মনোনয়ন নিতে এসে লাশ হয়ে বুড়িগঙ্গায় যশোরের বিএনপি নেতা

Feature Image

ঢাকা : আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নের জন্য ঢাকায় এসে চার দিন আগে পল্টন থেকে নিখোঁজ হওয়া যশোরের বিএনপি নেতা আবু বকর আবুর লাশ মিলেছে বুড়িগঙ্গায়।

ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার ওসি শাহ জামান গণমাধ্যমকে বলেন, মঙ্গলবার বিকালে বুড়িগঙ্গা নদীর ফরিদাবাদ ডকইয়ার্ড বরাবর নদী থেকে ভাসমান অবস্থায় লাশটি উদ্ধার করা হয়।

বুধবার রাতে তার স্বজনরা সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে গিয়ে লাশ শনাক্ত করেন বলেও জানান তিনি।

ওসি শাহ জামান বলেন, ‘লাশ অনেকটাই পচে গেছে। পরনে ছিল স্যান্ডো গেঞ্জি আর পাজামা। তার ভাগ্নে আর ভাতিজা তাকে আবু বকর আবু হিসেবে শনাক্ত করেছেন।’

আবু বকর আবু যশোর জেলা বিএনপির সহসভাপতি ও কেশবপুর উপজেলার মজিদপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন।

তার ভাগ্নে খুলনার একটি স্থানীয় পত্রিকার সাংবাদিক জাহিদ হাসান বলেন, ‘গত রবিবার রাতে পল্টনের মেট্রোপলিটন হোটেল থেকে মামা নিখোঁজ হন। আজ তার লাশ পাওয়া গেল।’

পরিবারের সদস্যরা বলছেন, আবুকে অপহরণ করা হয়েছে জানিয়ে তাদের কাছ থেকে ১ লাখ ৭০ হাজার টাকাও আদায় করা হয়েছে। কিন্তু তাকে আর মুক্তি দেওয়া হয়নি।

অন্যদিকে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী পাঁচ নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে জানিয়ে বুধবার দলটির পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনে যে তালিকা দেওয়া হয়েছিল, সেখানেও আবুর নাম ছিল।

তবে কারা কেন কীভাবে আবুকে হত্যা করেছে, সে বিষয়ে কোনো ধারণা পুলিশ দিতে পারেনি।

যশোর-৬ (কেশবপুর) আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশী ও যশোর জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি আবু বকর আবুর (৭০) মরদেহ দুইদিন আগে ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা পুলিশ বুড়িগঙ্গা নদী থেকে উদ্ধার করা হয়। তিনি কেশবপুরের মজিদপুর ইউনিয়ন পরিষদের পাঁচবারের নির্বাচিত চেয়ারম্যান ছিলেন।

পরিবারের সদস্য ও বিএনপি নেতারা জানান, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নের জন্য আবু বকর আবু গত ১২ নভেম্বর ঢাকায় যান। পল্টন এলাকার মেট্রোপলিটন হোটেলের চতুর্থ তলায় ৪১৩নং রুমে ছিলেন। সেখান থেকে দলীয় মনোনয়ন ফরম কিনে ও জমা দেন। সাক্ষাৎকার বোর্ডে অংশ নেয়ার জন্য ওই হোটেলেই অবস্থান করছিলেন। ১৮ নভেম্বর রোববার রাত ৮টার দিকে তার সঙ্গী মজিদপুর ইউপি মেম্বার সাইফুল ইসলাম ওষুধ কিনে ফিরে এসে তাকে আর রুমে পাননি। রাত সাড়ে ৮টার দিকে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন থেকে কেশবপুরে অবস্থানরত তার এক ভাগনের মোবাইল ফোনে কয়েকবার মিসকল আসে।

প্রত্যেকবার ব্যাক করলে শুধু হ্যালো হ্যালো ছাড়া কোনো কথা হয়নি। এরপর ০৯৬৩৮৮৮৮২০২ নম্বর মোবাইল থেকে ওই ভাগনের কাছে ফোন দিয়ে তার মামার জন্য দেড় লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। এ জন্য ওই রাতে কয়েকটি বিকাশ নম্বরও সরবরাহ করেন তারা। কিন্তু রাত ১২টার পর বিকাশের ট্রানজিকশন বন্ধ থাকায় মঙ্গলবার সকালে অপহরণকারীরা ০১৭৪৮১১০৫৭৭ নম্বর মোবাইল থেকে পুনরায় যোগাযোগ করেন। এরপর তাদের দেয়া বিভিন্ন নম্বরে দেড় লাখ টাকা বিকাশ করা হয়। পরবর্তীতে সকাল ৯টার দিকে অপহরণকারীরা দেড় লাখ টাকার প্রাপ্তি স্বীকার করে আরও ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন।

অনেক অনুরোধের পর অপহরণকারীরা ২০ হাজার টাকা বিকাশ করার জন্য দুটি নম্বর সরবরাহ করে বলেন, ওই টাকা পাওয়ার আধা ঘণ্টার মধ্যে আবু বকর আবুকে ওই হোটেলের সামনে ছেড়ে আসা হবে। সাড়ে ১০টার দিকে ২০ হাজার টাকা বিকাশ করার পরও তাকে ছাড়া হয়নি এবং তারা আর মোবাইল ফোন রিসিভ করেননি। দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে অপহরণকারীদের মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়। বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত আবু বকর আবুর মোবাইল ফোনটি বন্ধ ছিল।

এদিকে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী আহমেদ বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সংবাদ এক সম্মেলনে অভিযোগ করেছেন, গত রবিবার তাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তুলে নিয়ে যাবার পর তার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। বুড়িগঙ্গা নদীতে তার লাশ পাওয়া গেছে।

তিনি আরও বলেন, এলাকার একজন জনপ্রিয় নেতা ও জনপ্রতিনিধি আবু বকর আবুকে নির্মমভাবে হত্যা করার পর লাশ বুড়িগঙ্গায় ফেলে দেয় হত্যাকারীরা। কোটা সংস্কার আন্দোলনে এভাবেই একজন আন্দোলনকারীর লাশ ভেসে উঠেছিল বুড়িগঙ্গায়। সরকার এখন আগুন নিয়ে খেলা শুরু করেছে। যশোর জেলা বিএনপির নেতা ও চারবারের একজন জনপ্রিয় জনপ্রতিনিধিকে হোটেল থেকে তুলে নেয়া হলো, আর গায়েব করে হত্যা করার মাধ্যমে তার লাশ বুড়িগঙ্গায় ফেলা দেয়া হলো।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরো বলেন, ‘বর্তমান সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় এজেন্সির মাধ্যমে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। গোটা দেশ এখন মৃত্যুউপত্যকায় পরিণত হয়েছে। দেশব্যপী প্রায় প্রতিদিনই বিএনপি নেতাকর্মীদের গুম করা হচ্ছে, হত্যা করে লাশ নদী, খাল-বিল কিংবা রাস্তার ধারে ফেলে দেয়া হচ্ছে। আমি আবু বকর আবুর হত্যাকাণ্ডের তীব্র ধিক্কার জানাচ্ছি। অবিলম্বে হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোর দাবি করছি।’

রিজভী আরো অভিযোগ করেন, শাহবাগ থানাধীন ২০ নং ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও ঢাকা মেডিকেল ইউনিট বিএনপির সভাপতি মো. আজিমকে বৃহস্পতিবার দুপুরে সাদা পোশাকধারী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আটক করে নিয়ে গেলেও এখনও পর্যন্ত স্বীকার করছে না। সম্ভাব্য সব স্থানে খোঁজ নিলেও তার সন্ধান মেলেনি।

তিনি বলেন, আমি অবিলম্বে মো. আজিমকে জনসমক্ষে হাজির করার জোর দাবি জানাচ্ছি।

আরো খবর »