বন্যায় ভাসছে উত্তরাঞ্চল, শিশুসহ মৃত্যু পাঁচ

Feature Image

স্বাধীনবাংলা২৪.কম

ঢাকা: দিনাজপুর, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামে বন্যায় আজ সোমবার শিশুসহ পাঁচজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। নিখোঁজ বেশ কয়েকজন। এ নিয়ে তিন দিনে বন্যায় তিন জেলায় ১৮ জনের মৃত্যু হলো। এর মধ্যে গত দুই দিনে দিনাজপুরেই মারা গেছে ১৩ জন।

দিনাজপুরে বন্যার পানির স্রোতে ভেসে আজ সোমবার একজন মারা গেছেন। লালমনিরহাটে গতকাল রোববার পানি পার হয়ে আশ্রয়ের খোঁজে যাওয়ার সময় সাড়ে তিন বছরের এক শিশু মারা গেছে। আরেক শিশুসহ তিনজন নিখোঁজ। কুড়িগ্রামে তিনজন মারা গেছেন।

পাহাড়ি ঢল ও ভারী বৃষ্টিতে যমুনা, তিস্তা, ধরলা, আত্রাইসহ সব প্রধান নদ-নদীর পানি বেড়েছে। উত্তর ও উত্তর পূর্বাঞ্চলের ১৪ জেলা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আজ সোমবার দিনাজপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, বগুড়া, গাইবান্ধা, রংপুর, জামালপুরের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে।

আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর:

দিনাজপুর: দিনাজপুর সদর উপজেলায় বন্যার পানির স্রোতে ভেসে আজ সকালে একজন মারা গেছেন বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক খায়রুল আলম। তাঁর পরিচয় জানা যায়নি। গত দুই দিনে দিনাজপুর সদর, খানসামা, বিরল, বীরগঞ্জ ও কাহারোল উপজেলায় বন্যায় ১৩ জন মারা গেছেন। এ নিয়ে তিন দিনে ১৪ জনের মৃত্যু হলো।

জেলার বিভিন্ন এলাকায় নয়টি বাঁধ ভেঙে গেছে। নদীতে পানি কমলেও এর ফলে শহরের বিভিন্ন এলাকায় পানি ঢুকেছে। প্লাবিত হয়েছে কয়েক হাজার ঘরবাড়ি। দিনাজপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উপসহকারী কর্মকর্তা মো. সিদ্দিকুরজ্জামান জানান, গতকাল রোববার পুনর্ভবা নদীতে পানির উচ্চতা ছিল ৩৮ দশমিক ৩১ মিটার। আজ এই নদীতে পানির উচ্চতা ৩৮ দশমিক ২৮ মিটার। আত্রাই নদীতে পানির উচ্চতা গতকাল ছিল ৪০ দশমিক ১৫ মিটার। আজ কমে হয়েছে ৪০ দশমিক ১০ মিটার।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. মোখলেসার রহমান বলেন, বন্যার পানিতে দিনাজপুরের বিভিন্ন স্থানে রেললাইন ডুবে গেছে। এ জন্য দিনাজপুরের সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ গতকাল থেকে বন্ধ রয়েছে।

লালমনিরহাট: লালমনিরহাট জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মতিয়ার রহমান জানান, গতকাল বেলা দুইটার দিকে সদর উপজেলার কুলাঘাট ইউনিয়নের পূর্ববড়ুয়া গ্রামে রবিউল ইসলামের সাড়ে তিন বছরের ছেলে নাজিম, নাজিমের মা নাজমা বেগম (২২), রবিউলের বোনের স্বামী মোজাম্মেল হক (৪৫) ও মোজাম্মেলের সাত বছরের ছেলে আলী হোসেন বন্যার পানি পার হয়ে আশ্রয়ের খোঁজে যাচ্ছিল। একপর্যায়ে সবাই পানিতে তলিয়ে যায়। এক ঘণ্টা পর শিশু নাজিমের লাশ ভেসে ওঠে। বাকিরা নিখোঁজ রয়েছে।

লালমনিরহাটের পাউবো বলছে, সকাল ছয়টার দিকে ধরলা নদীর পানি বিপৎসীমার ১৩২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে, তিস্তা নদীর পানি ডালিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার ৩০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।

লালমনিরহাট রেল বিভাগীয় সূত্র জানায়, বন্যার পানিতে লালমনিরহাট-বুড়িমারী রুটের ভোটমারী থেকে বুড়িমারী পর্যন্ত, কুড়িগ্রামের রমনা বাজার থেকে কুড়িগ্রাম পর্যন্ত, ঠাকুরগাঁও পঞ্চগড় রুট, লালমনিরহাট রেলস্টেশন থেকে তিস্তা পর্যন্ত ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে।

কুড়িগ্রাম: কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার ও ত্রাণ কর্মকর্তা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানান, বন্যায় তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তবে তাঁদের পরিচয় জানা যায়নি।

ফুলবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দেবেন্দ্রনাথ জানান, ওই উপজেলার বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বন্যার্তদের আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

আজ সকালে ধরলা নদীর পানি বিপৎসীমার ১৩২ সেন্টিমিটার, চিলমারী পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ৬৮ সেন্টিমিটার ও নুনখাওয়া ইউনিয়নে দুধকুমার নদের পানি ৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

কুড়িগ্রামের কাঁঠালবাড়ি, রাজারহাটের কালুয়া ও ফুলবাড়ীর গোড়কমণ্ডল এলাকায় বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বিভিন্ন স্থানে সড়ক ভেঙে যাওয়ায় এবং পানি ওঠায় জেলার সঙ্গে এসব এলাকার সড়ক ও রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে।

বগুড়া: জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা শাহারুল হোসেন মোহাম্মদ আবু হেনা আজ সকালে প্রথম আলোকে বলেন, গত রাতে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে যমুনা নদীতে ৩০ সেন্টিমিটার ও বাঙালি নদীতে অস্বাভাবিক পানি বেড়েছে। সারিয়াকান্দি উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, যমুনায় পানি বেড়ে যাওয়ায় উপজেলার চন্দনবাইশা, কামালপুর, কুতুবপুর, বোহাইল, কর্ণিবাড়ি, চালুয়াবাড়ি, হাটশেরপুর, কাজলা, সারিয়াকান্দি সদর ইউনিয়নের অনেক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। শুধু সারিয়াকান্দি উপজেলাতেই পানিবন্দী মানুষের সংখ্যা অর্ধলাখে ছাড়িয়ে যেতে পারে। স্রোতের তোড়ে চরাঞ্চলে নদী ভাঙনে চালুয়াবাড়ি ইউনিয়নের মানিকদাইর চর ও বহুলাডাঙ্গা চরের অর্ধশত পরিবার গৃহহারা হয়ে পড়েছে।

বগুড়া পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী রুহুল আমিন বলেন, ‘গত ৪৮ ঘণ্টায় যমুনা নদীর মথুরাপাড়া পয়েন্টে ৯৭ সেন্টিমিটার পানি বেড়ে এখন বিপৎসীমার ৮৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। যমুনায় পানি যেভাবে ধেয়ে আসছে, তাতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বন্যা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি এবং গত জুলাই মাসের বন্যার চেয়েও পরিস্থিতি দ্বিগুণ খারাপ হতে পারে।’

রংপুর: উজান থেকে ধেয়ে আসা পানি ও কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে রংপুরের ছয় উপজেলার ৩০ ইউনিয়নের দেড় লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। তিনটি বন্যা নিয়ন্ত্রণ আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। জেলার গঙ্গাচড়া উপজেলায় সাতটি ইউনিয়নে ৫০টি গ্রামের প্রায় ৭০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। কাউনিয়া উপজেলার প্রায় ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। পীরগাছার ২০টি গ্রামের প্রায় ১০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। বন্যাকবলিত অন্যান্য উপজেলাগুলো হলো, পীরগাছা, বদরগঞ্জ, তারাগঞ্জ ও পীরগঞ্জ। পানিতে ডুবে গেছে রোপণকৃত আমন খেতসহ বিভিন্ন রবি ফসল।

জামালপুর: যমুনা নদীর পানি বেড়ে জামালপুরের চারটি উপজেলার লাখো মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। জামালপুরের পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) পানি পরিমাপের নিয়ন্ত্রক আব্দুল মান্নান বলেন, ‘গত ২৪ ঘণ্টায় ৪৮ সেন্টিমিটার পানি বেড়ে বাহাদুরাবাদ পয়েন্টে বিপৎসীমার ১১৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। যেভাবে পানি বাড়ছে দ্রুত সময়ের মধ্যে বন্যা পরিস্থিতি আরও অবনতি হতে পারে।’ জামালপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রাসেল সাবরিন বলেন, ‘দ্রুত সময়ের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী দুর্গত এলাকায় পৌঁছানোর কাজ চলছে।’

গাইবান্ধা: দফায় দফায় বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে গত ২৪ ঘণ্টায় জেলার সুন্দরগঞ্জ, গাইবান্ধা সদর, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার ১৫টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দী হয়ে পড়েছে ৩০ হাজারের বেশি মানুষ। ব্রহ্মপুত্র বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের সুরক্ষা কাজে সহযোগিতা করছে সেনাবাহিনী। গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কার্যালয় বলছে, আজ সোমবার দুপুর ১২টায় ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ফুলছড়ি পয়েন্টে বিপৎসীমার ৭৮ সেন্টিমিটার, ঘাঘট নদীর পানি গাইবান্ধা শহর রক্ষা বাঁধ পয়েন্টে ৬৪ সেন্টিমিটার, করতোয়া নদীর পানি গোবিন্দগঞ্জ পয়েন্টে ২ সেন্টিমিটার ও তিস্তা নদীর পানি সুন্দরগঞ্জ পয়েন্টে ৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ফুলছড়ি উপজেলা।

স্বাধীনবাংলা২৪.কম/এমআর

আরো খবর »