করোনাকালেও ভেজাল ওষুধের রমরমা

Feature Image

রাজধানীর মিরপুর ১০ নম্বর এলাকায় বুধবার র‌্যাবের অভিযানে চারটি ফার্মেসি থেকে জব্দ করা হয় নকল, ভেজাল ও অনুমোদনহীন বিপুল পরিমাণ ওষুধ। জরিমানা করা হয় ১০ লাখ টাকা। জব্দ করা ওষুধের মধ্যে এমন কিছু ওষুধ রয়েছে, যা মানুষের কিডনি বিকল থেকে শুরু করে শরীরে নানা জটিলতা তৈরি করে বলে জানান অভিযানে অংশ নেওয়া ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। ১২ জুলাই ডেমরায় এসএইচএস কেয়ার নামের হাসপাতালে চালানো অভিযানেও পাওয়া যায় নকল, ভেজাল, মেয়াদোত্তীর্ণ ও অবৈধ ওষুধ, যার মধ্যে শিশুদের কিছু ভ্যাকসিনও ছিল। সেখানে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা এবং একজনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

রাজধানীর কাকরাইলে ১৩ জুলাই লাজ ফার্মায় পাওয়া যায় বিপুল পরিমাণ অবৈধসহ মেয়াদোত্তীর্ণ ও নকল ওষুধ। এসব জব্দ করাসহ লাজ ফার্মাকে ২৯ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। এর আগে ৯ জুলাই উত্তরায় একটি অভিযানেও এসবি করপোরেশন নামের একটি প্রতিষ্ঠানে আমেরিকা ও থাইল্যান্ডের বিভিন্ন ওষুধ নকল করে তৈরি করার ঘটনা ধরা পড়ে। একই এলাকায় লাজ ফার্মা ও তামান্না ফার্মেসি থেকেও একই ধরনের অবৈধ, মেয়াদোত্তীর্ণ ও নকল ওষুধ জব্দ করা হয়। ১২ জুলাই মিরপুর ১ নম্বর এলাকার সাতটি ফার্মেসিকে এক লাখ ৪৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। ঢাকার বাইরে সিলেট, দিনাজপুর, জয়পুরহাটসহ আরো কয়েকটি জেলায় ১৪ জুলাই পৃথক অভিযানে নানা ধরনের নকল হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও অবৈধ ওষুধ জব্দ করা হয়, করা হয় জরিমানা। ঢাকার মিটফোর্ডে ওষুধের মার্কেটেও চলতি মাসে একাধিক অভিযানে নকল, ভেজাল, নিবন্ধনহীন বিপুল পরিমাণ ওষুধসহ জীবাণুনাশক জব্দ করা হয়।

এ ধরনের যখনই কোনো অভিযান হয় তখনই ধরা পড়ে এ রকম ওষুধ। ঢাকাসহ সারা দেশের ওষুধের দোকানেই পাওয়া যায় এসব। ওষুধের দোকানের পাশাপাশি করোনাভাইরাস থেকে সুরক্ষায় নকল ও ভেজাল হ্যান্ড স্যানিটাইজারসহ অন্যান্য জীবাণুনাশকে সয়লাব এখন সাধারণ দোকানপাট, ফুটপাতসহ অলিগলি পর্যন্ত। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রায় প্রতিদিনই অভিযান চালিয়েও তা বন্ধ করতে পারছে না প্রত্যাশিত মাত্রায়। জেল-জরিমানার পরও চলছে এই নকল ও ভেজালের অবৈধ ব্যবসা।

এই পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু বিক্রেতাদের ধরে জরিমানা করে কিংবা জেল দিয়ে কোনো লাভ হবে না। এসব নকল, ভেজাল ও অবৈধ ওষুধের উৎপাদন ও বাজারজাতকারীদের খুঁজে বের করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। তা না করে দু-চারটা ফার্মেসিতে অভিযান চালানো হলেও অন্য হাজার হাজার ফার্মেসি কিংবা ফুটপাতে এই বাণিজ্য দেদার চলতেই থাকবে। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে যেসব নামকরা ওষুধের দোকানের ওপর মানুষের অপেক্ষাকৃত বেশি আস্থা ছিল, সেগুলোতেও এখন পাওয়া যাচ্ছে ভেজাল, নকল কিংবা অবৈধ ওষুধ। ফলে ওষুধ ব্যবহার নিয়েও এখন শঙ্কায় পড়েছে মানুষ।

মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও ইউজিসি অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নকল ও ভেজাল ওষুধ মানুুষের কিডনি, স্নায়ু, হার্ট, লিভারসহ বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নানা রকম ঝুঁকিতে ফেলছে। যে রোগের জন্য ওষুধ দেওয়া হচ্ছে, সেই রোগ তো সারেই না বরং আরো জটিলতা বেড়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে রোগীরা এসে আমাদের কাছে বলে, ওষুধ খেয়ে কাজ হচ্ছে না। আমরা তখন দ্বিধায় পড়ে যাই; অন্য ওষুধ দিই বা ডোজ বাড়িয়ে দিই।’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশে যে কী পরিমাণ নকল ও ভেজাল ওষুধের কারবার চলে, তা চারদিকে চোখ ফেললেই দেখা যায়। প্রতিনিয়ত মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একটি বড় হাসপাতালে একটি নকল ওষুধ ব্যবহার করায় আমাদের একজন প্রোভিসি চিকিৎসক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে মামলা করেছিলেন। পরে সেই প্রোভিসি মারা গেছেন। এমন ঘটনা আরো আছে। ভেজাল প্যারাসিটামলের ট্র্যাজেডি তো বড় ইতিহাস হয়ে আছে। কিন্তু তার পরও এই বাণিজ্য আমরা বন্ধ করতে পারছি না। অন্য কোনো দেশে এমন নকল ও ভেজাল ওষুধের বাণিজ্য নেই।’

অভিযান চালানো সম্পর্কে র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আনিসুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কখনো ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর থেকে আমাদের অবহিত করা হয় আবার কখনো আমরা নিজেরাই বিভিন্ন অভিযোগের আলোকে অভিযানে যাই। এমনকি আমরা ছদ্মবেশেও রোগী বা ক্রেতা সেজে তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করে অভিযানে যাই।’ তিনি বলেন, অবৈধ বাণিজ্য পুরোপুরি নির্মূল করা না গেলেও অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে। বিক্রেতাদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হচ্ছে। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর থেকেও নানামুখী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তারা তাদের মতো করে আরো পরিকল্পনা করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, করোনাভাইরাস মহামারির ভেতরে বিভিন্ন ধরনের অসুস্থতায় ভুগতে থাকা মানুষ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই হাসপাতালে না গিয়ে বাসায় আছে। চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বারের বেশির ভাগই বন্ধ। টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে চলছে চিকিৎসার বড় অংশ। ফলে করোনাভাইরাস ছাড়াও অন্যান্য রোগের ক্ষেত্রেও বাসাবাড়ি এখন হয়ে পড়েছে এক ধরনের চিকিৎসাকেন্দ্র। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় হাসপাতালের সামনে বা হাসপাতালকেন্দ্রিক ওষুধের দোকানগুলোতে এখন ভিড় কমে আবাসিক এলাকার আশপাশের ফার্মেসিগুলোতে ওষুধ বিক্রির রমরমা অবস্থা। এমন সুযোগ নিয়ে অসাধু ওষুধ ব্যবসায়ী চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে আগের চেয়ে অনেক বেশি মাত্রায়।

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের উপপরিচালক আইউব হোসেন অবশ্য কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা বড় বা ছোট বলে কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে আলাদা ভাবছি না, যেখানে অন্যায় দেখছি সেখানেই ব্যবস্থা নিচ্ছি। যেমন লাজ ফার্মাও আমাদের অভিযান ও শাস্তি থেকে রক্ষা পায়নি এবং সামনেও পাবে না।’ তিনি আরো বলেন, ‘র‌্যাব বা পুলিশ প্রশাসনকে সঙ্গে নিয়ে সারা দেশেই প্রতিদিন আমাদের অভিযান চলছে। বিভিন্ন এলাকায় নকল, ভেজাল, নিম্নমানের ও অনুমোদনহীন ওষুধ উদ্ধার হচ্ছে, জেল জরিমানা করা হচ্ছে। ফলে এখন নকল, ভেজাল ও অবৈধ ওষুধ বিক্রির তৎপরতা অনেকটাই কমে গেছে।’

তবে বাংলাদেশ কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি মো. দীন আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা কোনো অবৈধ, ভেজাল বা নকল ওষুধের ব্যবসা কিংবা ব্যবসায়ীকে প্রশ্রয় দিই না। বরং সরকারকে সব সময় সহায়তা করি এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে। তার পরও হয়তো তা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হচ্ছে উৎস বন্ধ করতে না পারা।’ এই ওষুধ ব্যবসায়ী নেতা আরো বলেন, ‘ফার্মেসিগুলোত শুধু ওষুধ বিক্রি হয়, তারা তো আর ওষুধ নিজেরা তৈরি বা বাজারজাতও করে না। যারা এসব ভেজাল ও নকল ওষুধ তৈরি করে কিংবা নিবন্ধনহীন বা অবৈধ ওষুধ বাজারজাত করে, তারা সব সময়ই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। ওই উৎসগুলো বন্ধ করা গেলে কোনো ফার্মেসিতেই তা পাওয়া যেত না। মানুষও ঝুঁকির মুখে পড়ত না।’ এ ছাড়া অবৈধ ওষুধের ব্যাপারে দীন আলী বলেন, ‘অনেক ওষুধই আছে, যেগুলোর আমাদের দেশে নিবন্ধন নেই বা আমদানির অনুমোদন নেই, কিন্তু চিকিৎসকরা সেগুলো লিখছেন; সেগুলোর চাহিদা রয়েছে বলেই গোপনে বাজারজাত হচ্ছে। আর এসব ওষুধ বিদেশ থেকে আসে চোরাপথে। লাগেজে নিয়ে আসে অনেকে।’

ম্যাজিস্ট্রেট আনিসুর রহমান বলেন, ‘কোনো অজুহাতেই নকল, ভেজাল ও অবৈধ বাণিজ্য চলতে পারে না। বিক্রি বন্ধ হলে উৎপাদনও বন্ধ হয়ে যাবে। আর অবৈধ পণ্য বেচাকেনা আইনত দণ্ডনীয়, তা জেনেও যারা তা সংরক্ষণ ও বেচাকেনা করে তাদের শাস্তির আওতায় আসতেই হবে।’

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের উপপরিচালক এ বিষয়ে বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন সময় নকল ওষুধ উৎপাদনকারী ও বাজারজাতকারী চক্রও ধরেছি, যেসব ওষুধের নিবন্ধন নেই সেগুলোর বিরুদ্ধেও অভিযান করছি এবং শাস্তির আওতায় এনেছি। চলতি মাসেও এমন কয়েকটি অভিযান হয়েছে।’

আরো খবর »