খাবার নেই, আশ্রয় নেই- কেবল বুক সমান হাহাকার

Feature Image

‘ঘরের চৌকিটা বানের পানিতে ডুবে যাওয়ায় দুই রাত চেয়ারে বসেই পার করচি। আইজকা পানি একটু কমায় চৌকিটা জাইগা উঠছে। পেটে খিদে থাকলেও আইজকা রাতের ঘুমটা হইতে পারে।’

তিন সপ্তাহ ধরে বন্যার পানিতে আটকে থাকা সিরাজগঞ্জের বিয়ারাঘাট এলাকার আমিনা বেগম এভাবেই বন্যার পানির সঙ্গে নীরবে লড়াই করে চলেছেন। অশ্রুচোখে তিনি জানালেন, বাড়তে থাকা পানি এখন বুক সমান। ইট দিয়ে ঘরের চৌকি উঁচু করে কোনো রকমে দিন পার করলেও গত শুক্রবার চৌকিটিও ডুবে যায়। চাল-ডালের পাশাপাশি আগুন জ্বালানোর শুকনো জ্বালানিও নেই। গতকাল দুপুরে কাঁঠালের বিচি ভেজে খেয়েছেন, রাতে কী খাবেন সেটা তাঁর কাছেও অজানা। শুধু সিরাজগঞ্জের আমিনা বেগম নন, এই হাহাকার চলছে বন্যাদুর্গত সব এলাকায়।

এদিকে, মধ্যাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি ক্রমেই বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। নতুন করে তলিয়ে গেছে ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট। অসংখ্য মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্র, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধসহ উঁচু জায়গাগুলোয় আশ্রয় নিয়েছে। খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও গবাদি পশুর খাদ্যসংকটে পড়ে একরকম দুর্বিষহ জীবন পার করছে লাখ লাখ পানিবন্দি মানুষ। সরকারিভাবে ত্রাণের বরাদ্দও অপ্রতুল বলে জানিয়েছে বানভাসিরা। অন্যদিকে উত্তরাঞ্চলে পানি কমতে থাকায় নদীতীরের মানুষের মনে ভাঙনভয় পেয়ে বসেছে। পানি কমলেও কিছু কিছু নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার ওপর দিয়ে বইছে।

পদ্মার পানি বাড়তে থাকায় মুন্সীগঞ্জের বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। কয়েক দিন ধরে নিম্নাঞ্চলের লোকজন পানিবন্দি থাকলেও এখন একটু উঁচু এলাকায় পানি ঢুকে পড়ছে। কোথাও কোথাও ঘরের চালা সমান পানি উঠেছে। অনেক রাস্তাঘাট তলিয়ে গেছে।

শ্রীনগরের ভাগ্যকুল পয়েন্টে গতকাল শনিবার সকাল ৯টায় তিন সেন্টিমিটার কমে বিপৎসীমার ৫৯ সেন্টিমিটার ও মাওয়া পয়েন্টে দুই সেন্টিমিটার কমে বিপৎসীমার ৫৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পদ্মার পানি প্রবাহিত হয়েছে। এতে মুন্সীগঞ্জ সদর, টঙ্গিবাড়ী ও লৌহজংয়ের পদ্মার চরের ৪০ গ্রামের হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ে।

মুন্সীগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী টি এম রশিদুল কবির বলেন, গত কয়েক বছরের চেয়ে এবার পদ্মায় পানির চাপ সর্বোচ্চ। ভাঙন ঠেকাতে টঙ্গিবাড়ীর দীঘিরপাড়ে ২৬ হাজার ও লৌহজং উপজেলায় ১৩ হাজার বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে।

এদিকে, রাজবাড়ীতে ২৪ ঘণ্টায় পদ্মার পানি ১০ সেন্টিমিটার বেড়ে নিম্নাঞ্চলের অনেক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বর্তমানে পদ্মার পানি বিপৎসীমার ১০৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে। পদ্মার পানি বেড়ে যাওয়ায় সদর উপজেলার মিজানপুর, চন্দনী, কালুখালীর রতনদিয়া, পাংশার হাবাসপুর, গোয়ালন্দের দেবগ্রাম ও দৌলতদিয়া ইউনিয়নের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের বাইরের এলাকাগুলোয় পানি উঠেছে।

মানিকগঞ্জের হরিরামপুরের ১৩ ইউনিয়নের ১০টিই ইতিমধ্যে বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে হাজার হাজার মানুষ। উপজেলা কার্যালয়, থানা চত্বরসহ প্রধান প্রধান সড়কে এখনো হাঁটুপানি। জেলা সদর ও ঢাকার সঙ্গে হরিরামপুরের সড়ক যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। তলিয়ে গেছে ফসলি জমি। ভেসে গেছে মাছ। মাদারীপুরের শিবচরে আড়িয়াল খাঁ নদেও দেখা দিয়েছে ভাঙন।

জামালপুরে যমুনার পানি ১৯ সেন্টিমিটার কমলেও গতকাল সন্ধ্যায় বিপৎসীমার ১০১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। ফলে দেওয়ানগঞ্জ, ইসলামপুর ও মাদারগঞ্জের পানি নামতে শুরু করায় বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। গতকাল সন্ধ্যা থেকে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে এক সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

ফলে মেলান্দহ, ইসলামপুর, বকশীগঞ্জ, সরিষাবাড়ী ও জামালপুর সদরে বন্যা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি হয়েছে। বন্যায় এই পাঁচটি উপজেলার নিচু এলাকা, গ্রামীণ রাস্তাঘাট ও ফসলের ক্ষেত ডুবে গেছে। এই পাঁচ উপজেলাসহ সারা জেলায় ৬৫৩টি গ্রামের অন্তত সাড়ে আট লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এদিকে বন্যার পানিতে ডুবে গতকাল জামালপুর সদর ও দেওয়ানগঞ্জে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

পুরাতন ব্রহ্মপুত্রসহ মৃগী ও দশানি নদীর পানি বাড়ার ফলে শেরপুরের চরাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। শেরপুর সদরের সাত ইউনিয়ন, পৌরসভার একাংশ ও নকলার দুই ইউনিয়নের নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। চরাঞ্চলের কমপক্ষে ৪০ গ্রামের অর্ধলক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বন্যার তোড়ে শেরপুর-জামালপুর মহাসড়কের নন্দির বাজার এলাকার পোড়ার দোকান ও শিমুলতলী ডাইভারশনের ওপর দিয়ে পানির স্রোত বইছে। পোড়ার দোকান ডাইভারশনের বেইলি ব্রিজের দক্ষিণ পাশের মাটি ধসে যাওয়ায় দুই দিন ধরে শেরপুর-জামালপুর মহাসড়কে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

এদিকে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বেড়ে শ্রীবরদীর ২৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে কয়েক হাজার মানুষ।

তীব্র পানির চাপে হুমকিতে রয়েছে চাঁদপুরের পদ্মাপারের দুর্গমচর রাজরাজেশ্বর। দুই দিনে এই চরের তিন শতাধিক বসতবাড়ি, ফসলি জমি, একটি বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মসজিদ নদীগর্ভে চলে গেছে। এ পরিস্থিতিতে ভিটেবাড়ি হারিয়ে চরের শত শত মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে অন্যত্র ছুটছে।

মেঘনার ভাঙনে নরসিংদীর রায়পুরার চরাঞ্চলের চানপুর ইউনিয়নের ইমামদিরকান্দি গ্রামটি বিলীন হয়ে গেছে। সর্বশেষ এই গ্রামে ১৫ পরিবারের বসতি ছিল। চার দিনের টানা ভাঙনে মানচিত্র থেকে গ্রামটি হারিয়ে গেছে।

অপরদিকে উত্তরবঙ্গের জেলা গাইবান্ধার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। ব্রহ্মপুত্র নদ, তিস্তা, ঘাঘট ও করতোয়া নদীতীরবর্তী গাইবান্ধার চার উপজেলার ২৬টি ইউনিয়ন এখনো ডুবে আছে। ২৪ ঘণ্টায় গাইবান্ধায় ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ৩০ সেন্টিমিটার ও ঘাঘট নদীর পানিও ২৮ সেন্টিমিটার কমেছে। তবে ২৪ ঘণ্টায় করতোয়া নদীর পানি ৯০ সেন্টিমিটার বেড়েছে। গতকাল বিকেলে করতোয়ার পানি গোবিন্দগঞ্জের কাটাখালী পয়েন্টে বিপত্সীমার ১২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এসব ইউনিয়নের দেড় লক্ষাধিক মানুষ এখনো পানিবন্দি রয়েছে।

কুড়িগ্রামে ধরলা ও ব্রহ্মপুত্রের পানি কমতে থাকলেও বন্যাদুর্গত তিন লাখ মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। বন্যার পানি ঢুকে নতুন করে প্লাবিত হয়েছে চিলমারী শহর। কেসি রোজ ও উপজেলা সড়কসহ অসংখ্য সড়কে পানি ওঠায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। চিলমারী উপজেলা শহরের সংলগ্ন ৫০টি গ্রাম নিমজ্জিত হয়েছে। দুই শতাধিক পুকুরের মাছ ভেসে গেছে।

যমুনা নদীর পানি সামান্য কমলেও তা বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় সিরাজগঞ্জে বন্যার সার্বিক পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে।

বগুড়ার সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনটে যমুনা নদীর পানি কমছে। তবে বাড়িঘর থেকে এখনো নামেনি বানের পানি। ওই তিন উপজেলার ১৮টি ইউনিয়নের ১৫০টি গ্রাম এখনো ডুবে আছে।

আরো খবর »