কুড়িগ্রামের ডিসি সুলতানা পারভীন’র স্বপ্নের যত কথা

Feature Image

কুড়িগ্রাম জেলা হানাদার মুক্ত হয় ৭১ সালের ৬ই ডিসেম্বরে । আন্দোলন, সংগ্রাম ঐতিহ্যের ধারক কুড়িগ্রাম জেলার মুক্তিযোদ্ধারা অসীম বীরত্ব ও সাহসিকতায় পাকবাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে হানাদার মুক্ত করে কুড়িগ্রামকে। মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য বীর বিক্রম এবং বীর প্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধারা ঐশ্বর্যময় ও গৌরবান্বিত করেছে এ জেলাকে। বিশেষ করে সদ্য প্রয়াত বীর প্রতীক তারামন বিবি কুড়িগ্রাম জেলাকে মহিমান্বিত করেছেন। বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে মুক্তিযোদ্ধারা প্রতিনিয়ত হারিয়ে যাচ্ছেন। দিনদিন কমে যাচ্ছে এসব বীরের সংখ্যা।

মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানীদের কথা চিন্তা করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মাঝে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ছড়িয়ে দিয়ে একটি অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অভিযাত্রায় মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতি সংরক্ষণে একটি ডকুমেন্টারি তৈরির উদ্যোগ নেন কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভিন ও তার টিম।

ডিসি সুলতানা পারভীনমনে করেন যে, মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ও চেতনা বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে আমরা যাদের হারিয়েছি তাদের স্মৃতি সংরক্ষণ করা সম্ভব না হলেও এখনও যেসব বীর জীবিত আছেন তাদের স্মৃতি সংরক্ষণ করে রাখা সম্ভব। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের দুই হাতের স্পর্শের ছাপ, তাদের তথ্যসহ ছবি, স্বহস্তে স্বাক্ষর সংকলনের মাধ্যমে একটি ডকুমেন্টারি ‘বীরগাঁথা’ তৈরি করে কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসন। ইতোমধ্যে ডকুমেন্টারির কাজ সম্পন্ন হয়েছে।

‘বীরগাঁথা’ ডকুমেন্টারিতে জেলার তালিকাভুক্ত ২৭৩০ জন জীবিত বীর মুক্তিযোদ্ধার দুই হাতের ছাপসহ তাদের তথ্য এবং ১৫৭১ জন প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধার তথ্যসহ মোট ৪২৭৩ জন মুক্তিযোদ্ধার তথ্য সংরক্ষিত আছে। জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের দুই হাতের ছাপ, মহান মুক্তিযুদ্ধের দুর্লভ কিছু ছবি, মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান ও তাদের সম্মুখ সমরের গল্প সম্বলিত ডকুমেন্টারিটি কুড়িগ্রামের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে খুব সহজেই জেলার মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতে ও তাদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জাগ্রত রাখতে সহায়তা করবে।

এ প্রসঙ্গে কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক মোছাঃ সুলতান পারভিন বলেন, ডকুমেন্টারির প্রতিটি খণ্ডের প্রতি পাতায় মুক্তিযোদ্ধাদের জীবন্ত স্পর্শ রয়েছে। ৬টি ভলিউমে ১৩২টি খণ্ডে প্রস্তুতকৃত ডকুমেন্টারিতে কোনো দলিল বা তথ্যের ছায়ালিপি ব্যবহার করা হয়নি। কোন প্রেক্ষিতে বীরগাঁথা সৃষ্টির অনুপ্রেরণা পেলেন ? এমন প্রশ্নের জবাবে জেলা প্রশাসক মোছাঃ সুলতান পারভিন বলেন, মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে আমার বাবা একজন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা। দিনাজপুরের বালুবাড়িতে মহারাজা স্কুলে মাইন্ বিস্ফেরণে তিনি আহত হয়েছিলেন। খুব ছোটবেলায় বাবার কাছে যুদ্ধের কথা শুনতাম আর শিহরিত হতাম। ছোটবেলার সেই শিহরণ ও আবেগ আজ আমাকে বাস্তবতার মুখোমুখি উপনীত করেছে। কুড়িগ্রাম আমার কর্মস্থল বলে নয়, এখানকার মানুষ সহজ সরল, মাটির মানুষ। মহান মুক্তিযুদ্ধে এখানকার সেই মাটির মানুষ আর আমার বাবার মুখে শোনা যুদ্ধকথা’র বাস্তব রূপ ”বীরগাঁথা”। বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের জন্যে এ ”বীরগাঁথা” যেন এক জীবন্ত স্পর্শতা লাভ করে। এই আকাঙ্খা নিয়েই মূলতঃ বীরগাঁথা’র জন্ম। তিনি আরও বলেন, ‘বীরগাঁথা’ ডকুমেন্টারিটি প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি সাপেক্ষে স্বশরীরে হস্তান্তর করতে ইচ্ছুক। সাক্ষাতের অনুমতি পাওয়া গেলে ডকুমেন্টারিটি সরাসরি হস্তান্তর করা হবে।

আইনশৃঙ্খলা, শিক্ষা সহ বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা নিরসনে কুড়িগ্রাম জেলার সফল সাবেক এসপি,বর্তমানে রংপুর আর আর এফ এর এসপি মোঃ মেহেদুল করিম পিপিএম, বীরগাঁথা প্রসঙ্গে বলেন, মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত, জাতির পিতা সম্পর্কিত যেকোনো ধরণের কাজের সাথে নিজের ভাবনাকে যুক্ত করাকে বাঙালি হিসেবে গর্ববোধ করি। কুড়িগ্রামের সম্মানিত জেলা প্রশাসক, সুলতানা পারভীন আমার ব্যাচমেট, মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিকে অম্লান করে রাখার জন্য, তাঁদের হাতের ছাপ সহ সকল তথ্য নিয়ে বীরগাঁথা সত্যি এক অনন্য আয়োজন তাঁর। অনেকটা সাহস করেই তাঁর কাছ থেকে সম্মাননাপত্র ও কভারপেজ ডিজাইন করার কাজটি আমি নিয়েছিলাম। যদিও আমি প্রফেশনাল কোনো আর্টিস্ট না, তারপরেও বুকের ভালোবাসা আর সম্মান শ্রদ্ধা মিশ্রিত আমার এই সামান্য কাজ সকলের মাঝে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছি। কোনো কম্পিউটার এর সহায়তা না নিয়ে সম্পূর্ণ হাতে করতে চেয়েছি বীরগাঁথা’র প্রচ্ছদ। কভারপেজ এ আমি মানচিত্র ফুটো করে নিচ থেকে একটি হাত ও বঙ্গবন্ধুর তর্জনী তুলে এনেছি। এই অঙ্গুলী নির্দেশনায় সারাজীবন উদ্ভাসিত থাকুক আমাদের জীবন। ব্যাকগ্রাউন্ড এ পতাকার লাল সবুজ রং এ মুক্তিযোদ্ধাদের নাম দিয়েছি। শুনেছি জেলা প্রশাসক মহোদয় বীরগাঁথা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেয়ার প্রত্যাশা করেছেন । এই উদ্যোগ, এই প্রত্যাশার খবরটি জেনে খুব ভালো লাগছে। একজন বিশ্বনন্দিত নেত্রী, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে পৌঁছুবে আমাদের স্বপ্ন দিয়ে মোড়ানো বীরগাঁথা।

বীরগাঁথা’র সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জিলুফা সুলতানা।তিনি জানান, কুড়িগ্রাম জেলার নয়টি উপজেলা কেন্দ্রিক ”বীরগাঁথা” এর ১৩২টি খন্ড। সকল খন্ড সমূহের পৃষ্ঠা সংখ্যা প্রায় ১৮ হাজার। একজন মুক্তি যোদ্ধার হাতের ছাপ ছয় বার করে নিয়ে অরিজিনাল ৬টি কপি করা হয়েছে। সাবেক এসপি মেহেদুল করিম সহ কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা কর্মচারী, অন্যান্য সরকারী দপ্তর সমূহের কর্মকর্তা কর্মচারী, উপজেলা প্রশাসন সহ বীর মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক, সাধারণ জনতার সহযোগিতায় বীরগাঁথা’ জন্মলাভ করেছে। বীরগাঁথা’র সম্পাদক অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জিলুফা সুলতানা বারবার ভাবাবেগে আপ্লুত হয়ে তিনি তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ কর্মের অনুভূতি এভাবে ব্যক্ত করেন যে, আমার বাবাও একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন।সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি মৃত্য বরন করেছেন, প্রতিটি মুক্তিযোদ্ধার হাতের ছাপে আমি আমার বাবার স্পর্শ লাভ করেছি। যে কাজটা আমরা শুরু করলাম, এই কাজটা অতিতে কেউ শুরু করলে যে হাত দিয়ে আমার বাবা যুদ্ধ করেছিলেন, সেই হাতের ছোঁয়াটা আমার বাকিটা জীবন ছুঁয়ে যেত। জিলুফা সুলতানার পরম শান্তনা, জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন এমন মহতী কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে পেরেছেন। তাঁর প্রত্যাশা, বীরগাঁথা শুধু কুড়িগ্রাম নয়, সারাদেশে অনুকরণীয় হোক।

ধরলা নদীর কোলঘেঁষে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার হলোখানা ইউনিয়নের নিভৃত পল্লী, সারোডোব গ্রামে অসুস্থ ,বয়োবৃদ্ধ বীর মুক্তিযোদ্ধা মতিয়ার রহমান এই প্রতিবেদককে বলেন, একদিন যে হাত দুটো দিয়ে অস্ত্র ধরেছি, যুদ্ধ করেছি, সেই হাত দুটো আল্লাহর দরবারে প্রতিনিয়ত উঠাচ্ছি, দোয়া কামনা করছি। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কুড়িগ্রামের ডিসি সুলতানা পারভীন জেলার সকল মুক্তিযোদ্ধাকে যেভাবে সম্মানীত করেছেন, আমাদেরকে বীরগাঁথায় আবদ্ধ করেছেন, সেই ”বীরগাঁথা” যেন তিনি তুলে দিতে পারেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে।

আরো খবর »