ঈশ্বরদীতে চালের বাজারে লেগেছে আগুন

Feature Image

উপজেলা প্রতিনিধি, স্বাধীনবাংলা২৪.কম

ঈশ্বরদী  থেকে সেলিম আহমেদ: উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার মোটা চালের বৃহৎ আড়ৎ ঈশ্বরদী’র জয়নগর মোকামে হঠাৎ করে চাল বেচা কেনা স্থবির হয়ে বেড়ে গেছে চালের দাম। চালের বাজার অস্থির হওয়াতে খুচরা ক্রেতাদের নাভিশ্বাস বেড়ে গেছে। রাজধানী ঢাকার বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রভাব পড়েছে ঈশ্বরদীর মোকামেও। চালের বাজার অস্থির হচ্ছে ক্রমশই। এর প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের উপর। কিন্তু দাম লাগামহিন ভাবে বাড়লেও এখন পর্যন্ত এই বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেই। গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে এই মোকামে চালের দাম বেড়েছে বস্তা প্রতি (৮৪ কেজি) ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত। তবে চালের দাম বাড়ার কারণে ঈশ্বরদী মোকাম ক্রেতা শুন্য হয়ে পড়ছে। গত মঙ্গলবার যে চাল ৩৮০০ টাকায় বিক্রি হয় তা গতকাল মঙ্গলবার সকালে ৪৫০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এই মোকামে চালের দাম আরও বেড়ে যাওয়ার আশংকায় ঈশ্বরদীর বাইরের ব্যবসায়িরা চাল কিনতে আসছেনা বলে মোকাম সূত্রে জানা গেছে। অপর দিকে চালের দাম বৃদ্ধি হওয়াতে খুচরা ক্রেতাদের নাভিশ্বাস বেড়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের শক্ত নজরদারির অভাবেই চালের বাজার চড়া।

সরেজমিনে গতকাল মঙ্গলবার সকালে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঈশ্বরদীর জয়নগর মোকামে গত এক সপ্তাহ থেকে চালের দাম উর্দ্ধমুখি। গতকাল মঙ্গলবার এই মোকামে মিনিকেট চাল প্রতি বস্তা (৮৪ কেজি) চার হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়। এক সপ্তাহ আগে মিনিকেট চালের দাম ছিল ৩৪০০ থেকে ৩৪’শ ৫০ টাকা। এই মোকামে মোটা চাল বিআর-২৮ এক সপ্তাহ আগে ৩৩৫০ টাকা বর্তমানে ৪০৫০ টাকা, বিআর-২৯ এক সপ্তাহ আগে ৩১’শ টাকা বর্তমানে ৩৮০০ টাকা, বাঁশমতি এক সপ্তাহ আগে ৪৪’শ টাকা বর্তমানে প্রতিবাস্তা ৫২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া অন্যান্য চালের দামও বেড়েছে বস্তা প্রতি ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত।

ব্যবসায়িরা জানান, তারা বিভিন্ন হাট বাজার ও মোকামে কৃষকদের নিকট থেকে ধান কিনে এনে এখানে চাল তৈরি করেন। ঈশ্বরদীতে চাল উৎপাদনের এ রকম ৬০০ ধানের চাতাল রয়েছে। এসব চাতালে ১২ হাজার শ্রমিক কাজ করছে। এখান থেকে ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম, খুলনা, যশোর, মাগুরা, কুষ্টিয়া, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইলসহ ২০টি জেলায় নিয়মিত চাল পাঠানো হয়। এসব জেলার ব্যাপারি ও মহাজনেরা এসেও এখান থেকে পাইকারি দামে চাল কেনেন। ব্যবসায়িরা জানান, উত্তরবঙ্গে মোটা চালের বৃহৎ মোকাম ঈশ্বরদী’র জয়নগরে বর্তমানে চালের বাজার উর্দ্ধমুখি। এদিকে মোকামে চালের দাম বাড়ার কারণে খুচরা বাজারে প্রকার ভেদে চালের দাম বেড়েছে প্রতি কেজিতে ১১ থেকে ১২ টাকা পর্যন্ত।

জয়নগরের ভ্যান চালক খালেক প্রামানিক, শ্রমিক রমজান আলী, সবজি ব্যবসায়ী আজগার মন্ডল, ঈশ্বরদী বাজারে আসা ক্রেতা রফিকুল ইসলাম, নিলুফা ইয়াসমিন, কুলি শ্রমিক আমির হোসেন, মাছ ব্যবসায়ী বাবুল সরকার, রিকসা চালক জুলহাস বিশ্বাস বলেন, আমরা দিন আনি, দিন খাই। প্রতিদিন এভাবে চালের দাম বৃদ্ধি হলেও আমাদের আয় বৃদ্ধি পাচ্ছেনা। চালের দাম বাড়ার কারণে ছেলে-মেয়ে নিয়ে অনাহারে থাকতে হবে। সরকার ১০ টাকা কেজি দরে চাউল খাওয়াতে চাইলেও বর্তমানে খুচরা বাজারে ৬০ টাকা কেজি দরে চাউল বিক্রি হচ্ছে। এভাবে দেশ চলতে পারেনা। চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নজরদারির প্রয়োজন রয়েছে।

জয়নগরের চাল ব্যবসায়ি আলমগির হোসেন বাদশা বলেন, বর্তমানে মোকামে ধানের দাম তুলনামুলক অনেক বেশি। এখানকার ব্যবসায়িরা  উত্তর ও দক্ষিণ বঙ্গের বিভিন্ন ধানের মোকাম থেকে বেশি দামে ধান কিনছেন। মোকামে ১৩৫০ টাকা দরে ৩৭.৫০ কেজি (বাংলা এক মন) ধান কিনতে হচ্ছে। বাজারে এলসির চাউল থাকার পরেও চালের দাম হু হু করে বেড়েই চলেছে। কারণ ভারত এলসির চাউলের দামও অনেকটা বাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি আরও বলেন, চালের দাম বাড়তি থাকার কারণে ঈশ্বরদীর বাইরের  ব্যাপারিদের জয়নগর মোকামে কম দেখা যাচ্ছে।

ঈশ্বরদী উপজেলা ধান-চাউল ব্যবসায়ি সমিতির সাধারন সম্পাদক আলহাজ্ব মজিবর রহমান মোল্লা জানান, বর্তমান মওসুমে ধানের ফলন কম এবং কিছু কিছু এলাকায় ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অটো মিল মালিকেরা চড়া দামে ধান কেনার কারণে মোকামে ধানের প্রচুর চাহিদা থাকায় দাম বেড়ে গেছে। অটো মিলের কারণে ঈশ্বরদী উপজেলার ৮০ ভাগ হাসকিন মিলের চাতাল ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, চাউলের দাম বাড়ার আরেকটি বড় কারণ হচ্ছে দেশের বাইরে থেকে বর্তমানে এলসির চাউল কম দামে কিনে এনে আমদানিকারকেরা সেই চাউলের মূল্যও বাড়িয়ে দিয়েছে। এক দিকে মোকামে ধান নেই, অপর দিকে এলসির চাউলের মূল্য বৃদ্ধি হওয়াতে বাজার ক্রমান্বয়ে অস্থির হচ্ছে।

ঈশ্বরদী উপজেলা চাউল ব্যবসায়ি সমিতির সভাপতি আলহাজ্ব খায়রুল ইসলাম জানান, হাওর-বিল তলিয়ে যাওয়ার কারণে বেশ কিছু ধানের মোকামে ধান নেই এবং ধানের ফলন তুলনামূলক অনেক কম হয়েছে। এর পরেও আমাদের দেশে বর্তমানে খাদ্যের কোন অভাব নেই। কৃষক ধান বিক্রি করে দেয়ায় আমাদের দেশের কৃষকদের গোলায় এখন আর ধান নেই। কৃষকের ধান এখন মজুতকারিদের গোডাউনে চলে গেছে। অটো মিল মালিকেরা সেই ধান চড়া দামে মোকাম থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণে ক্রয় করার কারণে সাধারণ হাসকিং মিলের ব্যবসায়িরা ধান পাচ্ছেন না। মোকামে ধানের প্রচুর চাহিদা থাকায় দাম বেড়ে গেছে। যার ফলে চালের দাম উচ্চহারে প্রতিদিনই বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশের স্বল্প আয়ের মানুষদের চালের দাম ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে আনার জন্য সরকারের খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সাথে জড়িত উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের দ্রূত এলসির ভ্যাট প্রত্যাহার করে চালের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা উচিত। নইলে বর্তমান চাউলের বাজার কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে সেটাই দেখার বিষয় হয়ে গেছে।

স্বাধীনবাংলা২৪.কম/এমআর

আরো খবর »