১৯৮৪ সর্দার গদ্দার হ্যা পর্ব ২

Feature Image

দেবশ্রী চক্রবর্তী: ন্যাশনাল হাইওয়ে দুইয়ের ধারে বিখেলপুর গ্রাম। গ্রামটির চারদিক সোনালী গমের ক্ষেত বর্মের মতন বেষ্টন করে রেখেছে। রোজ এ পথে অনেক গাড়ি যায়, গাড়ি গুলো থেকে হলুদ আলো এসে পরে এই সোনালী ক্ষেতে। কিন্তু আজ এ পথে কোন গাড়ি নেই। একটা জীবন্ত হাইওয়ের যেন মৃত্যু হয়েছে । ঝোড় হাওয়া বয়ে যাচ্ছে ক্ষেতের ওপর দিয়ে, গ্রামে ঢোকার মুখে গুরুদ্বারা। সন্ধ্যাবেলায় গুরু নাম পাঠ করে সজ্জন সিং গুরু দ্বারার দরজায় তালা দিতে দিতে হাইওয়ের দিকে একবার তাকালেন। তার কপালে চিন্তার ভাজ। আজ উত্তরের হাওয়ার দাপটও অন্য দিনের থেকে একটু বেশি। গুরু দ্বারার ডান দিকের দেওয়ালের পাশে একটা বিশাল লাল ফুলের গাছ আছে, হাওয়ার দাপটে লাল ফুল গুলো ধেয়ে আসছে তার দিকে। এখন বয়স হয়েছে, তার ওপর চোখেও ভালো দেখেন না তিনি, এসব উপদ্রোপ এ বয়সে আর ভালো লাগে না। এসবের বয়স পার করে এসেছে সজ্জন। আকাশটাও বেশ মেঘলা, মনে হয় খুব দুর্যোগ আসছে। এখান থেকে গ্রাম প্রায় পনেরো মিনিটের পথ। ফেরার পথে একটা রেডিও তার সঙ্গী। রেডিওতে একটু পরে সাতটার খবর শুরু হবে, সজ্জন সিং রেডিওটা চালিয়ে চলতে লাগল। এসময় গ্রামের প্রায় সব লোক ঘুমিয়ে পরে, তাই রাস্তাঘাটে দু একজন মানুষ ছাড়া আর কারুকে সেরকম চোখে পরে না।এই পথে দুটো লাইট পোস্ট পরে, কিন্তু আজ দুটোর একটাতেও আলো জ্বলছে না, সজ্জন সিং টর্চ লাইটের আলো লাইট পোস্টে ফেলতেই মনে হল লাইটটা কেউ ভেঙ্গে ফেলেছে। তেঁতুল তলা পার করার সময় খবর শুরু হল। খবর পড়ছেন একজন মহিলা, গলার আওয়াজটা বেশ ভারি, এরকম থমথমে পরিবেশে এই মহিলার কণ্ঠ সজ্জনকে সাহস যোগাচ্ছে। টর্চ লাইটের আলোটা দোলাতে দোলাতে সে চলেছে। গতকাল ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী তার দুই শিখ নিরাপত্তারক্ষীর হাতে নিহত হয়েছেন। সজ্জন সিং এর মুখ থেকে দুটো কথা বেরিয়ে এলো। বাই গুরু ওনাকে শান্তি দিয়ো। মাথা ঝাঁকিয়ে দুঃখ প্রকাশ করতে করতে তিনি তেঁতুল তলা পার করে ডান দিকে বাক নিতেই মনে হল তার পেছন দিক থেকে খুব উজ্জ্বল আলো এসে পরছে পিঠের ওপর। সজ্জন দাঁড়িয়ে পড়লেন। তার ডান হাতের রেডিওতে এক মহিলা খবর পড়ে চলেছেন, মহিলা কি বলছেন সজ্জন শুনতে পাচ্ছে না, সে অনুভব করছে তার পেছন দিকে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছেন। পেছন ফিরতে গিয়ে তিনি দেখলেন বাঁদিকে ক্ষেতের মাঝে বিল্লুদের মাটির বাড়ির দোতলায় বিল্লু বসে তাকে দেখছে। বিল্লুকে এখান থেকে ছোট্ট একটা বিন্দুর মতন লাগছে। তিনি বিল্লুকে বললেন, বিল্লু, পুত্তর, ঘরে যা। বিল্লু যেন চোখের পলকে মিলিয়ে গেল। সর্দার সজ্জন সিং ঘুরে দাড়াতেই একটা তীব্র আলো তার চোখের ওপর এসে পড়ল। তারপর একটা গুলির আওয়াজ। সজ্জনের রেডিওটা ছিটকে পড়ল পাশের ক্ষেতের ওপর। টর্চের হলুদ আলো ভেদ করে রক্ত এসে পড়ল তেঁতুল গাছটার ছালের ওপর।
বিল্লু তাদের দোতলার ঝাঁঝরির মধ্যে দিয়ে তাকিয়ে আছে পেছনের রাস্তার দিকে। তার নাকে তন্দুরের গন্ধ আসছে। বিজি তন্দুরে রাতের রুটি বানাচ্ছে আর বাউজি বাড়ির খোলা উঠানের মধ্যে খাটিয়াতে শুয়ে রাতের খবর শুনছেন। এই সময়টা সারাদিনের মধ্যে সব থেকে পছন্দের ওর। বিজির তন্দুরের গরম গন্ধটা বিল্লুর সারা শরীরকে এক গভীর স্নেহে আবৃত করে রাখে, একটু ঘুম ঘুম আবেশ আসে। সারা দিন বাওজির সাথে ক্ষেতে থেকে সন্ধ্যায় ফেরে, তারপর ছোট্ট বিল্লুর শরীরটা খুব ক্লান্ত হয়ে যায়। একটু পরেই বিজি রাতের খাবার দিয়ে দিলে ওরা ঘুমিয়ে পরবে।
ক্ষেতের ওপারে গুরু দ্বারার বুডঢা বাবা একটু আগে রাস্তার মধ্যে পরে গেছেন, বুডঢা বাবাকে একটা লোক গুলি করেছে, লোকটা এখন বিল্লুদের বাড়ির দিকে তাকিয়ে আছে। বিল্লুকে সে দেখতে না পেলেও বিল্লু তাকে দেখতে পাচ্ছে। আলো আধারির মধ্যে মানুষ গুলোর মুখ দেখা যায় না। কিন্তু বুডঢা বাবাকে সে চিনতে পেরেছে তার সাদা পোশাক আর দাড়ি দেখে। এরকম চেহারার লোক এ গ্রামে এই একজনই তো আছে। এই বুডঢা বাবাকে গ্রামের সবাই যেমন চেনে, ইনিও সবাইকে চেনেন। তাই তো বিল্লুকে দূর থেকে দেখেই তিনি চিন্তে পেরেছেন। কিন্তু এভাবে তার মৃত্যুটা বিল্লু কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। খুব কষ্ট হচ্ছে তার মনে। বিল্লু দেখছে জনা পাঁচেক লোক এসে দাঁড়াল লোকটার পেছনে। এখন সন্ধ্যের হাল্কা আলোটাও মুছে গিয়েছে, ঘন অন্ধকারে কিছু দেখা যাচ্ছেনা। তবে লোক গুলো বুডঢা বাবাকে ঘিরে ধরেছে বোঝা যাচ্ছে। ওরা কিছু করছে, কিন্তু কি করছে এখান থেকে বোঝা যাচ্ছেনা।
গুলির শব্দটা কানে যেতেই বাউজি রেডিওর আওয়াজ কমিয়ে খাটিয়ায় উঠে বসল। তিনি বিজির সাথে খুব আস্তে কথা বলছেন। বিজির রুটি বেলার খটখট শব্দ হচ্ছে। লোক গুলো বুডঢা বাবার দেহটা একটা দড়ি দিয়ে বেঁধে দড়ির আরেক প্রান্ত নিয়ে একটা লোক তেঁতুল গাছে উঠে পড়ল। তার পর গাছের একটা ডালের ওপর দিয়ে দড়িটাকে তুলে ফেলে দিল নিচে। দুটো লোক সেই দড়ি ধরে টানতে লাগল। বিল্লু দেখতে পাচ্ছে বুডঢা বাবার দেহটা টেনে তারা ঝুলিয়ে দিচ্ছে গাছের ওপর। সজ্জন সিং এর পা দুটো গাছের সাথে বাঁধা আর তার মাথাটা নিচের দিকে ঝুলছে। আরো চারটে মতন লোক অন্ধকারে ভারি কিছু একটা মাথায় করে আনল,মনে হচ্ছে জিনিশটা কোন লড়ির টায়ার। তাদের পেছনে আরো কিছু লোক যাদের হাতে কিছু আছে তবে কি আছে তা বোঝা যাচ্ছে না। লোকগুলো ভারি মতন জিনিশটা সজ্জন সিং এর মাথার নিচে রেখে তার মধ্যে আগুন ধরিয়ে দিল। সজ্জন সিং এর শরীরে তখন প্রাণ ছিল, সে তার হাত দুটো ঝাঁকিয়ে চিৎকার করতে লাগল। লোকগুলো তার শরীরের ওপর পেট্রেল ছড়িয়ে দিতেই আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল। সজ্জন সিং এর মাথার পাগাড়িতে আগুন জ্বলছে। এমন সময় একটা কুকুর তীরের মতন ছুটে যেতেই একটা গুলি খেয়ে পরে গেল। কুরের শেষ আকুতি শুনতে পাচ্ছে সে। বাওজি নীচ থেকে ডাক দিল তাকে। বাওজির গলার আওয়াজ মনে হয় ওদের কানে গিয়ে পৌঁছেছে। লোক গুলো ক্ষেতের আল ধরে এগিয়ে আসছে বিল্লুদের বাড়ির দিকে। বিল্লুর বাওজি ওকে আরো জোরে ডাকছে, তিনি বিল্লুর উত্তর না পেয়ে হয় তো ক্ষুব্ধ কিংবা গুলির আওয়াজ শুনে এরকম ব্যাবহার করছেন।

এখানে আর বেশিক্ষণ থাকলে বাওজি তাকে লাঠি পেটা করবে তা সে জানে, তাই ছোট্ট বিল্লু নিচে নেমে এসে বাওজির পিঠ দাবাতে লাগল। বিল্লু চোখ বন্ধ করে দেখতে পেলো কত গুলো টর্চের আলো নদীর ধার দিয়ে এগিয়ে আসছে তাদের গ্রামের দিকে । কুকুরের ডাক আর শুকনো পাতার খড়খড় শব্দের ভেতর দিয়ে এগিয়ে আসছে কিছু মানুষ । বিজি বসে ছিল তন্দুর আগলে । তন্দুরের লাল আলো এসে পড়ছিল বিজির মুখে ।
রেডিওতে রাতের খবর শুনতে শুনতে বাউজি বলল, খাবার দিয়ে দাও, এত রাতে জেগে থাকা ঠিক না ।
বিল্লু ভাবছে গুলি চলল, বুডঢা বাবা চিৎকার করল, কোন কিছুই বিজি আর বাউজি শুনতে পেল না, এ কি করে সম্ভব! তবে রেডিওর আওয়াজটা খুব জোড়ে, তাই হতো অতোটা বুঝতে পারেনি।
পাশের শস্যের ক্ষেত থেকে ঠাণ্ডা হাওয়া বয়ে যাচ্ছে উঠানের ওপর দিয়ে । বিল্লু খাটিয়ায় বসে বাউজির পিঠ দাবাতে দাবাতে তাকিয়ে আছে তন্দুরের দিকে । তন্দুরের গন্ধে তার সারা শরীর অবশ হয়ে আসে । রাত দশটার খবর শেষ হলে কারেন্ট চলে গেলো । গ্রামে কারেন্ট চলে গেলে চারদিক কিরকম যেন থম থমে হয়ে যায় ।
বিজি বিড়বিড় করে বলল, বিল্লু, বেটা হেরিকেনটা নিয়ে আয় ।
বিল্লু খাটিয়া থেকে নেমে গেলো দোতলার সিঁড়ির দিকে । সে আস্তে আস্তে উঠে যাচ্ছে সিঁড়ি দিয়ে । কিছুটা ওঠার পর সে তাকিয়ে দেখল পাশের ক্ষেতের দিকে । আজ অমাবস্যার রাত, অন্ধকারে শস্যে ক্ষেতের মাঝখান দিয়ে বুটের শব্দ ভেসে আসছে , তার সাথে কুকুরের ফোঁস ফোঁস শব্দ । বাউজির কুকুর কালু উঠানের মাঝখান থেকে ডেকে উঠতেই বাউজির খাটিয়ায় খট করে একটা শব্দ হল । অন্ধকারের মধ্যেও সব কিছু স্পষ্ট দেখতে পারছে সে । তন্দুরের আলোটা ঝপ করে নিভে গেলো, মাটিতে জল পড়লে যেমন গন্ধ বের হয় ঠিক সেরকম একটা গন্ধ নাকে এলো , সে দেখতে পেলো তন্দুর থেকে সাদা ধোয়া মিলিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারে । বিজির গলার আওয়াজ পেলো সে ।
বিজি বলল, লুকিয়ে পড় বিল্লু, ভুলেও নিচে আসিস না । বিল্লু শুনতে পাচ্ছে ক্ষেতের মধ্যে দিয়ে বুটের শব্দটা তাদে বাড়ির দিকে এগিয়ে আসছে । বিল্লু দোতলার মাটির কার্নিশের পেছনে লুকিয়ে থাকল । কালু বাড়ি থেকে বেরিয়ে ছুটে গেলো গম ক্ষেতের দিকে , বিল্লু কালুর দৌড়ের শব্দ শুনতে পারছে , কালু বীরের মতন এগিয়ে যাচ্ছে বুটের শব্দকে লক্ষ্য করে ।

তারপর পর পর তিনটে গুলির শব্দ । কালু ক্যাউ ক্যাউ করে গুঙিয়ে একেবারে চুপ করে গেলো । চুন্নু অন্ধকারে দেখতে পাচ্ছে কালুর রক্তাক্ত দেহ , সে জিভ বার করে পড়ে আছে রাস্তার ধারে সে বিজি আর বাউজিকে দেখতে পাচ্ছে না, শুধু শুনতে পাচ্ছে বুটের শব্দ , অন্ধকারে সব কিছু অতো পরিষ্কার দেখা যায় না । সে এবার ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে পিছু হটতে থাকল , পিছু হটতে হটতে সে পৌঁছে গেলো ডানদিকের কার্নিশের দিকে , অন্ধকারে বাড়ির উঠানে বুটের শব্দ, সে তার ছোট্ট দুটো হাতে ভড় দিয়ে উঠে পড়ল কার্নিশের ওপর । টর্চের আলো এসে পড়ল বিল্লুর ওপর, বিজি চিৎকার করে বলল বিল্লু ভাগ ।বিল্লুর মাথাটা কেমন যেন ঘুরে গেলো , সে পড়ে গেলো নিচের খড়ের গাদায় । বাড়ির ভেতর থেকে গুলির শব্দ ভেসে আসছে , বিল্লুর কানে শুধু বিজির আর্তনাদ, বিল্লু ভাগ, বিল্লু ভাগ । সে ক্ষেতের পাশ দিয়ে দৌড়তে দৌড়তে এসে উঠল হইওয়েতে ।
বিল্লু যখন হাইওয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল ঠিক সেই সময় গ্রামের ট্রাক ড্রাইভার শ্যামলাল তার বড় দাদা রামলালের সাথে সংসারের হিসেব নিয়ে বসেছিল। ট্রাক নিয়ে দিনের পর দিন সে গ্রামের বাইরে থাকে, তাই সময় পেলে সংসারের হিসেব নিকেশ সে তার বড় দাদাকে বুঝিয়ে দেন।কিন্তু আজ হিসেবের দিকে তার যে নজর নেই তা তার দাদা অনেক আগেই বুঝতে পেরেছে, তাই তার স্ত্রী সুনিতাকে সে বলেছে চা বানাতে। রামলালের একটু চায়ের নেশা আছে, তাই নানারকম কাড়ন দেখিয়ে সে তার স্ত্রীর কাছে চায়ের আবদার করে। স্ত্রী সুনিতা বিরক্ত হলেও আজ সে না করেনি, কাড়ন তার দেবর আজ অনেক দিন পর বাড়ি ফিরেছে। রাস্তাঘাটে ইচ্ছে মতন যে তার খাওয়া হয়না তা সে জানে, তাই আজ দম আলু, তরকার ডাল আর তন্দুরি রোটি সে বানিয়েছে, একটু পরেই খেতে দেবে। খাবার আগে এক কাপ চা খেলে খিদে অনেকটা বেড়ে যাবে। তাই আর কোন আপত্তি সে করেনি। শ্যমলালের মা রাতের বেলা চোখে কিছু দেখতে পায়না। সে দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে দুই ছেলের কথা শুনছে।

শ্যামলাল তার দাদাকে জিজ্ঞাসা করল, গ্রামের অবস্থা কেমন বুঝছ?
রামলালের কপালে ভাজ দেখা গেল, সে বলল কেন? তুমি অন্যরকম কিছু বুঝছ নাকি?
শ্যামলাল একবার ভাবল এসব কথা রামলালকে বলে কোন লাভ নেই। কিন্তু পরক্ষনে তার মনে হল সব সময় তো সে এখানে থাকে না, তাছাড়া দাদা সহজ সরল মানুষ, তাকে বর্তন সময়ের পরিস্থিতির একটু আভাস দেওয়া দরকার। সে বলল,
দিল্লির অবস্থা ভালো না, ওখানে সব ট্রাক আটকে দেওয়া হয়েছে, শুনছি সব ট্রাক থেকে নাকি পেট্রল আর টায়ার নেওয়া হচ্ছে।
রামলাল তার ভাইকে এখনো ছেলেমানুষ মনে করে, তাই তার কথা গুরুত্বহীন বলে সে মনে করে। সে একটু বিদ্রূপের সুরেই সে বলল,
-তোমাকে এত খবর কে দিল?
শ্যামলাল তার দাদার কানের কাছে ঝুঁকে বলল, আমার কাছে সব খবর আছে, শুনছি ট্রান্সপোর্ট কোম্পানি গুলোকে বলা হয়েছে পেট্রল সরবরাহ করতে।
রামলালের এ কথা শুনে এবার একটু চিন্তা হল, সে গ্রামের সহজ সরল মানুষ হলেও একটা কথা বোঝে যে এত পেট্রল যারা চাইছে তারা কোন ভালো উদ্দেশ্যে চাইছে না। সে তার ভাইকে জিজ্ঞাসা করল, কোন বিদেশী শত্রুর হাত আছে নাকি ?
শ্যমলাল ফিসফিস করে বলল, কোন বিদেশী না, ওপর থেকে অর্ডার আছে।
রান্নাঘর থেকে চা ঢালার শব্দ আসছে, রামলাল আবার প্রশ্ন করল, কিন্তু এত পেট্রল দিয়ে সরকার করবে কি?
শ্যামলাল তার থাইয়ের ওপর দুবার ঘুসি মেড়ে বলল, এটাই তো চিন্তা করছি। এত পেট্রল নিয়ে ওরা করবে কি। আমি কিন্তু একটু আগে বেশ কয়েকটা গুলির আওয়াজ পেয়েছি, গ্রামে অন্যরকম লোকজনের আসা যাওয়া আছে নাকি?
অন্যরকম লোকজন মানে কি তা রামলাল জানে, তাই সে বলল, না, সেরকম কোন ব্যাপার এখানে নেই। পাশে হাইওয়ে, টায়ার ব্লাস্টের আওয়াজ হতে পারে। এত চিন্তা করো না।
রামলালের স্ত্রী চায়ের কাপ স্টিলের থালা থেকে তুলে দিল তার স্বামী আর দেবরের হাতে। এমন সময় বাইরের সদর দরজায় কেউ কড়া নাড়ল। সবাই তাকিয়ে আছে বাইরের দরজার দিকে, রাত সাড়ে সাতটা মানে অনেক রাত, এত রাতে কে এলো, তাছাড়া কড়া নাড়ার শব্দটাও খুব রুক্ষ।
শ্যামলাল উঠে দাঁড়িয়ে এগিয়ে গেল দরজার দিকে।
রামলাল খাটিয়ার ওপর থেকে একটা হাঁক দিলো কে?

বাইরে থেকে উত্তর এলো, আমি শ্যামলালের বন্ধু বিরেন্দ্রের কাছ থেকে এসেছি ওর ট্রাক নিয়ে।
শ্যামলাল আজ তার ট্রাক নিয়ে ফিরতে পারেনি। তার বন্ধু বিরেন্দ্র তাকে দিল্লি ছেড়ে চলে যেতে বলেছিল, সে বলেছে এক সপ্তাহ পর তার লোক মুন্না ট্রাক গ্রামে পৌঁছে দেবে, সেখান থেকে সেই ট্রাক নিয়ে তাকে হিমাচল প্রদেশ যেতে হবে। কিন্তু আজই ট্রাক চলে এসেছে শুনে তার একটু অবাক লাগল। সে দরজা খুলে দেখল একটা বেটে রোগা ছেলে হাঁফ প্যান্ট আর গেঞ্জি পরে দাঁড়িয়ে আছে। শ্যামলাল ছেলেটাকে দেখে মনে মনে ভাবল এরকম ছোটখাটো মিষ্টি চেহারার ছেলের নাম মুন্নাই হবে। সে বলল, মুন্না, ভেতরে এসো।
ছেলেটি হাসি হাসি মুখে বলল, না আমাকে আজ রাতেই দিল্লি ফিরতে হবে। আপনি একবার গাড়িটা দেখে নিন।
শ্যামলাল গাড়ির চাবি চাইতেই ছেলেটি জিভ কেটে বলল, গাড়ির চাবি সে ভুল করে গাড়িতেই রেখে এসেছে।
মুন্নার কথা শুনে শ্যামলালের বিরেন্দ্রের ওপর একটু রাগ হল, এ কার হাতে সে গাড়ি পাঠিয়েছে! ছেলেটা নিশ্চয়ই সারা রাস্তা তার গাড়ি এদিক ওদিক রেখে গেছে। যদি গাড়িটা চুরি হয়ে যেত, তাহলে তার খেসারৎ কে দিত?

শ্যামলাল বেরিয়ে যেতেই রামলাল তার স্ত্রীকে বলল, আরো গোটা দশেক রুটি বানিয়ে রাখো, ছেলেটা অনেক দূর থেকে এসেছে, খিদে পেয়েছে হয় তো।
রামলালের মা দেওয়ালে হেলান দিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। রামলালে স্ত্রী মুখ বেঁকিয়ে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে চলল, ঝোড় হাওয়ায় সদর দরজায় আওয়াজ হচ্ছে, বাইরের মেঠো পথের দুই ধারের গাছ থেকে শুঁকন পাতা খোলা দরজা দিয়ে ছুটে আসছে খোলা আঙ্গিনার দিকে। রামলালের মা ছেলেকে বলল, দরজা খুলে কেউ ভেতরে ঢুকেছে, রামলাল তার হিসেবের খাতায় চোখ রেখে বলল কেউ না বিজি। ঝড়ের জন্য দরজায় আওয়াজ হচ্ছে।
শুঁকন পাতার সর সর শব্দ আর দরজার কপাটের আওয়াজের মাঝে বাসন পড়ার আওয়াজ হল। রান্নাঘরে মনে হয় ইঁদুর আছে, না হলে এত জোড়ে কে বাসন ফেলবে। রামলাল হাসতে হাসতে বলল, সুনিতা, চিন্তা করো না, কাল বাজার থেকে ইঁদুর মাড়ার ওষুধ নিয়ে আসবো।
সুনিতার রাগ হলে সে কোন কথার উত্তর দেয় না। উত্তর না পেয়ে রামলালের মনে হল সুনিতাকে দশ খানা রুটি বানাতে দেওয়া হয়েছে বলে হয় তো তার রাগ হয়েছে। বিজি এবার বেশ জোড়ে কাঁদতে শুরু করল। কোন কিছু বোঝার আগেই রামলালের ঘরের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ হয়ে গেল। রামলাল উঠে দাঁড়িয়ে দরজায় ধাক্কা দিচ্ছেন, কিন্তু দরজা খুলছে না। সে সুনিতার নাম ধরে বারবার ডাকছে, কিন্তু তারও কোন উত্তর নেই। এমন সময় সে তার ঘরের ডান দিকের জানালা দিয়ে দেখতে পেল বাইরের খড়ের গাদার ওপর আগুন জ্বলছে। সেই আগুন ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে তার জানালার দিকে। রামলাল পেট্রলের গন্ধ পাচ্ছে। একটা তীব্র পেট্রলের গন্ধ তার ঘরের ভেতর থেকে আসছে। রামলাল মেঝে দিকে তাকিয়ে দেখে জানালা দিয়ে কেউ তার ঘরের ভেতরে পেট্রেল ছড়িয়ে দিয়েছে।

মুন্নার সাথে শ্যামলাল যখন তেঁতুল তলায় পৌঁছল, তখন তার মনে হল একটু আগে তেঁতুল গাছটার ওপর বাজ পরেছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে শ্যামলাল দেখল বেশ মেঘলা আকাশ হলেও বৃষ্টি হবার কোন সম্ভাবনা তেমন নেই, বাজ পরলে তো আকাশে বিদ্যুতের রোশনাই দেখা যেত, তাও দেখা যায়নি, তাহলে গাছে আগুল ধরল কি করে। কিছুটা এগোতেই সে দেখল ক্ষেতের মাঝে টনক সিং এর বাড়িটা যেন আগুনের গোলার মতন সারা ক্ষেতে ছড়িয়ে পরছে।
শ্যামলালের মুখ থেকে দুটো কথা বেরিয়ে এলো, হায় রব্বা, রাতা রাতি গ্রামের এ কি হাল হল!
শ্যামলাল তার পেছন থেকে এক অজানা কণ্ঠস্বর পেল, বড় উল্কাপাত হলে, এরকমই আগুন ছড়িয়ে পরে শ্যামলাল।
সে পেছন ফিরে দেখে মুন্না আর নেই, সেখানে দুজন অপরিচিত লোক দাঁড়িয়ে আছে যাদের হাতে তলওয়ার। লোক দুটো তার নাম জানলেও সে এদের চেনে না।
শ্যামলাল দুবার ডাকল মুন্না, মুন্না।
দুটো লোকের মধ্যে একজন বলল, বুদ্ধু, ওর নাম মুন্না না রতন।
শ্যামলাল বুঝতে পারল এরা ছক কেটে তাকে বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছে, এবার চন্দু সিং এর মতন তাকে মরতে হবে। কিন্তু শ্যামলাল হেরে যাবার পাত্র না। জিততে তাকে হবেই, সে পেছন ফিরে দৌড় দিল। শ্যামলাল জ্বলন্ত গম ক্ষেতের পাশ দিয়ে দৌড়তে দৌড়তে যখন গুরু দ্বারার কাছে পৌঁছল, তখন ও দেখল গুরু দ্বারার দরজা খোলা। সজ্জন চাঁচা এখনও হয় তো গুরু বানী পাঠ করছেন। এর ভেতরে একবার ঢুকে গেলে আর কোন চিন্তা নেই, শ্যামলাল ছুটে দরজা দিয়ে ঢুকতে যাবে এমন সময় শক্তপোক্ত একটা তলওয়ার ওর পেটের মধ্যে গেঁথে গেল।

শ্যামলাল তাকিয়ে দেখে প্রাঙ্গণের মাঝে জ্বলন্ত গুরুগ্রন্থসাহেব পরে আছে ঠিক তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে একটা লোক, লোকটা তলওয়ারটা তার পেটে ঢুকিয়ে এখন ধীরে ধীরে তা বার করে নিচ্ছে, শ্যামলাল দেখতে পাচ্ছে তলওয়ার দিয়ে রক্তের ধারা মাটির ওপর পরে এগিয়ে যাচ্ছে জ্বলন্ত গ্রন্থটির দিকে। যে গুরু গ্রন্থ সাহেবের সাথে সমগ্র শিখ সম্প্রদায়ের মান সম্মান জড়িয়ে আছে, তাকে এভাবে পুড়িয়ে দেবার সাহস কার হল। শ্যামলালের পেটে যে তলওয়ারটা গেঁথে ছিল তা এখন আর নেই, কিন্তু তার উঁচু ভুরি মাঝখান দিয়ে ফেটে নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে নিচের দিকে ঝুলছে। লোকটা তলওয়ার নিয়ে এখন তার ডান দিকে দাঁড়িয়ে আছে।শ্যামলাল দেখল তলওয়ারটার দিকে, সেখানে এখনো ছেড়া নাড়িভুঁড়ি আর রক্ত লেগে আছে। তাকে তোয়াক্কা না করে সে “জো বলে সো নিহাল,সস্রিয়াকাল”বলে ছুটে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল জ্বলন্ত ধর্ম গ্রন্থের ওপর। শ্যামলালে ফাটা ভুঁড়ির মাঝখান দিয়ে আগুন ঢুকে তার সারা শরীরে ছড়িয়ে পরতে লাগল। দু তিনজন লোক এসে তার শরীরের ওপর জ্বলন্ত খর দিয়ে পেট্রল দিয়ে দিল।
শ্যামলালের শরীর যখন জ্বলছে একটা সবুজ ওড়না উড়ে এসে সামনের গমের ক্ষেতের ওপর এসে পড়তেই ঝোড় হাওয়ায় তন্দুরের মিষ্টি গন্ধ ছুটে চলল ফাঁকা হাইওয়ে দিয়ে।

আরো খবর »