করোনাভাইরাসের পরীক্ষা নিয়ে বিভ্রান্তিতে বিদেশগামী যাত্রীরা

Feature Image

আকাশপথে বিদেশগামী যাত্রীদের জন্য করোনাভাইরাস পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করে এজন্য ১৬টি কেন্দ্র নির্দিষ্ট করে দেয়ার পর বিভ্রান্তি আর ভোগান্তিতে পড়েছে অসংখ্য বিমানযাত্রী।

কারণ বিদেশ যাত্রার আগে তাদের করোনাভাইরাসের নেগেটিভ সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক করা হলেও কোথায় তারা নমুনা দেবেন, তা জানা নেই। সরকারের পক্ষ থেকে রবিবার দুপুর পর্যন্ত বিষয়টি পরিষ্কার করা হয়নি।

যেসব কেন্দ্রের মাধ্যমে করোনাভাইরাস পরীক্ষা করানো যাবে বলে সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, সেগুলোর কয়েকটি প্রতিষ্ঠান থেকে জানানো হয়েছে যে, তারা কোন নমুনা সংগ্রহ করে না, শুধুমাত্র পরীক্ষা করে। কিন্তু কীভাবে নমুনা সংগ্রহ হবে, ফলাফল কীভাবে দেয়া হবে, সেটি তাদের জানা নেই।

কয়েকদিনের মধ্যেই বিদেশে যাওয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করতে হবে, এমন কয়েকশো মানুষ এসব প্রতিষ্ঠানে ভিড় করেও কোন তথ্য জানতে পারেননি।

তবে বিবিসি জানতে পেরেছে, জেলার সিভিল সার্জন অফিস নমুনা সংগ্রহের ব্যবস্থাপনায় থাকবে। যদিও এখন পর্যন্ত এসব নমুনা সংগ্রহের জন্য বুথ স্থাপন করা হয়নি।

সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী, বিমান যাত্রার ৭২ ঘণ্টা আগে পাসপোর্ট ও টিকেট দেখিয়ে নমুনা দিতে হবে এবং যাত্রার ২৪ ঘণ্টা পূর্বে রিপোর্ট ডেলিভারির ব্যবস্থা করতে হবে। ল্যাবে গিয়ে নমুনা প্রদানে ৩৫০০ টাকা ও বাড়ি থেকে নমুনা সংগ্রহে ৪৫০০ টাকা ফি ধার্য করা হয়েছে।

বাংলাদেশের রিজেন্ট হাসপাতালসহ কয়েকটি হাসপাতালে করোনাভাইরাসের পরীক্ষার ফলাফল জালিয়াতির অভিযোগ ওঠা এবং বাংলাদেশ থেকে যাওয়া যাত্রীদের মধ্যে করোনা পজিটিভ ব্যক্তি পাওয়ায় ঢাকার সাথে কয়েকটি দেশের বিমান চলাচল স্থগিত করার প্রেক্ষাপটে সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বিদেশগামী যাত্রীদের ভোগান্তি

ঢাকার বাসিন্দা আরিফুল ইসলামের যুক্তরাষ্ট্রের যাওয়ার কথা রয়েছে ২৩শে জুলাই। টিকেট কাটার পর একটি বেসরকারি হাসপাতাল থেকে তিনি নিজের ও তার স্ত্রীর করোনাভাইরাসের পরীক্ষা করিয়েছেন।

রবিবার তিনি গুলশানে একটি বিমান সংস্থার দপ্তরে এসেছেন জানার জন্য যে, তার আবার করোনাভাইরাসের পরীক্ষা করাতে হবে কিনা? তাহলে কোথা থেকে করাবেন?

বিবিসি বাংলার সংবাদদাতাকে তিনি বলছেন, ”শেষ সময়ে এসে এরকম একটি নির্দেশনা পেয়ে চিন্তায় পড়ে গেছি। একবার পরীক্ষা করিয়েছি, এখন আবার পরীক্ষা করাতে হবে। অথচ হাতে আছে আর মাত্র চারদিন। এর মধ্যে নমুনা দিয়ে ফলাফল পাবো কিনা, বুঝতে পারছি না। আর নমুনা কোথায় দেবো, সেটাও তো জানা নেই।”

সেই বিমান সংস্থাটি তাকে কোন পরামর্শ দিতে পারেনি।

এরপরে তিনি স্ত্রীকে নিয়ে মহাখালীর জনস্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের সামনে যান। সরকারি তালিকায় এখানকার ইন্সটিটিউট অব পাবলিক হেলথ রয়েছে।

নমুনা পরীক্ষা করানোর জন্য রবিবার এই ইন্সটিটিউটের সামনে ভিড় করেন প্রায় পাঁচশ মানুষ। তাদের সবার কিছুদিনের মধ্যেই বিদেশে যাত্রা করার কথা রয়েছে। কিন্তু করোনাভাইরাস পরীক্ষার ব্যাপারে তারা কোন রকম তথ্যই পাচ্ছেন না। কেউ তাদের পরিষ্কারভাবে কিছু বলতে পারছেন না। ফলে তারাও বুঝতে পারছেন না, নমুনা দেয়ার জন্য কোথায় যাবেন।

ইন্সটিটিউট অব পাবলিক হেলথের ভাইরোলজিস্ট খন্দকার মাহবুবা জামিল বিবিসিকে জানিয়েছেন, তাদের কাছে এখনো এই ব্যাপারে সরকারি নির্দেশনাটি আসেনি। শুধুমাত্র বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স থেকে একটি চিঠি পেয়েছেন। ফলে বিদেশগামী যাত্রীদের পরীক্ষা কীভাবে হবে, কে নমুনা নেবে, কীভাবে ফলাফল দেয়া হবে, সেসব বিষয়ে তাদের এখনো কিছু জানা নেই।

তিনি জানান, তারা নিজেরা কোন নমুনা গ্রহণ করেন না। তাদের কাছে নমুনা পাঠানো হলে তারা সেটা পরীক্ষা করে থাকেন। সেটাও দোহার, নবাবগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জ এলাকার রোগীদের।

বিবিসির একজন সাংবাদিক ঢাকার দুটি ল্যাবরেটরির সাথে যোগাযোগ করেও জানতে পারেননি, কোথায় নমুনা দেয়া যাবে। এসব ল্যাবরেটরি করোনাভাইরাসের নমুনা পরীক্ষা করলেও নিজেদের নমুনা গ্রহণের ব্যবস্থা নেই বলে জানানো হয়েছে।

বিদেশগামী যাত্রীরা কোথায় নমুনা দিতে পারবেন, কিভাবে সেটি সংগ্রহ হবে, সে বিষয়েও কোন তথ্য জানাতে পারেননি। অনেক যোগাযোগ করেও তিনি জানতে পারেননি, বিমান যাত্রার জন্য কোথায় নমুনা দেয়া যাবে।

আবার বিমান যাত্রীরা চাইলেই যেকোনো স্থান থেকে করোনাভাইরাসের পরীক্ষা করাতে পারছেন না। কারণ বিমানে যাত্রার ক্ষেত্রে পরীক্ষার জন্য ১৬টি ইন্সটিটিউট নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার।

এরকম একটি প্রতিষ্ঠান, ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারেল মেডিসিনের পরিচালক অধ্যাপক একেএম শামসুজ্জামান বিবিসিকে জানিয়েছেন, বিদেশযাত্রীদের পরীক্ষা করানোর ব্যাপারে তারা শুনেছেন, তবে এখনো প্রজ্ঞাপন পাননি। পেলে সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবেন।

তিনিও জানিয়েছেন, তাদের এখানে নমুনা গ্রহণ করা হয় না। শুধুমাত্র তাদের কাছে পাঠানো নমুনাই তারা পরীক্ষা করে থাকেন।

কোথায় নমুনা পরীক্ষা করানো যাবে

রবিবার দুপুর পর্যন্ত নমুনা পরীক্ষার জায়গা নির্ধারণ করতে পারেনি সরকার।

ঢাকাতেই কোথায় নমুনা দিতে পারবেন বিদেশ-গামী যাত্রীরা, সে বিষয়ে পরিষ্কার তথ্য নেই কারো কাছে।

সরকার নির্ধারিত ১৬টি প্রতিষ্ঠানে নমুনা পরীক্ষা করা হবে। কিন্তু সেখানে নমুনা দেয়া যাবে কিনা, তারা নমুনা না নিলে কোথায় দেয়া যাবে, এসব তথ্য পরিষ্কার নয় বিদেশগামী যাত্রীদের কাছে।

তবে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় থেকে শনিবার জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, বিদেশ গমনেচ্ছু যাত্রীরা কোভিড-১৯ পরীক্ষার নিমিত্তে নির্দিষ্ট করে দেওয়া পরীক্ষাগার যে জেলায় অবস্থিত সে জেলার সিভিল সার্জন অফিসে স্থাপিত পৃথক বুথে তাদের নমুনা প্রদান করবেন।

ঢাকা জেলার সিভিল সার্জন আবু হোসাইন মোঃ মাইনুল আহমেদ বিবিসিকে জানিয়েছেন, তারা সরকারের নির্দেশনা পাওয়ার পর নমুনা সংগ্রহের কয়েকটি স্থান নির্ধারণের কাজ শুরু করেছেন।

”আমরা আপাতত মহাখালীর পাশে ডিএনসিসি মার্কেটে নমুনা বুথ বসানোর কথা ভাবছি, যদিও এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বুথ স্থাপন করা হলে সেখানে নমুনা দিতে পারবেন বিদেশগামী যাত্রীরা।”

তিনি জানান, এসব স্থানে নমুনা দেয়া হলে তা সরকার নির্ধারিত প্রতিষ্ঠানগুলোয় পাঠিয়ে দেয়া হবে। সেখান থেকে ইমেইলের মাধ্যমে যাত্রীদের কাছে পরীক্ষার ফলাফল পৌঁছে যাবে।

বিশেষ ব্যবস্থাপনায় বিদেশগামী যাত্রীদের ক্ষেত্রে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এই ফলাফল প্রস্তুত করা হবে বলে তিনি জানাচ্ছেন।

ঠিক সময়ে ফলাফল পাবেন যাত্রীরা?

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের পরীক্ষায় নমুনা দেয়ার পর দীর্ঘদিন অপেক্ষা করার অভিযোগ রয়েছে। কোন কোন ক্ষেত্রে ফলাফল পেতে সাতদিনেরও বেশি সময় লেগেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এমন পরিস্থিতিতে নমুনা দেয়া সম্ভব হলেও মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তার ফলাফল পাওয়া যাবে কিনা, তা নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন বিমানযাত্রীরা।

হাবিবা আক্তার নামের একজন যাত্রী বলছেন, ”একবার পরীক্ষা করিয়েছি, তারপরে আবার নাকি পরীক্ষা করাতে হবে। কিন্তু কোথায় করবো, তাও তো ঠিকভাবে জানতে পারছি না। অনেকে নমুনা দিয়ে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে দেখেছি, রেজাল্ট পাননি। এখন আমরা টাকা খরচ করে নমুনা দেবো, সেটার ফলাফল কি বিমানে ওঠার আগে পাবো? দেখা গেল, ঠিক সময়ে নমুনা পেলাম না আর বিমানে উঠতে পারলাম না।”

কয়েকদিনের মধ্যে যুক্তরাজ্যে যাওয়ার কথা রয়েছে হাবিবা আক্তারের। শেষ মুহূর্তে স্বজনদের সঙ্গে সময় কাটানোর বদলে তিনি ব্যস্ত রয়েছে করোনাভাইরাসের নমুনা দেয়া নিয়ে।

তবে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমআইএস শাখার পরিচালক ডা. হাবিবুর রহমান বিবিসিকে বলছেন, ”ল্যাবগুলো যাতে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই ফলাফল দিয়ে দেয়, সেই ব্যবস্থা আমরা করবো। সেরকম ব্যবস্থাই নেয়া হচ্ছে।”

সারা দেশে বিদেশগামী যাত্রীদের করোনাভাইরাসের পরীক্ষার জন্য মাত্র ১৬টি প্রতিষ্ঠান নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার। কিন্তু অনেক জেলাতেই এসব পরীক্ষার কেন্দ্র নেই। ফলে সেসব জেলার বাসিন্দাদের এই পরীক্ষা করানোর জন্য আরেক জেলায় গিয়ে নমুনা দিতে হবে।

বিদেশ যাত্রার তিনদিন আগে এরকম নমুনা দেয়ার ব্যাপারটি তাদের জন্য আরেক ভোগান্তি তৈরি করতে বলে আশঙ্কা করছেন আফসার মিয়ার মতো অনেক বিদেশযাত্রী।

বরগুনার বাসিন্দা আফসার মিয়া বলছেন, ”যাওয়ার তিনদিন আগে আমার বাড়ি থেকে বরিশাল যেতে হবে নমুনা দিতে। বাসে বা গাড়িতে করে যাবো, তখন যে আমি আক্রান্ত হবো না, তার নিশ্চয়তা কে দেবে?”

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল হাসান ফেসবুকে লিখেছেন, বাংলাদেশের মতো দেশে একজন যাত্রীর জন্য সাড়ে তিন বা সাড়ে চার হাজার টাকায় করোনা পরীক্ষা করতে দেওয়াটা আসলেই চাপ। কারণ বাংলাদেশ থেকে মূলত যে শ্রমিকেরা দেশের বাইরে যায় এই কাজ করতে হলে তাকে শেষ মুহূর্তে অতিরিক্ত এই টাকা দিতে হবে। অধিকাংশ সময় তিনি যেহেতু এই কাজগুলো বোঝেন না হয়তো তিনি দালাল বা এজেন্সি ধরবেন। তাতে তার খরচ হবে ৫ থেকে দশ হাজার টাকা।

তবে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মোঃ আবদুল মান্নান বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ”আমরা আপাতত ১৬টি কেন্দ্র দিয়ে শুরু করলেও, পরবর্তীতে পরিস্থিতি দেখে হয়তো সেন্টারের সংখ্যা আরও বাড়ানো হবে। আমরা দেখবো যে আরও লাগবে কিনা। তখন হয়তো আরও দুই-চারটি বাড়ানোর চেষ্টা করা হবে।”

কিন্তু এতো কম সময়ের মধ্যে যাত্রীরা রিপোর্ট পাবেন কিনা, বিমানে উঠতে পারবেন কিনা, এই আশঙ্কার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলছেন, ”যাদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, তারা ৭২ ঘণ্টার আগেই রিপোর্ট দিয়ে দেবে, এটাই কথা। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই তাদের দেয়ার কথা, সেই ব্যবস্থাই করা হয়েছে।”

আরো খবর »