মাল্টিসেক্টরাল প্রোগ্রামে ১৬ বছরে ৪৫৪১ টি মামলা- ৬০টিতে শাস্তি কার্যকর

Feature Image

রাজশাহী থেকে ওবায়দুল ইসলাম রবিঃ  সরকার ২০০১ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে মাল্টিসেক্টরাল প্রোগ্রামের আওতায় ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল, খুলনা, রংপুর ও ফরিদপুর জেলায় ওয়ানুস্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি) চালু করে। সেন্টারগুলোর মাধ্যমে এই আটটি জেলার ধর্ষণের শিকার নারীরা আইনি সহযোগিতা পান। ২০১৭ সাল পর্যন্ত এই সেন্টারগুলো থেকে ধর্ষণের শিকার নারী ও শিশুদের পক্ষে ৪ হাজার ৫৪১টি মামলা দায়ের হয়। এর মধ্যে ১ হাজার ২২৯টি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে যা ৬০টিতে দোষী ব্যক্তিরা শাস্তি কার্যকর হযেছে। অন্যদিকে ৩ হাজার ৩১২টি মামলার (৭৩ শতাংশ ) নিষ্পত্তি হয়নি। ।

গত ১৬ বছারের ধর্ষণের ঘটনায় ১৬ বছরে সরকারের ওয়ানুস্টপ ক্রাইসিস সেন্টার ৪ হাজার ৫৪১টি মামলা করেছে। এবং ৬০টি মামলার দোষী ব্যক্তিদের শাস্তি হয়েছে। পুলিশ থেকে শুরু করে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো ঠিকমতো কাজ করছেনা তা প্রমান করা কঠিন। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে মাল্টিসেক্টরাল প্রেগ্রামের একজন কর্মকর্তা বলেন, ধর্ষণের বিচারের জন্য সরকারের যে কটি পক্ষ জড়িতরা সঠিকভাবে কাজ করছে না। একই মন্তব্য করেছেন ফরেনসিক মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও পুলিশ সদর দপ্তরের ওয়াকিবহাল সূত্রগুলো। পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে, সারা দেশে গত বছর ৩ হাজার ৬৪৮ জন নারী ধর্ষণের শিকার হন। ২০১২ সালে এই সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৭০০, ২০১৩ সালে ৩ হাজার ৮৯১, ২০১৪ সালে ৩ হাজার ৬৪৭ ও ২০১৫ সালে এই সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৬২২। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ঘটনার তুলনায় মামলা কম হয় আর মামলা হলেও নিষ্পত্তি হয় অনেক কম।

ধর্ষণের বিচার না হওয়ার কারণ খুঁজতে মহিলা ও শিশুবিষয়ক কর্মকর্তা, ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ, পুলিশ ও রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিরা এক পক্ষ অপরকে পক্ষকে দোষারোপ করেছে। মাল্টিসেক্টরাল প্রেগ্রামের প্রকল্প পরিচালক আবুল হোসেন বলেন, ‘মামলা প্রমাণ করা যাচ্ছে না বলে বিচার হচ্ছে না। ধর্ষণের বিচার

পাওয়ার ক্ষেত্রে আলামত খুব গুরুত্বপূর্ণ। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, টাঙ্গাইলে রুপা নামের যে মেয়েটি চলন্ত বাসে ধর্ষণের শিকার হয়ে খুন হয়েছে, তিনি একা বাসে যাওয়ার কথা জানিয়ে ১০৯-এ একটা ফোন করতে পারতেন। তাঁকে সহযোগিতা দেয়া সম্ভব হতো। তবে গত মঙ্গলবার ১০৯ নম্বরে ফোন করলে একজন কর্মকর্তাকে ফোনে পেতে সময় লেগেছিল প্রায় ৯ মিনিট। অপর প্রন্ত থেকে যিনি কথা বলেছেন, তাঁর কথাও পরিষ্কার শোনা যায়নি।

 

থানা থেকে ধর্ষণের শিকার নারী ও শিশুকে নেয়া হয় ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য। বাংলাদেশ মেডিকো লিগ্যাল সোসাইটির সভাপতি এ এম সেলিম রেজা বলেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ধর্ষণের শিকার নারী শিশু ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য আসছেন অনেক দেরি করে। তাতে আলামত নষ্ট হয়
বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) সঙ্গে কাজ করছেন ফারজানা শুভ্রা নামের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক। তিনি টু ফিঙ্গার্স টেস্ট ও সাক্ষ্য আইন: ১৫৫(৪)-এর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ‘টু ফিঙ্গার্স টেস্টে’ একজন চিকিৎসক নারীর যোনিপথে হাত ঢুকিয়ে দেখেন তাঁর সতীচ্ছদটি ছিড়েছে কি না। যদি আগে থেকেই ছেড়া থাকে, তাহলে ডাক্তারি প্রতিবেদনে লেখা হয় ‘যৌনকর্মে অভ্যস্ত’। এই মস্তব্য আসামিপক্ষের আইনজীবীরা কাজে লাগান। অন্যদিকে ১৫৫(৪)-এ বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তি যখন বলাৎকার বা শ্লীলতাহানির চেষ্টার অভিযোগে ফৌজদারিতে সোপর্দ হন, তখন দেখানো যাইতে পারে যে অভিযোগকারিণী সাধারণভাবে দুশ্চরিত্রা।’ অপরাধ প্রমাণের দায়ে ধর্ষণের শিকার নারীর ওপর বর্তায়। ভারতে ২০০৩ সালে এই বিধির পরিবর্তন হলেও বাংলাদেশে এখনো জারি আছে।

বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক সালমা আলী গত বুধবার বলেন, প্রথমত ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগকে শক্তিশালী করতে হবে। ঢাকাসহ কয়েকটি মেডিকেল কলেজের বাইরে এই বিভাগের অবস্থা খুবই করুণ। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ত্রুটিপূর্ণ প্রতিবেদন আসছে। পুলিশের সংবেদনশীলতা দরকার। আর ধর্ষণের মামলাগুলোর অগ্রগতি নিয়ে সরকারের বিশেষ নজরদারির প্রয়োজন।

আরো খবর »