স্বামী বি এন পি করে এটা কি আমার অপরাধ?

Feature Image

সংরক্ষিত মহিলা আসনে আওয়ামী লীগ সহ মহাজোটের ৪৯ জন প্রার্থীর তালিকা প্রকাশের পর সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়াতে ব্যাপক ভাবে শিরিনা নাহার লিপির মনোনয়ন প্রসঙ্গটি আলোচিত ও সমালোচিত হয়েছে। বিশেষ করে ফেসবুকে আলোচনার ঝড় বয়ে যায়। এরই ধারাবাহিকতায় নির্বাচন কমিশনে চূড়ান্ত ভাবে মনোনয়ন দাখিলে শিরিনা নাহার লিপির নাম বাদ দেয়া হয়েছে।

”আমি ছাত্রলীগের সজলকে বিয়ে করেছি, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সজল দলত্যাগ করে জাতীয় পার্টিতে চলে যায়, এখন সে বিএনপি করে। সজলের কারণে আমি কেন বঞ্চিত হব আমার প্রাপ্য থেকে? আমি তো আর বিএনপি করি না। জাসদ, বিএনপি থেকে হিউজ অফার এসেছে আমাকে তাদের দলে নেয়ার জন্য, আমি তো যাইনি। জন্ম থেকেই আমার রক্তে আওয়ামী লীগের চিন্তা, চেতনা, বিশ্বাস বইছে। এটা আমার শত্রুপক্ষও জানে”।

এভাবেই নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করলেন সংরক্ষিত আসনে ক্ষমতাসীন দল থেকে মনোনীত হওয়ার পরও শেষ মুহূর্তে ছিটকে পড়া যুব মহিলা লীগের দ্বিতীয় সহ-সভাপতি শিরিনা নাহার লিপি।

স্বামী সুপ্রিমকোর্টের অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম সজল বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত- এ অভিযোগে লিপি দল থেকে মনোনীত হওয়া সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশনে ফরম জমা দিতে পারেননি।

বিষয়টিকে ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যা দিয়ে খুলনা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, বঙ্গবন্ধুর সময়কার এমএনএ প্রয়াত এম এ বারীর সন্তান লিপি জানান, আশির দশক থেকে দলের সভানেত্রীর সঙ্গে তার পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে। সজলের সঙ্গে বিয়ে হওয়ার সময়ে নেত্রীকে বিয়ের দাওয়াত দিয়েছিলেন। বিয়ের পরও সজলকে সঙ্গে নিয়েই নেত্রীর সঙ্গে দেখা করে দোয়া নিয়েছেন। সজলকে নেত্রী ব্যক্তিগতভাবেও চেনেন, জানেন। সবকিছু জেনেশুনেই তো যুব মহিলা লীগের পদে বহাল রয়েছেন। রাজনৈতিক নিয়োগও পেয়েছেন লিপি।

শামসুন্নাহার হলের সাবেক সভাপতি লিপি আরো জানান, পরিকল্পিতভাবে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীরা মাঠে নেমেছেন। সফলও হয়েছেন। লিপি বলেন, নেত্রীকে ভুল বোঝানো হয়েছে, আমার ব্যাপারে রং মেসেজ দেয়া হয়েছে। এটি একটি ষড়যন্ত্র। তিনি আরো বলেন, ১৯৯৬ সালে সজলের সঙ্গে আমার বিয়ে। এরই মাঝে ২২ বছর অতিবাহিত হলেও এক মুহূর্তের জন্যে আমি বঙ্গবন্ধুর আদর্শচ্যূতি ঘটাইনি। বিভিন্ন সময়ে সময় দলীয় পদ ও বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছি। সজলকে বিয়ে করা যদি আমার অপরাধ হয়েই থাকে তাহলে যুব আওয়ামী মহিলা লীগের সহ-সভাপতি বানানো হল কেন? বিটিভি’র মত জাতীয় প্রচার মাধ্যমের প্রিভিউ কমিটির সদস্য বানানো হল কেন?

তিনি জানান, বিএনপি ও আওয়ামী পরিবারে আত্মীয়তা নতুন কিছু নয়। দুই দলেই আত্মীয় আছেন এমন বহু উদাহরণ দেয়া যাবে। আলাপকালে লিপি আরো জানান, এমপি হিসেবে নাম আসার আগে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা থেকে প্রার্থীদের ব্যাপারে তথ্য নেয়া হয়। সেখান থেকে আমার ব্যাপারে ক্লিয়ারেন্স না থাকলে নিশ্চয়ই আমার নাম আসত না।

কারো নাম উল্লেখ না করে লিপি বলেন, সজল বিএনপি করে এটা নেত্রী থেকে শুরু করে আমার ওর পরিচিত সবাই জানেন। সে তো রাষ্ট্রবিরোধী কোনোকিছু করেনি। ব্যাংকের টাকা মেরে খেয়েছে কি?

যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার আইনজীবী হিসেবে তার স্বামী সজল আইনি লড়াইয়ে নেমেছিলেন- এমন প্রশ্নের জবাবে লিপি জানান, একজন স্ত্রী হিসাবে আমি যতদূর জানি, সজল এমন ভূমিকা নেয়নি। এটি মিথ্যা অপপ্রচার। সজল নিজেও বিষয়টি চ্যালেঞ্জ দিয়ে নিজের ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছে। ফেসবুকে কোনো বিষয় এলে সেটা খোঁজখবর না নিয়ে দল এমন সিদ্ধান্ত কেন নিল সেটা জানতেই তিনি নেত্রীর সঙ্গে দেখা করবেন। নেত্রীর ভুল ভাঙাবেন।

এই প্রতিবেদক যুদ্ধপরাধী ট্রাইবুনালে ফাঁসির দন্ডিত আসামী জামায়াত নেতা আব্দুর কাদের মোল্লার অন্যতম আইনজীবী এডভোকেট মাসুদ রানাকে ফোন করলে তিনি জানান, অফিশিয়াল, ননফিসিয়াল কোন ভাবেই এই মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ঠ ছিলেন না এডভোকেট গাজী কামরুল ইসলাম সজল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এই মামলার আইনজীবী হিসাবে প্রচারিত এডভোকেট সজলের সংশ্লিষ্টতার প্রসঙ্গটি অসত্য ও ভিত্তিহীন বলে তিনি জানান।

৯০ এর দশকে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের জনপ্রিয় ছাত্রনেতা, সাংগঠনিক সম্পাদক মনিরুজ্জামান বাদল হত্যাকাণ্ডে কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতা নেত্রীকে বহিস্কার করা হয়েছিল। এর মধ্যে ছাত্রলীগ নেত্রী ফজিলাতুন্নেসা বাপ্পিও ছিলেন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কর্তৃক সংরক্ষিত মহিলা আসনে সংসদ সদস্য পদে ইতোপূর্বে তাকে দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত করা হয়। ফজিলাতুন্নেসা বাপ্পি সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জহুরুল হক হল ছাত্র সংসদের সাবেক জিএস মাসুম আহমেদ একটি তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, ফজিলাতুন্নেসা বাপ্পি ১৯৯২ সালে ডঃ কামাল ও মোস্তফা মহসিন মন্টু সমর্থিত ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার একজন সক্রিয় নেত্রী ছিলেন। সেই ছাত্রলীগের আমি ছিলাম ঢাবি শাখার সভাপতি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সাবেক ছাত্রলীগ নেতা জানান, চিহ্নিত ইয়াবা সম্রাট সাবেক এমপি আব্দুর রহমান বদির স্ত্রীকে মনোনীত করা গেলে শিরিনা নাহার লিপির মনোনয়ন বাতিল একটি অন্যায় সিদ্ধান্ত। এই প্রসঙ্গে মনোনয়ন পেয়েও শিরিনা নাহার লিপি যার কারণে বিতর্কের শিকার হয়ে মনোনয়ন বঞ্চিত হয়েছেন, সেই আলোচিত এডভোকেট গাজী কামরুল ইসলাম সজলের সঙ্গে এই প্রতিবেদক কথা বললে তিনি জানান, লিপির প্রতি লিপির দল অবিচার করেছে। তিনি আরও বলেন লিপি ও আমি দুজন দুই আদর্শ লালন করেছি, আর সুভাষ সিংহ রায় ও মমতা হেনা লাভলী দুজন দুই ধর্ম লালন করেছে, লিপি সফল হতে পারেনি, লাভলী সফল হয়েছে। একই সংসারে আলাদা ধর্ম পালনে দোষ নেই কিন্তু আলাদা দল করলে লিপির বেলায় দোষ? সজল বলেন, বাংলাদেশের আইন, মুসলিম আইন এবং সামাজিক প্রেক্ষাপটে এই অনৈতিক বিষয়কে এন্ড্রোস করলেও লিপির দলীয় আনুগত্য, আদর্শ ও সংগ্রামী ঐতিহ্যকে মূল্যায়নের নামে অপদস্ত করা হয়েছে। লিপির পরিবর্তে লাভলীকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে।

আরো খবর »