চিকিৎসাসেবার নামে মুনাফা লোটা ব্যবসা

Feature Image

দেশে গত কয়েক দশকে প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসাসেবা পরিণত হয়েছে মুনাফা লোটা ব্যবসায়। বেসরকারি পর্যায়ে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়েছে শত শত প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। এর বেশির ভাগই ধার ধারে না সেবার মান বা নীতিনৈতিকতার। অবৈধ কৌশলে, জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে রোগীদের পকেট কাটায় এই খাত এতই লাভজনক হয়ে উঠেছে যে অন্য খাতের ব্যবসায়ীরাও পুরনো ব্যবসা বাদ দিয়ে নেমে গেছেন হাসপাতাল ও ক্লিনিক প্রতিষ্ঠায়। লাভের আরো দিক এর সঙ্গে যুক্ত থাকে ওষুধের ব্যবসাও। সরকার হাজার হাজার প্রতিষ্ঠানের অনুমতি বা নিবন্ধন দিলেও ঠিকমতো করেনি নজরদারি। সাম্প্রতিক রিজেন্ট-জেকেজির কুকীর্তি ফাঁস, সর্বশেষ শাহাবুদ্দিন মেডিক্যালের বিরুদ্ধে র‌্যাবের তোলা অভিযোগে হতভম্ব হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল শাখার কর্মকর্তারা বছরের পর বছর এসব দেখেও দেখেননি। অনেক প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় জড়িত প্রভাবশালী চিকিৎসকরাও। অপকর্মের জন্য তাঁরা যেমন দায়ী, তেমনি সেবার শপথ নেওয়া চিকিৎসকদের যাঁরা এসব প্রতিষ্ঠানে চাকরি সূত্রে জড়িত তাঁরাও এসবের দায় এড়াতে পারেন কি না সেই প্রশ্নও ওঠে।

একাধিক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ কালের কণ্ঠ’র জিজ্ঞাসার জবাবে নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেছেন, দুর্নীতির মাধ্যমে চিকিৎসাসেবাকে ব্যাপক লাভজনক ব্যবসা হিসেবে প্রসার ঘটাতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে একাধারে স্বাস্থ্য প্রশাসন ও এক শ্রেণির চিকিৎসকদের সম্মিলিত সিন্ডিকেট। দুর্নীতির মূলে স্বাস্থ্য প্রশাসনের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি চিকিৎসা ব্যবসায় নেমে পড়া একদল ব্যবসায়ীর অনৈতিক ও অসাধু মানসিকতা যেমন আছে, তেমনি সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে থাকা চিকিৎসকদের দায়ও কম নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন সবচেয়ে জরুরি হয়ে পড়েছে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা খাতে কাঠামোগতভাবেই বড় সংস্কারের। প্রয়োজনে আলাদা স্বাস্থ্য কমিশন গঠন, জনবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা আইন প্রণয়ন। তা না হলে সামনে পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়ে উঠতে পারে।

স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতির বিষয়ে দেরিতে হলেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কিছুটা টনক নড়া দেখা যাচ্ছে। গতকাল সোমবার দুপুরে মন্ত্রণালয়ে এক সভায় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. আব্দুল মান্নান জানিয়েছেন, স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি বন্ধে দ্রুত সময়ের মধ্যে একটি টাস্কফোর্স গঠন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ ই মাহবুব কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চিকিৎসা হচ্ছে সেবার ব্যাপার। কিন্তু এই সেবা এখন ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। ফলে এই খাতে দুর্বৃত্তায়ন ঘটেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের ভেতরে থাকা দুর্বৃত্তচক্র বাইরের চক্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পুরো চিকিৎসা খাতকে বলি দিচ্ছে; যার ভেতরে আমাদের চিকিৎসকদেরও দায় আমরা এড়াতে পারি না।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতির অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চিকিৎসা খাতে সুশাসন কার্যকর করতে হলে এখন সবচেয়ে জরুরি হয়ে পড়েছে কাঠামোগত আমূল সংস্কার। শুধু কিছু অনিয়ম দূর করতে অভিযান চালিয়ে স্থায়ী কোনো সমাধান হবে না। এতে সাময়িক সুরাহা হতে পারে; কিন্তু পরে আবার আগের চেয়েও বহু মাত্রায় বেড়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে আমি মনে করছি, মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে একেবারে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত ধাপে ধাপে চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় থাকা কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ভাগ করে দিতে হবে। এসব জায়গায় যে ধাপগুলোতে চিকিৎসকরা রয়েছেন, তাঁদের কাউকে শুরু থেকেই চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে, তাঁদের রোগী দেখার দায়িত্বে রাখা যাবে না। আবার যাঁরা রোগী দেখবেন কিংবা মেডিক্যাল কলেজে চিকিৎসাশিক্ষা পড়াবেন, তাঁদের কোনোভাবেই চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার কোনো পদে বসানো যাবে না।’ সেই সঙ্গে প্রতিটি ক্ষেত্রে কঠোর নজরদারি কার্যকর করার জন্য ওপর থেকে একটি কমিশন দায়িত্ব পালন করলে দুর্নীতির মাত্রা যেমন কমবে, তেমনি বিশৃঙ্খলা ও অনিয়মের সুযোগও বন্ধ হয়ে যাবে বলে মনে করেন অধ্যাপক ড. হামিদ।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, দেশে এ পর্যন্ত প্রায় এক লাখ প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে দেশজুড়ে। এর মধ্যে প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিক রয়েছে সাড়ে ১৫ হাজার। বাকি সব কটি বিভিন্ন ধরনের ডায়াগনস্টিক সেন্টার, যার প্রায় ৮০ শতাংশ গড়ে উঠেছে গত ২০ বছরে। এর অর্ধেক আবার হয়েছে ১০ বছরের মধ্যে। অন্যদিকে সরকারি হিসাবে দেশে ফার্মেসির সংখ্যা এক লাখ হলেও অনুমোদনহীন বহু ফার্মেসি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। বেশির ভাগই নিয়ম-নীতির কোনো তোয়াক্কা না করে চালাচ্ছে শুধু ব্যবসা। এ ক্ষেত্রেও পর্যাপ্ত মনিটরিংয়ের অভাবে অবৈধ ও অনৈতিক তৎপরতা টিকে থাকছে। এ ব্যর্থতার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কিংবা ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর পর্যাপ্ত জনবল না থাকার অজুহাত দিয়ে যাচ্ছে বছরের পর বছর। সঙ্গে চিকিৎসকদের সরাসরি প্রশ্রয়, সহযোগিতা ও তদবির ওই অনিয়মকে আরো ফুলে-ফেঁপে উঠতে সহায়তা করছে। ক্ষেত্রবিশেষ কর্তৃপক্ষ জোরালো কোনো পদক্ষেপ নিতে গেলে চিকিৎসকদের ভেতর থেকেই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ বাধার সৃষ্টি হয় বলেও জানায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো; যদিও চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা আমলাদের দায়ী করা হয় স্বাস্থ্য খাতে অব্যবস্থাপনা টিকে থাকার জন্য।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. আমিনুল হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সারা দেশে যত হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে, তা পর্যাপ্ত মাত্রায় মনিটরিংয়ের সক্ষমতা আমাদের নেই। ঢাকায় মাত্র তিনজন কর্মকর্তা কাজ করছি হাসপাতাল শাখায়। কিন্তু ঢাকাতেই প্রতিষ্ঠান রয়েছে প্রায় ৩০ হাজার।’

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য-উপাত্ত ঘেঁটে দেখা যায়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিটি শাখায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। মহাপরিচালক থেকে শুরু করে অতিরিক্ত মহাপরিচালক, পরিচালক, উপপরিচালক, সহকারী পরিচালক, প্রকল্প পরিচালক, বিভিন্ন কর্মসূচির ব্যবস্থাপক, উপব্যবস্থাপকসহ প্রতিটি পদেই যাঁরা আছেন তাঁরা সবাই চিকিৎসক। সরকারি প্রতিটি হাসপাতালের পরিচালক-উপপরিচালকরাও চিকিৎসক। অন্যদিকে প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিকানা থেকে শুরু করে পরিচালনার ক্ষেত্রেও কোনো না কোনো পর্যায়ে চিকিৎসকদের সংশ্লিষ্টতাই বেশি। খুব কমসংখ্যক হাসপাতাল, ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার আছে, যার মালিকানা, পরিচালনা বা ব্যবস্থাপনার সঙ্গে চিকিৎসক নেই। তবে ওই সব প্রতিষ্ঠানেও চিকিৎসকরা নিয়মিত দায়িত্ব পালন করেন। ফলে তাঁদেরও নৈতিক দায় রয়েছে তাঁর কর্মস্থলে অন্যায়-অনিয়মের বিষয়ে নজরদারির।

সুশাসন নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাস্থ্য বা চিকিৎসা খাতে চিকিৎসকদের কর্তৃত্ব থাকবে, এটি স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের দেশের বাস্তবতায় চিকিৎসকদের বড় একটি অংশ এখন আর চিকিৎসাকে সেবা মনে না করে ব্যবসা হিসেবে বেছে নিয়ে নিজেদের নানা অনিয়ম ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে ফেলেছে। সেবার নামে তারা হাসপাতাল তৈরি বা পরিচালনা, ব্যবস্থাপনায় নিজেদের যুক্ত করলেও যেনতেনভাবে অর্থ উপার্জনের জন্যই প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করছে। এ ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সময়ে বহুল আলোচিত রিজেন্ট হাসপাতালের মালিকানায় এখনো কোনো চিকিৎসকের নাম বেরিয়ে না এলেও সেখানে করোনা পরিস্থিতির আগে যে চিকিৎসকরা ছিলেন, তাঁরাও এর দায় এড়াতে পারেন না।

শাহাবুদ্দিন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যে চিকিৎসকরা বছরের পর বছর দায়িত্ব পালন করেছেন কিংবা অন্য আরো যে হাসপাতালগুলোতে অনিয়ম চলছে, সেগুলোতে যাঁরা চিকিৎসক হিসেবে রয়েছেন তাঁরা নিজেদের পেশাকে অবৈধ চক্রের সঙ্গে যুক্ত করে নিয়েছেন। সেই সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে যে চিকিৎসকরা আছেন, তাঁরাও ওই চক্রকে সহায়তা করেছেন বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার মাধ্যমে। চিকিৎসক সংগঠনগুলোও অনেক সময়ই এসব চক্রকে টিকিয়ে রাখার জন্য তদবির করে বেড়িয়েছেন।

আরো খবর »