দেশে করোনার ধরন ‘বিপজ্জনক নয়’

Feature Image

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের যে ধরনটি দাপটের সঙ্গে সংক্রমণ ঘটিয়ে চলেছে, তা শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন দেশের বিজ্ঞানীরা। জিন রহস্য উন্মোচন করে তাঁরা বলছেন, একটি করোনাভাইরাসে এক হাজার ২৭৪টি প্রোটিন থাকে। এর মধ্যে ‘ডি৬১৪জি’ নম্বর প্রোটিনটি বাংলাদেশে সক্রিয় অর্থাৎ সংক্রমণের প্রধান কারণ। তবে আশার কথা হলো, করোনাভাইরাস মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ার জন্য দায়ী বিপজ্জনক প্রোটিনগুলো এখনো দেশে সক্রিয় হতে পারেনি।

বাংলাদেশ শিল্প ও বিজ্ঞান গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) জিনোমিক রিসার্চ ল্যাবের পক্ষ থেকে গতকাল রবিবার এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. আনোয়ার হোসেন এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারেল সেন্টারের পরিচালক এ কে এম শামসুজ্জামানসহ অন্যরা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, করোনাভাইরাসের ‘ডি৬১৪-জি’ প্রোটিন প্রথম ইউরোপে দেখা যায়। এখন ভারত, ইরান ও ব্রাজিলেও একই ধরনের প্রোটিন সক্রিয়। ভালো দিক হচ্ছে, দেশে ভাইরাসটির যতগুলো রূপান্তর বা মিউটেশন হয়েছে, এর মধ্যে আটটি খুবই ইউনিক, যা আমাদের এখানে টিকা তৈরিসহ অন্যান্য বিষয়ে খুবই সহায়ক হবে।

করোনাভাইরাসের জিনগত বৈশিষ্ট্য বের করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন দেশের বিজ্ঞানীরা। গত ১৬ জুলাই পর্যন্ত দেশের বিজ্ঞানীরা ২২২টি করোনাভাইরাসের সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স উন্মোচন করেছেন। এর মধ্যে ১৭১টি করোনাভাইরাসের পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্স করেছেন বিসিএসআইআরের জিনোমিক রিসার্চ ল্যাবের বিজ্ঞানীরা।

এই ২২২টি করোনাভাইরাসের পূর্ণাঙ্গ জিন রহস্য করোনাভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্সের উন্মুক্ত তথ্যভাণ্ডার জার্মানির গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ অন শেয়ারিং অল ইনফ্লুয়েঞ্জা ডাটা (জিসএআইডি) ও যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজিক্যাল ইনফরমেশনে (এনসিবিআই) প্রকাশিত হয়েছে। বিসিএসআইআর ছাড়া আরো ৯টি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান করোনাভাইরাসের জিন রহস্য উন্মোচনের গবেষণায় কাজ করছে।

বিসিএসআইআরের ডেজিগনেটেড রেফারেন্স ইনস্টিটিউট ফর কেমিক্যাল মেজারমেন্টস (ডিআরআইসিএম) ল্যাবে সংবাদ সম্মেলনে এর বিস্তারিত তুলে ধরেন জিনোমিক রিসার্চ ল্যাবের প্রধান মো. সেলিম খান। তিনি বলেন, ‘করোনাভাইরাসে এক হাজার ২৭৪টি প্রোটিন থাকে। এর মধ্যে ২১২ থেকে ৫২৩ পর্যন্ত হলো গুরুত্বপূর্ণ স্পাইক প্রোটিন। এর মধ্যে আমরা কোনো মিউটেশন পাইনি। ডি৬১৪-জি করোনাভাইরাসের যে স্ট্রেইনটি সিকোয়েন্সিংয়ে শনাক্ত হয়েছে, তা কিন্তু এর বাইরে পড়ছে। আমরা প্রত্যেকটি জিনোম সিকোয়েন্সে ডি৬১৪-জি করোনাভাইরাস স্ট্রেইনটি পেয়েছি।’ তিনি বলছেন, গবেষণায় দেখা গেছে যে বাংলাদেশে করোনাভাইরাস এরই মধ্যে তার জিনোমিক পর্যায়ে ৫৯০টি ও প্রোটিন পর্যায়ে ২৭৩টিরও বেশি রূপান্তর বা মিউটেশন ঘটিয়েছে। এগুলোর মধ্যে ৯৫ শতাংশ ক্ষেত্রে ডি৬১৪-জি প্রোটিনটি শনাক্ত হয়েছে, যাকে তাঁরা বাংলাদেশে সংক্রমণের প্রধান কারণ হিসেবে বলছেন।

সেলিম খান বলেন, ‘আমরা ২১২ থেকে ৫২৩ পর্যন্ত আটটি মিউটেশন পেয়েছি ইউনিক। এই মিউটেশনগুলো পৃথিবীর অন্য কোথাও ঘটেনি। আমাদের নজর রাখতে হবে, আমরা আরো ইউনিক মিউটেশন পাই কি না।’

সেলিম খান একটি সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, যেসব দেশে করোনা মহামারি আকারে ছড়িয়েছে সেসব দেশে করোনাভাইরাসের জিনে ৩৪৬ নম্বর থেকে ৫১২ নম্বর প্রোটিন মারাত্মকভাবে সক্রিয় ছিল, যা বাংলাদেশে এখনো দেখা যায়নি। এটা একটা স্বস্তির কথা। তবে করোনাভাইরাস যেহেতু দ্রুত রূপান্তর হয়, তাই বড় পরিসরে এর জিন রহস্য উন্মোচনের কাজটি অব্যাহত রাখা জরুরি। বিসিএসআইআরের বিজ্ঞানীরা সেটাই করছেন।

টিকা তৈরির ক্ষেত্রে এই গবেষণার গুরুত্ব তুলে ধরে সংবাদ সম্মেলনে সেলিম খান বলেন, যখন কোনো ওষুধ, টিকা তৈরি করা হবে তখন এসব মিউটেশন মাথায় রেখে করতে হবে।

সেলিম খান জানান, বিসিএসআইআরের বিজ্ঞানীরা করোনাভাইরাসের পাশাপাশি কভিড-১৯ রোগীর নমুনায় সহাবস্থায় অন্য আরো রোগ সংক্রামক জীবাণু বা প্যাথোজেনের উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন। এই পর্যায়ে বিজ্ঞানীদল সেই জীবাণুগুলোর উপস্থিতিতে সংক্রমণের তীব্রতার সম্ভাব্য যোগসূত্র খুঁজে বের করতে গবেষণা চালাচ্ছেন। এ ছাড়া বিসিএসআইআরের বিজ্ঞানীরা কভিড রোগীর নমুনায় অন্যান্য মাল্টি ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট জিনের উপস্থিতি শনাক্ত করতে সমর্থ হয়েছেন বলে জানান তিনি।

আরো খবর »