আ.লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব: আর কেউ রইল না জাতীয় চার নেতার পরিবারের

Feature Image

জাতীয় চার নেতার পরিবারের সর্বশেষ প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ, আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম আর নেই। সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন ও সৈয়দ আশরাফের মৃত্যুর পর মোহাম্মদ নাসিমই ছিলেন জাতীয় চার নেতার নিকটাত্মীয়দের মধ্যে জাতীয় পর্যায়ে আলোচিত গুরুত্বপূর্ণ নেতা। তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটিতে জাতীয় চার নেতার পরিবারের একমাত্র সদস্য। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে এই প্রথম আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ জাতীয় চার নেতার পরিবারের সদস্য ছাড়া হলো। স্বাধীন বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের প্রতিটি কেন্দ্রীয় কমিটিতে জাতীয় চার নেতার পরিবারের কোনো না কোনো সদস্য গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধকে একটি সফল পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে দৃঢ় নেতৃত্ব দেন তৎকালীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, অর্থমন্ত্রী এম মনসুর আলী, স্বরাষ্ট্র, কৃষি, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী আবুল হাসনাত মোহাম্মদ কামারুজ্জামান কাজল। তাঁরা স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। সৈয়দ নজরুল ইসলাম স্বাধীন বাংলাদেশে শিল্পমন্ত্রী, তাজউদ্দীন আহমদ অর্থ ও পরিকল্পনা, এম মনসুর আলী স্বরাষ্ট্র ও যোগাযোগ, এ এইচ এম কামারুজ্জামান ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর তাঁর ঘনিষ্ঠ এ চার সহচরকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে ৩ নভেম্বর জেলখানায় গুলি করে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় চার নেতাকে।

১৯৭৫ সালে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু এবং জেলখানায় জাতীয় চার নেতাকে হত্যার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতি দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছিল। দলে ভাঙন ও নেতাদের মধ্যে দ্বন্দ্বে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দলটির অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়েছিল। ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলনে বিদেশে নির্বাসিত বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে দলটির সভাপতি নির্বাচিত করতে জোরালো ভূমিকা রাখেন জাতীয় চার নেতার পরিবারের সদস্যরা। শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের হাল ধরলে তাঁর কাজে সর্বতো সহযোগিতা করেন জাতীয় চার নেতার পরিবারের সদস্যরা। ১৯৭৭ সালে দ্বিধাবিভক্ত আওয়ামী লীগের আহ্বায়কের দায়িত্ব নেন তাজউদ্দীন আহমদের সহধর্মিণী সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন। তিনি দুর্দিনে আওয়ামী লীগকে টিকিয়ে রাখতে বহু কষ্ট করেছেন। ২০১৩ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত জোহরা তাজউদ্দীন আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন।

দুর্দিনে আওয়ামী লীগের হাল ধরা আরেক নেতা হলেন সৈয়দ নজরুল ইসলামের সন্তান সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। তিনি আলোচিত এক-এগারোর সময়ে আওয়ামী লীগকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। তিনি টানা দুই মেয়াদে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং গত বছর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন। নির্লোভ রাজনীতিবিদ সৈয়দ আশরাফ দল-মত-নির্বিশেষে সব মানুষের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন।

সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার বাসিন্দা এম মনসুর আলী কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে পড়ার সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ হন। এ ঘনিষ্ঠতার সুবাদেই তিনি ১৯৫১ সালে মুসলিম লীগ ছেড়ে আওয়ামী মুসলিম লীগে যোগ দেন। ধীরে ধীরে তিনি বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর হয়ে ওঠেন। স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু বাকশাল গঠন করলে এম মনসুর আলী সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। সেই সময়ের মন্ত্রিসভায় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পান মনসুর আলী। ১৯৭৫ সালে তাঁকে হত্যার পর তাঁর দুই সন্তান মোহাম্মদ সেলিম ও মোহাম্মদ নাসিম আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। ১৯৮১ সালে ভারতে নির্বাসন থেকে শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসার পর এম মনসুর আলীর দুই পুত্র আওয়ামী লীগকে শক্তিশালী করতে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। মোহাম্মদ সেলিম ১৯৯১-১৯৯৬ মেয়াদে সিরাজগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন। তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীরও সদস্য ছিলেন। মোহাম্মদ নাসিম ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের সম্মেলনে কেন্দ্রীয় সম্পাদকমণ্ডলীতে স্থান পান। পরের কমিটিতে প্রচার সম্পাদক নির্বাচিত হন। এরপর দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের একমাত্র সাংগঠনিক সম্পাদকের পদে ছিলেন। সর্বশেষ তিন কমিটিতে মোহাম্মদ নাসিম আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন। এ ছাড়া তিনি আমৃত্যু আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের কেন্দ্রীয় মুখপাত্রের দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৪ দলের সমন্বয়ক সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকায় মোহাম্মদ নাসিমই মূলত ১৪ দলের সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করেন। নাসিম ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল মেয়াদের সরকারের মন্ত্রিসভায় স্বরাষ্ট্র, ডাক, তার ও টেলিযোগাযোগ, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত এবং ২০১৪ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয়ের পর রাজপথে আন্দোলনে নাসিম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তৎকালীন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েও রাজপথে পুলিশের পিটুনিতে রক্তাক্ত হয়ে সারা দেশে আলোচনার ঝড় তুলেছিলেন।

দীর্ঘ রাজনৈতিক তৎপরতার মধ্য দিয়ে মোহাম্মদ নাসিম নিজ দল ও জাতীয় পর্যায়ে একজন প্রভাবশালী ও গুরুত্বপূর্ণ নেতা হয়ে ওঠেন। উত্তরবঙ্গের দুই বিভাগে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অভিভাবক হয়ে উঠেছিলেন তিনি। আওয়ামী লীগের প্রয়াত সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মৃত্যুর পর মোহাম্মদ নাসিমই ছিলেন জাতীয় চার নেতার পরিবারের সদস্যদের মধ্যে প্রভাবশালী নেতা।

জাতীয় চার নেতার পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বর্তমানে দুজন সংসদ সদস্য রয়েছেন। তাঁরা হলেন সৈয়দ নজরুল ইসলামের কন্যা সৈয়দা জাকিয়া নূর, তাজউদ্দীন আহমদের কন্যা সিমিন হোসেন রিমি। রিমি একাধিকবার আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য ছিলেন। তবে আওয়ামী লীগের সর্বশেষ জাতীয় সম্মেলনে গঠিত কমিটিতে তিনি বাদ পড়েন। আর সৈয়দা জাকিয়া নূর স্থান পাননি কেন্দ্রীয় কমিটিতে। সিমিন হোসেন রিমির ছোট ভাই সোহেল তাজ ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। কিন্তু দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে অভিমান করে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন তিনি। বর্তমানে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয়। সোহেল তাজের অন্য দুই বোনও রাজনীতিতে যুক্ত হননি। সৈয়দ নজরুল ইসলামের সন্তান সৈয়দ সাফায়েত উল ইসলামের রাজনীতিতে আগ্রহ থাকলেও তিনি এখনো আওয়ামী লীগের কমিটিতে স্থান পাননি।

১৯৫৭ সালে রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এ এইচ এম কামারুজ্জামান স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। তাঁর পুত্র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন বরাবরই রাজশাহীকেন্দ্রিক রাজনীতিতে আটকে থেকেছেন। বর্তমানে তিনি রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র। একাধিকবার আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য হয়েছেন। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পদে আসতে পারেননি। গত বছর ২১তম জাতীয় সম্মেলনে গঠিত কেন্দ্রীয় কমিটিতে ঠাঁই হয়নি আগের কমিটির কার্যনির্বাহী সদস্য লিটনের।

মোহাম্মদ নাসিমের মৃত্যুর পর আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী বলেন, ‘জেল হত্যাকাণ্ডের বিয়োগান্তক ঘটনায় মোহাম্মদ নাসিম মানসিকভাবে ভেঙে পড়লেও ওই পরিস্থিতি দৃঢ়তার সঙ্গে মোকাবেলা করে রাজনীতিতে তাঁর বাবার ধারা, দেশের জন্য কাজ করা—সবই নিষ্ঠার সঙ্গে করেছেন। তিনি ছিলেন অবিচল, বিশ্বস্ত। দেশের জন্য কাজ করতে গিয়ে জেল-জুলুম, নির্যাতন হাসিমুখে বরণ করেছিলেন। অনেকে ঝামেলাহীন জীবন যাপন করলেও নাসিম তা করেননি। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে ১৪ দলের সব কর্মকাণ্ডে জড়িত থেকে সবাইকে এক জায়গায় এনে কাজ করানোটা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে করেছেন তিনি।’

আরো খবর »