ঈদুল আজহায় পরামর্শ ও নির্দেশনা

Feature Image

ঈদুল আজহায় ব্যাপক হারে জনচলাচলে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে বলে কভিড-১৯ জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল। সংক্রমণের বিস্তার রোধে ঈদের ছুটিতে চার জেলা থেকে অন্যান্য স্থানে যাতায়াত বন্ধ রাখার পরামর্শ দিয়েছিল কমিটি। সে অনুযায়ী স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় চিঠি দেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে। কমিটির সুপারিশে ঈদের আগে পাঁচ দিন এবং পরে তিন দিন পর্যন্ত মোট ৯ দিন গণপরিবহন বন্ধ রাখার নির্দেশনা দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। এখন পর্যন্ত মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা-পরামর্শ বহাল থাকলেও ঈদে গণপরিবহন চালু রাখার সিদ্ধান্তই এসেছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও বলেছেন, ঈদে সারা দেশে গণপরিবহন চলবে। পণ্যবাহী যান চলাচল বন্ধ থাকবে। আগের দিন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী প্রথমে বলেছিলেন ৯ দিন গণপরিবহন বন্ধ থাকবে। পরে বক্তব্য পরিবর্তন করে তিনি বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে লঞ্চ ও ফেরি চলবে।

ঈদের সময় গণপরিবহন চলাচল বিষয়ে কার্যত সমন্বয়হীনতা দেখা যাচ্ছে।

পরামর্শ ও নির্দেশনা : গত ১০ জুলাই করোনা সংক্রমণ মোকাবেলায় গঠিত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি সংক্রমণের বিস্তার রোধে ঈদের সময় ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রাম থেকে অন্যান্য স্থানে যাতায়াত বন্ধ রাখার পরামর্শ দিয়েছিল। এরপর গত ১৩ জুলাই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জননিরাপত্তা বিভাগ, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগকে চিঠি দিয়ে পরামর্শক কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী গণপরিবহন বন্ধ রাখার বিষয়টি বিবেচনা করার জন্য বলা হয়। এর আলোকে পরদিন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব জসিমউদ্দিন স্বাক্ষরিত একটি চিঠি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) মহাপরিচালককে পাঠানো হয়। চিঠিতে ঈদের আগে-পরে মোট ৯ দিন গণপরিবহন বন্ধ রাখার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়। একইভাবে ওই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে পুলিশের মহাপরিদর্শক ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেও চিঠি দেওয়া হয়। গত বুধবার নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকেও ওই ৯ দিন ফেরি বন্ধ রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়। এর আগে গত ১৪ জুলাই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ও বিষয়টি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানায়।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাঠ প্রশাসন সংযোগ অধিশাখা থেকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে ঈদের পাঁচ দিন আগে থেকে তিন দিন পর পর্যন্ত গণপরিবহন বন্ধ রাখার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয় গত ১২ জুলাই। বিআরটিএ সূত্রে জানা গেছে, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সিদ্ধান্তের আলোকে সড়ক বিভাগ থেকে বিআরটিএতে এসংক্রান্ত নির্দেশনা কার্যকরের জন্য চিঠি দেওয়া হয়। গত মঙ্গলবার বিআরটিএর পক্ষ থেকে এসংক্রান্ত আদেশ জারির প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এর আগেই এ বিষয়ে ভিন্ন সিদ্ধান্ত আসে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে যোগাযোগ করা হলে তাদের কেউ এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তবে সরকারের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে ঈদ উপলক্ষে গণপরিবহন বন্ধের বিষয়টি যৌক্তিক কারণেই নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময় সরকার এই জায়গায় অবস্থান বদল করে গণপরিবহন চালু রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে ঈদ উপলক্ষে গণপরিবহন চালু থাকার নতুন সিদ্ধান্ত সংক্রান্ত কোনো নির্দেশনা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোতে দেওয়া হয়নি, দেওয়া হবেও না। গতকাল সড়ক পরিবহন মন্ত্রী গণপরিবহন চালু থাকার যে সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন, তাই বহাল থাকবে। এ বিষয়ে বিআরটিএ থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করে বিস্তারিত জানানো হবে।

গত রাতে বিআরটিএর চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এসংক্রান্ত লিখিত নির্দেশনা মন্ত্রণালয় থেকে এখনো পাইনি। নির্দেশনা পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এদিকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ওই নির্দেশনার আলোকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে গত ১৩ জুলাই সরকারি-বেসরকারি সবার জন্য ঈদের ছুটি উপলক্ষে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। প্রজ্ঞাপনে ‘সম্প্রতি করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের বিস্তার দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ার’ বিষয়টি উল্লেখ করে সরকারি, বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সবাইকে ঈদের সরকারি ছুটি বা ঐচ্ছিক ছুটি—যাই হোক না কেন, নিজ নিজ কর্মস্থলে থাকার কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও জনপ্রশাসনের নির্দেশনার পর সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে ঈদে গণপরিবহন চালু রাখার সিদ্ধান্ত আসায় একই বিষয়ে দুই ধরনের সিদ্ধান্ত পরিলক্ষিত হচ্ছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন সচিব শেখ ইউসুফ হারুন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সিদ্ধান্ত ছিল ঈদের সময় গণপরিবহন বন্ধ থাকবে। তাই সরকারি-বেসরকারি সবার জন্যই প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে। এখন গণপরিবহন খোলা রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না জানি না। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ভালো জানবে।’

এ বিষয়ে জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা রোজার ঈদের মতো পরিস্থিতি আর দেখতে চাই না। চাই ঈদের ছুটিতে বড় মহানগরীগুলো থেকে বাইরে যাতায়াত বন্ধ থাকুক এবং এ ধরনের নগরীগুলোতে পশুর হাট না বসুক। আমাদের এই চাওয়া কেবলই করোনাভাইরাসে সংক্রমণ বিস্তার রোধ করার জন্য। এটা সবার মনে রাখলে এবং সে অনুসারে কর্মপন্থা ঠিক করলে ভালো হবে।’

ঈদের সময় গণপরিবহন চলবে : ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েতউল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঈদের সময় গণপরিবহন চলাচল করবে—এটাই আমরা জানি। চার জেলা থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত বন্ধ থাকবে—এমন কোনো সিদ্ধান্ত আমরা পাইনি। আমাদের জানানো হয়নি।’ বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য লীগের সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন বাচ্চু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের পরিবহনগুলো দূরপাল্লার নয়, ঢাকা জেলার মধ্যে আমরা স্বাস্থ্যবিধি মেনেই পরিবহন পরিচালনা করছি এবং ঈদেও একইভাবে পরিবহন পরিচালনা করব।’

নতুন নির্দেশনা পায়নি রেল : রেলের কর্মকর্তা বলছেন, নতুন নির্দেশনা না আসায় এখন যেভাবে ট্রেন চলছে, ঈদের সময়ও সেভাবেই চলবে। ঈদে ট্রেন বাড়ানো কিংবা বন্ধের বিষয়ে সরকার নির্দেশনা দিলে সেটা কার্যকরে প্রস্তুত রয়েছে রেল বিভাগ।

বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক শামছুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকার ট্রেন চালাতে যে নির্দেশনা দিয়েছে, ঈদেও সেভাবে চলবে। সরকার যদি বলে ট্রেন বন্ধ থাকবে, তাহলে বন্ধ থাকবে।’ রেলওয়ের মহাপরিচালক (পশ্চিম) মিহির কান্তি গুহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঈদে ট্রেন বন্ধ রাখার বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেই।’

আরো খবর »