মহম্মদপুরে ৫০ হাজার মানুষের দুর্ভোগ, পাঁচটি কাঁচা সড়কে কাঁদাপানি, জনদুর্ভোগ চরমে

Feature Image

মহম্মদপুর :  মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার বালিদিয়া ইউনিয়নের দশটি গ্রামের ৫০ হাজার মানুষের চলাচলের প্রায় ১৬ কিলোমিটার পাঁচটি কাচাঁ রাস্তার বেহাল দশা।
গ্রামের বাসিন্দারা জানান, গ্রামের এসব গুরুত্বপূর্ণ কাঁচা সড়কে বর্ষাকাল এলেই চাষ দেওয়া ধানখেতের মতো হয়ে যায়। কাদা থিকথিক করে। এ কারণে জনদুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করে। কেউ অসুস্থ হলে কোলে করে এই কাদায় ভরা পথ পার করতে হয়। কউৎপাদিক কৃষিপন্য বাজারজাত করতে পারেন না। স্কুলে কমে যায় শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি। কাদার যন্ত্রণায় স্থানীয় বাজারের অনেক ব্যবসায়ী এই গ্রামে তাদের বাড়ি ফেরেন না।

 

বিকল্প না থাকায় গ্রামের বাসিন্দাদের এই কাদা মাড়িয়ে যাতায়াত করতে হয়। এতে এই ইউনিয়নের বাসিন্দাদের চরম ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। বছরের পর বছর ধরে মানুষ চলাচলের অনুপযোগী এসব সড়ক উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে তারা গিয়েছেন। তবুও কোনো উন্নয়ন হচ্ছে না বলে জানান।
২ আগস্ট সরেজমিনে দেখা গেছে, মহম্মদপুর উপজেলা সদও থেকে পাকা রাস্তা ধরে তিন কিলোমিটার গেলেই বালিদিয়া ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স ভবন। প্রধান সড়ক থেকে গ্রামের মধ্যে যাওয়া অধিকাংশ সড়কই কাঁচা। এসব সড়ক বর্ষাকালে সম্পূর্ণ চলাচলের অনুপযোগি হয়ে পড়ে।
বেহাল সড়কগুলো হচ্ছে, বড়রিয়া বাবু মোল্যার বাড়ির ব্রীজ হতে মৌশা গুচ্ছ গ্রাম হয়ে নিখড়হাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ৩ কিলোমিটার। বড়রিয়া নতুন বাজার হতে মৌশা আদর্শ গ্রাম হয়ে নিখড়হাটা হাফেজিয়া মাদ্রাসার পাশ দিয়ে ছোট কলমধারী ৪ কিলোমিটার। বালিদিয়া শিকাদার মোড় থেকে নিখড়হাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশ দিয়ে গোলাবাড়ি মৌশা হয়ে কানুটিয়া বাজার ৫ কিলোমিটার। বালিদিয়া ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যন পান্নু মোল্লার বাড়ির সামনে থেকে ঘোষপুর মোড় হয়ে মৌশা মোল্লা পাড়া পর্যন্ত ২ কিলোমিটার এবং বড়রিয়া মেলা এলাকা থেকে নিখড়হাটা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ২ কিলোমিটার রাস্তা।

 

এসব সড়ক দিয়ে ধোয়াইল, বড়রিয়া, নিখোড়হাটা, বালিদিয়া, শ্রীপুর, ছোটকলমধারী, মঙ্গলহাটা, মৌলী, চাবিনগর, গোপিনাথপুর, কাওড়া, চাপাতলা, কানুটিয়া, মাইজপাড়া, ঘোষপুর, আউনাড়া ও যশপুরসহ আশপাশের এক লাখের বেশি মানুষ চলাচল করেন। এসব গ্রামের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ের দশটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কয়েক হাজার শিার্থীরা এসব সড়ক দিয়ে যাতায়াত করে। এ ছাড়া ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনেও গ্রামের মানুষ এই সড়কটি দিয়ে যাতায়াত করে। কয়েক হাজারহেক্টর কৃষি জমিতে উৎপাদিত ধান পাটসহ বিভিন্ন ফসল এসব সড়ক দিয়ে কৃসকের আঙিনায় আসে। অথচ সড়কগুলো উন্নয়নে কোনো পদপে নেওয়া হচ্ছে না। এসব গ্রামের অর্ধেকের বেশি লোক কৃষিকাজ করেন। বাকিরা ব্যবসাপাতি ও চাকরিজীবী রয়েছেন।
লোকজন উপহাস করে ডাকে কাদার গ্রাম বলে। বর্ষা এলেই এক প্রকার অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে গ্রামগুলোর মানুষ। অথচ এই কাঁচা সড়ক ব্যবসা-বাণিজ্য ও এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে এ এলাকার বাসিন্দারা জানান।

 

বর্ষা মৌসুমে কাদার জন্য লোকজন কোনো কাজে গ্রামের বাইরে যেতে চায় না। আত্মীয় স্বজন বেড়াতে আসেন না। বিয়েসহ বন্ধ থাকে নানা সামাজিক আচার অনুষ্ঠান। গ্রামে বিদ্যালয় থাকলেও ভোগান্তির কারণে শিার্থীরা স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসায় যেতে চায় না।
ওই ১৭ গ্রামের বেশ কয়েকজন বাসিন্দা অভিযোগ করে বলেন, পুরো বর্ষায় সব রাস্তা কাদায় ভরে থাকে। তারা এ নিয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে বহু ধরনা দিয়েছেন। কিন্তু তারা কোনো উদ্যোগ নিচ্ছেন না। শুধু রাস্তার কারণে গ্রামের ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৃষিকাজ স্থবির হয়ে গেছে।
সরেজমিনে ২ আগস্ট গিয়ে দেখা যায়, মৌশা ও নিখোড়হাটা গ্রামের রাস্তা দিয়ে কাদা মাড়িয়ে জুতা হাতে কয়েকজন পথচারী চলাচল করছেন। মৌশা গ্রামের বাহারুল ইসলাম ও বাদশা সিকদার প্রাণপণ চেষ্টায় তাদের রিকশাভ্যান টেনে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। ওই রাস্তা দিয়ে বাইসাইকেলে করে যাওয়ার সময় নিখোড়হাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে বাইসাইকেলসহ কাদায় পড়ে যান এক আরোহী।

মৌশা গুচ্ছ গ্রামের বাসিন্দা দিনমজুর দিন মজুর বলেন, ‘১৫ বছরেও কোনো উন্নয়ন নাই। বড় কষ্টে আছি। কায়দা থাকলি এই গ্রাম ছাড়ে চলে যাতাম।’
নিখোড়হাটার আবেজান বেওয়া জানান,‘আমাগের বিটারা নাই, অনেক সুমা দেওয়া বেশি নামলি ক্যাদার কারনে বাজারে জাতি পারিনে, আর বাজারে না গিলি সেদিন খাওয়াও বন্ধ।’
মৌশা গুচ্ছগ্রাম সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, আলী আকবর জানান, ‘বর্ষার ছাত্র-ছাত্রীদের স্কুলে আসতে খুব কষ্ট হয়। অনেকে স্কুলে আসতে গিয়ে রাস্তায় পড়ে শরিরে কাঁদা মেখে বাড়িতে ফিরে যায়। স্কুলে কমে যায় শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি।’
বড়রিয়া গ্রামের লাখু মোল্যা বলেন, ‘হাটুসমান কাদা মাড়িয়ে কী যে কষ্টে চলাচল করতে হয়, তা বোঝানোর না। গুরুত্বপূর্ণ এ রাস্তা নিয়ে কেউ ভাবেও না।’

ধোয়াইল হাইস্কুলের শিক্ষক অলিয়ার রহমান বলেন, ‘ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ এই রাস্তাগুলো আমার দাদার আমলের। অথচ বর্ষাকালে এটি প্রায় চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে।’
চাবিনগর গ্রামের লাইলি বেগম জানান,‘নহাটায় তার বিয়ে হয়েছে। দুই বছর বাবার বাড়ি আসেন রাস্তার জন্য। বাবার অসুস্থ্যতার খবর পেয়ে এসেছি।’
বালিদিয়া হাই স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র শাকিল আহমেদ বলে, ‘আমার মনে হয় দেশের কোথাও এত খারাপ রাস্তা নাই।’
মাইজপাড়া গ্রামের গৃহবধু বিলকিস জানান,‘আমরা বর্ষকালে ঘরের মধ্যে আটকা পড়ে থাকি। কেউ অসুস্থ্য হলে কোলে করে দুই মাইল নিয়ে পাকা রাস্তায় উঠতে হয়।’
গোপিনাথপুর গ্রামের কৃষক আলমগীর শেখ বলেন,‘ধান-পাটসহ কৃষিফসল বিক্রির জন্য হাটে নিতে পারি না। কোন যানবাহন এই সব রাস্তায় আসে না। মাথায় করে তিন কিলোমিটার দূরে পাকা রাস্তায় নিতে হয়।’

বালিদিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পান্নু মোল্লা জানান, বলেন, ‘ওই রাস্তাগুলো পাকাকরণের জন্য স্থানীয় সাংসদকে অনুরোধ করেছি। উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানকেও বিষয়টি জানিয়েছি। ১৭ গ্রামের মানুষ কাদাপানি মাড়িয়ে অতি কষ্টে চলাচল করছেন বলে তিনি জানান।

আরো খবর »