করতে হবে, শারীরিক অবস্থা কেমন হতে পারে, কোন ধরনের কাপড় ব্যবহার করতে হবে ইত্যাদি বিষয়ে বিশদ আলোচনা করেন তিনি।

এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জ উপজেলার মডার্ণ গার্লস স্কুলের নবম শ্রেণীর ছাত্রী নবনীতা কর্মকার বলেন আজ থেকে তিন বছর আগে আমাদের স্কুলে এই কর্মসূচী হয়। তখন খুব লজ্জা পেয়েছিলাম। কিন্তু সে সময় আমাদের যে উপকার হয়েছে তা আমার আজীবন মনে থাকবে। আমাদের স্কুলের প্রায় সব মেয়েই এই বিষয়ে এখন সচেতন। আবার যেসব শিক্ষার্থী নতুন ভর্তি হয় তাদেরকে আমাদের স্কুলের শিক্ষিকারা ডেকে নিয়ে আলাদাভাবে আলোচনা করেন। তাদেরকে সব বুঝিয়ে বলেন। যদি কোন সমস্যা হয় সাথে সাথে তা আমরা আমাদের শিক্ষিকাদের জানাই।

ওই স্কুলের সহকারী শিক্ষিকা জোবেদা খাতুন বলেন, আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকে স্কুলের মেয়েরা যেন স্বাস্থ্য সচেতন হয়। বিশেষ করে পিরিয়ড বিষয়ে। কারন এটি এমন একটি বিষয় যা মেয়েরা মুখ ফুটে কাউকে বলতে পারে না। এমনকি অনেক মেয়ে এখনো পর্যন্ত তার মায়েদের সাথেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেনা।
আমরা আমাদের স্কুলের পক্ষ থেকে মায়েদের নিয়ে মাঝে মাঝে বসি এবং তাদেরকেও এ বিষয়ে মেয়েদের সহযোগিতা করতে বলি।
একই স্কুলের অষ্টম শ্রেনীর ছাত্রী রোদেলা বলেন, প্রথমবার যখন আমার পিরিয়ড হয় তখন আমি ভয়ে অনেক কান্নাকাটি করি। প্রায় দশ দিনের মত স্কুলেও আসিনি। বাবা-মা বারবার স্কুলে না যাওয়ার কারন জানতে চাইলেও তাদেরকেও আমি কিছু বলতে পারিনি। পরে স্কুলে আসার পর আমার ক্লাস টিচার বারবার করে আমার স্কুলে না আসার কারন জানতে চায়। পরে তিনি আমাকে ডেকে আলাদা করে আমারা সাথে আলোচনা করেন। এবং আমি তাকে আমার শারীরিক সমস্যার কথা জানাই। তিনিই আমাকে বলেন, এটি কোন রোগ নয়। এটি সব মেয়েদের হয়। এতে ভয় বা লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। পরে তিনি আমার মাকে ডেকে তাকেও বিষয়টি জানান। এখন আমি আর স্কুল কামাই করিনা।
জানা যায়, সেনোরার এই কর্মসূচিটি চালু হওয়ার পর প্রায় প্রতি সপ্তাহে দেশের কোন না কোন স্কুলে তা চালিয়ে যাচ্ছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই কর্মসূচীর সাথে যুক্ত এক কর্মকর্তা বলেন, এখন পর্যন্ত প্রায় ৩৫ লাখের উপর স্কুল ছাত্রীকে পিরিয়ড বিষয়ে সচেতন করা হয়েছে এই প্রোগ্রামের মাধ্যমে। ভভিষ্যতেও এই প্রোগ্রাম চলবে।

আরো খবর »