করোনা উপসর্গ আছে, ডাক্তারও সতর্ক করছেন, বাড়িতে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যু!

Feature Image

করোনা উপসর্গ নিয়ে অনেকেই মৃত্যুবরণ করেছেন। জ্বর, সর্দি-কাশি ও শ্বাসকষ্ট ছিল তাঁদের। বাসাবাড়িতে মৃত্যুর পর অনেকেরই নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হচ্ছে। আবার একই ধরনের অসুস্থতা নিয়ে যাদের মৃত্যু হচ্ছে, কিন্তু পরীক্ষা করা হচ্ছে না, ধরে নেওয়া হচ্ছে তারা করোনা উৎসর্গ নিয়ে মারা গেছে। এ নিয়ে কোনো পর্যালোচনা হচ্ছে না। করোনাসংক্রান্ত সরকারের দৈনিক বুলেটিনেও নিশ্চিত করা হচ্ছে মৃতদের মধ্যে কতজন হাসপাতালে এবং কতজন বাড়িতে মারা গেছে। শয্যা খালি পড়ে থাকায় সরকার এরই মধ্যে করোনা রোগীদের চিকিৎসায় নির্ধারিত হাসপাতাল গুটিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে কেন প্রতিদিন করোনা আক্রান্ত বা উপসর্গ নিয়ে বাড়িতে মানুষের মৃত্যু হচ্ছে, তা নিয়ে সন্দেহ-সংশয় কাটছে না।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুরু থেকেই হাসপাতাল নিয়ে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল। সেই আতঙ্ক এখনো কাটেনি। করোনায় আক্রান্ত নয় এমন রোগীও হাসাতালে যেতে ভয় পাচ্ছে। সম্প্রতি রিজেন্ট হাসপাতালের ঘটনা কিংবা বেসরকারি হাসপাতালে অতিরিক্ত বিল আদায়ের ঘটনা মানুষকে হাসপাতালবিমুখ করে তুলেছে। কমিউনিটি পর্যায়ে তদারকি না করাও একটি বড় কারণ। আরেকটি হলো, বাড়িতে যারা মারা যাচ্ছে তাদের বেশির ভাগই বয়স্ক, যাঁরা হাসপাতালে যেতে চান না। অনেকেরই হাসপাতালে নেওয়ার মতো ব্যবস্থা নেই।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ হিসাব অনুসারে, গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত দেশে শুধু সরকারিভাবে করোনা রোগীদের চিকিৎসার জন্য নির্ধারিত (কভিড-১৯ ডেডিকেটেড) হাসপাতালে মোট সাধারণ শয্যার সংখ্যা ছিল ১৪ হাজার ৭২০। এ ছাড়া আইসিইউ শয্যা ছিল সরকারি প্রতিষ্ঠানে ৩৭৯টি। এর মধ্যে সাধারণ শয্যায় করোনায় আক্রান্ত রোগী ছিল চার হাজার ১৮৭ জন। আইসিইউ শয্যায় ছিল ২১৬ জন। অর্থাৎ ১০ হাজার ৫৩৩টি সাধারণ ও ১৬৩টি আইসিইউ শয্যা খালি পড়ে ছিল।

প্রায় এক সপ্তাহ আগে জ্বর-সর্দি ও শরীরের দুর্বলতাজনিত অসুস্থতায় মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার এক নারী (৫৫) স্থানীয় একজন চিকিৎসকের কাছে যান। হাকালুকি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের উপসহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার মোবারক হোসেন পলাশের ব্যবস্থাপত্র নেন ওই নারী। কিন্তু তাঁকে সিলেট যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন ওই চিকিৎসক। সিলেট না গিয়ে ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী বাড়িতে থেকে ওষুধ সেবন করছিলেন ওই নারী। অবস্থার অবনতি হওয়ায় বৃহস্পতিবার সিলেটে ইবনে সিনা হাসপাতালে ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ ডা. হাবিবুর রহমানকে দেখান তিনি। কারণ তাঁর ডায়াবেটিস ছিল। তিনিও প্রাথমিক পরীক্ষা শেষে তাঁকে করোনা পরীক্ষার পরামর্শ দেন। কিন্তু তিনি পরীক্ষা না করে হাবিবুর রহমানের দেওয়া ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী আবার ওষুধ নিয়ে বাড়ি চলে আসেন। এরপর গত শুক্রবার রাতে ওই নারীর শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়। পরে বড়লেখা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। করোনা পরীক্ষার জন্য তাঁর শরীর থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। করোনা স্বাস্থ্যবিধি মেনে তাঁর দাফনও হয়েছে। ওই বাড়িতে আরো দুজনের জ্বর-সর্দিসহ উপসর্গ রয়েছে।

নরসিংদীতে গত ১০ জুলাই নিজ বাড়িতে মারা গেছেন জয়নাল আবেদীন (৬৪) নামের এক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। তাঁর ছেলে বিল্লাল হোসেন বলেন, ‘আমার বাবা দীর্ঘদিন ধরে হৃদেরাগের রোগী। তাঁর বেশ কয়েকটি ব্লক ছিল। যেকোনো সময় তাঁর সুচিকিৎসার প্রয়োজন, এ চিন্তা থেকে গত ৯ জুলাই নরসিংদী করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালে নমুনা দিতে গিয়েছিলাম। তাঁর করোনা আক্রান্তের কোনো উপসর্গ

ছিল না। করোনার কোনো ওষুধ খাওয়ানো হয়নি। কিন্তু পরদিন সকালে বুকের ব্যথা নিয়ে বাবা মারা গেছেন।’

বেলাব উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. নজরুল ইসলাম বলেন, জয়নাল আবেদীন করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। পরীক্ষায় তাঁর করোনা পজিটিভ এসেছে। এখন হয়তো সামাজিক কারণে পরিবারটি করোনার বিষয় এড়িয়ে যাচ্ছে।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এ এস এম আলমগীর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মানুষ শুরুর দিকে যেমন আতঙ্কে হাসপাতালে দৌড়ঝাঁপ করেছে, এখন তাদের সেই আতঙ্ক অনেকটাই কেটে গেছে। সাধারণ উপসর্গ নিয়ে আর কেউ হাসপাতালে ছুটছে না। যারা বাড়িতে মারা যাচ্ছে তাদের ৯০ ভাগই বড় শহরের বাইরের এবং বয়স্ক মানুষ, যাঁদের আগে থেকেই বিভিন্ন রোগের জটিলতা রয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের দেশে গ্রামাঞ্চলে এখনো বয়স্ক অনেকের মধ্যেই হাসপাতালে যাওয়ার প্রতি এক ধরনের মানসিক অনাগ্রহ আছে। তারা বাড়িতে চিকিৎসায় বেশি স্বস্তি বোধ করে।’

গত ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্তের খবর জানায় সরকার। মৃত্যুর ঘটনা জানা যায় ১৮ মার্চ। এরপর বিভিন্ন সময় জ্বর, সর্দি-কাশি ও শ্বাসকষ্টে মৃত্যুর খবর সংবাদমাধ্যমে গুরুত্বসহকারে উঠে আসে। কথিত করোনা উপসর্গ নিয়ে মৃতের সংখ্যা দেড় হাজারের বেশি। এদের বেশির ভাগই বাড়িতে মারা গেছে। অন্যদিকে গত ২০ মে থেকে গতকাল শনিবার পর্যন্ত করোনায় বাড়িতে মৃতের সংখ্যা ৪১০। মে’র ২০-৩০ তারিখ পর্যন্ত ১৪ জন করোনায় আক্রান্ত হয়ে বাড়িতে মারা গেছে। জুনে মারা গেছে ২৫৬ জন। আর জুলাই মাসে গতকাল পর্যন্ত এ সংখ্যা ১৪০।

আরো খবর »