কোরবানির আগেই ল্যাম্পি রোগে লক্ষাধিক গরু আক্রান্ত

Feature Image

কোরবানির বাকি আর ১০ দিনের মতো; কিন্তু করোনা পরিস্থিতির কারণে এবার এখনো কোরবানির পশুর তেমন একটা বিক্রি নেই। আবার অনেক জেলায় বন্যার কারণে ক্রেতা-বিক্রেতা সবাই বিপাকে। এর সঙ্গে দেখা দিয়েছে পশুর ‘ল্যাম্পি স্কিন ডিজিজ’ (এলএসডি)। ভাইরাসজনিত এ চর্মরোগে দেশের বিভিন্ন এলাকায় লক্ষাধিক গরু আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এ রোগের কোনো প্রতিষেধক না

থাকায় অনেকটা চিকিৎসা ছাড়াই মারা যাচ্ছে গবাদি পশু। ফলে কোরবানির ঠিক আগ মুহূর্তে গরু নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন খামারিরা। রংপুর অফিস, ঠাকুরগাঁও, শেরপুর, গাইবান্ধা ও গফরগাঁও (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধির পাঠানো খবর :

রংপুরেই এক লাখ আক্রান্ত

রংপুর বিভাগের আট জেলায় ল্যাম্পিভাইরাসে এরই মধ্যে সহস্রাধিক গরুর মৃত্যু হয়েছে। তা ছাড়া আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়েছে এক লাখ। রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার কোলকোন্দ, সদর উপজেলার মমিনপুর, তারাগঞ্জ উপজেলার ইকরচালিসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে খামারি ও কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেকেই গবাদি পশুর এই রোগ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন। তারাগঞ্জের ইকরচালি গ্রামের আব্দুল হক জানান, তাঁর তিনটি গরু চর্মরোগে আক্রান্ত হয়েছে। ফলে কোরবানির হাটে খুব একটা দাম পাবেন না তিনি।

রংপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এ এস এম সাদেকুর রহমান বলেন, ‘অফিসে প্রতিদিনই চিকিৎসার জন্য অজানা রোগে আক্রান্ত গরু নিয়ে আসছেন খামার মালিক ও কৃষকরা। আমরা যথাসাধ্য চিকিৎসা দিতে চেষ্টা করছি।’

রংপুর বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ডা. হাবিবুল হক জানান, এ রোগের প্রকৃত কোনো ওষুধ নেই। সাধারণত মশা-মাছির মাধ্যমে এ রোগ ছড়ায়।

ঠাকুরগাঁওয়ে মারা গেছে অর্ধশত গরু

ঠাকুরগাঁওয়েও এ রোগটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এরই মধ্যে জেলায় প্রায় অর্ধশত গরু মারা গেছে। আক্রান্ত হয়েছে অন্তত আড়াই হাজার। তবে এর মধ্যে দুই হাজার পশুকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ৩৫ হাজার ৫০০ গরুকে টিকা প্রদান করা হয়েছে।

সদর উপজেলার নিশ্চিন্তপুর শাহপাড়া আরডিআরএস মোড় এলাকার মাসুমা খানম জানান, তাঁর দুটি গরুর শরীরে হঠাৎ করেই গুটি গুটি বলের মতো বের হয়েছে। স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা করিয়েও তিনি তেমন সুফল পাচ্ছেন না।

ঠাকুরগাঁও জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা কৃষিবিদ আলতাফ হোসেন বলেন, প্রাথমিকভাবে আক্রান্ত পশুর লক্ষণ অনুযায়ী প্যারাসিটামল, অ্যান্টিহিস্টামিন, সোডা ও গোট পক্স ভ্যাকসিন প্রয়োগে ইতিবাচক ফল পাওয়া যাচ্ছে। আক্রান্ত পশু সুস্থ হতে দেড় থেকে দুই মাস সময় লাগতে পারে। এ ছাড়া রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য গরুকে জিংক ও ভিটামিন সি খাওয়ানোর জন্য খামারিদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

শেরপুরে ৩০-৪০ শতাংশ গরু আক্রান্ত

শেরপুরের কৃষক ও খামারিরা জানান, দুই-তিন মাস ধরে এ ধরনের রোগে আক্রান্ত হচ্ছে গরু। ফলে চিকিৎসা ও পরিচর্যা করাতে গিয়ে আর্থিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়ছেন তাঁরা। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসা দিয়েও কোনো কাজ হচ্ছে না।

স্থানীয় পশু চিকিৎসকদের মতে, জেলায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ গরু এ রোগে আক্রান্ত হয়েছে। জেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের হিসাব মতে, শেরপুরে মোট গরুর সংখ্যা চার লাখ। এর মধ্যে ল্যাম্পি স্কিন ডিজিজে আক্রান্ত হয়ে ১৬টি গরু মারা গেছে। তা ছাড়া প্রায় সাড়ে তিন হাজার গরু এ রোগে ভুগছে।

শেরপুরের নকলা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আবুল খায়ের মো. আনিসুর রহমান বলেন, মূলত এটি একটি পক্স ভাইরাস। মশা ও মাছিকে এই ভাইরাসের প্রধান বাহক হিসেবে দায়ী করা হয়। তবে অন্যান্য কীটপতঙ্গের মাধ্যমেও ভাইরাসটি ছড়াতে পারে। আক্রান্ত গরুর লালা, গোখাদ্য কিংবা খামার পরিচর্যাকারী ব্যক্তির কাপড়ের মাধ্যমে এ রোগ ছড়াতে পারে।

শেরপুর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আব্দুল হাই বলেন, এ বিষয়ে খামারি ও কৃষকদের সচেতন করতে নানা পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে চিকিৎসা দেওয়া ছাড়াও মেডিক্যাল টিম গঠনের মাধ্যমে এলাকায় এলাকায় ক্যাম্প করে গরুকে ‘জিপিভি ভ্যাকসিন’ (গোট পক্স ভ্যাকসিন) দেওয়া হচ্ছে।

গাইবান্ধায় আক্রান্ত পাঁচ শতাধিক

গাইবান্ধায় এ পর্যন্ত ৫০৮টি গরু এই রোগে আক্রান্ত হয়েছে। এ ব্যাপারে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আব্দুস ছামাদ জানান, আটটি ভেটেরিনারি টিম আক্রান্ত এলাকায় গিয়ে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছে। জেলার ৩৪ হাজার গরুর শরীরে টিকা দেওয়ার কাজ চলছে। কোরবানির পশুর হাটে এই রোগের তেমন একটা প্রভাব পড়বে না। কারণ ল্যাম্পি স্কিন ডিজিজে আক্রান্ত হচ্ছে মূলত গাভি ও বাছুর। তবে কোনো গরুর শরীরে এ রোগের লক্ষণ দেখা দিলে হাটে না নিতে বলা হচ্ছে।

গফরগাঁওয়েও প্রাদুর্ভাব

ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়েও এ রোগের ব্যাপক প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে কয়েকটি গরু মারা গেছে। উপজেলার পাগলা থানাধীন লংগাইর ইউনিয়নের কাঁজা গ্রামের কৃষক মাইনুদ্দিনের পাঁচটি গরু এ রোগে আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি গরু মারা গেছে। তিনি বলেন, কোরবানির ঈদে বিক্রির জন্য প্রায় ৯০ হাজার টাকা মূল্যের একটি ষাঁড় বড় করেছেন। কিন্তু ষাঁড়টি চর্মরোগে আক্রান্ত হওয়ায় বিক্রি নাও হতে পারে।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ মামুনুর রহমান বলেন, ‘এই রোগের ভ্যাকসিনের চাহিদা অনেক। কিন্তু আমরা চাহিদা অনুযায়ী পাচ্ছি না। ফলে চিকিৎসা দিতে গিয়ে কিছুটা অসুবিধা হচ্ছে। তবে রোগটি যেহেতু মশা-মাছিবাহিত, তাই খামারিদের গোয়ালঘরে মশারি ও কয়েল ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।’

আরো খবর »