দৌলতপুরে বানভাসি মানুষের চরম দূর্ভোগ

Feature Image

মানিকগঞ্জ থেকে জালাল উদ্দিন ভিকু : যমুনা-ধলেশ্বরী অভ্যন্তরীন নদ-নদীতে মানিকগঞ্জে দৌলতপুর উপজেলার সার্বিক বন্যার পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হলেও উপজেলায় ৫০ হাজার বানভাসি মানুষের বাড়ি-ঘরে হাটু ও কোমড় পানিতে তলিয়ে আছে । উপজেলার ৮ টি ইউনিয়নে প্রায় ১ লক্ষ মানুষ পানি বন্দি হয়ে রয়েছে। বন্যার পানি কিছুটা উন্নতি হলেও বানবাসি মানুষ যারা বাড়ি-উঠানে ও ঘরে মাঁচা পেতে আশ্রয় নিয়েছে তাদের চরম দুর্ভোগ খাদ্যের ও বিশুদ্ধ পানির অভাব দেখা দিয়েছে । এছাড়া চলতি বর্ষা মৌসুমে যমুনা নদীর ভাঙ্গনে ইতিমধ্যে চরকাটারী ইউনিয়ন পরিষদ,ভূমি অফিস,চরকাটারী স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কল্যানকেন্দ্র,চরকাটারী সবুজ সেনা উচ্চ বিদ্যালয়, ২ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বাচামরা,বাঘটিয়া,জিয়নপুর ইউনিয়নে ৩ হাজার ১ শত পরিবারের বাড়ি-ঘর ও কয়েক হাজার বিঘা আবাদি জমি নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে ।

এদিকে রবিবারেও সরেজমিনে ঘুরে দেখা কয়েক দিনের প্রবল বর্ষণ ও যমুনা নদীর বন্যার পানি বৃদ্ধির ফলে যমুনা নদীর তীর বর্তী বন্যার পানিতে দৌলতপুর উপজেলার চরকাটারী ইউনিয়নের লাল পুর, চরকাটারীমন্ডলপাড়া, শেকপাড়া,করিমমোল্যারপাড়া, বোর্ডঘরবাজার, বাচামারাইউনিয়নেরইউনিয়নেরকৈল, বাগসাষ্টা, কল্যানপুর, হাসাদিয়া, চুয়াডাঙ্গা, বাচামারাউত্তরখন্ড,  বাঘুটিয়াইউনিয়নেরমুন্সিকান্দি, ইসলামপুর,বাঘুটিয়া, চরকালিকাপুর,ব্রামনদি, পারুরিয়া, জিয়নপুরইউনিয়নেরলাউতারা, আবুডাঙ্গা, বৈন্যা, বড়টিয়া,বিলপাড়া, পন্তিছা, জৈন্তা, চকমিরপুরইউনিয়নেররামচন্দ্রপুর, সমেতপুর, দৌলতপুর সদরের পাল পাড়া,কর্মকার পাড়া,চরমাস্তল, নিলুয়া, শ্যামপুরএই ৪২ টি গ্রামের এখনও প্রায় ৫০ হাজার বানভাসি মানুষের বাড়ি-ঘরে হাটু ও কোমড় পানিতে তলিয়ে আছে ।

এছাড়া উপজেলার চরকাটারী, বাচামারা, বাঘুটিয়া,খলসী,জিয়নপুর,চকমিরপুর,কলিয়া,ধামশ্বর এই ৮ টি প্রায় ১ লক্ষ মানুষ পানি বন্দি হয়ে রয়েছে । চরা রের চরকাটারী, বাচামারা, বাঘুটিয়া,জিয়নপুর ইউনিয়নের বানভাসি মানুষ লাকড়ির অভাবে রান্না-বান্না করতে না পেরে অর্ধাহারে অনাহারে ঘরে ও বাড়ির উঠানে মাঁচা পেতে মানুষ,গরু –ছাগল,হাঁস-মুরগী এক সাথে বসবাস করছে । সেই সাথে মানুষের বিশুদ্ধ পানি ও গো-খাদ্যের অভাব দেখা দিয়েছে ।
নদী ভাঙ্গনের শিকার বাচামারা গ্রামের রবিউল সেক ও রুবি বেগম ২ ছেলে ১ মেয়ে নিয়ে আশ্রয় নিয়েছে আমেনা খাতুন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে । বিকালে রুবি বেগম বিদ্যালয়ের মাঠে টিনের চাল জড়ো করা ঘরের সামনে রাতের খাবার রান্না করছিল । তখন রুবি বেগম সাংবাদিকদের জানান- ১৫ দিন যাবৎ বাড়ি-ঘর নদীতে ভ্যাঙ্গা গেছে আমাগো জাগা বাসা নাই । তাই এহন কি করমু এই মাঠে কোমতে খাইয়া না খাইয়া পোলাহেন নইয়া থাহি । চেয়ারম্যান আমাগো ১০ সের চ্যাইর দিছে তাই ন্যানতেছি ।পোলাহেনস নিয়া খুব কষ্টে থাহি । পানি নাইম্যা গেলে যে জামু কনে চিন্তায় আছি ।

বাচামারা কৈল গ্রামের খবিরন বেগম( ৫৫)বাড়ি-ঘরে কোমড় পানি মাঁচা পেতে ঘরের বাঁশের মধ্যে দুই নাতী নিয়ে বসে ছিল আর ঘরের সামনে কলা গাছের ভেলায় ছাগল চরাছিল তার নাতিন নাসিমা বেগম । নৌকা নিয়ে বাচামরা চেয়ারম্যান ও সাংবাদিকরা উপস্থিত হলেই হাউ মাউ করে কান্ন্া জড়িত কন্ঠে বলেন বাবারা ১০ দিন যাবৎ এই ঘরে মাঁচায় বসে বন্দি আছি । আমার পোলা নাই এই দুই লাতি লিয়া চিরা মুড়ি খাই । তোরা বাবা আমার লাতি দুইডারে কিছু দিস ওর বাপ নাই । খড়িজাবার অভাবে নানতে পারি না ।খুব কষ্ট বাইচা থাহি ্ । পরে বাচামারা চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ পকেট থেকে পাঁচশত টাকা বেড় করে দিযে বলে তোমার লাতি দুইটাকে দুত কিনা খাওয়াইও ।

চরকাটারী গ্রামের নদী ভাঙ্গনের শিকার আহাম্মদ আলী জানান-বর্ষাার শুরুতে বাড়ি নদীতে যাওয়ায় নদী থেকে ১ মাইল দুরে চরের উপর বাড়ি করেছি । এখানেও নদী কাছে চলে এসেছে বাড়ি-ঘরে কোমড় পানিতে তলিয়ে গেছে ।
বাচামারা বাজারের পাশে জেলে পাড়া অন্ধ নদিয়ার চাঁন রাজবংশীর বাড়ি-ঘরে কোমড় পানিতে তলিয়ে আছে । ঘরের বারান্দায় মেঝেতে মাচাঁয় বসে নাতি-পুতিদের তার স্ত্রী খাওয়াছিল । নৌকা নিয়ে বাড়ি উঠানে যাওয়ার পর অন্ধ নদিয়ার চাঁন রাজবংশীরকে কেমন আছেন জিজ্ঞেসা করতেই সে বলে উঠলো আর বাবা ভার নাই ।পানির জন্যে নানদা পারে না খুব কষ্ট হইতেছে । এক বেলা চিরা-মুড়ি ও এক বেলা ভর্তা ভাত খেয়ে কোন রকম ছোট-ছোট নাতি-পুতি নিয়ে বেচে আছি ।

বাচামারা ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ জানান-বাচামারা ইউনিয়নে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারন করে। প্রায় ৬ হাজার বাড়ি- ঘরে হাটু-কোমড় পানিতে তলিয়ে বানভাসি মানুষের চরম দুর্ভোগ শুরু হয়েছে । সরকারী ভাবে ৯ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ পেয়েছি ।বরাদ্দকৃত ত্রান চাহিদার তুলনায় খুবই অপুতুল। বন্যা পানি নেমে যাওয়ার পর বন্যায় ও নদী ভাঙ্গনে ক্ষতিগ্রস্থ্যদের পূর্নবাসনের জন্য সরকারকে ব্যবস্থা গ্রহনের দাবি জানান।
চরকাটারী ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আব্দুল বারেক মন্ডল জানান- চরকাটারী ইউনিয়নে শত শত বাড়ি-ঘর বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে । সরকারী ভাবে ৯ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ পেয়েছি । চাহিদার তুলনায় বরাদ্দকৃত ত্রানের চাল খুবই অপুতুল । এদিকে যমুনা নদীর ভাঙ্গনে ইতিমধ্যে চরকাটারী ইউনিয়ন পরিষদ,ভূমি অফিস,চরকাটারী স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কল্যানকেন্দ্র,চরকাটারী সবুজ সেনা উচ্চ বিদ্যালয়, ২ টি প্রাথমিক বিদ্যালয় নদী ঘর্ভে বিলীন হয়েছে ।

এবিষয়ে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো: তোজাম্মেল হক তোজা বলেন-জেলা ও উপজেলা প্রশাসন সমন্বয়ে বানভাসি মানুষের খোজ খবর রাখা হচ্ছে । প্রতিদিনই কোন না কোন এলাকায় সরকারী ত্রাণের চাল বানভাসি মানুষের মাঝে বিতরন করা হচ্ছে ।

এবিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার কানিজ ফাতেমা জানান- বাচামারা উচ্চ বিদ্যালয়,বাচামারা বি.বি.সি কলেজ,আমেনা খাতুন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়,চরকাটারী আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে ।বন্যায় প্লাবিত ৮ টি ইউনিয়নে সরকারী ভাবে ৭৩ মেট্রিক টন চাল এবং ১ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ পেয়েছি । আজ রবিবার পর্যন্ত ৪৮ মেট্রিক টন চাল বিতরন করা হয়েছে।

 

 

Loading...

আরো খবর »