স্টেডিয়াম পরিদর্শনে ২০ কর্তা যাবেন বিদেশে

Feature Image

সরকারের ৭০ লাখ টাকা ব্যয় করে বিদেশে স্টেডিয়াম পরিদর্শনে যাবেন সরকারি ২০ কর্মকর্তা। তাঁরা অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্যের তিনটি স্টেডিয়াম পরিদর্শন করে সেগুলোর নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণসহ নানা বিষয়ে সরেজমিন জ্ঞান অর্জন করবেন। আর সেই অর্জিত জ্ঞান তাঁরা মানিকগঞ্জে আন্তর্জাতিক স্টেডিয়াম নির্মাণের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রকল্পে কাজে লাগাবেন। এই প্রকল্পটিতে স্টেডিয়াম নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য প্রায় চার কোটি টাকা ব্যয়ে একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেওয়া হবে। কিন্তু তার আগেই বিপুল সরকারি অর্থ খরচ করে কর্মকর্তাদের বিদেশে স্টেডিয়াম পরিদর্শনে পাঠানো বড় অপচয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের সূত্রগুলো জানায়, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীন জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ মানিকগঞ্জ জেলায় আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেট স্টেডিয়াম কমপ্লেক্স নির্মাণের প্রস্তাব করে। আর এর সম্ভাব্যতা সমীক্ষার জন্য একটি প্রকল্প ২০১৮ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে মেয়াদ বাড়িয়ে চলতি বছরের ৩০ জুন করা হয়। ২০১৯ সালের ২২ জানুয়ারি অনুমোদন দেওয়া এ প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় চার কোটি ৯৮ লাখ টাকা। এই পুরো টাকাই বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়ন থেকে হওয়ার কথা।

সূত্রগুলো জানায়, প্রকল্পটির আইটেমওয়ারি যে ব্যয় দেখানো হয়েছে, তার মধ্যে শুধু পরামর্শক নিয়োগের জন্য তিন কোটি ৯৮ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। আর ৭০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে শিক্ষা সফরের জন্য। এ ছাড়া যানবাহন ভাড়া ৯ লাখ, সম্মানী পাঁচ লাখ, ব্যবস্থাপনা ব্যয় তিন লাখ, কম্পিউটার সরঞ্জাম দুই লাখ, আসবাবপত্র দুই লাখ, প্রকাশনা ও মুদ্রণ তিন লাখ, বিজ্ঞাপন তিন লাখ, স্টেশনারি ও অন্যান্য তিন লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের একটি সূত্র জানায়, অনুমোদিত প্রকল্পটিতে বলা হয়েছে, স্টেডিয়াম নির্মাণের উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা বিদেশে শিক্ষা সফরে যাবেন। তাঁরা অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্য সফর করে সেখানকার স্টেডিয়ামগুলো কিভাবে নির্মাণ করা হয়েছে সে বিষয়ে জানবেন। তাঁরা অস্ট্রেলিয়ার সিডনি ও মেলবোর্নে দুটি স্টেডিয়াম পরিদর্শন করবেন। ভ্রমণে যুক্তরাজ্যে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম পরিদর্শনের বিষয়টিকে প্রাধান্য দেওয়া হবে।

সূত্রমতে, দুটি গ্রুপে এই শিক্ষা সফর অনুষ্ঠিত হবে। দুই গ্রুপ দুই দেশ ভ্রমণ করবে। প্রতি গ্রুপে ১০ জন করে মোট ২০ জন কর্মকর্তা থাকবেন। এর মধ্যে তিনজন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় থেকে, চারজন জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ থেকে, একজন পরিকল্পনা কমিশনের এসইআই বিভাগ থেকে, একজন আইএমইডি থেকে ও একজন প্রগ্রামিং ডিভিশন থেকে। পরিদর্শনকারী দল সরেজমিন স্টেডিয়াম পরিদর্শন করবে এবং ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করে স্টেডিয়ামগুলো কিভাবে স্থাপন হয়েছে এবং এখন রক্ষণাবেক্ষণ হচ্ছে কিভাবে সে বিষয়ে জ্ঞানার্জন করবেন। স্টেডিয়ামগুলোর স্থায়িত্ব ধরে রাখার বিষয়েও জানবে পরিদর্শনকারী দল। এ ধরনের বিদেশ সফরের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তা বন্ধ রাখার পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্লেষকরা। জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এই রকম অর্থ অপচয় বন্ধ হওয়া দরকার। যত দ্রুত সম্ভব এটা বন্ধ শুধু নয়, যারা এ ধরনের জনগণের অর্থ অপচয়ের চেষ্টা করছে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।’

এক বছর মেয়াদ বাড়িয়েও পরামর্শক নিয়োগ হয়নি
প্রকল্পটি অনুমোদনের সময়ে মেয়াদ ঠিক হয় ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত। কিন্তু যথাসময়ে কাজ শেষ করতে না পারায় পরবর্তী সময়ে মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। কিন্তু এ সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ তো দূরের কথা পরামর্শক প্রতিষ্ঠানও নিয়োগ দিতে পারেনি জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ। এখন প্রকল্পটির মেয়াদ আবারও কিভাবে বাড়ানো যায় তা নিয়ে আলাপ-আলোচনা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

পরিকল্পনা কমিশনের একটি সূত্র জানায়, গত ২১ জুন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় থেকে পরিকল্পনা কমিশনকে চিঠি দেওয়া হয়। তাতে জানানো হয়, সম্প্রতি মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এডিপি পর্যালোচনা সভায় মানিকগঞ্জে আন্তর্জাতিক স্টেডিয়াম নির্মাণের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রকল্পটির মেয়াদ বৃদ্ধিসহ সংশোধনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। নির্ধারিত মেয়াদ ৩০ জুনের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না বলেও পরিকল্পনা কমিশনকে জানানো হয়।

সূত্রগুলো জানায়, গত বছরের ২৫ নভেম্বর জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ সচিব মো. মাসুদ করিম এক চিঠিতে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিবকে জানান, উন্মুক্ত ই-জিপিতে দরপত্র আহ্বান করে ঠিকাদার/উপদেষ্টা প্রতিষ্ঠান নির্বাচন প্রক্রিয়াধীন। তবে পিপিআর-২০০৮ মোতাবেক ইওআই এবং আরএফপি অনুসরণ করত ঠিকাদার/উপদেষ্টা প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ করতে হবে। ওই পদ্ধতি অনুসরণের ক্ষেত্রে পিপিআর-২০০৮ অনুযায়ী ন্যূনতম সময় দরদাতাদের প্রদানের নির্দেশনা থাকায় নিয়োগপ্রক্রিয়া বিলম্বিত হচ্ছে বিধায় নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প সমাপ্ত করা সম্ভব হবে না।

চিঠিতে ক্রীড়া পরিষদ সচিব প্রকল্পটির ব্যয় বৃদ্ধি ব্যতিরেকে মেয়াদ এক বছর অর্থাৎ ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পরামর্শ রাখেন।

প্রকল্প পরিচালকের বক্তব্য : সরকারি ব্যয়ে ২০ কর্মকর্তাকে স্টেডিয়াম পরিদর্শনে বিদেশে পাঠানোর যৌক্তিকতা নিয়ে জানতে চাওয়া হয় মানিকগঞ্জে আন্তর্জাতিক স্টেডিয়াম কমপ্লেক্স নির্মাণের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মো. শাহ আলম সরদারের কাছে। তিনি বলেন, ‘প্রকল্পে বলা হয়েছে আমাদের কর্মকর্তারা সেখানে যাবেন অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য। কিন্তু এখন তো পরিবর্তিত পরিস্থিতি। ফলে এখন আর সেই সুযোগ নেই। প্রধানমন্ত্রী সব ধরনের কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ নিষেধ করেছেন। বিদেশ সফরের বিষয়টি এখন আর বাস্তবায়ন হবে না হয়তো।’

এক বছর মেয়াদ বাড়িয়েও পরামর্শক নিয়োগ দিতে না পারা প্রসঙ্গে শাহ আলম সরদার বলেন, ‘এটা একটু সমস্যা হয়েছে। আর আপনারা জানেন এখন পরিবর্তিত পরিস্থিতি। আশা করি দ্রুত এটা ফয়সালা হয়ে যাবে।’

আরো খবর »