রাখাইন রাজ্যে ফের সহিংসতা: রোহিঙ্গারা আসছে বিচ্ছিন্ন ভাবে

Feature Image

জেলা প্রতিনিধি, স্বাধীনবাংলা২৪.কম

কক্সবাজার থেকে ইমরান জাহেদ: মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে গত ২৫ আগষ্ট ভোর রাতে সেনাবাহিনীর ৭ টি ক্যাম্পে “আল ইয়াকিন নামক রোহিঙ্গা বিদ্রোহী সংগঠনের সশস্ত্র জঙ্গীরা হামলা চালিয়েছে। গোপনে বিচ্ছিন্ন ভাবে সশস্ত্র রোহিঙ্গারা অবস্থান নেয়ার খবরে রোহিঙ্গাদের অভিযুক্ত করে মুসলমান অধ্যুষিত কয়েকটি রাজ্য অবরুদ্ধ করে রেখেছে সেদেশের সেনাবাহিনী। মিয়ানমারের মংডু টাউনশীপের কয়েকটি গ্রামে থেমে-থেমে গুলিবর্ষণের ঘটনায় মুসলমানরা আতংকগ্রস্থ হয়ে পড়েছে। সেনাবাহিনীর পাশাপাশি রাখাইনরা কয়েকটি গ্রামে রোহিঙ্গার অধ্যুষিত এলাকায় তাদের ঘরবাড়িতে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছে। কয়েকটি সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার আকাশে ঘুরে ঘুরে দেখছে। ফলে রোহিঙ্গারা বিচ্ছিন্নভাবে উখিয়া-টেকনাফ ও নাইক্ষ্যংছড়ির সীমান্তের চোরাই পথ দিয়ে অনুপ্রবেশ করার খবর পাওয়া গেছে।

এদিকে উখিয়ার সীমান্ত পয়েন্ট সমূহে বিজিবি অতিরিক্ত সৈন্য মোতায়ন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে অবস্থান নিয়েছে। উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নের রহমতের বিল সীমান্তে বিজিবি’র পাশাপাশি পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে বলে উখিয়া থাানর অফিসার ইনচার্জ মোঃ আবুল খায়ের জানিয়েছেন। গতকাল শুক্রবার ২৫ আগস্ট দুপুরে উখিয়ার বালুখালীর নতুন রোহিঙ্গা বস্তিতে আশ্রয় নিতে যাওয়া মিয়ানমারের খৈয়ারবিল গ্রামের মৃত আবদুল হাকিমের ছেলে মোঃ ইব্রাহিম (২৩), তার ভাই নাছের (১৮), বলি বাজার এলাকার রাজা মিয়ার ছেলে নুরুল আলম(২০), আবদুল হাইয়ের ছেলে শুক্কুর আলী(২২), মোহাম্মদ আলীর ছেলে  হোছন আলী (১৯) ও কেয়ারি প্রাং থেকে স্বপরিবারে চলে আসা নুরুল আলম (৪০), তার স্ত্রী ছেনুয়ারা বেগম(২৫) এর সাথে কথা হয়েছে।

তারা জানান, মিয়ানমারের নাইছাদং, মেদাই, ফকিরা বাজার, বলি বাজার, কুমির খালী, জিম্মংখালী, শিলখালী, রাংবাইল্ল্যা, কেয়ামং, চালিপ্রাং, নারাইশং, নাগপুরা, চাকমাকাটাসহ অন্তত ২৫টি গ্রাম মিয়ানমার সেনাবাহিনীরা অবরুদ্ধ করে রেখেছে। তারা ভীতি সঞ্চার করতে দিক বেদিক শত শত রাউন্ড গুলি বর্ষণ করে। এতে রোহিঙ্গা মুসলিমরা আতংকগ্রস্থ হয়ে পড়ে। পুরুষরা বিচ্ছিন্ন ভাবে বাংলাদেশ মুখী হলেও অনেকের স্ত্রী, সন্তান, পিতা-মাতা মিয়ানমারে রয়ে গেছে। শুক্কুর আলী জানান, তার ভাই মোহাম্মদ হাশেমকে গতকাল শুক্রবার ২৫ আগষ্ট দুপুরে মিয়ানমার সেনাবাহিনীরা ধরে নিয়ে গেছে। তাদের বাড়ি ঘর থেকে বের হতে দিচ্ছে না। তাদের সহায়সম্বল যা আছে তা সেনাবাহিনী ও রাখাইনরা লুটে নিয়ে যাচ্ছে বলে জানান।

সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমারে সেনাবাহিনী ও রাখাইনদের অব্যাহত তান্ডবে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা মুসলিমদের মধ্যে ২৪ আগষ্ট দিবাগত রাতে কথা হয় উখিয়ার সদর ষ্টেশন জামে মসজিদের দেয়াল ঘেষে বসে থাকা ৪টি রোহিঙ্গা পরিবারের সাথে। তাদের মধ্যে পুরুষ আবু ছিদ্দিক জানান, তার সাথে আসা অন্যরা মহিলা। সে জানান মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও রাখাইনদের তান্ডবে তাদের সবর্স্ব হারিয়ে এক কাপড়ে কোন রকম প্রাণ নিয়ে বাংলাদেশে পাড়ি জামায়। অন্য এক রোহিঙ্গা নারী জানান, তার সন্তান রয়েছে ৬জন, ছিল ৪ পরিবারের ৪টি বস্তা। বস্তার ভিতর রয়েছে কিছু খাবার, আর থালা,বাসন। তারা সবাই বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে সীমান্তের রেজু আমতলি এলাকা দিয়ে অনুপ্রবেশ করেছে। পথ ভুলে এরা উখিয়া ষ্টেশনে চলে এসেছে।

সূত্রে জানা গেছে, গত ২০১৬সালের ৯অক্টোবর সেনা ও রাখাইন উগ্রবাদীদের হাতে রোহিঙ্গা নির্যাতনে ক্ষত চিহ্ন মুছ না মুছতে ফের মিয়ানমার বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন রাখাইন প্রদেশের রোহিঙ্গা মুসলিম অধ্যুষিত মংডু, বুচিদং ও রাচিডং জেলায় অতিরিক্ত সৈন্য সমাবেশ ঘটাচ্ছে গত সপ্তাহ ধরে। এ ধরনের সৈন্য সমাবেশকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ সীমান্তে বিজিবি টহল জোরদার ও নজরদারি বৃদ্ধি করেছে বলে জানা গেছে।

নতুনভাবে রোহিঙ্গাদের উপর অত্যাচার, নির্যাতনের আশংকায় এসব এলাকা থেকে রোহিঙ্গা মুসলিমরা আবারো বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের আশংকা করছে স্থানীয় লোকজন। গত ১সপ্তাহে সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে প্রায় ১১ হাজার রোহিঙ্গা নতুন করে অনুপ্রবেশ করে উখিয়ার বালুখালী ও কুতুপালং এবং টেকনাফের লেদা ও মুছনি ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছে বলে এনজিও সংস্থার রিপোর্টে বলা হলেও সরকারী ভাবে এর কোন পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।

কক্সবাজার ৩৪ বিজিবির অধিনায়ক মনজুরুল হাসান খান বলেন, কক্সবাজার বিজিবি’র আওতাধীন সীমান্ত এলাকা দিয়ে কোন রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের তথ্য আমাদের কাছে নেই। তবে বিচ্ছিন্ন ও অনাকাঙ্খিতভাবে কয়েকজন রোহিঙ্গা গোপনে চোরাই পথে সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে অনুপ্রবেশের চেষ্টা প্রতিহত করা হচ্ছে বলে টেকনাফ বিজিবি অধিনায়ক মোঃ এস এম আরিফুল ইসলাম জানান। কিন্তু ঠিকই রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ আগের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে কুতুপালং নতুন ক্যাম্প অবস্থানকারী রোহিঙ্গা সিরাজুল হক ও বালুখালী নতুন বস্তির আয়ুব মাঝি ও লালু মাঝি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন।

তাদের মধ্যে টেকনাফ ছাড়াও উখিয়ার কুতুপালং এবং বালুখালী নতুন বস্তিতে অন্তত ৬হাজার রোহিঙ্গা নতুন করে আশ্রয় নিয়েছে। অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের মধ্যে রয়েছে দিল মোহাম্মদ (৪৪) তার স্ত্রী ছখিনা খাতুন (৩৫), তাদের ৪সন্তান মোঃ তাহাদ(৮) মোঃ আনাছ (৬) মোঃ হাসান (৪) এবং মোঃ হোসেন দেড় বছরের শিশু। তাদের বাড়ী মিয়ানমারের মংডু তমবিল গ্রামে। কেন পালিয়ে এসেছে এমন প্রশ্নের জবাবে তারাও মগ সেনাদের অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসছেন। এছাড়াও তাদের রয়েছে একই এলাকার নুরুল আলমের স্ত্রী বাবেয়া খাতুন (৩০)।

তিনি বলেন, মিয়ানমারের সেনা নির্যাতন সইতে না পেরে স্বামীকে ফেলে রেখে ১সন্তান নিয়ে সে চলে এসেছে বাংলাদেশে। একই কথা সহিদা নামের আরেক গৃহবধুর। তার স্বামীও মিয়ানমারে রয়ে গেছে। তারা প্রত্যেকে উখিয়া উপজেলার রাজাপালং ইউনিয়নের রেজু আমতলী সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে। এখন তারা কোথায় যাবে ভেবে পাচ্ছেনা। রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত অনুপ্রবেশকারীরা মসজিদের দেয়াল ঘেষে বসা ছিল। এ নিয়ে রেজু আমতলি বিজিবি’র সুবেদারের নিকট বক্তব্য নেওয়ার জন্য একাধিক বার ফোন করেও নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

উল্লেখ্য, গত ৩ আগস্ট মংডুর ময়্যু পর্বতমালার পাদদেশে সেদেশের উপজাতির ৭ জনের গুলিবিদ্ধ ও ছুরিকাঘাত লাশ উদ্ধার করা হয়। ইতিপূর্বে ২৯ সেপ্টেম্বর রাছিদং জেলার একটি নদীতে গলাকাটা একই পরিবারের পিতা, পুত্র ৩ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। চলতি বছরের মার্চ থেকে এ পর্যন্ত রাখাইনের বিভিন্ন এলাকায় ৫৫ জন নিহত ও ৩৪ জন নিঁখোজের তথ্য প্রকাশ করেছে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় কাউন্সিলর অং সান সুচি’র অফিস থেকে। এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে আরাকান প্রাদেশিক পরিষদের ৯ জন এমপি গত সপ্তাহে মিয়ানমারের সেনা প্রধানের সাথে রুদ্ধদার বৈঠক করেন।

উক্ত বৈঠকের একদিন পর প্রতিকুল আবহাওয়া উপেক্ষা করে বিমানে করে রেঙ্গুন থেকে আরাকান দেশের রাজধানী সিট্টুয়ে বিমানবন্দরে অতিরিক্ত প্রায় ৫ শতাধিক পদাতিক সৈন্য প্রেরণ করেছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। বিশেষ করে পূর্বে অবস্থিত কয়েক ডিভিশনের পাশাপাশি রাখাইনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার ঘোষণা দিয়ে মিয়ানমার সেনাবাহিনী রাখাইনের মংডু, বুছিদং ও রাছিদং জেলায় এসব অতিরিক্ত পদাতিক সৈন্য মোতায়েক করেছে বলে রয়টার্স ও এএফপি’র খবরে জানানো হয়েছে।

ইতিমধ্যে নিয়োজিত অতিরিক্ত সৈন্যরা বুছিদং ও রাছিদং জেলার ময়্যু পর্বতমালা সংলগ্ন রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতে মৌখিকভাবে কারফিউ জারি করেছে। এসব এলাকার লোকজনদের ভুলেও ময়্যু পর্বতমালার দিকে অগ্রসর না হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে বলে জানা গেছে। বর্তমানের রোহিঙ্গা মুসলমান অধ্যুষিত রাখাইন রাজ্যে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। ফলে সীমান্তে প্রবল বাঁধা সত্ত্বেও বিচ্ছিন্ন ভাবে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করছে চোরাই পথে।

স্বাধীনবাংলা২৪.কম/এমআর

আরো খবর »